নববী জীবন – এক নজরে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

68
নববী জীবন

এক নজরে নবীজির ﷺ নববী জীবন

৬১০ খ্রিস্টাব্দ: হেরা গুহায় রসুলুল্লাহ ﷺ এর উপর প্রথম ওহী নাযিল হয়। প্রথমে তিনি নিজ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মাঝে গোপনে ইসলামের বাণী প্রচার শুরু করেন।

জাবালে নূর। হেরা গুহা এই পাহাড়েরই চুড়ায় অবস্থিত।

 

 

আবিসিনিয়ার প্রাচীন একটি গির্জা।


৬১৩ খ্রিস্টাব্দ:
রসুল ﷺ তাঁর নিজ গোত্র বনু হাশেমকে একত্রিত করে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেন। এরপর সাফা পাহাড়ের উপর উঠে সমগ্র মক্কাবাসীর উপস্থিতিতে দাওয়াত দেন। এই ঘটনার পরেই ধীরে ধীরে মক্কার মুশরিকদের পক্ষ থেকে বাধা-বিপত্তি, হুমকি-ধমকি, হাসি-ঠাট্টা, যুলুম-নির্যাতন শুরু হয়।

৬১৫ খ্রিস্টাব্দ: ধীরে ধীরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা যখন চরম রূপ ধারণ করে তখন নবী ﷺ কিছু সংখ্যক মুসলিমকে লোহিত সাগরের অপর পাড়ে অবস্থিত আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে পাঠান। সেখান থেকেও কুরাইশরা মুসলিমদের ফেরত আনার চেষ্টা করে, যদিও তৎকালীন আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশির কারণে তা সফল হয়নি। ( নববী জীবন )

শিআবে আবী তালিব

৬১৭ খ্রিস্টাব্দ: রাসুল ﷺ এবং তাঁর গোত্র বনু হাশেমকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়। শিআবে আবী তালিবে মুসলমানদেরকে অবরোধ করে রাখা হয়।

৬১৯ খ্রিস্টাব্দ: বয়কট তুলে নেয়া হয় এবং একই বছরে চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী খাদীজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। পরপর এমন দুটি ঘটনায় রাসুল ﷺ দুঃখে কাতর হয়ে পড়েন। তাই ওই সময়টাকে ইতিহাসে দুঃখ বেদনার বছর বলা হয় ।

তায়েফ

৬২০ খ্রিস্টাব্দ: নবুওয়াতের দশম বর্ষে এসে রসুল ﷺ তায়েফে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যান। সেখান থেকে নির্যাতিত হয়ে ফেরার পর হজ্জের মৌসুমে মক্কায় আগত বিভিন্ন গোত্রের লোকদের নিকট দ্বীনের দাওয়াত দেন। এর ফলে মক্কার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় মদিনায়ও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে যায়। এবছরই ইসরা ও মেরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়। ( নববী জীবন )

আকাবার শপথ গ্রহণের স্থান

৬২১ খ্রিস্টাব্দ: মদিনা থেকে হজ্জ করতে আসা কয়েকজন ব্যক্তি আকাবা নামক স্থানে রসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট শপথ করেন যে তারা যেকোনো অবস্থায় তাদের নবী মুহাম্মাদকে ﷺ রক্ষা করবেন এবং ইসলামের প্রসারে কাজ করবেন। ইতিহাসে এই ঘটনাটি আকাবার শপথ নামে সুপরিচিত।

৬২২ খ্রিস্টাব্দ: পরবর্তী বছরে হজ্জের সময়ে মদিনার আরও কিছু ব্যক্তি এসে দ্বিতীয় দফায় আকাবায় শপথ নেন। মদিনার ১২টি গোত্রের নেতারা একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণের মাধ্যমে মুহাম্মাদ ﷺ কে মদিনায় আসার আমন্ত্রণ জানান। রাসুল ﷺ এবং তাঁর সাহাবীরা মদিনাতে হিজরত করতে শুরু করেন। মদিনার সকল গোত্রকে নিয়ে ঐতিহাসিক মদিনা সনদ স্বাক্ষরিত হয়। এই সনদের মাধ্যমে মদিনা একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুহাম্মাদ ﷺ তার শাসক হন।

শিল্পীর কল্পনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সময়কার মসজিদে নববীর নকশা

