হযরত সাঈদ ইবনে আমের আল জুমাহী(রা)

43

সাঈদ ইবনে আমের সে ছিল ঐ সকল হাজারো মানুষদের মধ্য থেকে একজন। যারা কুরাইশদের ডাকে সারা দিয়ে খুবাইব (রাঃ) হত্যার দৃশ্যকে দেখার জন্য মক্কার অদুরে তানাঈম প্রান্তরে একত্রিত হয়েছিল।হযরত খুবাইব (রাঃ) তিনি ছিলেন রাসুল (সাঃ) একজন প্রিয় সাহাবী। তাকে মক্কার মুশরিকরা প্রতারনার আশ্রয় নিয়ে বন্দী করেছিলো।

এবং তাকে হত্যা করে বদরের যুদ্ধে নিহত কুরাইশদের হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার সংকল্প করেছিলো।মক্কার মুশরিকরা খুবাইব (রাঃ) বন্দী করে তাকে টেনে হেচরে তানাঈম প্রান্তরে দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। আর পিছন দিক থেকে যুবক -যুবতী, নারী ও বৃদ্ধরা করোতালী দিয়ে উল্লাশ করছিলো। এবং শ্লোগানে শ্লোগানে তাতুজ্জার জয়ধ্বনি উচ্চারিত করছিলো। খুবাইব (রাঃ) যখন হত্যার জন্য নির্দিষ্ট স্হানে নিয়ে আসা হলো। তিনি যখন শূলী কাষ্ঠের সামনে দারিয়ে আছেন। তখন সাঈদ ইবনে আমেরের অনুসন্ধানী দৃস্টি খুবাইব (রাঃ) দিকে নিবদ্ধ হলো। তিনি দেখলেন খুবাইব (রাঃ) সেই কঠিন মূহুর্তেও নিঃচিন্তে দারিয়ে আছেন। তার চেহারায় বিন্দু পরিমানও আতঙ্কের ছাপ নেই।নারী শিশুদের শোরগোলের মাঝে সাঈদ ইবনে আমের হঠাৎ করে হযরত খুবাইব (রাঃ) প্রশান্ত কস্ঠশ্বর শুনতে পেলেন মৃতু্্য আগ মূহুর্তে তিনি কুরআইশ নেতৃবৃন্দদের লখ্য করে বলছিলেন, তোমরা যদি আমাকে দুরাকাত নামাজ পরার সুযোগ দিতে। মুশরিকরা তাকে দুরাকাত নামাজ পরার সুযোগ দিলো।

সাঈদ ইবনে আমের (রাঃ) খুবাইব (রাঃ) দিকে তাকিয়ে রইলেন, তিনি দেখলেন সে কাবার দিকে ফিরে দুরাকাত নামাজ আদায় করল। কতই না সুন্দর ছিলো সেই নামাজ কতই না সুন্দর ছিলো সেই মনোরম দৃশ্য। অতঃপর নামাজ শেষ করে তিনি কুরআইশ নেত্ববৃন্দের দিকে ফিরলেন।এবং তাদেরকে লখ্য করে বললেন। তোমরা যদি এই ধারনা না করতে যে আমি মৃতু্্যর ভয়ে নামাজকে দীর্ঘায়িত করছি।

তাহলে আমি আমার নামাজকে আরো দীর্ঘয়িত করতাম। আমি আরো দীর্ঘাসময় নিয়ে নামাজ আদায় করতাম। অতঃপর সাঈদ ইবনে আমের (রাঃ) স্বচোক্ষে প্রত্যক্ষ করলেন, যে মক্কার মুশরিকরা দাড়ালো অস্ত্র দিয়ে খুবাইব (রাঃ) এক একটি অঙ্গকে কর্তন করছিলো। আর বলছিলো তুমি কি চাও তোমার স্হানে মুহাম্মদকে রাখা হবে আর তুমি নিরাপধে পরিবারের নিকট ফিরে যাবে। সাঈদ ইবনে আমের (রাঃ) লখ্য করলেন রক্তাত্ব খুবায়ের অতান্ত্য দৃঢ় কন্ঠে বলে উঠলেন, অতন্ত্য অবিচল কন্ঠে বলে উঠলেন। আমি নিরাপদে আমার পরিবার পরিজনের নিকট ফিরে যাবো আর মুহাম্মদ (সাঃ) এর পায়ে একটি মাত্র কাটা বিদ্ধ হবে আমি এটাও বরদাস্ত করতে পারবো না।

