নেপাল ভ্রমণে গিয়ে একবার কেবলকারে চড়েছিলাম। নীচে সবুজ। কত্ত রঙ এর যে সবুজ তার ইয়ত্তা নেই। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ম্যাডাম, গাছের পাতা এত রকমের সবুজ কেন হয়?’ ম্যাডাম সম্ভবত জেনেটিক ডাইভারসিটি নিয়ে কিছু বলেছিলেন। বুঝিনি উত্তরটা।
.
আমরা সাধারণত ‘কীভাবে’ এর উত্তরটাকে ‘কেন’ এর উত্তর বলে ধরে নিই। অথচ ‘কেন’ আর ‘কীভাবে’র মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। যেমন, গাছের পাতা এত রকমের সবুজ কেন? বিজ্ঞানীরা উত্তর দেবে এরকম- ‘গাছের পাতায় ক্লোরোফিল এ, ক্লোরোফিল বি এবং অন্যান্য ক্যারোটিনয়েড পিগমেন্টের বিভিন্ন রকমের অনুপাতের কারণে একেক গাছের পাতা একেকরকম সবুজ হয়। আবার পাতার বয়সের সাথে সাথে সেই অনুপাতটাও বদলে যায়। হাল্কা সবুজটা আস্তে আস্তে গাঢ় হয়’। কিন্তু, আপনি খেয়াল করলে দেখবেন এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলো ‘কীভাবে’ এর উত্তর। ‘কেন’ এর নয়।
.
ধরুন, কেউ মাথার চুলের রং সবুজ করে ফেলেছে। আপনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই আপনার চুলের রঙ সবুজ কেন? এখন সে যদি ‘হেয়ার ডাই’টার নাম আর ডাই করার পদ্ধতি বর্ণনা করে – নিশ্চয় আপনি তাকে থামিয়ে দেবেন। দিয়ে বলবেন, কীভাবে সবুজ করলেন তা জানতে চাইনি, কেন করেছেন তা জানতে চেয়েছি।
কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, যেখানে আল্লাহ কিছু করেন সেখানে তথাকথিত বিজ্ঞানীরা ‘কীভাবে’ এর উত্তর আওড়ায় আর ভাব করে যেহেতু ঘটনা কীভাবে ঘটেছে তারা জানে (যদিও ভাসাভাসা) সেহেতু এটা এমনি এমনি হয়ে গেছে। স্রষ্টার কোনো অস্তিত্ব সেই আলোচনায় আসে না। আর এভাবেই ভুয়া বিজ্ঞানমনষ্করা সৃষ্টিকর্তাকে এবং ‘কেন’ তিনি কাজটা করলেন সে প্রশ্নকে এড়িয়ে যায়।
.
কিন্তু যে সত্যসন্ধানী সে থেমে থাকে না। সে যতটুকু বিজ্ঞান বোঝে তাতে বোঝা যায়, পিগমেন্ট সিস্টেমগুলোর অনুপাত আলাদা না হলেও কাজ চলে যেত। সব গাছ একই রকমের সবুজ হলেও সালোকসংশ্লেষণ ঠিকই চলত।
তাহলে, গাছের পাতাগুলো এত রকমের সবুজ কেন? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে কুরআনের বিকল্প নেই। সৃষ্টিকর্তা ছাড়া তাঁর কাজের উদ্দেশ্য আর কেউ জানে না।সূরা নাহলের ১৩ নম্বর আয়াতের অর্থটা পড়ে দেখুনঃ
‘আর তিনি তোমাদের জন্য যমীনে বিভিন্ন রং-এর বস্তুরাজি সৃষ্টি করেছেন। এতে ঐ সমস্ত লোকেদের জন্য নিশ্চিতভাবে নিদর্শন আছে যারা উপদেশ গ্রহণ করতে চায়’।আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার সৃষ্টিতে যে অসামান্য বৈচিত্র্য রেখেছেন তা আমাদের চিন্তার খোরাক দেয়ার জন্য। আল্লাহর পরিচয় দেয়ার জন্য। এই যে দুনিয়াতে এত রঙের মেলা – এর সবকিছুর স্রষ্টা আল্লাহ।

সূরা ফাতিরের ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা এনেছেন নানা রঙের ফলের কথা। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা এরপর পাহাড়ী পথের রঙের বৈচিত্র্যের কথা বলেছেন। কোনোটা সাদা, কোনোটা লাল। কোনোটা কুচকুচে কালো। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই দুনিয়ার বিভিন্নখানে সত্যি সত্যি হোয়াইট মাউনটেইন, রেড মাউনটেইন, এবং ব্ল্যাক মাউনটেইন আছে। আল্লাহ জাল্লা জালালাহু সেখানে বলেছেন পশুদের গায়ের হরেক রকম বর্ণের কথা। বনের পশু কী গৃহপালিত পশু – সবারই চমকে দেয়া রকমফের আছে।
.
আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা মানুষের গায়ের চামড়ার কথাও বলেছেন। আল্লাহর কাছে বর্ণ ‘বৈষম্যর’ ব্যাপার নয়। এটা তাঁর নিদর্শন। এটা তার একটা দান। পৃথিবীর যেসব এলাকা বিশেষ করে বিষুবরেখার আশপাশে যাদের বাস তাদের গায়ের রং দেখবেন কালো।
কীভাবে?
তাদের চামড়াতে মেলানোসাইট নামের কোষগুলো মেলানিন তৈরি করে যার প্রভাবে গায়ের রং কালো দেখা যায়।
কেন?

সঠিক কারণ আল্লাহই ভালো জানেন, তবে মেলানিন মানুষের চামড়ার কোষগুলোকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেয়। স্কিন ক্যান্সার থেকে বাঁচায়। আবার এও হতে পারে গায়ের রঙের নিদর্শন দিয়ে তিনি পরীক্ষা করেন মানুষকে। কে কালো চামড়া পেয়ে বেজার হলো আর কে সাদা চামড়া নিয়ে অহংকার করল। দুটোই আল্লাহর দান। দুয়ের ক্ষেত্রেই আমাদের বলতে হবে, আলহামদুলিল্লাহ। অন্তর থেকে বিশ্বাস আনতে হবে আল্লাহ যা দিয়েছেন তা আমার মঙ্গলের জন্য এবং আমি তাতেই সন্তুষ্ট।
.
সূরা ফাতিরের ২৮ নম্বর আয়াতটা আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শেষ করেছেন এভাবে – ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জানে তারাই তাঁকে সত্যিকার অর্থে ভয় পায়’।

একটা জিনিস ভেবে দেখেছেন – আল্লাহর সৃষ্টিতে তো অনেক রঙ কিন্তু ইসলামের কি কোনো রং আছে? যেমন বাঙালি পয়লা বৈশাখে লাল-সাদায় সাজে। কেন? এটা হিন্দু বাঙালি বিবাহিত নারীদের সিঁদুরের লাল এবং হাতে পরার শাঁখার সাদা রং এর অনুকরণ। এ রঙের পেছনে হিন্দু ধর্মের বিশদ শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আছে।
হিন্দু মেয়েরা কপালে লাল টিপ পরে। কেন? হিন্দু শাস্ত্র মতে- মানব শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন দেবতা অবস্থান করেন। ললাটে অধিষ্ঠান করেন ব্রহ্মা। লাল কুঙ্কুম ব্রহ্মাকে তুষ্ট করার জন্য হিন্দু মেয়েরা কপালে লাল টিপ পরে।
.
