উসমান রা. ছিলেন প্রবাদ-প্রতিম ভালোবাসার প্রতীক,প্রথম হিজরতকারী।

199

উসমান রা. এর পিতা আফফান কোরাইশদের মধ্যে উমাইয়া শাখার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ব্যাক্তিত্ব ছিলেন। পিতার মৃত্যুকালে একেবারেই তরুণ ছিলেন উসমান রা.। পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেন তিনি। আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত করেন ব্যাপকতরভাবে। এমনকি আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মত করে লোকেদের উপর বিপুল বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি।

অল্পকালেই হয়ে উঠেন বিজনেস আইকন। বিশাল সোনার মজুদ গড়ে তোলেন। গবাদিপশু, কাপড় ইত্যাদি ছাড়াও আমদানি-রফতানি নির্ভর নানাবিধ ব্যবসা ছিল তার। সেকালেও তার স্বর্ণ-রৌপ্য মুদ্রার মালিকানা মিলিয়নে হিসাবযোগ্য ছিল।

তিনি ছিলেন সেকালের আরবের সেই সব হাতেগোনা লোকদের একজন, যারা লিখতে ও পড়তে পারতেন। তাঁর চেহারা ছিল সোনা ও রূপার মিশ্রণ ঘটালে যেমন ঈষৎ সোনালি-সাদাভ রঙ হয়। তাঁর গায়ের রঙ ছিল তেমন। ঘন দাড়ি, মসৃণ ত্বক, প্রশস্ত বুক, পেশিবহুল দেহ আর লম্বা চুল ছিল তাঁর, চুলে ঘাড় ঢেকে যেত। মুখে অস্পষ্ট কয়েকটা বসন্তের দাগ ছিল

তিল যেমন চেহারায় সৌন্দর্য বাড়ায়, এমনকি এই ঈষৎ ভাসমান দাগ তাঁর মুখকে আরও সুন্দর করে তুলেছিল। তিনি সিরিয় ও আবিসিনিয় সভ্যতা স্বচক্ষে দেখেছেন, যে অভিজ্ঞতা আরবে ছিল তখন অদ্বিতীয়। তিনি আরবি কবিতায় পারদর্শী ছিলেন।

উসমান রা ছিলেন সেইসব মানুষদের একজন, যারা জাহিলিয়াতের যুগেও ছিলেন পবিত্র। তিনি সে সময় কখনো মদ পান করেন নি, কোনও জ্বিনায় লিপ্ত হন নি, এমনকি তার নিজের ভাষায়, ‘আমার ডান হাত কখনো কোনও দেহের কোনও গোপন অংশ ছোঁয় নি।’ তিনি নিজেই বলেছেন, জাহিলিয়্যাতের যুগেও তিনি কখনো কোনও গানের (সে সময়কার প্রচলিত) মজসিলে যান নি। অন্যদের মত তিনি বিনোদনের জন্য জুয়াও খেলতেন না।

আজকে কোন জিনিস আমাদের গুনাহের দিকে নিয়ে যায়? এডুকেশনাল কোয়ালিফিকেশন? হাইয়ার পজিশন? সোশাল স্ট্যাটাস? টাকা, পয়সা? এর কোন জিনিসে কে উসমানের নিকটবর্তী হতে পেরেছি আমরা? আমরা তো গুনাহের জন্য নিজেরা পথ গড়ে নিই। আফসোস! যে জিনিস উসমানকে আল্লাহ্‌র কাছে প্রিয় করেছে সেই সব জিনিসের দ্বারাই আমরা আল্লাহ্‌র থেকে দূরে যাই।

সেকালে তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ইতিহাস বর্ণনাকারী, বংশধারা বিশেষজ্ঞ, প্রবচনবিদ, সুবক্তা। এত সব গুণাবলী ও সমৃদ্ধি থাকা স্বত্ত্বেও তিনি কখনো লোকেদের নিচু চোখে দেখেন নি। কারও প্রতি তুচ্ছ সম্বোধন করেন নি। বিবাদে লিপ্ত হন নি।

যাবতীয় মানবিক গুণে এত উত্তম রূপে গুণান্বিত ছিলেন যে, তিনি ছিলেন লোকেদের মধ্যে প্রবাদ-প্রতিম ভালোবাসার প্রতীক। আরবের নারীরা তাদের সন্তানদের আবৃত্তি করে শোনাত, “আমি তোকে ততটাই ভালোবাসি, যতটা বাসে কুরাইশরা উসমানকে।”

অথচ ইসলামকে আলিঙ্গন করা মাত্রই তার উপর লোকেরা অত্যাচার শুরু করলো। দুই হাত, দুই পা বেঁধে, স্যাঁতস্যাঁতে বদ্ধ, অন্ধকার কুঠুরিতে তাঁকে আবদ্ধ করে রাখত। অত্যাচার চরমে পৌঁছুলে ইথোপিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

যে মানুষটা ইসলামের ছোঁয়ার পূর্বেই এত উত্তম ছিলেন, সে মানুষটা ইসলামের স্পর্শে এসে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে। আবু-বকর আর উমার ছাড়া কেউই আর তাঁকে অতিক্রম করতে পারে নি। তিনি ইসলামের জন্য অকাতর দান করেছেন।