এই জবাব শুনা মাত্রই মক্কার কাফিররা অট্ট হাসিতে ফেটে পরল এবং তারা চিতকার করে বলতে লাগল তাকে হত্যা করো, তাকে হত্যা করো, তাকে শূলীতে চরাও। খুবাইব (রাঃ) শূলে চরানো হলো শূলীবিদ্ধ খুবায়েব আকাশের দিকে চিতকার দিয়ে বললেন, “”আল্লাহুম্মা আহসিহিম আদাদা ওয়াকতুলহুম বাদাদা ওয়াল তুগাদিরমিনহুম আহাদা””। হে আল্লাহ আপনার কাছে বিচার দিচ্ছি আপনি এদের সংখ্যাগুলোকে গুনে রাখুন। এদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করুন। আপনি এদের কাউকে ছারবেন না।

অবশেষে অসংখ্যা তীর তরবারীর আগাতে খুবাইব (রাঃ) দেহটি ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে গেল। তার পবিত্র আত্নাটি আকাশে দিকে উরে গেল। আর তার নিশ্প্রান দেহটি জমিনেই পরে রইল। কুরাইশরা মক্কায় ফিরে এলো। কালের আবর্তে খুবাইব (রাঃ) শাহাদাতের বিস্ময়কর ঘটনাটি সবাই ভুলে গেল। কিন্তু সাঈদ ইবনে আমর এক মুহূর্তের জন্যও খুবাইব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু শাহাদতের সেই মর্মান্তিক দৃশ্যটি ভুলতে পারল না। তিনি যখন ঘুমাতেন তখন স্বপ্নের মাঝেও তার সামনে খুবাইব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর শাহাদাতের সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি ভেসে উঠতো। জাগ্রত অবস্থাতেও তার স্মৃতিপটে বারবার সেই দৃশ্যটি ভেসে বেড়াতো ।

খুবাইব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর কথা মনে পড়লেই তিনি স্থির থাকতে পারতেন না। সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু চিন্তা করতেন মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও কিভাবে একজন মানুষ এত সুন্দর করে নামাজ আদায় করতে পারে। সাঈদ ইবনে আমেরের কর্ণকুহরে খুবাইবের বদ দোয়া সেই শব্দগুলো বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তিনি ভাবছিলেন কখন জানি আসমানী আযাব এসে মক্কা নগরীকে গ্রাস করে নেয়। কখন জানি আকাশ থেকে বিশাল প্রস্তর খন্ড নিক্ষেপ করে মক্কা নগরীকে ধুলিস্যাৎ করে দেওয়া হয়। খুবাইব রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সাঈদ ইবনে আমের কে এমন কিছু বিষয় শিক্ষা দিয়ে গেলেন যা তিনি ইতিপূর্বে জানতেন না। তিনি তাকে শিক্ষা দিয়ে গেলেন প্রকৃত জীবন হচ্ছে তাওহীদের আকীদার উপর অটল থেকে আল্লাহর রাস্তায় জীবন বিসর্জন দেয়া। তিনি আরো শিক্ষা দিলেন যে মানুষের ঈমান যখন পরিপূর্ণ হয়ে যায় তখন তার থেকে অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনা প্রকাশ পায়।খুবাইব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু সাঈদ ইবনে আমের কে আরেকটি বিষয় শিক্ষা দিয়ে গেলেন।

যেই মানুষটি কে তার সাথীরা এতো ভালবাসে, যেই মানুষটির জন্য তার সাথীরা হাসিমুখে জীবন বিলিয়ে দেয়। নিশ্চয়ই তিনি আসমানী সাহায্যপ্রাপ্ত নবী। অতঃপর সাঈদ ইবনে আমেরের অন্তরকে আল্লাহ তাআলা ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দিলেন। তিনি সকল মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কুরাইশের পাপাচার থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করলেন এবং তারা যে সকল বাতিল ইলাহের ইবাদত করে তাদের থেকেও সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। এবং তিনি সকলের সামনে সুউচ্চ কণ্ঠে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন। সাঈদ ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রিয় রাসুলের সান্নিধ্য লাভের জন্য হিজরত করে মদীনায় চলে গেলেন। মদিনায় যেয়ে তিনি সব সময় রাসুল সাঃ এর পাশেই থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে তিনি খাইবারের যুদ্ধ অংশগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে সকল যুদ্ধে তিনি রাসুল সাল্লাহু সাল্লাম এর সাথে উপস্থিত ছিলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উপর সন্তুষ্ট অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। পরবর্তীতে আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর খিলাফতের সময় তিনি ইসলামের উন্মুক্ত তরবারী হয়ে যান। সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু তিনি ছিলেন প্রকৃত মুমিনদের এক অনন্য উপমা। তিনি দুনিয়ার উপর আখেরাতকে প্রধান্য দিয়েছিলেন। দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাতকে ক্রয় করেছিলেন। খলীফাতুল মুসলিমীন আবু বকর ও ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তার তাকওয়া ও পরহেজগারীতার ব্যাপারে ভাল করেই অবগত ছিলেন। তাই তারা সাঈদ ইবনে আমের এর উপদেশ ও দিকনির্দেশনাকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখতেন। ওমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর খেলাফতের শুরুর দিকে সাঈদ ইবনে আমর ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর কাছে গেলেন। এবং তাকে লক্ষ্য করে বললেন।

