বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
একজন বান্দার চারিত্রিক বিশুদ্ধতার জন্য সম্ভাব্য যত ধরণের সদগুণ থাকা দরকার তার সবই আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক এর (রহঃ) মাঝে পাওয়া যায়। তার সাথীরা মজলিসে বসে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক এর চরিত্রের ভালো দিকগুলো গণনা করা শুরু করত। আয যাহাবী বলেন, ‘একদিন তারা বললো, চলো আজ আমরা আমাদের বন্ধু আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক এর চরিত্রের কি কি ভালো দিক আছে তার একটা তালিকা বানিয়ে ফেলি’। আর সেদিন তারা তালিকায় যা পেলো- ‘ইলম, ফিকাহ, সাহিত্য, ব্যাকরণ, ভাষাজ্ঞান, যুহদ, বাগ্মিতা, কাব্যপ্রতিভা, তাহাজ্জুদ, ইবাদত গুজার, হজ্জ, জিহাদ, বীরত্ব, প্রেরণা, শক্তিমত্তা, অনর্থক বিষয়ে চুপ থাকা, সততা এবং সাথীদের সাথে কখনোই মতবিরোধে না জড়ানো।’

আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক এর জীবনের দিকে তাকালে বাস্তবিকভাবে এসবই পাওয়া যাবে। বরং যে জীবন আদর্শ তিনি রেখে গেছেন সেখান থেকে এর চেয়েও গভীর শিক্ষনীয় ব্যাপার লুকিয়ে আছে।

১। নিজের সম্পর্কে তোমার ধারণা যতই খারাপ হোক না কেন, তোমার সামনে সবসময় উন্নতি করার সুযোগ আছে।
আল কাযী ইয়াদ বলেন, ইবনে মুবারককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো ঠিক কোন সময় তিনি ইলম অর্জন করা শুরু করেন। জবাবে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক বলেন, আমি এমন এক যুবক ছিলাম যে মদ পান করত, বাদ্য বাজনা পছন্দ করত, আর মাতাল হয়ে এই বাদ্য বাজনায় বুঁদ হয়ে থাকতো। একদিন আমার এক বাগানে আমার বন্ধুদের ডেকে আনলাম। বাগানের মিষ্টি আপেল খাওয়া আর মদের আসর শুরু হলো। মাতাল হয়ে অচেতন না হওয়া পর্যন্ত আমরা মদ্যপান চালিয়ে গেলাম। শেষ রাতের দিকে আমি একটা সেতার হাতে নিয়ে গান গাইতে শুরু করলাম।

মদের নেশায় আমি ঠিকমত গানের লাইনই উচ্চারণ করতে পারছিলাম না। আবার যখন গান গাওয়ার চেষ্টা করলাম সাথে সাথে আমার হাতে থাকা সেতার মানুষের মত কথা বলে উঠল। সেতার থেকে কুরআনের এই আয়াতটা উচ্চারিত হচ্ছিল, “যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবর্তীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? ” [সূরা হাদীদঃ আয়াত ১৬]
.
হ্যাঁ আমার রব, সময় এসেছে__আমি জবাব দিলাম। হাতের সেতার ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেললাম, ফেলে দিলাম শরাবের পাত্র। আল্লাহর কাছে তাওবা করে আমি দ্বীনের পথে ফিরে আসলাম। আর এভাবেই শুরু হলো আমার ইলম আর ইবাদাতের এক নতুন জীবন।
তারতিব আল মাদারিক (১/ ১৫৯)

২। ইবন আল জাওযী (রহঃ) বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহঃ) গরীব অভাবীদের জন্য বছরে ১ লক্ষ দিরহাম দান করতেন”
সিফাত আস সাফওয়াহ (২/৩২৭)

৩। ঋণদাতার ঋণ ফিরিয়ে দেওয়াঃ
আল হাসান বিন আরাফাহ বলেন, “একদিন আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক আমাকে বললেন, ‘আমি সিরিয়ায় এক লোকের কাছ থেকে একটা কলম ধার নিয়েছিলাম। কলমটা ফিরিয়ে দেওয়ার নিয়তও আমার ছিলো। কিন্তু মারউ (তুরকেমিস্তান) পৌঁছে আমার খেয়াল হলো কলমটা ফেরত দেওয়া হয়নি। কলমটা মালিকের কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য আমি আবার সিরিয়ার পথ ধরলাম।
সিফাত আস সাফওয়াহ (২/৩২৯)

৬। সাহসী হও, তবে নিজের ভালো কাজগুলো গোপন রেখোঃ
আবদাহ বিন সুলায়মান বলেন, রোমানদের বিরুদ্ধে আমরা একবার আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারকের সাথে জিহাদে গিয়েছিলাম। আমরা শত্রুপক্ষের মুখোমুখি হলাম, রোমানদের বাহিনী থেকে এক লোক বেরিয়ে এসে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহবান জানালো। আমাদের পক্ষ থেকে এক মুজাহিদ তার আহবানে সাড়া দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো। ঘন্টাব্যাপী দ্বন্দ্বযুদ্ধ শেষে আমাদের মুজাহিদ রোমান যোদ্ধাকে হত্যা করলো। রোমানদের থেকে আরেকজন বেরিয়ে আসলো, এবার সে তাকেও হত্যা করলো। এবার সে নিজেই দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহবান জানালো। তার আহবানে সাড়া দিয়ে একজন বেরিয়ে এলো, ঘন্টাব্যাপী যুদ্ধ শেষে তাকেও সে হত্যা করলো। সবাই আমাদের মুহাজিদ ভাইটির চারপাশে জড়ো হতে থাকলো, আমিও সেখানে ছিলাম আর দেখলাম মুজাহিদ ভাই জামার আস্তিনে নিজের চেহারা ঢেকে রেখেছে। আমি তার আস্তিনের এক প্রান্ত ধরে টান দিতেই অবাক বিস্ময়ে আবিস্কার করলাম এ আর কেউ নয় , তিনি আমাদের আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক। ইমাম আয যাহাবীর অন্য এক বর্ণনায় আছে ইবনে মুবারক আবদাহ বিন সুলায়মানকে কসম খাইয়েছিলেন যেন তার পরিচয় গোপন রাখা হয়।
সিফাত আস সাফওয়াহ (২/৩২৯)