নানা ধর্মের রয়েছে নানা রং। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা গেরুয়া বসন পরে। এটা নাকি সুখের রং। তাও ধর্মের ইন-ইয়াং এর রং সাদা আর কালো। ইহুদিদের স্টার অফ ডেভিডের রং গাঢ় নীল। কিন্তু ইসলামের কোনো প্রতীকি রং নেই।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কালো পতাকা নিয়ে যুদ্ধে যেতেন আবার মৃতদের সাদা কাপড়ে কাফন দিতে বলতেন। কুরআনে জান্নাতীদের সবুজ পোশাকের কথা পাওয়া যায়। আবার সূরা বাকারার গরুটাকে হলুদ হতে হবে এটা আল্লাহর হুকুম ছিল।
আইকোনোক্লাজম বলে একটা শব্দ সেকুলারদের ভারী প্রিয়। যা প্রতিষ্ঠিত কোনো চিহ্ন বা প্রতীককে ধ্বংস করা তাই iconoclasm। সেকুলাররা ধর্মের বিরুদ্ধে দুটো কথা বলে নিজেদের আইকোনোক্লাস্ট বলে ভাবতে ভালোবাসে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে সেকুলাররাই আইকন তৈরি করে বেশি। এই যে তথাকথিত মঙ্গল শোভাযাত্রার মুখোশ আর মূর্তিগুলো – এগুলো আইকন নয়ত কী?
.
ধর্ম হিসেবে ইসলাম আইকোনোক্লাস্টিক। ইসলাম এসেছেই মানুষের বানানো চিহ্ন, রং, প্রতীককে ধ্বংস করতে। সেই সব প্রতীক যা মঙ্গল-অমঙ্গলের মিথ্যা ক্ষমতা দাবী করে। সেই সমস্ত রঙকে মুছে দিতে যা আনুষ্ঠানিকতার বেড়াজালে ধর্মীয় কল্যাণকে আবদ্ধ করে।
চাঁদ তারা? ওটা অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতীক ছিল। ইসলামের না।
অনেকে বলতে পারেন সবুজ গম্বুজের কথা।
ওটা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা যাওয়ার বহু বছর পরে বানানো। গম্বুজটা যেমন ইসলামের প্রতীক নয়, তেমন সবুজ রংটাও ইসলামের কোন প্রতীকি ব্যাপার নয়।
.
যারা তাজমহলে গিয়েছেন তারা দেখেছেন – এর চারপাশে অনেক দোকান। সেখানে তাজমহলের ছোট ছোট রেপ্লিকা বিক্রি হয়।
কাবা ঘরের রেপ্লিকা বিক্রি হতে দেখেছেন কাবার চারপাশে? যারা হজ্ব করেছেন তারা কী শখ করে কাবার রেপ্লিকা কিনে আনে? সেই রেপ্লিকা সামনে রেখে কী কেউ সিজদা দেয়? না, দেয় না। কারণ, কাবাঘরটা আমাদের কিবলা। সারা দুনিয়ার মুসলিমরা যেন একটা নির্দিষ্ট দিকে ফিরে সলাত আদায় করতে পারে সেই হিসেবে বায়তুল্লাহ আমাদের কিবলা।
.
এক সময় আমাদের কিবলা ছিল ফিলিস্তিনের বায়তুল মাকদিস। মদীনাতে মুসলিমদের হিজরতের পরে আল্লাহ যখন কিবলা পরিবর্তন করে দিলেন, মুসলিমরা সলাতের মধ্যেই ফিলিস্তিন থেকে মুখ ঘুরিয়ে মক্কার দিকে সিজদা করেছিল। অনেক অবুঝ মুসলিম অবশ্য কাবাঘরের ছবিওয়ালা জায়নামায কেনেন। এটা ঠিক না। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবারা সলাতের দৃষ্টির স্থানে নকশাওয়ালা কিছু পছন্দ করতেন না। উমার রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তো একবার একটা কাপড় ছিড়েই ফেলেছিলেন কারণ সেটা তার মনোযোগ নষ্ট করেছিল।
.