হে উমর শুনে রাখ তুমি তোমার জনসাধারণের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহর ব্যাপারে কাউকে ভয় করবে না। মনে রাখবে তোমার কথা যাতে তোমার কাজের বিপরীত না হয়। কেননা সর্বোত্তম কথাই সেটা যেটাকে কাজে পরিণত করা হয়। হে উমর তুমি দূরবর্তী ও নিকটবর্তী সকল মুসলমানদের প্রতি খেয়াল রাখবে। তুমি তাদের জন্য তাই পছন্দ করবে যা তুমি তোমার নিজের জন্য ও পরিবারের জন্য পছন্দ করো।

এবং তাদের জন্য ঐ সকল জিনিসকে অপছন্দ করবে যা তুমি নিজের জন্য ও তোমার পরিবারের জন্য অপছন্দ করো। তুমি সত্য জীবন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ো, আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভয় করবে না। ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বললেন হে সাঈদ? এটা কে করতে পারে। সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু বললেন। হে উমর তুমি পারবে, এবং তোমার মত আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মার শাসক হিসেবে নিযুক্ত করেছেন তারাই পারবে। ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু। এবার সুযোগ পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন হে সাঈদ আমি তোমাকে হিংসের গভর্নর নিযুক্ত করতে চাই? তখন তিনি বললেন হে উমর আল্লাহর কসম করে বলছি তুমি আমাকে পরীক্ষায় ফেলো না। এ কথা শুনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু একটু রাগান্বিত হলেন, এবং বললেন এটা কেমন কথা তোমার আমার মাথায় দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিবে। আর তোমরা দূরে সরে থাকবে।

আল্লাহর কসম এবার আমি তোমাকে ছাড়ছি না অতঃপর তাকে হিনসের গভর্নর নিযুক্ত করা হলো। এবং তাকে বলা হলো আমি কি তোমার জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতার ব্যবস্থা করব। সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু বললেন আমি রাষ্ট্রীয় ভাতা দিয়ে কি করবো। যদি আমাকে ভাতা দেওয়া হয় তাহলে এটা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি হিংসে চলে গেলেন কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর হিনস নগরী থেকে একটি বিশ্বস্ত প্রতিনিধি দল মদিনায় আসলো। ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন তোমরা আমাকে তোমাদের নগরীর দরিদ্র লোকদের একটি তালিকা তৈরি করে দাও। যাতে করে আমি তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারি। অতঃপর তারা একটি তালিকা তৈরি করে দিল। ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর যখন সেই তালিকাটি তে চোখ বুলাচ্ছিলেন তখন তিনি দেখতে পেলেন কয়েকটি নাম এর পরের নামটি হচ্ছে সাঈদ ইবনে আমের। তখন ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন কে এই সাঈদ ইবনে আমের।

তখন তারা বলল উনিই হচ্ছেন আমাদের আমির। তখন ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তাদেরকে বললেন তোমাদের আমির ও কি দরিদ্র। প্রতিনিধিদলটি বলল আল্লাহর কসম করে বলছি কখনো দিনের পর দিন এমন অতিবাহিত হয় যে তার চুলায় আগুন পর্যন্ত জ্বলে না। এ কথা শুনে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। এমন কি এমনটি চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে গেল। তিনি 1000 দিনার একটি থলে তাদের হাতে দিয়ে বললেন সাঈদ ইবনে আমের এর নিকট আমার সালাম পৌঁছাবে তাকে বলবে ওমর ইবনে খাত্তাব এগুলো আপনাকে আপনার প্রয়োজন পূরণের জন্য দিয়েছেন। প্রতিনিধিদলটি সাঈদ ইবনে আমেরের বাড়িতে এলো এবং তাকে আমিরুল মুমিনীনের পক্ষ থেকে সালাম দিয়ে বলল। আমিরুল মোমেনীন আপনার প্রয়োজন পূরণের জন্য এই দিনারগুলো পাঠিয়েছেন। সাঈদ ইবনে আমের দিনারের থলিটি দেখামাত্রই বিস্ময়ের সাথে বলে উঠলেন ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

