অশ্রুসিক্ত ইফতার!

40

অশ্রুসিক্ত ইফতার!

প্রতিদিনের মতো আজও আমি একাকি ইফতার করতে বসলাম আর হতাশার চোখে দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম ।

ইফতারির সময় হলেই দরজাটা লাগিয়ে দিতে হয় কারণ দরজার ওপাশে রয়েছে আমার বাবা-মা রুম,তারা মুশরিক। আমাকে নামাজ পড়তে দেখলে, রোজা রাখতে দেখলে নানা কটু কথা বলে। যা আমার বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। এজন্য আমি দরজা বন্ধ করে সব করি।একই ঘরে বসবাস করে তাওহীদ আর শিরক। মাঝে আড়াল হয়ে দাড়িয়ে আছে কাঠের দরজাটা ।

প্রায়ই ভাবি কবে, আজই দরজাটা খুলে আমার বাবা-মা আমার সাথে বসে ইফতার করবে। পরে আমার মা বলবে “চল পাগলা , নামাজ পড়ে নিই”
মা আমাকে আদর করে ‘পাগলা’ বলে ডাকে , ছোটবেলা থেকে দুষ্টুমি করতাম তাই আমার ইসলাম গ্রহণও তাদের কাছে আমার পাগলামির একটা অংশ মনে হল ।

ছোটবেলায় মা আমাকে গির্জায় নিয়ে যেতো। আমি থাকতে চাইতাম না একদম। তো বাবা আমাকে বলে ছোট বেলা থেকেই আমার ভিতর শয়তানী আছে , তাওহীদের বীজ হয়ত আল্লাহ ছোট থেকেই আমার ভেতরে বপন করে দিয়েছিলেন ।

ছোট বেলা থেকেই খুব অসুস্থ থাকতাম দেখতাম মা সারারাত জেগে আমার সেবা করছে ,হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছে, সারারাত না খেয়ে থাকতো , গির্জাতে বসে আমার জন্য প্রার্থনা এবং বিভিন্ন মানত করতো।

আমি ছিলাম আমার মায়ের কলিজার টুকরা কিন্তু সেই আমি যখন বললাম “আল্লাহ এক, রসূল ﷺ হলেন আমার শেষ নবী” তখন থেকেই শুরু হলো আমার ওপর তাদের উপর মানসিক নির্যাতন, ভাবতেই অবাক লাগে, যে মা আমাকে ছাড়া খাবার মুখে দিত না ! সেই মা ই ইসলাম গ্রহণের অপরাধে নিজের কলিজার টুকরাকে জঙ্গি বানিয়ে জেলে পাঠাতে চেয়েছিল। আমার নানা RAB এর বড় পদে কাজ করেন। তাকে দিয়ে চেষ্টা করেছিল।

যাইহোক এখানে পোস্ট করার উদ্দেশ্য তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কিংবা মানুষের সহানুভূতি পাওয়া নয়, বরং পোস্ট করার উদ্দেশ্য আপনাদের উপর আল্লাহর নিয়ামতগুলো মনে করিয়ে দেয়া ।

আপনাদের সবারই একটা পরিবার আছে। মা বাবা আছে। সবার সাথে একত্রে বসে সাহরী ইফতার করতে পারেন। কিন্তু আমাকে সাহরী-ইফতারী করতে হয় চোরের মত লুকিয়ে লুকিয়ে, এই যে এত বড় নেয়ামত পেয়েছেন এর জন্য কখনো আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদার করেছেন ?

সিরিয়া-ইরাকে ইফতারির সময় আকাশ থেকে বোমা পড়ে , ইয়েমেনী-রোহিঙ্গা ভাইবোনরা তো ইফতারিও পায় না আর উইঘুরের মুসলিমরা তো রোজাই রাখতে পারে না। তাদের পরিবার থেকে কেউ না কেউ নিহত । আমরা সবসময় আমাদের নিজেদের সমস্যাকেই সবচেয়ে বড়বিপদ মনে করি কিন্তু অপর পাশে আমাদের ভাই বোনরা কতো কষ্টকর অবস্থায় আছে এটা কখনোই ভেবে দেখি না !

আল্লাহ তা’আলা বলেন

وَ اِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّکُمۡ لَئِنۡ شَکَرۡتُمۡ لَاَزِیۡدَنَّکُمۡ وَ لَئِنۡ کَفَرۡتُمۡ اِنَّ عَذَابِیۡ لَشَدِیۡدٌ ﴿۷﴾
স্মরণ কর, যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য (আমার নি‘য়ামাত) বৃদ্ধি করে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও (তবে জেনে রেখ, অকৃতজ্ঞদের জন্য) আমার শাস্তি অবশ্যই কঠিন।{১৪:০৭}

আশেপাশে তাকান , দেখুন আপনার উপর আল্লাহর নিয়ামত গুলো । আপনি যে শ্বাস নিচ্ছেন কোন অসুবিধা ছাড়া এই শ্বাস নেওয়ার জন্য আমেরিকা, ইতালির মানুষ মাসের মাসের পর মাস হসপিটালে আছে ।

কিতাবুল যুহদ এ আইয়ুব আ: এর ঘটনাতে উল্লেখ আছে যে তিনি পানি খাবার পরে ‘আলহামদুল্লিলাহ’ বলেন নাই দেখে আল্লাহ তাকে পরিক্ষাস্বরূপ মরনব্যাধী রোগ দেন ফলে তার পুরো শরীরে পচন ধরে ।

আমার বাবা মা মুশরিক তাও আমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চেষ্টা করি কারণ আল্লাহ জানেন আমার সক্ষমতা কতটুকু। সে অনুসারে আমার পরিস্থিতি তৈরী করে দিয়েছেন এবং ভালো জানেন কোন অবস্থাতে আমি ঠিকতে পারবো। আমার থেকে যারা মুসলিম পরিবারে জম্নেছে তাদের নিয়ামত বেশী তাহলে তাদের কতোটা কৃতজ্ঞ হতে হবে আমাদের রবের প্রতি ?

দেখতে দেখতে দুই টা রমজান চলে গেল ! ইন শা আল্লাহ একদিন এই দরজা খুলবে , এই দরজা দিয়েই আমার বাবা প্রবেশ করবে তওহীদের নূর নিয়ে সেদিন আমি ইমাম হবো আমার বাবা মা হবেন আমার মুসল্লী।

লেখা~ একজন নওমুসলিম ভাই
সম্পাদনা ~ আমাতুল্লাহ ইফফাত
এডমিন অব দাওয়াহ~Dawah 

Facebook Comments