কাবা ইসলামের শিয়ার। আল্লাহর একটা নিদর্শন। কিন্তু এটা ইসলামের কোনো চিহ্ন বা প্রতীক নয় যা মানুষ ধারণ করবে। কোনো কারণে যদি কখনও কাবাঘর ধ্বংস হয়ে যায় তাও মুসলিমরা তাদের সলাত যথানিয়মে আদায় করে যাবে। কারণ তারা কাবাঘরের পূজা করে না, তারা কাবার মালিকের ইবাদাত করে।
.
১৪০০ বছর আগে খ্রিষ্টানরা নবজাতককে হলুদ রঙের পানিতে ডুবিয়ে ব্যাপটিজম করাত। ব্যাপটিজম এর শাব্দিক অর্থ ‘রাঙানো’। রোমান ক্যাথলিকদের ধর্ম পরিবর্তন হতে হতে এখন অবশ্য আর ডুবানোর ব্যাপার-স্যাপার নেই। এখন কিছুটা পানি মাথায় ঢেলে দেয়া হয় অথবা গায়ে ছিটিয়ে দেয়া হয়। ব্যাপটিজম নামে আছে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে নেই।
তো, খ্রিষ্টানরা যখন মুসলিমদের বলল, এই যে আমরা ব্যাপটিজম করাই – তোমাদের এমন কিছু আছে? আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা তখন সূরা বাকারার ১৩৮ নম্বর আয়াত নাযিল করলেন। তিনি আমাদের বলতে বললেন,‘আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করলাম। আর রং এর দিক দিয়ে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক সুন্দর? আর আমরা তাঁরই ইবাদাতকারী’।
.
এই রং মানে আল্লাহর দ্বীন – ইসলাম। আমরা চামড়াতে রঙিন পানি ঢেলে ধার্মিক সাজি না। আমরা আমাদের অন্তরগুলোকে আল্লাহর সামনে নুইয়ে দিই, আত্মসমর্পণ করি।
কুরআনের অন্যান্য খানে রং বলতে ব্যবহৃত হয়েছে লাওন ( ِاللون ) ইংরেজিতে যাকে বলে কালার (Color)। কিন্তু যখন আল্লাহ সূরা বাকারার এই আয়াতে তার দ্বীন বা মনোনীত জীবন ব্যবস্থার কথা বলেছেন তখন তিনি এনেছেন সাবাগ (صبغ) শব্দটি। ইংরেজিতে এর প্রতিশব্দ ডাই (dye)।
.
লাওন আর সাবাগের মধ্যে তফাত কী?
লাওন হচ্ছে বাহ্যিক, কোনো কিছুর ওপরে আলো ঠিকরে পড়ে আমাদের চোখে যে রঙের প্রতিফলন ধরা পরে তাই লাওন। আর সাবাগ হচ্ছে অভ্যন্তরীন, যা কোনো কিছুর ভেতরে ঢুকে সেটাকে একটা রং দেয়। গাছের পাতার লাওন হচ্ছে সবুজ আর সাবাগ হচ্ছে ক্লোরোফিল।
.
এই যে বর্ণিল পৃথিবী, রঙিন প্রাণীকুল, একেকটা রঙের শয়ে শয়ে শেড – এই সবকিছুই আমাদের ইশারা দেয় তাওহীদের দিকে। আল্লাহকে একক মেনে নেওয়ার দিকে। আল্লাহর অসামান্য সুন্দর জীবন ব্যবস্থা ইসলাম দিয়ে আমাদের অন্তরটাকে রাঙিয়ে নেওয়ার দিকে। প্রকৃতির বর্ণবৈচিত্র্য মনোহর কিন্তু এক আল্লাহর ইবাদাতের চেয়ে সুন্দর কোনো কিছুই নেই। আল্লাহ যেন আমাদের তাঁর সত্যিকার আবদ, সত্যিকার বান্দা হওয়ার তাওফিক দেন। ইসলামের স্বচ্ছতায় আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার তাওফিক দেন।
—–
লেখক- মুহতারাম শরীফ আবু হায়াত তপু
Facebook Comments