ইসলামে নিকাব নেই !

457
ইসলামে নেকাব
তানভীর আহমেদঃ রঙঢঙের যুগেও যেসব বোনেরা নিজেদের হিফাজত করে যথাযথ হিজাব করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, দুই একজন ইসলামবিদ্বেষীর কারণে সেসব বোনদের ভোগান্তি আর অপমানের শিকার হতে হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানের ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। এখন যখন সেই কালপ্রিটরা বুঝতে পেরেছে যে ৮৮% মুসলিমদের দেশে কোনো প্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ করলে আর যাই হোক সুবিধা করা যাবে না, তখন তারা একটু ডিফারেন্ট এপ্রোচ নিল। আর সেটা হল হিজাব থাকুক – সমস্যা নেই, কিন্তু নিকাব পরিধান করা যাবে না।
তারা ভাবল, এখন যে হারে পূর্ণ দ্বীন না বোঝা বোকা মেয়েগুলো হিজাবের নামে লালনীল পট্টি বেঁধে, লিপস্টিক দিয়ে নয়া জামানার সম্ভ্রমী সেজেছে তাতে হিজাব থাকলেও সমস্যা নেই। কিন্তু যারা এখনও দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে নিজেদের পর্দার ইবাদাতে পূর্ণতা এনে নিকাবও করছে এদেরকে সওয়া যায় না। সুতরাং, নিকাব নিষিদ্ধ করো। তাছাড়া একদল আলেমের ফতোয়া তো আছেই! প্রথমদিকে বলা হল হিজাবই তো যথেষ্ট, নিকাবের আর কী দরকার? এরপর ধীরে ধীরে এল, ইসলামে নিকাবের বিধানই নাকি নেই! আল্লাহু আকবার! ফলাফলস্বরূপ আইইউবিএটিসহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা নিকাব নিষিদ্ধ করতে দেখেছি। আরও হয়ত অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই কাতারে দাঁড়িয়ে আছে।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট যা হয়ত আমাদের নজর এড়িয়ে যায় তা হল, জ্বিন শয়তানের মত মানব শয়তানদেরও হুটহাট কাজ না করে ধীরস্থির কর্মপদ্ধতি বারসিসাকে যেমনি শয়তান সরাসরি জিনা-হত্যা আর শিরকের অপরাধে জড়াতে পারে নি, কিন্তু ঠিকই দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় ঠিকই উপরোক্ত ভয়ানক অপরাধগুলোতে জড়িয়ে ফেলেছিল; তেমনি মানব শয়তানরাও কিন্তু সরাসরি পর্দা-হিজাব সমস্ত বাদ এমন সুর তুলে নাই। কিন্তু তারা ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে।


এটা পড়ুন – পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ নেক রমণী


 প্রথমে তারা নিকবকে আক্রমণ করেছে। প্রথমে বলছে নিকাব ছাড়াও পর্দা হয়। এরপর বলছে, নিকাব ছাড়াও যেহেতু পর্দা হয়, সেহেতু আমার প্রতিষ্ঠানে থাকতে হলে নিকাব করা যাবে না। এমনি হিজাব করে আসো, তাতে সমস্যা নেই; আমি তো আর ইসলামবিদ্বেষী নই যে হিজাব নিষিদ্ধ করব! এরপর হয়ত একদিন বলা হবে অমুক দিন সবাইকে শাড়িই পরিধান করতে হবে।
এহেন পরিস্থিতিগুলো মাথায় রেখে ইসলামে নিকাবের বিধান নিয়ে পড়াশোনার আগ্রহ জমলো, যেহেতু সকল ফিতনার এখানেই হয়েছিল শুরু। অতঃপর যা জেনেছি সুবহানাল্লাহ! নিকাবের দলিলসমূহ থেকে শুরু অন্যান্য আলেমরা যারা নিকাব ছাড়াও পর্দা হয় এমন ফতোয়া দিয়েছিলেন তাদের দলিলগুলোরও যথার্থ রিফিউটেশন। অর্থাৎ এককথায় জানতে পেরেছি, ইসলামে নিকাব ছাড়া পর্দা নেই
পরবর্তী কয়েকটি প্যারায় আমি উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দলিল উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ। আমার মতে এই বিষয়ে সবার অন্তত সাধারণ থাকা উচিত। তানাহলে হুটহাট কেউ আপনাকে বা আপনার সামনে কোনো বোনকে হয়ত পার্সোনালি আক্রমণ করে বলবে, ‘ইসলামে নিকাব নেই’ আর তখন জ্ঞানহীনতার দরুণ আপনি বাধ্য হবেন মেনে নিতে। আর পরবর্তীতে যা হবার তাই হবে। ধীরে ধীরে আক্রমণের মাত্রা বাড়তে বাড়তে একসময় নিকাব খুলে ফেলবার মত বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা চাই না আমাদের কারও মা, বোন, স্ত্রী বা কন্যার এমন অবস্থার শিকার হতে হয়। তাই এসব ঘটনা ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকাকালীনই নিকাবের শক্ত দলিলগুলো দিয়ে ইতি টেনে দিতে হবে ইনশাআল্লাহ। আর আল্লাহ তো মু’মিনদেরই সাথে রয়েছেন।
নিকাবের উল্লেখযোগ্য দলিলসমূহঃ