৬২৩ খ্রিস্টাব্দ: নাখলা অভিযান সংঘঠিত হয়।

৬২৪ খ্রিস্টাব্দ: মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই মক্কার কুরাইশরা মদিনা রাষ্ট্রের ধ্বংসের জন্য যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখাতে থাকে। তারা গৃহত্যাগী সকল মুসলিমদের সম্পত্তি ছিনিয়ে নেয়। এই অবস্থায় নবী মুহাম্মাদ ﷺ একটি সেনাদলকে মক্কার একটি বাণিজ্যিক কাফেলাকে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাঠান। কিন্তু কুরাইশরা তাদের কাফেলা রক্ষায় সফল হয়। এই প্রচেষ্টার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কুরাইশরা যুদ্ধের ডাক দেয়। এই যুদ্ধ বদর যুদ্ধ নামে পরিচিত। যুদ্ধে মুসলমানরা জয়লাভ করেন এবং আবু জাহল সহ সত্তরজন মুশরিক নেতা নিহত হয়। এবছরেই ইহুদি গোত্র বনু কায়নুকাকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করা হয়।

বদর প্রান্তর

৬২৫ খ্রিস্টাব্দ: বদরে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পরবর্তী বছরে মুশরিকরা আবার সংঘবদ্ধ হয়। নতুন করে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। এবার যুদ্ধক্ষেত্র হয় উহুদ প্রান্তর। যুদ্ধে মুসলমানদের বাহ্যিক পরাজয় হলেও আদর্শিক বিজয় হয়, যার সুফল পরবর্তীতে বোঝা যায়। এবছর বীর মাউনাতে ৭০ জন সাহাবী (রা.) শহীদ হন। ইহুদি গোত্র বনু নাযিরকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করা হয়।

উহুদ পাহাড়

৬২৭ খ্রিস্টাব্দ: খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এসময় প্রায় এক মাস ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রসমূহ মিলে মদিনা অবরোধ করে রাখে। মুহাম্মাদ ﷺ মদিনার চারিপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। শত্রুপক্ষ মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি গোত্র বনু কুরাইযাকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়, যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়। এই যুদ্ধের পর ইসলাম আগের চেয়ে আরো বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। যুদ্ধের পরপরই ইহুদি গোত্র বনু কুরাইযাকে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে কঠোর শাস্তি প্রদান করা হয়।

খন্দকের যুদ্ধক্ষেত্রের একটি অংশ

৬২৮ খ্রিস্টাব্দ: নবী ﷺ স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি তাঁর সাথীদের সাথে নিয়ে মদিনা থেকে মক্কায় চলে গেলেন এবং সেখানে উমরা পালন করলেন। স্বপ্ন দেখার পর তিনি ১,৪০০ সাহাবীসহ উমরা পালন করার নিয়তে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কিন্তু, মক্কাগামী পথের পাশে হুদাইবিয়া নামক স্থানে মক্কার মুশরিকদের দ্বারা তিনি বাধাপ্রাপ্ত হন। ফলে মক্কায় পৌছে উমরা পালন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। অপরদিকে কুরাইশদের পক্ষ থেকে সামরিক অভিযানের হুমকি আসতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কুরাইশদের পক্ষ থেকে দূত পাঠানো হয়। সেখানে কিছু লিখিত সমঝোতা হয়, যা ইতিহাসে হুদাইবিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত। এবছরেই খাইবার অভিযান সংঘঠিত হয়। এছাড়া, বিভিন্ন বাদশাহ ও আমীরদের নিকট রসুল ﷺ ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি প্রেরণ করেন।

হুদাইবিয়া

৬৩০ খ্রিস্টাব্দ: দশ বছর মেয়াদী হুদাইবিয়ার সন্ধি মাত্র দুবছর পরেই ভেঙে যায়। নবী মুহাম্মাদ ﷺ দশ হাজার সাহাবীর বিশাল এক বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হন। বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষ ছাড়া মোটামুটি বিনা প্রতিরোধে মক্কা বিজিত হয়। মক্কাবাসীর জন্য তিনি ﷺ সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন। এর বাইরে, এবছর হুনাইন, আওতাস এবং তায়েফ অভিযান পরিচালিত হয়। ( নববী জীবন )

মসজিদুল হারাম। ১৯০৮ সালের ছবি।

৬৩২ খ্রিস্টাব্দ: রাসুল ﷺ বিদায় হজ্জ পালন করেন। বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পর সফর মাসে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। অবশেষে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে মদিনায় আয়িশা (রা.)-এর গৃহে তিনি ইন্তেকাল করেন। এসময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

রাসুলুল্লাহ ﷺ এর হুজরা

মূল লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় লেখকের (S M Nahid Hasan) ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে।

Facebook Comments