মৃত্যু দিবস পালন : শরয়ী দৃষ্টিকোণ

606

মুফতী পিয়ার মাহমুদঃ জন্মদিবস পালনের মত মৃত্যুদিবস পালনও এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। খ্রিস্টীয় মাসের যে তারিখে লোকটি মৃত্যুবরণ করেছিল প্রতি বছর সে তারিখ এলেই শুরু হয় মরহুমের আত্মীয়-স্বজন দৌড়-ঝাঁপ। গরু-খাশি জবাই করে বিশাল ডেকোরেশন করে আয়োজন করা হয় পোলাও-কোরমা, বিরিয়ানি, তেহারি, জর্দা ইত্যাদির।

গরীব হলে অন্তত মোরগ-মুরগি এবং পোলাও, সাদা ভাত ইত্যাদির। যেন প্রচলিত কোন বিয়ের আয়োজন। এই ভোজসভায় নিমন্ত্রণ করা হয় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষকে। অনেক সময় আবার মৃত্যুর তিন দিন, সাত দিন, চল্লিশ দিন পর আয়োজন করা হয় এ জাতীয় ভোজসভার। এতে খরচ করা হয় অকৃপণ হাতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ সকল অনুষ্ঠানে কুরআন খতম, তিলাওয়াত, দুআ-দুরুদ ইত্যাদি হয়ে থাকে এবং এর বিনিময়ে টাকা-পয়সা দেওয়া হয় বা খাওয়ানো হয়।

কিন্তু বড় আর্শ্চযের ব্যাপার হলো, কুসংস্কার আর রুসুম-রেওয়াজে নিমজ্জিত মুসলিম উম্মাহ একবারও ভেবে দেখে না যে, এই যে এতো টাক খরচ করলাম, এতো ঘাম ঝরালাম, এর দ্বারা মরহুম কতটুকু উপকৃত হলো আর আমরাই বা কি উপকার পেলাম এবং এ ব্যাপারে ইসলামই বা কী বলে! এতটুকু খবর নেয়া বা রাখার সময়-সুযোগ আমাদের নেই।

ছোট্ট একটি উদাহারণ দেই। গত ২৬. ৮. ২০১৬ তারিখে শুক্রবার আমার এক পরিচিত ব্যক্তি ফোন করে বললেন, হুজুর, আমার আব্বার মাগফিরাতের জন্য আজ রাতে খাওয়া-দাওয়ার ইন্তিজাম করেছি। আপনাকেও তাতে আসতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মাইয়িতের উপলক্ষে আয়োজিত দাওয়াতে অংশগ্রহণ করাকে অপছন্দ করি। তারপরও এক রকম অপারগ হয়েই বললাম, ভাই! খাওয়ার পর কি দুআ করতে হবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, দুআ করতে হবে। তখন আমি বললাম, ভাই! মাসআলা অনুযায়ী তো খেলে বা বিনিময় গ্রহণ করলে দুআ করা যাবে না। আর দুআ করলে কোন বিনিময় গ্রহণ করা যাবে না। যদি এমন করা হয়, তাহলে আমরা সবাই গুনাহগার হব। তাই এক কাজ করি, শুধু দুআ করি বা শুধু খাবার খাই। দু’টোর একটা করি। তিনি এটা মানতে নারাজ। তখন আমি বললাম, আমি এলে আমার কথা মানতে হবে। নতুবা আমি আসব না। এ কথা শুনে তিনি বললেন, আচ্ছা হুজুর, ঠিক আছে। তাহলে আপনাকে আরেক দিন আনব।

এখানে ভাবার বিষয় হলো, টাকা খরচ করে এভাবে ইন্তিজাম করলে সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হবে, এ কথা জানার পরও সামাজিক রুসুম-রেওয়াজ ও মেকি প্রথার কারণে টাকা খরচ করেও সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ করতে রাজি কিন্তু সামাজিক মেকি প্রথা ছাড়তে রাজি নয়। এমন হাজারও উদাহারণ দেয়া যাবে।

