ইমাম মনসুর শিশানি – ককেশাসের সিংহ

359

ইমাম মনসুর শিশানি। ১৭৪৮ সালে চেচনিয়ার রাজধানী গ্রোজনীর নিকটে, সুনজা নদী বিধৌত, আলদাই শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার মূল নাম মুহাম্মদ। রাশানরা তাকে ‘আশুরমা’ উপাধি দেয়। আঠার শতকের শেষদিকে রুশদের বিরুদ্ধে যমদূত হয়ে আবির্ভূত হন। ককেশাসের আধ্যাত্মিক সাধক আত্মোৎসর্গী যুবকদের নিয়ে ১৭৮৫ সালে রুশ আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে হারাকাত আল-মুরিদিয়্যাহ নামে বিপ্লব কায়েম করেন। প্রথমে রুশ সম্রাজ্ঞী ক্যাটরিন [১৭২৯-১৭৯৬] তার বিপ্লবের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করেনি। কিন্তু রুশ কমান্ডার কলোন্যাল বেরি ইমাম মনসুরের হাতে পরাজিত হবার পর সম্রাজ্ঞীর টনক নড়ে ওঠে!

ইমাম মনসুর ছোটবেলায় দাগিস্তানে কুরআনে কারিম হিফজ করেন। উজবেকিস্তানের বুখারায় ইলমে দীন হাসিল করেন। সেখানেই তিনি হাজার হাজার হাদিস মুখস্ত করেন। পরে নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। তিনি নকশবন্দি তরিকার অনুসারী একজন আলেম থেকে ক্রমান্বয়ে চেচনিয়ার জনপ্রিয় একজন আধ্যাত্মিক সম্রাট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ককেশাসে ইমাম মনসুর হিসেবে সবার শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন। তিনি অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। মাটির ঘরে বাস করতেন। কয়েকটি ঘোড়া আর গরু ছাড়া নশ্বর এই দুনিয়ার কোনোকিছুর মালিক ছিলেন না। নিজের সব সম্পদ তিনি জিহাদ ফি সাবিলিল্লায় ব্যয় করতেন।

ইমাম মনসুর দেখতে পেলেন ক্রুশের পূজারি রুশ ক্রমেই গ্রাস করে ফেলছে গোটা ককেশাসের মুসলিম জনপদগুলো। উসমানি খিলাফত তাদের দমাতে পারছে না। ভয়াবহ এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে ককেশাসকে বাঁচাতে প্রতিরোধ যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ দেখলেন না তিনি। ককেশাসের প্রায় ৩০টি জাতিগোষ্ঠীর প্রায় সবাই মুসলমান। নিজেরা বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষায় বিভক্ত হলেও ইসলাম তাদের প্রধান সেতুবন্ধন। সবাই মুসলিম। ইমাম মনসুর এসব মুসলমানকে একতাবদ্ধ করে রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জেহাদের ডাক দেন। তার ডাকে সাড়া দেন তার হাজার হাজার মুরিদ।

১৭৮৫ সালে ঐতিহাসিক সুনজা নদীর তীরে রুশ সম্রাজ্ঞী ক্যাটরিনের বিশাল বাহিনীর সাথে তার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাশানরা ছিল তারচে দশগুণ বেশি। তার মুরিদ মুজাহিদরা রাশনদের ব্যুহ ভেঙে ফেলে। অসংখ্য সৈনিকের মৃতদেহ পেছনে ফেলে রুশ বাহিনী পালিয়ে যায়। মুজাহিদরা বিজয় অর্জন করার পর ইমাম মনসুরের নেতৃত্বে চেচনিয়া, দাগিস্তান, ইঙ্গুশেটিয়া ও উত্তর ককেশাসের আরো কয়েকটি এলাকা নিয়ে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল ককেশাসের প্রথম ইমাম শাসিত রাষ্ট্র। কিন্তু রুশ আগ্রাসী শক্তি ছিল নাছোড়বান্দার মতো। তারা আরো বেশি শক্তি নিয়ে হামলা অব্যাহত রাখে। ইমাম মনসুরও বিভিন্ন সীমান্তে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যান। সর্বশেষ ১৭৯১ সালে কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী এক এলাকায় যুদ্ধ করতে গিয়ে ইমাম মনসুর উসমানিদের আনাপা দূর্গে আবস্থান নেন।

রুশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন এ দুর্গ অবরোধ করে রাখে। অবশেষে দূর্গের পতন হলে ইমাম মনসুরকে বন্দি করা হয়। বন্দি হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি তলোয়ার হাতে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন। কিন্তু অসংখ্য রুশ সৈন্যের আক্রমণের মুখে টিকতে পারেননি। তিনি যুদ্ধ করতে করতে শাহাদত বরণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সম্রাজ্ঞীর নির্দেশ ছিল, তাকে যে কোনোভাবে জীবিত বন্দি করতে হবে। তিনি তাকে একনজর দেখতে চান। রুশ সেনারা অনেক কৌশলে ক্ষত-বিক্ষত শরীরে বন্দি করতে সক্ষম হয়। তাকে সেন্ট পিটার্সবার্গে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার দুর্ধর্ষ শ্লুসেলবার্গ কারাগারে বন্দি করা হয়।

তাকে রুশ সম্রাজ্ঞী ক্যাটরিনার কাছে মাফ চাইতে প্রস্তাব দেয়া হয়। তিনি তা নাকচ করে দেন। কারাগারেও কয়েকবার বিভিন্ন প্রলোভনের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয় সম্রাজ্ঞীর বশ্যতা স্বীকার করাতে। কিন্তু ককেশাসের সিংহ ইমাম মনসুর মাথা নত করেননি। অবশেষে ১৭৯৪ সালে কারাগারেই শাহাদাতবরণ করেন। সম্রাজ্ঞীর নির্দেশে তার কারারক্ষী তাকে হত্যা করে।
——


লেখক – আইনুল হক কাসেমী (বা-রাকাল্লাহু ফি ইলমিহি)
সূত্র: تاريخ القوقاز، نسور الشيشان في مواجهة الدب الروسي- পৃষ্ঠা: ৫৫-৬৪, মাহমুদ আবদুর রহমান

Facebook Comments