।। অবশেষে ফিরে আসা ।।

39

মানুষটার বয়স ষাট বছর। এখন পর্যন্ত তার কপালে সিজদাহর কোন চিহ্ন নেই। হবেই বা কি করে? মুসলিম দেশে, মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও জীবনে কোনদিন সে আল্লাহ্‌র সামনে সিজদাহয় মাথা অবনত করেনি। কোনদিন সলাত আদায় করেনি, এমনকি এক ওয়াক্তও না। তার ছিল দুই সন্তান। মহান আল্লাহ্‌ তাদেরকে হিদায়াত দিয়েছিলেন। তারা বিশ বছর বয়স থেকেই ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মেনে চলত। প্রতিনিয়ত সলাত আদায় করত। তারা তাদের পিতাকে দাওয়াহ দিত। ফিরে আসার দাওয়াহ, আল্লাহকে সিজদাহ করার দাওয়াহ। তারা বিভিন্নভাবে দাওয়াহ দিত, বারবার নাসীহাহ দিত। কিন্তু সে তার সন্তানদের কথা কানে নিত না। তার ভিতরে এক ধরনের অহংবোধ কাজ করত। সে ভাবত, বাচ্চা ছেলেরা আমার চাইতে কতটুকই বা বোঝে। তার এই গর্ব ছেলেদের সামনে সে কোনদিনই খর্ব করতে চাইত না। একটা বেশী জানা ভাব নিয়ে থাকত সবসময়।

.
একদিন তার বড় ছেলে তাকে কোন একটা বিষয়ে নাসীহাহ দিতে গেলে তার গালে দাঁড়ি দেখে সে বলেছিল, “তুমি শেইভ কর না কেন, এটা কেটে ফেল না কেন?”। বাবার মুখে এমন কথা শুনে সে যারপর নাই আশ্চর্যান্বিত বোধ করল। সে তার মুখের উপর বলেই ফেলল, “আমার ভয় হয় আপনি জাহান্নামে যাবেন, আমার ভীষণ ভয় হয় আপনি জাহান্নামে যাবেন।”
.

অনেক সময় দাওয়াহ দিতে গিয়ে আমরা খেই হারিয়ে ফেলি, আমাদের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করে ফেলি। তার ছেলের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটিই হয়েছে। আসলে দ্বীনের কোন বিধিবিধানের ব্যাপারে কেউ মশকরা করলে মাঝে মাঝে মেজাজ গরম হয়ে যায়। এটা অবশ্য দ্বীনের প্রতি ভালবাসা থেকেই হয়।
তবে এ কথা বলায় কাজের কাজটি ঠিকই হল। খুব ভাল মতই হল। বরফ গলতে শুরু করল। ভয়ংকর এই কথাটি তার বাবার বুকে তীরের মত গিয়ে বিঁধল। সে কী কী যেন ভাবতে লাগল, তার মধ্যে কিছু একটা ভাবনার উদ্রেক হল।

.
সুবহানাল্লাহ! ঠিক এর কয়েক মাস পর…

.
তার বাবা গুটিগুটি পায়ে মাসজিদের দিকে পা বাড়াল। জীবনে প্রথমবারের মত সলাত আদায় করল। সলাতে যে ইমামতি করল সে আর কেউ নয়, তারই সন্তান। সে জানত না যে তার বাবা আজ মাসজিদে এসেছে। অন্যান্য মুসল্লিগণ সলাত শেষে তাকে ব্যাপারটা জানালে সবার সামনে সে নিজেকে সংযত রাখল, তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না, কারণ সে জানত কিছু একটা বলতে গেলেই তার বাবার ভিতরে থাকা অহংবোধ জেগে উঠতে পারে। ভরা মজলিসে সে তার বাবার সাথে কোন কথাও বলল না। সে শুধু এতটুকুই বলল, “তিনি হয়ত পথ খুঁজে পাবেন, তিনি যা করছেন তা তাকে করতে দিন।” সে এতটুকু বলেই চুপ হয়ে গেল।
.

এই লোক দিনে আশিটা সিগারেট খেত। একটা নয়, দুইটা নয়, আশিটা সিগারেট। একদিন সে সিদ্ধান্ত নিল সে আর সিগারেট খাবে না।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সে অনেকগুলো ইসলামী হালাকায় বসেছে, আল্লাহ্‌র বাণী ও রাসূল ﷺ এর হাদীস শুনেছে। কার মুখে শুনেছে? তার ছেলের মুখে শুনেছে। মাসজিদের মাঝখানে যে খুঁটি থাকে তার পিছনে লুকিয়ে লুকিয়ে সে এতদিন তার ছেলের মুখে আল্লাহ্‌র বিধিবিধান শুনেছে। ছেলের মুখে দ্বীন ইসলামের বিভিন্ন বিধিবিধান শুনতে শুনতে কবেই যেন তার মুগ্ধশ্রোতা বনে গেছে। এখন তার আক্বিদায় পরিবর্তন এসেছে, চিন্তা ভাবনা পাল্টে গেছে, জীবনের উদ্দেশ্যই যেন বদলে গেছে। সে বুঝে গেছে, যে জীবন সে পার করে এসেছে সেটা আসলে জীবন নয়, সে এতদিন অনর্থক সময় পার করে এসেছে। এখন যে জীবনে সে আছে সেটাই আসলে জীবন, এক সুন্দরতম প্রশান্ত জীবন, মাসজিদে সময় পার করার নামই জীবন, আল্লাহ্‌র সাথে সম্পর্ক রাখার নামই জীবন। এভাবেই সে মিষ্টি এক জীবনের স্বাদ পেয়ে গেল, বেঈমানীর তিতা জীবন ফেলে দিয়ে, মিষ্টি এক ঈমানের স্বাদ পেল।