প্রথম দলিল

আল কুরআনের আয়াতঃ

“হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।”

(সূরা আহযাব: ৫৯)
এই আয়াতে সকল নারীর কথাই উল্লেখ রয়েছে। রাসূল্লাহ (সঃ) এর পূন্যাত্মা স্ত্রীগণসহ অন্যান্য মুসলিম নারীগণও এ হুকুমের আওতাভুক্ত। এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মুসলিম নারীদের জন্য চেহারার পর্দা করা জরুরী। আরও আদেশ করা হয়েছে তারা যেন তাদের সৌন্দর্য পরপুরুষ থেকে আড়ালে রাখে।

দ্বিতীয় দলিল

দু’টি হাদিস ও ব্যাখ্যাঃ
যে কেউ অহংকার বশত তার কাপড়কে মাটিতে হেঁচড়িয়ে চলবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দিকে তাকাবেন না।
(বুখারী শরিফ, হাদিস নং- ৫৭৮৪ এবং মুসলিম শরিফ, হাদিস নং- ২০৮৫)
এটা শুধু পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য, নারীদের জন্য নয়। এ ব্যাপারে নিম্নের হাদিসটি উল্লেখযোগ্য-
ইবনে ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গর্বভরে তার কাপড় হেঁচড়িয়ে চলে ক্বিয়ামত দিবসে আল্লাহ তার দিকে (রহমতের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না’, উম্মে সালমা বললেন, তাহলে মহিলারা তাদের আঁচল কী করবে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, ‘এক বিঘত ঝুলিয়ে পরবে’, উম্মে সালমা বললেন, তবে তো তাদের পা প্রকাশ হয়ে পড়বে। নবী করীম (সঃ) বললেন, ‘এক হাত ঝুলিয়ে দিবে, তার থেকে বেশি করবে না’
(তিরমিযী হা/১৮৩৫; নাসাঈ হা/৫৩৩৬)
এ হাদিসে মহিলাদের পা ঢেকে রাখা ওয়াজিব হওয়ার দলিল। আর এটা মহিলা সাহাবিদের নিকট খুবই পরিচিত ও জানা ছিল।

নিঃসন্দেহে দু’পায়ের গোড়ালির সৌন্দর্য্য সম্পূর্ণ মুখমন্ডল ও হাতের সৌন্দর্য্যের তুলনায় কিছুই নয়।

কেননা, এ বাস্তবতা অনস্বীকার্য যে মুখমণ্ডলেই মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য্য প্রতিফলিত হয়। এছাড়া শরী‘আতের হিকমত হচ্ছে ছোট বা হালকা ফিতনায় বিধান হালকা করা এবং গুরুতর ফিতনার ক্ষেত্রে কঠিন করা। এর বিপরীত করলে সেটি হবে আল্লাহর হিকমত ও শরী‘আতের মধ্যে দন্দ্ব সৃষ্টি করা। তাই মুখের নিকাবও আবহমান কাল ধরে ওয়াজিব

তৃতীয় দলিল

“ইহরাম গ্রহণকারী নারী যেন নেকাব ও হাতমোজা পরিধান না করে।”

(সহীহ বুখারী ৪/৬৩, হাদীস : ১৮৩৮)
এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূল (সা) যুগের নারীরা অর্থাৎ সাহাবিয়াতগণ সাধারণত নিকাব এবং হাতমোজা উভয়ই ব্যবহার করতো। আর এজন্যই ইহরাম অবস্থায় তা বিশেষভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সাহাবিয়াতগণ যদি নিকাব আর হাতমোজা নাই পরিধান করতেন তবে কখনোই ইহরামের জন্য এমন নির্দেশ আসতো না।