এ ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান হলো, মৃত্যুদিবস, তিন দিনা, সাত দিনা, চল্লিশা ইত্যাদি আচার-অনুষ্ঠান পালন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। শরিয়তে এগুলোর কোনও ভিত্তি নেই। এ সকল আয়োজন নিছক মনগড়া ও বিজাতীয় কুসংস্কার। তাই মৃত্যুদিবস, তিন দিনা, সাত দিনা, চল্লিাশা ইত্যাদি উপলক্ষে কাউকে খাওয়ানো কিংবা আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা বিদআত ও নাজায়িয এবং এ উপলক্ষে খতম ইত্যাদির বিনিময়ে টাকা-পয়সা দেয়া-নেয়া এবং খাওয়া-খাওয়ানো সবই বিদআত ও হারাম।

কারণ এ ক্ষেত্রে তিলাওয়াত ও দুআকারী নিজেই সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহগার হয়, সুতরাং মরহুমকে সে সওয়াব পৌঁছাবে কিভাবে? মরহুমকে ইসালে সওয়াব করতে হলে প্রথমত তিলাওয়াত ও দুআকারীর সওয়াব পেতে হবে, এরপর না সে সওয়াবটা অন্যের জন্যে পাঠাবে। বিনিময় গ্রহণ করার কারণে যখন সে নিজেই সওয়াব থেকে মাহরুম হচ্ছে তখন অন্যের জন্য ইসালে সওয়াবের তো প্রশ্নই আসে না। এ ব্যাপারে জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ রা. বলেন, আমরা দাফনের পর মৃতের বাড়িতে একত্র হওয়া এবং খাবারের আয়োজন করাকে ‘নিয়াহাহ’ অর্থাৎ মৃতের শোকে বিলাপের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করতাম। [মুসনাদে আহমাদ : হাদীস ৬৯০৫] [বিলাপ করাকে হাদীস শরীফে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে]


এটা পড়ুন – মৃতের একাধিক জানাজা কি জায়েজ ?


এ কথার দ্বারা হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ রা.-এর উদ্দেশ্য হলো, নিয়াহাহ যেভাবে নিষিদ্ধ, মৃতের বাড়িতে খাবারের আয়োজন করাও সেভাবে নিষিদ্ধ। প্রসিদ্ধ ফকীহ আল্লামা শামী রহ. বলেন, মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে ভোজসভার আয়োজন এবং তাতে অংশগ্রহণ মাকরুহে তাহরীমী ও জঘন্য বিদআত। কারণ ভোজসভার আয়োজন শরিয়তে অনুমোদিত হয়েছে আনন্দ-খুশির বেলায়; শোকের বেলায় নয়। এভাবে ইন্তিকালের প্রথম দিন, তৃতীয় দিন বা এক সপ্তাহ পর খাবারের আয়োজন করা এবং কুরআন পাঠের বিনিময়ে সেই দাওয়াত কবুল করা এবং তাতে নেককার ও কুরআন খতমকারীগণের অংশগ্রহণ বা সূরা আনআম, সূরা ইখলাছ পাঠের জন্য উপস্থিত হওয়া মাকরুহে তাহরীমী ও জঘন্য বিদআত। একটু অগ্রসর হয়ে তিনি আরও বলেন, মাইয়িতের জন্য কুরআন তিলাওয়াত, যিকর ইত্যাদি করে বিনিময় গ্রহণ করা যা হাল-যামানায় ব্যাপকভাবে প্রচলিত তা হারাম হওয়া এবং এ জাতীয় ওসিয়ত বাতিল হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। [আর-রদ্দুল মুখতার: ৩/১৩৮-১৩৯ আরও দেখুন, বাযযাযিয়া আলা হামিশিল হিন্দিয়া:৪/৮১]