.
সে গোপনে, নিভৃতে, আড়ালে থেকে তার ছেলের বয়ান শুনত। এমনকি বাজার থেকে তার ছেলের বিভিন্ন সিডি কিনে নিয়ে আসত। বাসায় বসে বসে তার বয়ান শুনত। অবশেষে একদিন সে সিগারেট খাওয়া একদমই ছেড়ে দিল। আমরা অনেকেই আমাদের বিভিন্ন ধরনের বদঅভ্যাস ছেড়ে দিতে পারিনা। আমরা সেই ভয়ঙ্কর পথ থেকে বের হয়ে আসতে পারিনা। সিগারেট, মদ, পর্ণ, বিভিন্ন রকমের জ্বিনার মত মরণ নেশা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারিনা। অনেক সময় ধূমপানের চেয়েও এই নেশাগুলি আরও বেশী ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে।

অবশেষে সে ধূমপান ছেড়ে দিল। সিগারেটের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া নয় বরং পুরাদমে ছেড়ে দিল সে। দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে নিজেকে ধিক্কার দিল। “যথেষ্ট হয়েছে” বলে নিজের প্রতি কঠোর হল। এভাবেই দিনে আশিটি সিগারেট পৌঁছে গেল শূন্যের কোঠায়। যখন কারো অন্তর আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে সংযুক্ত হয় তখন দুনিয়ার যাবতীয় মোহ তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়। যখন জান্নাতের আশা আর জাহান্নামের ভয় মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায় তখন দুনিয়ার মিষ্টতা তিক্ততায় পরিণত হয়।

.
এখন তার বাবার বয়স ৭৩ বছর। সে সিগারেট ছেড়ে দেয় ৬৮ বছর বয়সে। এবং আমার পরিচিত জ্ঞানী মানুষের তালিকায় যারা আছে তার মধ্যে সে-ও একজন। ৬৮ বছর বয়সে তার জীবনের মোড় ঘুরে গেছে। এই সময়ের মধ্যে তাফসীরে ইবন কাছির পনের বারের বেশী পড়া হয়েছে তার। বিশ খন্ডের তাফসীরে ইবনে জারীর আত-তাবারী তার দশবারের বেশী পড়া হয়েছে। সে বেশ কয়েকবার ইবনে জারীর আত-তাবারীর ইতিহাস পড়েছে। আলবানী (রহ) এর ত্রিশ খন্ডের সিলসিলা আস-সহীহাহও পড়ে ফেলেছে। সে উপরের সমস্ত কিতাব এই পাঁচ বছরে পড়ে শেষ করে ফেলেছে। এখন কেউ যদি তার পাশে বসে, তার মুখ দিয়ে আর সিগারেটের গন্ধ আসেনা, বরং ইলমের সুগন্ধময় কথা বের হয়ে আসে। যেন তেন ইলম নয়, কুরআন ও হাদীসের গভীর ইলম।

অনেক সময় যুবক ভাইদের মুখে ইলম অর্জন কঠিন বলতে শোনা যায়। তাহলে এই লোকের ব্যাপারে কী বলবেন? এই বৃদ্ধ বয়সেও কীভাবে তার স্মৃতিশক্তি এত প্রখর হয়, যা তাকে পরিণতি করেছে জ্ঞানে পরিপক্ক এক তলিবুল ইলমে?
.
____________________________

এই সত্য ঘটনাটি “তাওবাহর গল্প” বই থেকে নেওয়া। অনেক সময় নরম দাওয়াতে কাজ না হলেও শক্ত দাওয়াতে কাজ হয়। জান্নাতের সুসংবাদ যেমন আশা যাগায়, তেমনি মৃত্যু, কবর ও জাহান্নামের খবর মনে ভয় জাগায়। এই নরম ও গরম দাওয়াতেই মানুষ ফিরে আসে সীরাত্বুল মুস্তাকীমে।
.

সম্প্রতি মাহমুদ তাসের নামক এক নাস্তিক, মুক্তমনা সাংবাদিক শেষ বয়সে দ্বীনে ফিরে এসেছেন। মৃত্যুর ভয়ে, জাহান্নামের ভয়ে তাওবাহ করেছেন। অনলাইনে এসে জানান দিচ্ছেন সেই তাওবাহর ঘটনা। নিজের প্রতি অনুশোচনায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন। মানুষ আসলে নিজেকে ধোঁকা দিতে পারেনা, অন্যকে ধোঁকা দিলেও সে জানে আমি কি করছি।
.
সে যাই হোক, এখন তিনি পাঁচওয়াক্ত সলাত আদায় করছেন। পাক্কা মুসলিম হবার আকুল প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফালিল্লাহিল হামদ। তাওবাহর গল্পের এই গল্পটি উনার জন্য। মহান আল্লাহ উনার তাওবাহকে কবুল করে নিন।
.
মহান আল্লাহ বলেন,

“”তবে যে তাওবাহ করে, ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, ফলে আল্লাহ্‌ তাদের গুনাহসমূহ নেকী দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল,পরম দয়ালু। আর যে তাওবাহকরে ও সৎকাজ করে, সে তো সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্‌র অভিমুখী।” (আল ফুরক্বান, আয়াতঃ ৭০-৭১)

.

#বেলা_ফুরাবার_আগে

Facebook Comments