ছুটি কাটাতে যেয়ে যারা জীবন থেকেই ছুটি নিয়ে নিলেন, কী মনে হয়, তারা কি আপনার আমার মতই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতেন না? অবশ্যই। আমরা এখন যেমন ফেসবুক ব্রাউস করছি, সাধারণ আর দশটা জীবিত মানুষের মত, ওনারাও তেমনই ছিলেন গতকাল সকালেও।

আমরা যারা বেঁচে আছি, তারা মৃত্যুকে ভুলে থাকতে পছন্দ করি। এড়িয়ে চলতে চাই। কেউ মৃত্যুর কথা মুখে নিলে মুরুব্বিরা বলেন ‘অলক্ষুণে কথা মুখে আনতে নেই’। অথচ আল্লাহর রাসূল [ﷺ] বলেছেন মৃত্যুকে বারবার স্মরণ করতে। তিনি মৃত্যুকে নাম দিয়েছিলেন ‘আনন্দ ধ্বংসকারী’। হাদীসে উল্লিখিত هاذم اللذات এর যদি কথ্য ভাষার রূপান্তর করি, তাহলে হবে ‘আরামের হারামি’। আমরা যে মৃত্যুকে ভুলে দুনিয়ার আরামের জীবন-যাপন করি, মৃত্যু সহসাই সেই আরামে ব্যাঘাত ঘটায়। কতই না কঠিন কথা মাত্র দুই শব্দে বলেছেন আল্লাহর রাসূল [ﷺ]।

প্রতিদিন অন্তত একবার মৃত্যুকে স্মরণ করা উচিত। মরে যাবো, মরতেই হবে – এটা চিন্তা করা উচিত। কীভাবে মরবো, কোথায় মরবো, জানি না। তবে এটা নিশ্চিত যে মরবই। এভাবে চিন্তা করতে হবে। সাথে নিতে হবে প্রস্তুতি।

প্রস্তুতি কেমন? দুনিয়াবি কিছু প্রস্তুতি রাখা ভালো। যেমন আপনার স্থাবর-অস্থাবর কোন সম্পদ থাকলে তা কাছের মানুষদেরকেও জানিয়ে রাখুন। আপনার অর্থ-সম্পদ, দেনা-পাওনা, এসবের ব্যপারে তাদেরও অবহিত করুন। কেউ আপনার কাছে টাকা পেলে যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধ করে দিন। লেনদেনের হিসেব টুকে রাখুন আর পরিবারের সদস্যরা খুঁজলেই পেয়ে যাবে, এমনভাবে সহজলভ্য করে রাখুন। যাতে আপনার কাছে যারা টাকা পায়, তারা যেন আপনাকে হাশরে আটকে ফেলতে না পারে। ঋণ যত কম পারেন, তত কম করেন। ঋণ আল্লাহর রাসূল [ﷺ] একদম পছন্দ করতেন না।

যত সম্পদ এবং জরুরি তথ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরিবারের সবার জন্য সহজলভ্য করে রাখুন, যাতে আপনার মৃত্যুর পর তাদের আপনার বিয়োগ-শোকের পাশাপাশি বাড়তি কষ্টে পড়তে না হয়। আপনার অনুপস্থিতি যাতে তাদের অতিরিক্ত বিপদে না ফেলে। ভবিষ্যতের কোন জরুরি পরিকল্পনা থাকলে নিজের মাঝেই লুকিয়ে রাখবেন না, সবচাইতে কাছের মানুষটাকে বলে রাখুন। নিজেকে কখনই ‘অপূরণীয়’ করে রাখবেন না। আপনি ছাড়া দুনিয়া চলবে না, এমন কোন অবস্থা তৈরি করে রাখবেন না। আপনি এই জগতে মুসাফির মাত্র। মুসাফিরকে যেতেই হবে। মুসাফিরের স্থান অপূরণীয় করা সাজে না।

তবে মূল প্রস্তুতি অন্যখানে। মৃত্যু হলেই তো এই দুনিয়ার সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। স্থান হবে অন্ধকার কবরে। একা। সেখানে থাকার প্রস্তুতি কি নিতে হবে না?