তিনি আরও বলেন, মৃতের জন্য কুরআন তিলাওয়াতকারী যদি বিনিময় নিয়ে তিলাওয়াত করে, তাহলে তার নিজেরই সওয়াব হয় না; সুতরাং মাইয়িতকে সে কি পৌঁছাবে? এরপর তিনি বলেন, মৃতের পক্ষ হতে মৃত্যুর পর ভোজসভার আয়োজনের ওসিয়ত এবং তার জন্য কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদি পাঠ করে বিনিময় গ্রহণ করা বিদআত, মুনকার, বাতিল ও হারাম। পাঠকারীরা দুনিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠ করার কারণে গুনাহগার হবে। [আর-রদ্দুল মুখতার: ৯/৭৮]

উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুফতী ফকীহুল আছর রশীদ আহমাদ লুধয়ানবী রহ. আহসানুল ফাতওয়াতে বলেন, মৃতের জন্য ইসালে সওয়াব করে বিনিময় দেয়া-নেয়া উভয়টাই হারাম। তিনি আরও বলেন, উল্লিখিত কারণে ইসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে প্রচলিত কুরআনখানি নাজায়িয; বরং এটি মাইয়িতের আযাবের কারণ হওয়ারও যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছ। এ জন্য উলামায়ে কিরাম লিখেছেন যে, প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরজ মৃত্যুর পূর্বে এ জাতীয় অনৈসলামিক পন্থায় ইসালে সওয়াব করতে নিষেধ করে যাবে। [আহসানুল ফাতওয়া: ৭/২৯৬-২৯৭ আরও দেখুুন: ফাতওয়া রহীমিয়া: ২/১১৬-১১৭]

তবে নির্দিষ্ট দিন-তারিখ জরুরী মনে না করে এবং কোন বিনিময়ের আদান-প্রদান ব্যতীত কেবলমাত্র ইসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন খতম, যিকির-আযকার, তাসবীহ-তাহলীল, ফকীর-মিসকিনকে খাওয়ানো, দান-খয়রাত ইত্যাদি করা জায়িয এবং এতে মৃতের অশেষ উপকার হয় এবং ইসালে সওয়াবকারীও লাভবান হয়। বরং কবরস্থ ব্যক্তিরা সর্বদা এই অপেক্ষায় থাকে যে, দুনিয়াতে রেখে যাওয়া তার প্রিয়ভাজনরা তার জন্য কখন ইসালে সওয়াব করবে? ইসালে সওয়াব করা হলে এটি তাদের নিকট দুনিয়া ও দুনিয়ার সমুদয় বস্তু হতেও প্রিয় হয়।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসর রা. থেকে বর্ণিত, সূত্রে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন- ‘কবরস্থ প্রতিটি  ব্যক্তি তার বাবা-মা, ভাই-বেরাদর ও বন্ধু-বান্ধবের প হতে দুআ ইস্তিগফারের জন্য এভাবে অপো করতে থাকে যেভাবে পানিতে ডুবন্ত ব্যক্তি অন্যের সাহায্য কামনা করে। যখন সে দুআ প্রাপ্ত হয় তখন এই দুআ তার নিকট দুনিয়া ও দুনিয়ার সমুদয় বস্তু হতেও প্রিয় হয় এবং আল্লাহ তাআলা দুনিয়াবাসীর দুআর বদৌলতে তাকে দান করেন পাহাড়সম প্রতিদান। আর মৃত্যুদের জন্য জীবিতদের হাদিয়া হলো, তাদের জন্য দুআ ইস্তিগফার করা। [শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস, ৭৫২৭]

