মক্তব : ইসলামী শিক্ষার প্রথম সোপান

607
মকতব
ইমরান রাইহানঃ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া সাল্লামের সময়ে বাচ্চাদের শিক্ষার জন্য আলাদা কোনো মক্তব ছিল না । সাহাবায়ে কেরাম তাদের সন্তানদের কে ঘরেই শিক্ষা দিতেন। সাধারণত কথা বলা শিখলেই তারা বাচ্চাদের সাতবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়াতেন। সাত বছর বয়স থেকে তাদের কোরআন তিলাওয়াত ও নামাজের পদ্ধতী শিক্ষা দিতেন। হযরত উমর রা এর শাসনামলে সর্বপ্রথম বাচ্চাদের জন্য মক্তব প্রতিষ্ঠা করা হয়। তিনি এসব মক্তবে শিক্ষক নিয়োগ দেন । মদীনায় তখন তিনটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিটি মক্তবের শিক্ষকদের মাসিক ১৫ দিরহাম ভাতা দেয়া হতো ।বিভিন্ন ঘটনাবলী দ্বারা বুঝা যায় হযরত উমরের শাসনামলে মক্তবগুলোতে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। আইয়ুব বিন হাসান রাফেয়ী বলেন, আমরা প্রতি শুক্রবার মদীনার মক্তবের বাচ্চাদের সাথে বাইরে যেতাম।

ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির সাথে সাথে মুসলিমরা বিজীত অঞ্চলের শিক্ষাদীক্ষার দিকেও মনোযোগ দেন। শাম বিজয়ের পর সেখানে অনেক মক্তব প্রতিষ্ঠা করা হয়। মুসলমানদের সন্তানরা এসব মক্তবে পড়াশুনা করতো। হেমসের বিখ্যাত কবি আদহাম বিন মেহরাজ বাহেলি এমনই এক মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।

পুরো মুসলিম বিশ্বে মক্তব প্রতিষ্ঠার এই ধারা এতোটাই বেগবান হয় যে, বিখ্যাত পর্যটক ও ভুগোলবিদ ইবনে হাউকাল সিসিলির একটি শহরেই তিনশো মক্তব দেখেছেন। এসব মক্তবে শিশুরা আরবী ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান ও কোরআনুল কারীমের তিলাওয়াত শিখতো ।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ প্রথম জীবনে এমনই এক মক্তবে শিক্ষকতা করেছেন। ইবনে খাল্লিকান লিখেছেন, হাজ্জাজ রুটির বিনিময়ে বাচ্চাদের পড়াতেন। জনৈক কবি তাই হাজ্জাজকে কটাক্ষ করে লিখেছিলো,
أ ينسى كليب زمان الهزال
و تعليمه سورة الكوثر
رغيف له فلكة ما ترى
و آخر كالقمر الأزهر
কুলায়ব (কুকুর ছানা) কি ভুলে গেছে সেই কংকালসার দিনগুলোর কথা, যখন সে রুটির বিনিময়ে সুরাতুল কাউসার শিক্ষা দিত। হরেক রকমের রুটি, কোনোটা ফোলা ফোলা , কোনোটা উজ্জ্বল চাদের মতো গোল। (অনুবাদ : শায়খ আবু তাহের মিসবাহ)
যাহহাক ইবনে মুজাহিম কুফার একটি মক্তবে পড়াতেন। তার মক্তবে তিন হাজার ছাত্র পড়তো। ইয়াকুত হামাভী লিখেছেন আবুল কাসেম বলখীর মক্তবের কথা। তার মক্তবেও তিন হাজার ছাত্র ছিল। তিনি গাধায় চড়ে ছাত্রদের চারপাশে চক্কর দিতেন এবং তাদের দেখাশোনা করতেন। তিউনিসিয়া ও মরক্কোতে প্রচুর মক্তব গড়ে উঠে। কিছু কিছু মক্তব ছিল শুধু সুলতান ও আমিরদের সন্তানদের জন্য। সাধারনত প্রাসাদের এক কক্ষ এসব মক্তবের জন্য নির্ধারিত ছিল। আবু ইসহাক ইবরাহিম বিন আহমদ বিন আলী (মৃত্যু ৩৯৯ হিজরী) ছিলেন কাইরাওয়ানের বিখ্যাত আলেম। তিনি নিজের গ্রামের মক্তবে শিশুদের পড়াতেন।