সাঈদ ইবনে আমের ভয়ার্ত কণ্ঠ শুনে দৌড়ে ছুটে এলেন এবং আশ্চর্যনিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। কি হয়েছে আমীরুল মুমিনীন কি ইন্তেকাল করেছেন। সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু বললেন না। বরং এর চেয়ে ভয়াবহ কিছু ঘটেছে। তার স্ত্রী বললেন তাহলে কি মুসলিম বাহিনী কোথাও পরাজিত হয়েছে, সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু বললেন না বরং তার চেয়েও বেশি ভয়াবহ। তার স্ত্রী বললেন তাহলে বলোনা কি হয়েছে? সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু আমার আখেরাতকে ধ্বংস করার জন্য দুনিয়া আমার উপর চেপে বসেছে আর ফেতনা আমার ঘরে এসে উপস্থিত হয়েছে। তার স্ত্রী তখনও দীনার সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তার স্ত্রী বললেন ফেতনাকে দূরে সরিয়ে দিন। নিজেও তা থেকে বেঁচে থাকুন। সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু বললেন তুমি কি এই ব্যাপারে আমাকে সহযোগিতা করবে। তিনি বললেন হাঁ অবশ্যই করবো।

তারপর সাঈদ ইবনে আমের দিনার গুলো কে ভাগ করে অনেকগুলো থলেতে ভরলেন এবং হিনসের দরিদ্র মুসলমানদের মাঝে তা বন্টন করে দিলেন। এর কিছুদিন পর আমিরুল মুমিনিন ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু জনসাধারণের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য শামে এলো। হিংসের অধিবাসীরা তাদের গভর্নরদের ব্যাপারে সব সময় বেশি অভিযোগ করত। ওমর রাদিয়াল্লাহু পৌঁছামাত্রই অধিবাসীরা তার সাথে দেখা করতে এলো হযরত ওমর রাঃ তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন তোমরা তোমাদের আমিরকে কেমন পেয়েছ? তখন তারা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর নিকট তাদের আমিরের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ উত্থাপন করলেন।

যার প্রত্যেকটি অভিযোগই একটি অপরটির তুলনায় গুরুতর ছিল। ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন অতঃপর আমি তাকে ও তাদেরকে একই মজলিসে একত্রিত করলাম। আল্লাহ তা’আলার নিকট দোয়া করতে থাকলাম আল্লাহতায়ালা যেন সাঈদ এর ব্যাপারে আমার ধারনাকে ভুল প্রমাণিত না করেন। সাঈদ ইবনে আমের ও তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর মজলিসে উপস্থিত হলো। আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম তোমাদের আমিরের ব্যাপারে তোমাদের কি কি অভিযোগ আছে। তারা বলল আমাদের প্রথম অভিযোগ হলো অনেক দেরি করে ঘর থেকে বের হন? আমি বললাম হে সাঈদ এ ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি? সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু তখন কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর বলতে লাগলেন আল্লাহর কসম করে বলছি আমি এই বিষয়টি কারো সামনে বলতে চাচ্ছিলাম না।

কিন্তু এখন বাধ্য হয়ে বলতে হচ্ছে আসলে আমার ঘরে কোন চাকর চাকরানী নেই এজন্য প্রত্যেক দিন সকালে আমি আঠা গুলাই তারপর খামিরা তৈরি করি। তারপর আমার নিজ হাতে পরিবারের জন্য রুটি বানাই। অতঃপর অজু করে জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য বাহিরে বের হয়ে আসি। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন তারপর আমি অভিযোগকারীদের বললাম তোমাদের আর কোন অভিযোগ আছে কি? দ্বিতীয় অভিযোগ হলো তিনি রাতে আমাদের কারো ডাকে সাড়া দেন না। আমি বললাম হে সাঈদ এ ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি? আল্লাহর কসম করে বলছি এ বিষয়টিও আমি কারো সামনে প্রকাশ করতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু এখন বাধ্য হয়েই প্রকাশ করতে হচ্ছে। আসলে আমি আমার দিনের সময় গুলোকে জনসেবা মূলক কাজের জন্য নির্ধারণ করেছি। আর রাতের সময় গুলোকে আমার রবের ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করেছি।