এ জগতে ঋষি থেকে পাপী, কেউই মৃত্যুভয় থেকে মুক্ত নয়। তবুও মরতেই হবে। আপনি আজ রাতেই ঘুমের মাঝে মারা যেতে পারেন, এটা কি অস্বীকার করা যায়? আপনি রিক্সায় চড়ছেন, ট্যাক্সিতে চড়ছেন, বাসে উঠছেন, ব্যস্ত রাস্তা পার হচ্ছেন – মরে যেতে পারেন কি না? অবশ্যই! হঠাৎ বুক-ব্যথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারেন কি না? আলবৎ!

উফফ! এই চিন্তা এলেই সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়! ধুর! ভাল্লাগছে না কিছু।
এইটাই। ঠিক এইটাকেই আল্লাহর রাসূল [ﷺ] বলেছিলেন আনন্দ ধ্বংসকারী।
তাহলে কী করা? সারাক্ষণ টেনশনে থাকা? মুখ বেজার করা? হাসি বন্ধ করে দেয়া? আনন্দ না করা? কষ্ট পাওয়া?
নাহ। আল্লাহর রাসূল [ﷺ] নিজেও তো দাঁত দেখিয়ে হেসেছেন! স্ত্রীর সাথে খেলেছেন। আনন্দ করেছেন, উৎসব করেছেন। মৃত্যুকেও স্মরণ করেছেন। প্রতিদিন।

একজন বিশ্বাসী কখনই মৃত্যুভয়ে কাতর হবে না। আল্লাহর রাসূল [ﷺ] বলেছেন মৃত্যু একজন বান্দার জন্য আল্লাহর সাথে দেখা করার উপলক্ষ। যে আল্লাহর সাথে দেখা করতে অপছন্দ করবে, আল্লাহও তার সাথে দেখা করতে অপছন্দ করবেন।

তাই আমরা মৃত্যুভয়ে কাতর হবো না। কিন্তু মৃত্যুর সত্যতাকে মেনে নেব। জীবনটাকে এলেবেলে রাখবো না। জীবনটাকে এমনভাবে এলোমেলো করে রাখবো না, যাতে কখনো সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে আকস্মিক মৃত্যুর মুখে আফসোস করতে হয় যে, ‘ইশ! জীবনটা শুধুই নষ্ট করলাম!’

.
একজন বিশ্বাসী তার জীবনটার প্রতিটা মুহুর্তই আল্লাহর জন্য কাটাবে। আল্লাহকে খুশি করে। আল্লাহর আদেশ মেনে। তার নিষেধ থেকে দূরে থেকে। একজন বিশ্বাসীর সকালে ঘুম ভাঙবে মুয়াযযিনের ডাকে। সে মাসজিদে গিয়ে ফজর পড়ে দিন শুরু করবে। ফিরে এসে কুর’আন পড়বে। অল্প একটুই না হয়। এরপর পড়াশোনা করবে বা হালাল রুজির সন্ধানে দিনভর বেরিয়ে পড়বে। ওয়াক্তে ওয়াক্তে মুয়াযযিনের ডাকে সাড়া দিয়ে আল্লাহর তরে সিজদা দেবে। সে মিথ্যা বলবে না। সে সুদ খাবে না। সে ঘুস খাবে না। সে ওয়াদার বরখেলাপ করবে না। সে হারাম কিছুই গ্রহণ করবে না, সে হারাম খাবার হোক, বা হারাম কাজ হোক।