এসব মক্তবে কখনো কখনো একের অধিক শিক্ষক থাকতো। সিসিলির মক্তবগুলোতে কমপক্ষে পাচজন শিক্ষক থাকতো। একজন থাকতেন প্রধান। তিনি সব দেখভাল করতেন।একারনে সিসিলিতে প্রচুর মক্তব শিক্ষক ছিলেন। ইয়াকুত হামাভী লিখেছেন শুধু পালের্মো শহরেই ৩০০ মক্তব শিক্ষক ছিলেন।
মুসলিম বিশ্বের খ্যাতনামা আলেম ও ফকীহরা তাদের বাল্যকালে এসব মক্তবেই প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছেন। ইমাম শাফেয়ী নিজের বাল্যকালের কথা বলেছেন, ‘আমি ছিলাম এতীম। আমার মা আমাকে মক্তবে ভর্তি করেন। কোরআনুল কারীম খতম করার পর আমি মসজিদে প্রবেশ করি এবং উলামায়ে কেরামের মজলিসে বসি। ইবনে আব্দুল বার ‘জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহি’তে এই বর্ননা এনেছেন। আবু মুসলিম খুরাসানিও তার বাল্যকালে এমন এক মক্তবে পড়াশুনা করেছেন বলে ইবনে খাল্লিকান উল্লেখ করেছেন।
অভিবাবকরা চাইতেন সন্তানদের প্রসিদ্ধ ও স্বনামধন্য শিক্ষকের কাছে পাঠাতে। সেকালের এমনই এক প্রসিদ্ধ শিক্ষক মুসলিম বিন হুসাইন বিন হাসান আবুল গানায়েম (মৃত্যু ৫৪৪ হিজরী)। ইবনে আসাকির তার প্রসিদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন। সাধারণ জনগন মক্তবের শিক্ষকদের সম্মান করতো। এমনকি খলীফা ও আমীররাও মক্তবের শিক্ষকদের সম্মান করতেন।
খলীফা হারুনুর রশীদ তার দুই সন্তান মামুন ও আমিনের জন্য মালেক ইবনে আনাস রহিমাহুল্লাহকে গৃহশিক্ষক নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন। ইমাম মালেক তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, ইলমের কাছে আসতে হয়। ইলম কারো কাছে যায় না। শেষে খলীফা তার দুই সন্তানকে ইমাম মালেকের কাছে পাঠাতে সম্মত হন।
ইমাম মালেক শর্ত দেন, তারা সবার চোখের আড়ালে মজলিসের একেবারে শেষ প্রান্তে বসবে। খলীফা এই শর্ত মেনে নেন। মেহরাজ বিন খালাফ তিউনেসিয়ার একটি মক্তবে পড়াতেন। পরে তিনি প্রসিদ্ধি অর্জন করেন।
মকতব
শিল্পির চোখে সেকালের মক্তব।
মক্তবে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মহিলারাও পিছিয়ে ছিলেন না । তারাও সকাল বেলা বাচ্চাদেরকে পড়াতেন। তাবেয়ী আবদু রব্বিহী ইবনে সুলাইমান জানিয়েছেন উম্মে দারদা কাঠের ফলকে বিভিন্ন প্রজ্ঞামূলক বাক্য লিখে তাকে শিক্ষা দিতেন। এর মধ্যে একটি ছিল ‘বাল্যকালে প্রজ্ঞা শিখ, পরবর্তী জীবনে সে অনুযায়ী কাজ করবে’।