৬। একটি কোমল হৃদয়ঃ
আল কাসিম বিন মুহাম্মদ বলেন, “একবার আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারকের সাথে সফরে ছিলাম। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, কি এমন আছে এই লোকটার মাঝে যে সে এতটা জনপ্রিয়? সে যদি ইবাদত গুজার হয়, আমরাও তো ইবাদত করি। যে যদি সিয়াম রাখে, আমরাও তো রাখি! যে যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ বের হয়ে থাকে, আমরাও তো জিহাদে অংশগ্রহণ করি! সে যদি হজ্জ করে, আমরাও তো হজ্জে যাই! তাহলে আমাদের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?

সিরিয়া অভিমুখে যাত্রার পথে আমরা এক বাড়ীতে রাত কাটালাম। হঠাৎ ঘরের পিদিমটা নিভে গেলো, এতে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ জেগে উঠলো। আব্দুল্লাহ ইবেন মুবারক নিভে যাওয়া পিদিম হাতে বাইরে বেরিয়ে গেলেন সেটাতে আবার আলো জ্বালানোর জন্য। কিছুক্ষণ বাইরে অবস্থান করে ইবনে মুবারক পিদিম হাতে আবার ঘরে প্রবেশ করলেন। পিদিমের আলোয় হঠাৎ আমার চোখ পড়লো ইবনে মুবারকের চেহারার দিকে। আর আমি দেখলাম ইবনে মুবারকের চোখের পানিতে তার দাঁড়ি ভিজে আছে। তখনই আমি মনে মনে বললাম, ‘এই সেই আল্লাহর ভয় যা আমাদের সবার কাছ থেকে ইবনে মুবারকের মর্যাদাকে আলাদা করে দিয়েছে”। যখন ঘরে আলো নিভে গিয়ে চারদিকে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিলো, ইবনে মুবারক আখিরাতের কথা ভেবে অঝোরে কাঁদছিলেন।
সিফাত আস সাফওয়াহঃ (২/৩৩০)

৭। সাথীদের প্রতি উদারঃ
ইসমাইল ইবনে আয়্যাশ বলেন, “আমি এমন একটিও ভালো বৈশিষ্ট্যের কথা জানিনা যা আল্লাহ্‌ তায়ালা আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারকের চরিত্রে জুড়ে দেননি। আমি আমার বন্ধুদের মুখে শুনেছি একবার তারা আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারকের সাথে মিশর থেকে মক্কায় সফর করছিলো। আর তিনি আমার বন্ধুদেরকে খাবিস ( আটা দিয়ে তৈরী এক ধরণের মিষ্টি খাবার) দিয়ে আপ্যায়ন করছিলেন অথচ পুরো সফরে তিনি রোযা অবস্থায় ছিলেন।
সিফাত আস সাফওয়াঃ ২/৩২৯

৮। শয়তানের ধোঁকায় পড়া যাবে নাঃ
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক একদিন গোসল করছিলেন। শয়তান তাকে এই বলে ওয়াসওয়াসা দিলো যে, তোমার তো শরীরের এই অংশটা পরিষ্কারই হয়নি। ইবনে মুবারক জবাব দিলেন, আমি পরিষ্কার করেছি। শয়তান বলল, না, করোনি। এবার ইবেন মুবারক জবাব দিলেন, তুমি যেহেতু প্রথমে এই দাবী তুলেছো তাহলে তুমিই তোমার দাবীর পক্ষে প্রমাণ পেশ করো।
তারতিব আল মাদারিকঃ ১/১৫৯

৯। মানুষের দ্বীনের পথে আসার জন্য আন্তরিক দু’আঃ
আল হাসান ইসা বিন সিরজিস ছিলেন একজন খ্রিষ্টান। একবার তিনি ইবনে মুবারকের সাথে হাঁটছিলেন। ইবনে মুবারক জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কে?’ তিনি জবাবে বললেন, ‘আমি একজন খ্রিষ্টান’। সাথে সাথে ইবনে মুবারক দু’আ করলেন, ‘হে আল্লাহ্‌, তাকে মুসলিম হিসেবে কবুল করো’। আল্লাহ্‌ ইবনে মুবারকের দু’আ কবুল করেছিলেন। আল হাসান বিন ইসা এরপর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে একজন অসাধারণ মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করেন। জ্ঞান অন্বেষণে তিনি দেশ দেশান্তরে ভ্রমণ করতেন, এবং একসময় তিনি উম্মাহর এক বিজ্ঞ আলেম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
তারতিব আল মাদারিকঃ ১/১৬২

কালেক্টেড

Facebook Comments