অন্য এক বর্ণনায় হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষ যখন মারা যায় তখন তার সকল প্রকারের আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিন প্রকার আমলের সওয়াব তখনও পৌঁছতে থাকে। ১. সদকায়ে জারিয়া, ২. উপকারী ইলম, ৩. নেক সন্তান। [মুসলিম : হাদীস ১৬৩১] তিরমিযী শরীফের এক বর্ণনায় ইবনে আব্বাস রা. বলেন, এক  ব্যক্তি [হযরত সাদ রা.] রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা ইন্তিকাল করেছেন, আমি যদি তার জন্য সদকা করি তাতে কি তিনি উপকৃত হবেন এবং এর সওয়াব তিনি প্রাপ্ত হবেন? জবাবে তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি উপকৃত হবেন এবং এর সওয়াব তিনি প্রাপ্ত হবেন। একথা শুনে সাহাবী বললেন, আমার একটি বাগান আছে। আমি আপনাকে সাী রেখে বলছি, আমার উক্ত বাগানটি আমার মায়ের জন্য সদকা করে দিলাম। [তিরমিযী: ১/৮৫] উসমান ইবনে আফ্ফান রা. বলেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোন মাইয়েতের দাফনকার্য সম্পন্ন করতেন তখন সেখানে অবস্থান করতেন এবং বলতেন, তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ইস্তিগফার কর এবং তার জন্য অবিচলতার দুআ কর। কারণ এখন তাকে সওয়াল-জওয়াব করা হবে। [আবু দাউদ: ১/৭৫]

উপরিউক্ত হাদীসগুলোর দ্বারা একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসালে সওয়াব তথা কোন আমলের সওয়াব কোন মৃত ব্যক্তির জন্য পৌঁছালে তা সে প্রাপ্ত হয় এবং এর দ্বারা সে অনেক উপকৃত হয় ও তার কবরের আযাব-গযব মাফ হয়। শুধু তাই নয়, একাধিক হাদীসে একথাও আছে যে, ইসালে সওয়াব করলে ইসালে সওয়াবকারী নিজেও উপকৃত হয় এবং অফুরন্ত পুণ্যের অধিকারী হয়। যেমন হযরত আলী রা.-এর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোন কবরস্থানের পাশ দিয়ে অতিক্রম কালে ১১ বার সূরা ইখলাছ পাঠ করে মৃতদের বখশে দেয় তাকে মৃতদের সংখ্যা পরিমাণ সওয়াব দেয়া হয়।  সূরা ইয়াসিন পাঠ করে বখশে দিলেও এমন সওয়াব পাওয়া যায়।’ [দারাকুতনী ও তাবরানী শরীফ সূত্রে ফাতওয়া শামী: ১/৮৪৪; তাহতাবী আলাল মারাকী: ৩৪২]

আবু হুরায়রার রা. সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কবরস্থানে গিয়ে সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাছ ও সূরা তাকাছুর পাঠ করে তার সওয়াব কবরস্থ মুমিন নর-নারীর জন্য ইসালে সওয়াব করে তার জন্য এ সকল কবরবাসী সুপারিশকারী হবে।’ [দারাকুতনী : ৪/৮২] হযরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  ইরশাদ করেন ‘যে ব্যক্তি স্বীয় মা-বাবার প থেকে হজ করে সে তাদের প থেকে তো হজ আদায় করলই পাশাপাশি তাকে অতিরিক্ত দশটি হজের সওয়াব দেয়া হবে।’ [দারাকুতনী সূত্রে ফাতওয়া শামী: ২/৬০৭] শেষোক্ত হাদীসের দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় ইসালে সওয়াব করলে অনেক সময় মৃত ব্যক্তির চেয়ে ইসালে সওয়াবকারী নিজে বেশি উপকৃত ও লাভবান হয়।
স্মর্তব্য : ইসালে সওয়াবের নির্দিষ্ট কোন পন্থা বা পদ্ধতি নেই। কুরআন খতম, সূরা ইয়াসিন, ইখলাছ, তাকাছুর ইত্যাদি যে কোন সূরা পাঠ করে কিংবা দুরূদ, নফল নামায, রোযা, যাকাত, সদকা, হজ ইত্যাদিসহ যে কোন নফল ইবাদতের মাধ্যমেই ইসালে সওয়াব করা যায়। [আর-রদ্দুল মুখতার: ১/৮৪৪; হিন্দিয়া:৫/৩৯৪; মিরকাত: ৪/৮২; ফাতওয়া রহীমিয়া: ৭/৯৪-৯৫]

লেখক : গ্রন্থ প্রণেতা, ধর্মীয় গবেষক ও মুহাদ্দিস
জামিয়া মিফতাহুল উলুম, নেত্রকোনা

Facebook Comments