ওমর (রাঃ) বলেন এরপর আমি অভিযোগকারীদেরকে বললাম তোমাদের আর কোন অভিযোগ আছে কি? তারা বলল হা! আমাদের তৃতীয় অভিযোগ হলো! প্রত্যেক মাসে একদিন তিনি ঘর থেকে বাহিরে বের হন না। আমি বললাম হে সাঈদ এ ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি? সাঈদ ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হে আমীরুল মুমিনীন এই পরিধেয় কাপড় ছাড়া আমার আর কোনো কাপড় নেই। তাই মাসে একবার কাপড় টিকে ধৌত করি এবং শুকানোর অপেক্ষায় ঘরে অবস্থান করি। দিন থেকে কাপড় শুকানো শেষ হলে ঘর থেকে বের হই। ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন তারপর আমি তাদেরকে বললাম তোমাদের আর কোন অভিযোগ আছে কি? তারা বলল হা আছে। আমাদের চতুর্থ অভিযোগ হলো। মাঝেমধ্যে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন ফলে তিনি তার মজলিসে উপস্থিত হতে পারেন না। আমি বললাম হে সাঈদ এর কারণ কি? সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন আমি মুশরিক অবস্থায় খুবাইব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর মৃত্যু যন্ত্রণা দেখেছি। আমি দেখেছি কিভাবে মুশরিকরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করছিল।

তার শরীর থেকে এক একটি অঙ্গ কেটে ফেলা হচ্ছিল। আর তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল। তুমি কি চাও তোমার স্থানে মোহাম্মদ কে রাখা হবে। আর তুমি নিরঅপরাধে বাড়ি ফিরে যাবে। খুবাইব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেছিলেন আল্লাহর কসম করে বলছি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হবে আর আমি নিরাপধে পরিবার পরিজন এর নিকট ফিরে যাব এটা কিছুতেই হতে পারে না। আল্লাহর কসম করে বলছি আমার সেই দিনের কথা মনে পড়ে, যখনই খুবাইব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর হত্যার দৃশ্যটি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখন আমি আমার নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না।

তখন আমাকে আমার নিজের কাছেই খুব অপরাধী মনে হয়। কেননা আমি তো সেখানে উপস্থিত থেকেও খুবাইবের জন্য কিছুই করতে পারিনি এবং আমার মনে হয় আল্লাহ তাআলা হয়তো আমাকে কখনোই ক্ষমা করবেন না। এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই আমি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ি।আমি অচেতন হয়ে যায়। এ কথা শেষ হওয়া মাত্রই ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু আবেগজনিত কন্ঠে বলে উঠলেন। আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া যিনি সাঈদ এর ব্যাপারে আমার ধারনা কে সত্য প্রমাণিত করেছে।

তারপর হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু মদিনায় ফিরে এলেন। সাঈদ ইবনে আমের নিকট 1000 দিনার পাঠিয়ে দিলেন। সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু এর স্ত্রী দিনার গুলো দেখা মাত্রই। আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলেন এবং বলল হয়তো আমাদের কষ্ট দূর হবে। আপনি এই দিনার গুলো দিয়ে একজন গোলাম ক্রয় করে আনুন। আর কিছু খাবারের ব্যবস্থা করুন।

সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু তার স্ত্রীকে বললেন, এই দিনার গুলো দিয়ে এর চেয়ে ভালো কিছু করা যায় না। স্ত্রী বললেন সেটা আবার কি? সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন এই দিনার গুলোকে আমরা এমন এক মহান সত্তা র নিকট আমানত রাখবো।


যিনি আমাদের তীব্র প্রয়োজনের সময় আমাদের কাছে এগুলোকে ফিরিয়ে দিবেন। স্ত্রী বললেন আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে এটা কিভাবে রাখব। সাঈদ ইবনে আমের (রা:) বললেন, আমরা আল্লাহ তায়ালাকে ঋন দিবো। স্ত্রী আনন্দ ভরা কন্ঠে বললেন আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে তাই করুন। হযরত সাঈদ ইবনে আমের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু মজলিস থেকে উঠার আগেই দিনার গুলোকে বিভিন্ন থলের মাঝে ভাগ করে রাখলেন এবং পরিচিত একজনকে ডেকে বললেন। যাও এই থলেটি অমুক বিধবা নারীকে দিয়ে আসো।

যাও এই থলেটি ঐ এতিমদের দিয়ে এসো। এই থলেটি অমুক মিসকিনদের দিয়ে এসো। এই থলেটি অমুক ব্যক্তি দরিদ্র সন্তানদের দিয়ে এসো। এভাবে বন্টন করতে করতে সব দিনারগুলোকে শেষ করে ফেললেন। আল্লাহ তাআলা সাঈদ ইবনে আমের আল জুমাহী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর উপর রহম করুন। তিনি নিজের প্রয়োজন থাকা সত্বেও সর্বদা অন্যকে প্রাধান্য দিতেন। হে আল্লাহ আমাদেরকে তার মত জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন। আমিন। ওমা আলাইনা ইল্লাল বালা।

Facebook Comments