পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা:

44

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা:

মহাগ্রন্থ আল কুরআনে অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে৷ এর মধ্যে কোনোটি বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, কোনোটি বেশি শিক্ষনীয়, কোনোটি অনেক দুঃখের কিংবা কোনোটি অনেক বেশি বিষ্ময়কর ঘটনা৷ কিন্তু, যদি বলা হয়, সবচেয়ে বেশি নাটকিয়তা কোন ঘটনায় রয়েছে? [সবচেয়ে ভালো হবে, নিচেরটুকু না পড়ে নিজে কুরআন পড়ুন, চিন্তাভাবনা করুন এবং নিজ প্রচেষ্টায় খুজে বের করুন৷]

আসলে এটি মুসা (আ) এর ঘটনা, যেখানে হযরত মুসা (আ) কে নবজাতক শিশু অবস্থায় তার মা কাঠের বাক্সে করে নদীতে ভাসিয়ে দেন! এই ঘটনাটি সুরা ক্বছছ এ সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে৷ আল্লাহ তায়ালা এভাবে বর্ণনা করেন-

“মূসার জননীর কাছে অহী পাঠালাম, শিশুটিকে স্তন্যদান কর। যখন তুমি এর সম্পর্কে কোন ভয় করবে, তখন একে (নীল) দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। নিশ্চয় আমি একে তোমার নিকট ফিরিয়ে দেব এবং একে একজন রসূল করব।”

এটা এমন সময়ের ঘটনা, যখন ফিরাউন বনী ইসরাইলে নবজাতক শিশুদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়! তখন আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ) এর মায়ের কাছে ওহী পাঠালেন শিশুটিকে দুধ পান করানোর জন্য এবং যদি কখনো ভয় হয় যে ফিরাউনের সৈন্যরা শিশু মুসা (আ) কে মেরে ফেলবে, তবে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য৷
(এখানে ‘ওহী’ পাঠানো বলতে বুঝানো হয়েছে, মনে এমন ধারণা বা চিন্তাভাবনা বদ্ধমূল করে দেওয়া৷ অর্থাৎ, মুসা (আ) এর মা মনে মনে “আপাতত দুধপান করাতে থাকি৷ যদি খুব বিপদের সম্ভাবনা হয় তখন নদীতে ভাসিয়ে দিব৷” এরকম কিছু একটা ভাবলেন৷ এর মানে এই নয় যে আল্লাহ তায়ালা তার কাছে সেরূপ ওহী পাঠিয়েছিলেন যেরূপ ওহী নাবী রাসুলদেরকে পাঠানো হয়৷ [বিস্তারিত তাফসির আহসানুল বায়ান দেখুন৷])

কথিত আছে যে, সন্তান হত্যার এই ধারা যখন অনেক লম্বা হয়ে গেল, তখন ফিরআউন জাতির এই আশংকা বোধ হল, যদি এভাবে বানী ইস্রাঈল জাতিই নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে শ্রমসাধ্য কঠিন কাজগুলি আমাদেরকেই করতে হবে। এই আশংকার কথা তারা ফিরআউনের কাছে ব্যক্ত করলে সে এক নতুন আইন জারী করল যে, এক বছর নবজাত সন্তান হত্যা করা হোক আর এক বছর বাদ দেওয়া হোক। যে বছর সন্তান হত্যা না করার কথা সে বছর হারুন (আঃ)-এর জন্ম হয়। কিন্তু মূসা (আঃ)-এর জন্ম হয় হত্যার বছরে! কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর পরিত্রাণের ব্যবস্থা এইভাবে করলেন যে, প্রথমতঃ মূসা (আঃ)-এর মায়ের গর্ভাবস্থার লক্ষণ এমনভাবে প্রকাশ করলেন না, যাতে ফিরআউনের ছেড়ে রাখা ধাত্রীদের চোখে পড়ে। সেই জন্য গর্ভের এই মাসগুলি নিশ্চিন্তে পার হয়ে গেল এবং এই ঘটনা সরকারের পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্বশীলদেরও জানা হল না। কিন্তু জন্মের পর তাঁকে হত্যা করার আশংকা বিদ্যমান ছিল। যার সমাধান মহান আল্লাহ নিজেই ইলহামের মাধ্যমে মূসা (আঃ)-এর মাতাকে বুঝিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি তাঁকে একটি কফিনে (কাঠের বাক্সে) পুরে নীল নদে ভাসিয়ে দিলেন। (ইবনে কাসীর)

ভাসতে থাকা সেই কাঠের বাক্স আল্লাহ তায়ালা পৌছে দিলেন ফিরাউনের কাছে! আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“অতঃপর ফেরাউনের লোকজন তাকে উঠিয়ে নিল যাতে সে তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হতে পারে। ফেরাউন, হামান ও তাদের বাহিনীর লোকেরা তো ছিল অপরাধী।” সুরা ক্বছছ ২৮:৮

