সবচেয়ে ভয়ংকর গোনাহ কোনটি?

36

সবচেয়ে ভয়ংকর গোনাহ কোনটি?
না, কাউকে হত্যা করা নয়, ব্যভিচার নয়, দেশদ্রোহিতা নয়। সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর গোনাহটি হলো- শিরক।

অনেকেই জানেন উত্তরটা। কিন্তু কেউ কেউ হয়তো জানেন না, আর কেউ কেউ জানলেও আমলে নেন না যে, কুরআনের বেশকিছু আয়াতে আল্লাহ তাআলা যখন যখন শিরক করতে নিষেধ করেছেন, তখন একটি সম্পর্ক; হ্যাঁ একটিমাত্র সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন।

দুনিয়াতে মানুষ স্বামী স্ত্রী, সন্তান, বন্ধুবান্ধব নানা ধরনের সম্পর্কে জড়ায়, এবং এই প্রত্যেকটা সম্পর্ক মানুষের একের অধিক জনের সাথে থাকতে পারে। যেমন- এক স্বামী বা স্ত্রীর সাথে তালাক হলে অন্য স্বামী স্ত্রী নেয়া যায়। সন্তান মানুষের একের অধিক থাকে, ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব, সব। কিন্তু এই একটা সম্পর্ক কিছুতেই একের অধিক থাকে না। এক না থাকলে অন্যটি পাওয়া যায় না।

আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সম্পর্কটির নাম হচ্ছে- ‘মা, মা, মা এবং বাবা।’

এবার একটু চিন্তা করুন দেখি, আল্লাহর ইবাদতের পর যে কাজগুলো আপনি প্রতিদিন করেন, সেই লিস্টের প্রথমদিকে আপনার মা ও বাবা আছেন কিনা? রমজানের এই বিশেষ সময়ে আপনার মা বাবার কতটুকু যত্ন নিয়েছেন? বিশেষ করে আপনার মা, যার কথা তিনবার বলার পর নবীজি সা. বাবার কথা বলেছেন?
দিনে কতবার তার খেদমত করেন?
তার কাজগুলো করে দেন?
তার কী খাবেন খোঁজ নেন?
তার শরীরের খোঁজ নেন?

স্বামী হোন বা ননদ দেবর, বাড়ির বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। মা বাবা আপনার, তার না। আপনি সেবা করুন। আবার বাড়ির বউও স্বামীকে উৎসাহিত করুন মা বাবার সেবা করতে।

আপনার স্বামী, আপনার স্ত্রী, আপনার সন্তান, আপনার সংসারের চেয়েও যে গুরুত্বপূর্ণ আপনার মা মা মা ও বাবা।

এখানে একটি বিষয় আছে, আমরা যারা মা বাবা থেকে দূরে থাকি, তাদের জন্য মা বাবাকে ভালোবাসা সহজ। কিন্তু যারা কাছে থাকি তারা অনেক ক্ষেত্রেই বাবা মাকে তীব্রভাবে ভালোবাসতে পারি না। কারণ মা বাবা আমাদের মা বাবা হলেও তারা মূলত মানুষ। তারা আমাদের অনেক ভুল কথা বলেন, হয়তো অন্যায় আচরণও করেন, আমি মেয়ে হলে আমার পোশাক আশাক চলাফেরা নিয়ে বকা দিতেই থাকেন, আমি ছেলে হলে আমাকে স্ত্রৈন বলেন, আমার স্ত্রী পুত্রের সাথে মন্দ আচরণ করেন। আরো অনেক অনেক দোষ তাদের। কিন্তু দেখুন, আল্লাহ তাদেরকে আপনাকে মানুষ হিসেবে দেখতে বলছেন না। তারা মানুষ সেটা আল্লাহর কাছে। তাদের দোষত্রুটি, এমনকি আপনার প্রতি অন্যায় আচরণও অন্যসব মানু‌ষের মতো আল্লাহর বিচারে। কিন্তু আপনার কাছে তারা আপনার বাবা – মা।

আর তাই তারা যদি সবচেয়ে ভয়ংকর, সবচেয়ে বড় গোনাহ শিরকও করেন, তবু আল্লাহ আপনাকে বলছেন, তারা আপনার বাবা মা, তাদের সাথে ভালো আচরণ করুন।

এবার দেখুন কিছু আয়াত-
আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে অপর কাউকে শরীক করো না, পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো…. [নিসা ৩৬]

আল্লাহ তাআলা বলেছেন: পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরীক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই। তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। [লোকমান ১৫] দেখুন, তারা যদি মুশরিকও হয় তবে তাদের শরীয়তবিরোধী আদেশ মানা যাবে না, কিন্তু তবুও ভালো ব্যবহার করতে হবে।

‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। আমারই দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বলে দিব যা কিছু তোমরা করতে’ [আনকাবূত ৮]

আল্লাহ বলেন: ‘আপনার রব নির্দেশ দিলেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না, আর তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বল। অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বল, হে পালনকর্তা! তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন। তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মনে যা আছে তা ভাল করেই জানেন। যদি তোমরা সৎ হও, তিনি মনোযোগীদের প্রতি ক্ষমাশীল’ [বনী ইসরাঈল ২৩- ২৫]

ভাবুন, কতবার উহ বলেন তাকে? কতবার অসহ্য লাগে আপনার তাদের আচরণ? আর ভালোবাসেন কতবার? খোঁজ নেন কতবার? যত্ন নেন কতবার? রাসূল বলছেন, যে সন্তান নিজ মাতা-পিতার প্রতি রহমত ও আন্তরিকতার দৃষ্টিতে একবার তাকাবে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক দৃষ্টির বিনিময়ে তার জন্য একটি মাবরুর হজের সওয়াব লিপিবদ্ধ করবেন। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! যদি উক্ত ব্যক্তি দৈনন্দিন একশত বার তাকায়, তাহলে? তিনি উত্তরে বলেন, হ্যাঁ! আল্লাহ তায়ালা সুমহান ও বড় করুণাময়। [বায়হাক্বী: শুয়াবুল ঈমান ১০/২৬৫]

নবীজি বলছেন, পিতা- মাতা জান্নাতের মাঝের দরজা। যদি চাও, দরজাটি নষ্ট করে ফেলতে পারো, নতুবা তা রক্ষা করতে পারো। [তিরমিযী, তুহফাতুল আহওয়াযী, ৬/২৫]

আপনার দরজাটি ঠিক আছে তো?

মা বাবা যে কী, তা তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, যাদের মা নেই, বাবা নেই। মা বাবাকে ভালোবাসুন। বিশেষ করে মা কে। মনে রাখবেন রাসূলের কথা : মা মা মা, তারপর বাবা।

Facebook Comments