প্রত্যেক জুমায় তিনি ক্রীতদাসদের ক্রয় করে মুক্ত করতেন। কেবল তাবুক যুদ্ধে তিনি যে স্বর্ণ ও স্বর্ণমুদ্রা দান করেছিলেন তার ওজন ছিল ১০ কেজি পরিমাণ। এছাড়াও তিনি এতে যুদ্ধ সাজে সুসজ্জিত ৯ শত উট দান করেছিলেন। একবার তিনি ০৩ হাজার (কোনও কোনও বর্ণনায় ২ হাজার) উষ্ট্রারোহী বাহিনী প্রস্তুত করেন, উট এবং যাবতীয় রসদসহ।

তার ঘর ছিল পাথরের সর্বোচ্চ সজ্জায় সজ্জিত। দরজা ছিল স্যান্ডাল উডের। যা থেকে বেরুত সুগন্ধি। অথচ এই মানুষটাই ৭ নভেম্বর ৬৪৪ সালে যখন দায়িত্ব নিলেন খেলাফতের। ১২ টা বছর শাসন করলেন। একটি টাকাও রাজকোষ থেকে নেন নি।

জনগণের সেবায় নিজেকে ধুলির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। লোকেদের দ্বারে দ্বারে উপস্থিত হয়ে তাদের খোঁজ নিতেন। আইবেরিয়ান পেনিনসুলার প্রান্ত থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত মুসলিম ভূমির বিস্তৃতি রচনা করেন।

ইয়েমেনি ডোরাদার চাদর পরতেন। আর হাঁটু ও টাখনুর মাঝামাঝি শরীরের নীচের অংশের পোশাক (লুঙ্গি, পাজামা) পরতেন আর লোকেদের বলতেন, ‘এই এভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরতেন’।

সুন্নাতের খুব ছোট ছোট বিষয়ও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনুসরণ করতেন। একবার তিনি অজুর সময় হাসলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হাসির কারণ কি? তিনি বললেন, রাসুলকে তিনি একদিন ওযু করার সময় হাসতে দেখেছিলেন।

একবার তিনি ছাগলের মাংস খাচ্ছিলেন। মাঝপথে খাওয়া রেখে তিনি সোজা নামাজ আদায় করলেন। লোকেরা বলল, এইরকম কেন করলেন? তিনি বললেন, রাসুল ছাগলের মাংস খাওয়ার সময় এই অংশের মাংসে কামড় দেবার পর নামাজ আদায় করেছিলেন। আদতে এগুলো কোনও বাধ্যতামূলক বিষয় ছিল না।

তবুও করতেন, এভাবে সমস্ত কিছুতেই রাসুলের পূর্ণ অনুসরণ করতেন। কেন করতেন? কারণ রাসুলকে ভালবাসতেন বলেই তাঁর মত আহার করতেন, চলতেন, পরতেন আর জীবন অতিবাহিত করতেন।

এত সরল চলতেন যে, অসংখ্য গোলাম থাকা স্বত্ত্বেও নিজের কাজ নিজেই করতেন। যুবাইর বিন আব্দুল্লাহ রা. এর আম্মা ছিলেন উসমান রা. এঁর কাজের লোক। তিনি বলেন, কোনও গোলাম তাহাজ্জুদে সজাগ না পেলে উসমান কখনোই তাঁদের সজাগ করতেন না অজুর পানি আনার জন্য। এমনকি একবার রাতে কেউ একজন তাঁর জন্য পানি আনতে গেলে তিনি তাঁকে বলেছিলেন, ‘রাত বিশ্রামের জন্য’।

হজরত হাসান রা. বলেন, একদিন দেখি, মসজিদের ভেতর তিনি শুয়ে আছেন, একটা চাদর জড়িয়ে। কোনও মানুষই তাঁর পাশে নেই। না খাদেম, না দেহরক্ষী। অথচ তিনি ছিলেন, তদানীং সবচে’ বড়ো রাষ্ট্রটির শাসক।

উসমান রা. এঁর একটা কথা আমার অত্যন্ত প্রিয়। তিনি বলতেন, ‘দুনিয়ার জন্য চিন্তিত হওয়া মানে নিজেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দেওয়া। আর আখিরাতের জন্য চিন্তিত হওয়ার মানে নিজেকে আলোর পথে নেওয়া’।

উসমান রা. ছিলেন প্রথম স্বপরিবারে হিজরতকারী ব্যক্তি, চতুর্থ ইসলাম গ্রহণকারী পুরুষ, ইসলামের জন্য প্রথম ওয়াকফকারী ব্যক্তি ছিলেন তিনিই। তাঁর খেলাফতকালে তিনিই প্রথম পৃথক ও স্বতন্ত্র আদালত ভবন নির্মাণ করেন। মুয়াজ্জিনদের ভাতা রাষ্ট্রীয়করণ করেন। জেদ্দা বন্দর নির্মাণ করেন। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ডাকবাংলো নির্মাণ করেন। তিনিই প্রথম শহররক্ষা বন্যা-নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করেন। তিনিই প্রথম নৌবহর গঠনের অনুমতি দিয়েছিলেন।

আবুল ফুরাত বর্ণনা করেন, একবার উসমান রা.তাঁর এক গোলামকে নির্দেশ করলেন, উঠে এসে আমার কান মলো। গোলাম, কান মলতে শুরু করল। তিনি বললেন, আরও জোরে। এরপর বলতে থাকলেন, আখিরাতের সাজার চেয়ে এটা ভালো। একদিন আমি তোমার কান মলেছিলাম। অথচ তিনি তা করেছিলেন, নিতান্তই ঠাট্টাবশে। অথচ আফসোস, আখিরাতের ভাবনা তো আমাদের অন্তর থেকে বিদূরিত হয়েই গেছে!


লেখক – আরজু আহমাদ

Facebook Comments