এ সকল মক্তবের পাঠ্যক্রমও ছিল বৈচিত্র্যময়। এসব মক্তবে শেখানো হতো কুরআনুল কারিমের তিলাওয়াত ও হস্তলিপি। পড়ানো হতো প্রয়োজনীয় মাসআলা -মাসায়েল, কবিতা ও আরবী ব্যকরণ। প্রাথমিক হিসাব নিকাশও ছিল পাঠ্য এমনকি ছাত্ররা পড়তো ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাবলীও। আলকামা বিন আবি আলকামার মকতবে আরবী ভাষা, ব্যকরন ও ছন্দ পড়ানো হতো। সাধারণত পাচ ছয় বছর বয়সী বাচ্চারাই এসব মক্তবে পড়তো । এই বয়সেই বাচ্চারা কুর আন হিফজ শুরু করত।এসব মক্তব শিক্ষকদের অনেকেই নিজের জীবনে উন্নতি করেছেন পরে। শুরুতে বলা হয়েছে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কথা । শুরুর দিকে ছিলেন মকতবের শিক্ষক। পরে আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ানের শাসনামলে তিনি ইরাকের গভর্ণর হন। এমনই আরেকজন হলেন ইসমাঈল বিন আব্দুল হামিদ । জীবনের শুরুর ভাগে মক্তবের শিক্ষক ছিলেন। পরে অবস্থার পরিবর্তন হলে মারওয়ান বিন মুহাম্মদের শাসনামলে তিনি মন্ত্রী হন।
সাধারণত শিক্ষকরা ছাত্রদের থেকে বিনিময় গ্রহণ করতেন। তবে যাহহাক বিন মুজাহিম ও আব্দুল্লাহ বিন হারিস সম্পর্কে ইবনে কুতাইবা লিখেছেন তারা শিক্ষাদানের বিনিময় গ্রহণ করতেন না । এখানে বিস্ময়কর এক শিক্ষকের কথা বলা যেতে পারে। আবু আবদুল্লাহ তাউদি (মৃত্যু ৫৮০ হিজরী)। তিনি মরক্কোর ফাস শহরে মক্তবে পড়াতেন। তার নিয়ম ছিল ধনী ব্যক্তিদের সন্তান পড়িয়ে বিনিময় গ্রহণ করতেন এবং সেই অর্থ দরিদ্র ছাত্রদের হাতে তুলে দিতেন।

আরও পড়ুন – ভারতবর্ষের কাগজ


ইবনে যুবাইর আন্দালুসী ও ইবনে বতুতার সফরনামায় এসব মক্তবের বিবরণ পাওয়া যায়। ইবনে বতুতা দামেশকের উমাভী মসজীদের মক্তবের বর্ননা দিয়েছেন এভাবে,
‘একদল শিক্ষক কোরআনুল কারীমের পাঠদানে ব্যস্ত। তারা বসেছেন মসজিদের পিলারে হেলান দিয়ে। তারা কাঠের ফলকে লিখে নয়, বরং মুখে উচ্চারণ করে করে পড়ান। এছাড়া আছেন হস্তলিপির শিক্ষক। তারা বিভিন্ন কবিতার পংক্তি লিখে ছাত্রদের হস্তলিপিতে পারদর্শী করে তোলেন।’
এসব মক্তবের শাসনপদ্ধতীর দিকেও উলামায়ে কেরামের সতর্ক নজর ছিল। আহমদ ইবনে হাম্বলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল বাচ্চাদের প্রহার করা যাবে কিনা? তিনি বলেছিলেন, করা যাবে, অপরাধ অনুসারে তবে ভালোমন্দের পার্থক্য করতে অক্ষম এমন শিশুদের প্রহার করা যাবে না। এসব মক্তবের শিক্ষকরা সমসাময়িক সামাজিক জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন। মিসরের অধিপতি আহমদ ইবনে তুলুন যখন অসুস্থ হন, ২৭০ হিজরীতে, তখন তার সুস্থতার জন্য বিভিন্ন মক্তবে দোয়া করা হয়।