সে আল্লাহর কিতাব আর তার রাসূলের [ﷺ] সুন্নাত থেকে শিখে নেবে কী কী জিনিস আল্লাহ হারাম করেছেন। সেসব থেকে সে একশ হাত দূরে থাকবে। সে হালাল কাজ, উত্তম কাজ হয়তো তার যতটা সক্ষমতা আছে, ততটা করবে, কিন্তু হারাম কাজ, অনুত্তম কাজ সে পুরোপুরি বর্জন করবে। সে মানুষের অধিকার রক্ষা করবে, সে কারো প্রতি জুলুম করবে না।

সে রামযানে রোযা রাখবে। সে যাকাত দেবে। সে সক্ষম হলে হজ করবে। সে অশ্লীল কিছু দেখবে না, বলবে না, শুনবে না। সে নিজে দৃষ্টির পর্দা করবে, পরিবারের সদস্যদেরও করতে বলবে। সে হয়তো আহামরি বুজুর্গ হয়ে উঠবে না। কিন্তু সে হারাম এর ছায়া মাড়াবে না। হালালের গা ঘেঁষে থাকবে। তাকে হয়তো কেউ অনেক বেশি ধার্মিক বলবে না, কিন্তু সে অন্তত আল্লাহর আদেশ অমান্য করে নাফরমানি করবে না।

.
বিশ্বাসীর জীবন তো এটাই। এই বিশ্বাসী যদি এশার নামাজ পড়ে সুন্নত মত দুয়া পড়ে ঘুমিয়ে পড়ে আর চিরঘুমে পতিত হয়ে সকালে আর উঠতেই না পারে, তাতে কি তার এতটুকু আফসোস থাকার সুযোগ আছে? এ জীবন দিয়েছেন যিনি, তিনি তো এ জীবনে চলার পথের ম্যানুয়ালও দিয়েছিলেন। সে ম্যানুয়াল-মাফিক চলেছে যে মানুষ, সে মানুষের জীবন ঘড়ি হঠাৎ থেমে গেলে তাতে হতাশার কিছু থাকে কি?
জীবনটা এমনভাবে গুছিয়ে নেয়া চাই, যাতে দু’চোখ বোজার আগে শয়তানও আফসোস করে ওঠে, যে মানুষটা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদত করেছে। চলনে, বলনে, স্মরণে।

যার জীবনের প্রতিটা দিনই আল্লাহর প্রতি নিবেদিত, সেই জীবন হঠাৎ থেমে গেলে আল্লাহর রাসূল [ﷺ] বলেছেন তাকে সুসংবাদ দেয়া হবে। কারণ সে দুনিয়ার কষ্ট, পরীক্ষা থেকে বেঁচে গেছে। আর আল্লাহর সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। আল্লাহও তার সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন।

.
আল্লাহর রাসূল [ﷺ] বলেছেন, মৃত্যুমুখে পতিত বিশ্বাসীর জন্য এর চাইতে বেশি পছন্দের আর কিছুই থাকতে পারে না।

সিদ্ধান্ত আমাদেরই। আমরা সবাই মরবো। কেউ খাটে, কেউ ঘাটে। কেউ মৃত্যুর প্রহর গুনে, কেউ হঠাৎ করেই। তবে মরবো সবাই। তাই আমাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, মৃত্যুর ঠিক আগের মুহুর্তটাতে আমরা কি অন্তত এই কথাটা ভাবতে পারি কি না, যে ইয়া আল্লাহ্‌! যতদিন নিঃশ্বাস নিতে দিয়েছো, তোমার আদেশের গাফেলতি করি নি। তোমার অপছন্দের কাজ করি নি। তোমার দেয়া নিয়মেই জীবন গড়তে চেয়েছি। তুমি কবুল করে নিয়ো।

শেষ বেলায় এইভাবেই যদি বিদায় নিয়ে যেতে পারি, মৃত্যু সে আসমানে হোক আর জমিনে, কালান্তরে হোক আর সহসায়, সে মৃত্যু আর যাই দিক, অন্তত আফসোস করতে দেবে না।

নোঙর 

Facebook Comments