আমরা ভাগ্যবান রব হিসেবে আল্লাহকে পেয়ে।

39

“একটা টিভি প্রোগ্রামের জন্য স্টুডিওতে অপেক্ষা করছিলাম। মধ্যবয়স্ক এক লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। সালাম দিয়ে বলল, ‘স্যার আমার একটা সমস্যা আছে। আপনার কাছে সেটার সমাধান চাচ্ছি।’

আমি হাসিমুখে সমস্যার কথা জানতে চাইলাম। লোকটা যা বলল তার সারমর্ম এই, সে বিশ্বাস করে একজনের কাছে তার জমিজমার কাগজপত্র দিয়েছিল। কিন্তু এখন সে আর তা ফেরত দিচ্ছে না। ফোন করলে ফোনও ধরছে না। এতো এতো টাকার কাগজপত্র! এগুলো ছাড়া কীভাবে সে কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার কাছে মনে হচ্ছে, গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

আমি তাকে হাসিমুখে বললাম, ‘দেখুন! আপনার দলীল তো আর আমি ফিরিয়ে দিতে পারব না। তবে আপনাকে কিছু দু‘আর কথা বলে দিচ্ছি। এই দু‘আগুলো তাহাজ্জুদের সালাতে পড়ে পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।’ এটা বলে আমার ‘রাহে বেলায়েত’- বইটা থেকে উনাকে কিছু দু‘আ দাগিয়ে দিলাম।

আমি এরপর উনার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। তারপর আবার উনার সাথে ঝিনাইদহে দেখা। সালাম দিয়ে আগে কীভাবে দেখা হয়েছিল সেটার কথা বলল লোকটা। তারপর বলল, ‘স্যার! আপনার কথামত একমাস আমি তাহাজ্জুদের সালাতে দু‘আগুলো পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছি। এরপর একদিন কলিংবেলের শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখি যার কাছে আমার দলীল রয়েছে সেই লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে কোনো কথা না বলে দলীলগুলো দিয়ে সে চলে গেলো।’

আমি খুব খুশি হয়ে বললাম, ‘আলহামদুলিল্লাহ! তাহলে তো আল্লাহ আপনার কথা শুনেছেন। আপনার সমস্যা দূর করে দিয়েছেন।’

কিন্তু লোকটা হতাশ গলায় বলল, ‘কিন্তু স্যার একটা সমস্যা হচ্ছে আমার। ঐ একমাস তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে চেয়ে যে শান্তি আমি পেয়েছিলাম, এখন আর আমার অন্তরে সে শান্তি নাই। মনে হচ্ছিলো, আল্লাহ তা‘আলার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। দলীল পেয়ে খুশী হওয়া উচিত। কিন্তু স্যার! আমার এখন মনে হচ্ছে দলীলগুলো আরো পরে পেলে ভালো হত’।”

গল্পটা আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ) স্যারের মুখ থেকে শোনা। উনি গল্পের শেষে বলেছিলেন, “লোকটা আমার কাছে এসেছিলো তার একটি সমস্যা নিয়ে। কিন্তু এ সমস্যা তাকে আল্লাহর ওলী বানিয়ে ছেড়েছে।”

আমাদের অনেকের জীবনেই এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। তীব্র সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আর কোথাও দিশা না পেয়ে আল্লাহর কাছে বারবার চাইতে বাধ্য হয়েছি। অথচ সে সমস্যাটা যদি সৃষ্টি না হতো তবে কিন্তু আমরা আল্লাহর কাছে সেভাবে চাইতাম না। ইবনে তাইমিয়া (রহ) বান্দার এ অবস্থার কথা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন,

“একজন মানুষের জীবনে হয়তো মারাত্মক কোনো সমস্যা আসতে পারে। সে তখন ঐ বিপদ দূর করতে চায়। তাই সে দু‘আ করতে থাকে আর আল্লাহর সাহায্য চাইতে থাকে। যদিও তার নিয়ত ছিলো একমুখী (দুনিয়াকেন্দ্রিক)- কোনো শত্রুর ওপর জয়লাভ করা কিংবা সুস্থতা কামনা করা।

তবে সময় যতো যেতে থাকে দু‘আগুলো তার জন্যে ঈমানের অনেকগুলো দরজা খুলে দেয়। সে তার রবকে আরো ভালোভাবে চিনতে পারে, আরো ভালোবাসতে পারে। আর এগুলো যখন তার রবকে সবসময় স্মরণ করার আনন্দের সাথে যুক্ত হয়ে যায়, তখন ঐ বান্দার কাছে এ অবস্থাই বেশি প্রিয় মনে হয় যে সমস্যা তাকে কষ্ট দিচ্ছিলো সেটার থেকে।
যেভাবে মহান আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াবি প্রয়োজন সৃষ্টি করেন আর তারপর বান্দার মর্যাদাকে উঁচু করেন, সেটা নিঃসন্দেহে বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমত।” (ইকতিদা আস-সিরাতাল মুস্তাকিম, ২/৩১২-১৩)

ইবনুল মুসিলি (রহ) একই কথা বলেছেন একটু অন্যভাবে-

“এটা পুরোটাই আল্লাহর দয়া যে মাঝে মধ্যে তিনি তাঁর বান্দাদেরকে ভাঙনের তিক্ততার স্বাদ দেন আরোগ্যের মিষ্টতা অনুভব করার জন্যে। বান্দার ওপর বিপদ দিয়ে তাকে অনুভব করতে বাধ্য করেন তাঁর অনুগ্রহের কথা। ঠিক যেভাবে তিনি আদমকে জান্নাতের নিয়ামতের কথা অনুভব করতে বাধ্য করেছিলেন তাকে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হবার তিক্ত স্বাদ দিয়ে। যেখানে (দুনিয়াতে) আদম অনুভব করেছিলো দুনিয়ার রূঢ় জীবন। যে জীবনে আনন্দ মিশে আছে কষ্টের সাথে।”

এরপর তিনি বলেন,
“তাই আল্লাহ শুধু আরোগ্যের জন্যেই বান্দাকে অসুস্থতা দেন তা না বরং বিপদের দ্বারা তিনি আসলে বান্দার ভালোই চান। তিনি তাকে মৃত করেন জীবিত করার জন্যে। তার দুনিয়ার জীবনকে কঠিন করে দেন যাতে সে আখিরাতের ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হয়। আর মানুষের মনে তার ব্যাপারে ঘৃণা ঢেলে দেন যেন তার মনোযোগ মানুষের দিকে না থেকে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়।” (মুখতাসার আস-সাওয়া’ইক আল-মুরসালা, ১/৩০৬)

দুনিয়ার যে কোনো বিপদে সবর করলে একজন মুমিন পরকালে পুরস্কার পাবে। তবে আল্লাহ যে এর দ্বারা তার আখিরাতটাকে গুছিয়ে দিচ্ছেন তা না, বরং দুনিয়ার জীবনটাও প্রশান্তির করে দিচ্ছেন। কেননা, কেবল আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যমেই প্রকৃত সুখ অর্জন সম্ভব। অথচ একটু বিপদেই আমরা কতো হতাশ হয়ে যাই। নিরাশ হয়ে যাই। আমরা শুধু পিক্সেলটা দেখি আর সর্বদ্রষ্টা হিসেবে আল্লাহ পুরো ছবির ব্যাপারেই জ্ঞান রাখেন।

আমরা ভাগ্যবান রব হিসেবে আল্লাহকে পেয়ে।

© শিহাব আহমেদ তুহিন

Facebook Comments