আল্লাহ তায়ালার পরিকল্পনা এই আয়াতে ব্যাক্ত হয়েছে- “….যাতে সে তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হতে পারে।” আল্লাহ তায়ালা কি চান, কেন চান? সুরার শুরুর দিকেই তা তিনি বলেছেন,

“আর আমি চাইলাম সেই দেশে যাদেরকে (বনি ইসরাইলদেরকে) দুর্বল করে রাখা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে এবং তাদেরকে নেতা বানাতে, আর তাদেরকে উত্তরাধিকারী বানাতে। আমি ইচ্ছা করলাম দেশে তাদেরকে (বনি ইসরাইলদেরকে) ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ফিরআউন হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তাদের (বনি ইসরাইলদের) নিকট হতে ওরা আশঙ্কা করত।”
সুরা ক্বছছ ২৮: ৫,৬

অর্থাৎ, ফিরাউনদের আশংকা ছিল যে, একজন বনি ইস্রাঈলীর হাতে ফিরআউন, তার দেশ ও তার সৈন্য-সামন্ত সব ধ্বংস হয়ে যাবে৷ আল্লাহ তায়ালা তাদের সেই আশংকাকে সত্যে পরিণত করলেন।

আসলে পুরো বিষয়টা আল্লাহ তায়ালা নিজস্ব তত্ত্বাবধানে এত সুনিপুণভাবে সাজালেন যে,
কবি বলেন,
“প্রানে ছিল যাহার ভয়
সেথায় পেল সে আশ্রয়!”

আল্লাহ তায়ালা ফিরাউনের স্ত্রীর অন্তরে শিশু মুসা (আ) এর প্রতি মায়া মমতা তৈরী করে দিলেন৷ এবং ফিরাউনকেও নমনীয় করলেন, যার জন্য সে স্ত্রীর আবদার ফেলতে পারল না! অন্যদিকে, আরেক নারী, যার কোল খালি হয়ে গেল, তার কি অবস্থা? আল্লাহ তায়ালা তার অন্তরকে আশ্বস্ত ও দৃঢ় করে দিলেন৷ আল্লাহ বলেন,
“ফেরাঊনের স্ত্রী বলল- ‘এ শিশু আমার ও তোমার চক্ষু শীতলকারী, তাকে হত্যা করো না, সে আমাদের উপকারে লাগতে পারে অথবা তাকে আমরা পুত্র হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি আর তারা কিছুই বুঝতে পারল না (তাদের পরিণাম কী)। মূসার মায়ের অন্তর বিচলিত হয়ে উঠল। সে তো তার (মুসার) পরিচয় প্রকাশ করেই ফেলত যদি না আমি তার মনকে দৃঢ় করতাম, যাতে সে আস্থাশীল হয়।” সুরা ক্বছছ ২৮:৯,১০

এখানেই শেষ নয়;
মহান আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ) এর জন্য ধাত্রীর দুধ পান হারাম করে দিলেন৷ ফলে শিশু মুসা (আ) ফিরাউনের দরবারে থাকলেও কোনো ধাত্রীই তাকে দুধ পান করাতে পারেনি! আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আমি পূর্ব হতেই ধাত্রীর স্তন্য পান করা থেকে তাকে বিরত রেখেছিলাম। মূসার বোন বলল, ‘তোমাদেরকে কি আমি এমন পরিবারের কথা বলব, যারা তোমাদের হয়ে একে লালন-পালন করবে এবং এর হিতাকাঙ্ক্ষী হবে?”

সকল দৃশ্য তাঁর বোন চুপি চুপি প্রত্যক্ষ করছিল। কারণ, তার মা বলেছিল নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া মুসা (আ) এর উপর নজর রাখতে৷ এক পর্যায়ে সে ফিরাউনের কর্মচারীদের বলে যে, ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি পরিবারের কথা বলব, যারা এই শিশুর লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে?’ তখন সে তার মায়ের কথা জানায়৷ ফলে, তার মাকেই নিযুক্ত করা হয় মুসা (আ) কে দুধ পান করানোর কাজে!!

আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“এভাবে আমি তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে আনলাম যাতে তার চোখ জুড়ায়, সে দুঃখ না করে আর জানতে পারে যে, আল্লাহর ও‘য়াদা সত্য৷ কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।” সুরা ক্বছছ ২৮:১৩


উপসংহার: এই ঘটনাটি যে কতটা শ্বাসরুদ্ধকর ছিল, তা নিজেকে এরকম পরিস্থিতিতে কল্পনা না করলে বুঝতে পারবেননা৷ আল্লাহ তার মহান কুদরতের মাধ্যমে পুরো ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করলেন৷ পরিণামে মুসা (আ) এর মা ফিরাউনের নিকট থেকে পারিশ্রমিক/বেতন পেতে লাগলেন নিজের সন্তানকে দুধ পান করানোর বিনিময়ে!!! আর মুসা (আ) পরিচিত হলেন মিসরের রাজপুত্র হিসেবে!!! 😍
[প্রশ্ন: আপনার কাছে পবিত্র কুরআনের কোন ঘটনাটি সবচেয়ে নাটকীয় বলে মনে হয়?]

Facebook Comments