চতুর্থ দলিল

হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ) হতে বর্ণিত,
তিনি বলেন- আমি জনৈক মেয়েকে বিবাহ করার জন্য প্রস্তাব দেই এবং বিষয়টা রাসূল (সাঃ)-কে বলি । রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে বললেন, “তুমি কি তাকে দেখেছো?” আমি বললাম, “না।” তিনি বললেন, “তুমি তাকে দেখে এসো । কারণ- এ দেখাটা তোমাদের মাঝে সৌহার্দ্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে বেশ উপযোগী হবে।” ফলে আমি মেয়েটিকে দেখার জন্য যাই। তখন তার বাবা-মা সেখানে ছিল এবং মেয়েটি পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিল। তখন আমি বললাম, “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মেয়েটিকে দেখার জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।” আমার এ-কথায় তার বাবা-মা নীরব রইলেন। অন্য বর্ণনায় আছে – “যেন তারা আমার এ কথাকে অপছন্দ করলেন।” (তারা বিবাহের আগে পাত্রীকে দেখানোর পক্ষে ছিলেন না।) ইতিমধ্যে মেয়েটি বলল, “যদি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে দেখার জন্য আপনাকে আদেশ করে থাকেন, তাহলে আপনার দেখার সুবিধার্থে আমি আপনার সামনে আসছি। আর যদি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে দেখার জন্য আপনাকে নির্দেশ না দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনি আমার দিকে দৃষ্টি দিবেন না।” হযরত মুগীরা (রাঃ) বলেন, “এরপর আমি তাকে দেখি এবং তাকে বিবাহ করি।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, ২য় খন্ড, ৪২৪ পৃষ্ঠা; হাদীস নং ১৮৬৬)
আল্লাহ আমাদের প্রতি রহম করুন। নারী সাহাবাগণ কেমন আল্লাহভীরু ছিলেন। সাহাবীকে শপথ দিচ্ছেন – আল্লাহর রাসূল অনুমতি দিলে সে তার চেহারা দেখাবে, নয়ত নয়। অথচ আমরা আজ নিকাব ইসলামে নেই বলে বলে প্রচার করছি! সেই নারী সাহাবাটি তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসা একজন সৎ, পরহেযগার সাহাবীর সামনে একবার খোলা চেহারায় আসতে কতো সংকোচ করেছে। অথচ আমরা চেহারা অনাবৃত রেখে, নকশি বোরকা গায়ে জড়িয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে যত্রতত্র ঘুরে বেড়াব! আল্লাহু আকবার! আমাদের আল্লাহকে সর্ববিষয়ে ভয় করা উচিত এবং তাঁর ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

বিভ্রান্তি নিরসন

আল-কুরআনের সূরা নূরের ৩১ নং আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেনঃ

“ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে… ”

অনেকে দাবি করেন যে এই আয়াতের إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا (ইল্লা মা- যহা-র মিনহা) অর্থাৎ ‘যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া’ দিয়ে চেহারা আর হাতের অবকাশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আসলে চেহারা আর হাত এর উদ্দেশ্য নয়। إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا বলে আল্লাহ সুবহানাহুতাআলা সৌন্দর্য্য প্রকাশক সেসব বিষয়াদি পরিস্থিতিকে বাদ দিয়েছেন যা এমনিই প্রকাশ হয়ে যায় অর্থাৎ যার উপর বান্দার নিয়ন্ত্রণ নেই। যেমন নারীর দৈর্ঘ্য ও খর্বতা, কৃশতা ও স্থুলতা ইত্যাদি। আবার, অনেক সময় একদিক থেকে জোর বাতাস বইলে নারীর যথাযথ পর্দা থাকা স্বত্বেও একদিকের আকৃতির কিয়দাংশ বোঝা যেতে পারে যা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। এই বিষয়গুলো বোঝাতেই আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا বলেছেন কিন্তু إِلَّا مَا ظَهَرَت (ইল্লা মা- যহা-রতু) অর্থাৎ ‘নারী নিজে যা প্রকাশ করে’ বলেন নাই।

সুতরাং, إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا (ইল্লা মা- যহা-র মিনহা) এর উদ্দেশ্য হল,

যে বিষয়াদিগুলো ইচ্ছা ব্যতীত এমনিতেই স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হয়ে যায় সেগুলো।

সুতরাং আমাদের আল্লাহকেই যথার্থরূপে ভয় করে তাঁর বিধান মেনে নেওয়াই কল্যাণকর।
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে তেমনিভাবে ভয় করো ঠিক যেমনিভাবে ভয় করা উচিত…” (সূরা আল-ইমরান, ১০২)
(এখানে কেবল উল্লেখযোগ্য দলিলগুলো দেওয়া হয়েছে। ইসলামের এই ওয়াজিব বিধানটির ওয়াল্লাহি আরও বহু দলিল রয়েছে।)
পরিশেষে কেবল এতটুকুই বলব, আপনার সামনে যখন একজন বোনের নিকাব বা হিজাব নিয়ে ঠাট্টা করা হবে বা কথা শোনানো হবে তখন তা আসলে সেই বোনটির জন্য পরীক্ষা নয়। তা আপনারও পরীক্ষা সুবহানাল্লাহ! কারণ তখন আসলে ইসলামের একটি বিধানকে আক্রমণ করা হয়েছে। তাই সামনে এগিয়ে তখন কথা না বললে নিজে কতটুকু দ্বীন ধারণ করি, পালন করি সেই প্রশ্নের চেয়ে আদৌ নিজের ঈমান আছে কিনা সেই প্রশ্নই গুরুতর হয়ে যাবে।
আল্লাহ আমাদের যথার্থরূপে ইসলামের বিধিবিধানগুলো মেনে নেবার এবং মেনে চলবার তাওফিক দিন। আল্লাহ আমাদের যথার্থরূপে ‘সৎ কাজের উপদেশ ও অসৎ কাজে বাধা দেওয়া’ র তাওফিক দিন। আমাদের চেষ্টাগুলোকে কবুল করুন।
Facebook Comments