বাংলায় সুলতানী আমল ও মুঘল আমলে প্রচুর মক্তব প্রতিষ্ঠা করা হয়। সাধারনত এসব মক্তবের ব্যয়ভার রাষ্ট্র কিংবা অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের জমিদান ইত্যাদী থেকে করা হতো। প্রতিটি মসজিদে মক্তব ছিল। এমনকি ধনী ব্যক্তিদের বাড়ির সামনেও মক্তব থাকতো। হিন্দু কবি মুকুন্দরামের উক্তি থেকে জানা যায়, হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় গড়ে উঠা ক্ষুদ্র মুসলমান পল্লীতেও মক্তব ছিল। সাধারনত পাচ বছর বয়সে শিশুদের শিক্ষা শুরু হত।
বাংলাসহ সমগ্র ভারতে একটা সাধারন রীতি ছিল চার বছর চার মাস চার দিন বয়সে শিশুদের শিক্ষা শুরু করা হত। শিশুদের শিক্ষা শুরুর দিনে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হত। পূর্ব থেকে নির্ধারিত সময়ে শিশু তার শিক্ষকের সামনে বসতো। শিক্ষক কোরআন শরীফ থেকে একটি আয়াত তিলাওয়াত করতেন, শিশু তা পুনরাবৃত্তি করতো।অনুষ্ঠানের দাওয়াত পত্র লেখা হতো ফারসীতে। এই অনুষ্ঠানকে বিসমিল্লাহ-খানি বলা হত।
এসব মকতবে বালক-বালিকা একসাথেই পড়ত। মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি দৌলত উযির বাহরাম খানের লাইলি মজনু কাব্য থেকে জানা যায়, বাল্যকালে লাইলি ও মজনু একই মক্তবে পড়ত।
ধর্মীয় শিক্ষাদানই ছিল মক্তবের প্রধান উদ্দেশ্য। কবি বিপ্রদাস লিখেছেন, মক্তবে মুসলমান ছেলেমেয়েদের অযু করা ও নামাজ পড়া শেখানো হতো। ধর্মীয় বিষয় ছাড়াও মক্তবে আরবী, ফার্সী ও বাংলা পড়ানো হতো। ‘শমসের গাজীর পুথি’ থেকে জানা যায় , শমসের গাজী একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। সেই মক্তবের জন্য ঢাকা থেকে একজন মুন্সী (ফার্সি শিক্ষক), হিন্দুস্তান থেকে একজন মৌলবী (আরবী শিক্ষক) এবং জুগদিয়া থেকে একজন পন্ডীত (বাংলা শিক্ষক) নিয়োগ দেন।
সেকালে ফার্সী ছিল রাজভাষা । ফলে হিন্দু বালকরা , বিশেষ করে কায়স্থ পরিবারের ছেলেরা প্রায়ই মক্তবের মৌলভীর কাছে শিক্ষাগ্রহণ করতো। বিদ্যাসুন্দরের লেখক রামপ্রসাদ সেনকে তার পিতা একজন মৌলভীর নিকট প্রেরণ করেন এবং তিনি ফার্সী ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। রাজা রামমোহন রায়ও বাল্যকালে মক্তবে ফার্সী শিখেছেন।
তথ্যসূত্র :
১। দুহাল ইসলাম — ড. আহমদ আমীন
২। মাজা কদ্দামাল মুসলিমুনা লিল আলম — ড. রাগেব সারজানি
৩। আল হায়াতুল ইলমিয়্যা ফি ইফ্রিকিয়া — ড. ইউসুফ বিন আহমাদ হাওয়ালাহ
৪। আল হায়াতুল ইলমিয়া ফি সকিলাতিল ইসলামিয়া — ড আলী বিন মুহাম্মদ বিন সাঈদ যাহরানি
৫। খাইরুল কুরুন কী দরসগাহে — কাজী আতহার মোবারকপুরী
৬। হিন্দুয়ো কি ইলমি ও তালিমি তরক্কি মে মুসলমান হুকুমরানো কি কোশিশে — সাইয়েদ সুলাইমান নদভী।
৭। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস — ড. এম এ রহিম
৮। সুলতানি আমলে বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষার উৎপত্তি ও বিকাশ — মো. আব্দুল করিম
৯। লাইলি মজনু — দৌলত উযির বাহরাম খান (আহমদ শরীফ সম্পাদিত)
Facebook Comments