খিলাফত ও ভারতীয় উপমহাদেশ

481
খিলাফত ও ভারতীয় উপমহাদেশ

আবু ইসমাইল আল-বেইরভীঃ খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংসের পর আরও একটি বার্ষিকী অতিক্রম করছে মুসলিম উম্মাহ। এই মুহুর্তে অতিব জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে ইতিহাস ফিরে দেখা এবং এই পতন ও ধ্বংসের প্রতি মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল তা খতিয়ে দেখা। ধারণা করা হয়, খিলাফত ধ্বংসের প্রতি মুসলিমদের ও তৎকালীন আলেম-ওলামাদের কোন প্রতিক্রিয়াই ছিল না এবং তারা এর গুরুত্ব বুঝতে পারেন নি। কিন্তু এটি সত্য না; ইতিহাস সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট যে, মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল, কিভাবে তাঁরা এটি রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন এবং আল্লাহর ছায়াকে দুনিয়া থেকে নির্মূল হতে দেখে কীরূপ কষ্ট সহ্য করেছিলেন। এই ভারত উপমহাদেশের মুসলিম ও তাদের গড়ে তোলা খিলাফত আন্দোলন তার জ্বাজ্জল্যমান উদাহরণ।

মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া জানার পূর্বে আমাদের জেনে নেয়া দরকার কিভাবে ইসলামী শাসনব্যবস্থা এই ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছেছিল। যেখানে ইসলামি উম্মাহর প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বসবাস। সংখ্যায় যার পরিমাণ প্রায় অর্ধ বিলিয়ন, অর্থাৎ ভারতে ২৫০ মিলিয়ন মুসলিম, পাকিস্তানে ১৬০ মিলিয়ন মুসলিম এবং বাংলাদেশে ১২০ মিলিয়ন মুসলিম। বস্তুত উর্দূ হচ্ছে যথা সম্ভব এই উম্মাহর সবচেয়ে বহুল উচ্চারিত ভাষা। এমনকি আরবী অপেক্ষাও বেশি।

ভারতে খিলাফতের ইতিহাস:

৭১১ খ্রিষ্টাব্দ; মুসলিম বণিকেরা সীলন (Ceylon) থেকে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে নোঙর ফেলেছিলেন সিন্ধু উপকূলে। কিন্তু তাদের জাহাজ লুট করা হয় এবং মুসলিমদের আটক করে জেলবন্দী করা হয়। এই খবরটি তৎকালীন খিলাফত রাষ্ট্রের রাজধানীতে খলীফা আল ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের কানে পৌঁছল। তিনি তৎকালীন বাগদাদের ওয়ালী (গভর্নর) হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে চিঠি পাঠালেন যেন সে তৎক্ষণাত সিন্ধুর শাসক প্রধানের কাছ থেকে ক্ষমা আদায়ের ব্যবস্থা করে ও মুসলিমদের মুক্ত করে। একদল সেনাবাহিনী পাঠানো হলো যার নেতৃত্বে ছিলেন এই উম্মাহর দীপ্তিমান সন্তানদের মধ্যে একজন। এই যুবকের নামটি সকল মুসলিম বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের অন্তরে এক উচ্চ স্থান দখল করে আছে। এই যুবকের কাঁধেই দায়িত্ব পড়েছিল খিলাফাহ্ রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে একটি অপরিচিত ভুমিতে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে যাওয়ার। তাঁর নাম মুহাম্মদদ বিন কাসিম আল-ছাকাফী। বিলাদ-আল-হিনদ মুক্তকারী।যখন খিলাফত রাষ্টের সেনাবাহিনী দিবাল পৌঁছাল (বর্তমান করাচির কাছাকাছি), মুহাম্মদ বিন কাসিম তাঁর দাবীসমূহ রাজা দাহিরের কাছে তুলে ধরলেন। রাজা দাবীসমূহ প্রত্যাহার করেছিলো এবং ফলাফলসরূপ মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল ও তার রাজ্য দখলে নেয়া হয়েছিল।

এই সফলতার পরপরই মুহাম্মদ বিন কাসিম আরও অভিযান পরিচালনা করেছিলেন যেহেতু মুসলিম বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহ আজ্জা ওয়া জালের বাণীকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরা। এই আকীদার জোরেই মুসলিম সেনাবাহিনী অভিযান পরিচালনা করতে করতে মূলতান পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিলেন। তিন বছরের মধ্যে অর্থাৎ ৭১৪ খ্রিষ্টাব্দতে সমগ্র সিন্ধু অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের নিম্নাঞ্চল খিলাফত রাষ্ট্রের হুকুমের অধীনে চলে এসেছিল।

ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চল বিজিত হওয়ার পর তাঁর সেনাবাহীনী মূর্তিপূজারীদেরকে অন্ধকার থেকে ইসলামের আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর প্রশাসনে মুসলিম ও অমুসলিম বিভেদ ছিল না। তিনি বিজিত ভুমিসমূহের অমুসলিম কর্মকর্তাদের তাদের আগের জায়গায় বহাল রেখেছিলেন।

মুহাম্মদ বিন কাসিম খিলাফতের অধীনস্ত প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “মানুষের ব্যপারে সততা ও রাষ্ট্র সৎভাবে পরিচালনা কর। কর নির্ধারন করো মানুষের পরিশোধ করার সামর্থ্য অনুযায়ী।

খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালিকের সময় অর্থাৎ ৭২৪ থেকে ৭৪৩ খ্রিষ্ট্রাব্দের মধ্যে কাশ্মীর ও কাঙ্গারা খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে চলে আসে। এবং ৭৫৪ থেক ৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে আব্বাসীয় খলীফা আবু জাফর আল মানছুর কান্দাহার মুক্ত করেন এবং তাঁরই প্রচেষ্টায় সংগঠিত ভাবে সমগ্র ভারত উপমহাদেশে খিলাফত রাষ্ট্রের সীমান্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৭৮৬-৮০৯ খ্রিষ্ট্রাব্দের মধ্যে, হারুন আর রশীদের খিলাফত আমলে মুসলিম আর্মি সিন্ধু সীমান্ত বৃদ্ধি করে গুজরাট (অর্থাৎ বর্তমান ভারতে) পর্যন্ত নিয়ে যায়। এই সময়ে এসেই মুসলিম সেনাবাহীনী স্থানীয় ভাবে বসবাস শুরু করেছিল এবং নতুন শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল। এই সময়ে পর থেকেই ব্যাপক সংখ্যক ভারতীয়রা তাদের কুফর সামাজিক বর্ণবাদী সংস্কৃতির ভিত্তিহীনতা থেকে উঠে এসে বিশ্ব ভাতৃত্বের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিল। তারা সন্ধান পেয়েছিল ইসলামের আলোর, আল্লাহর ইবাদাতের এবং পরিত্যাগ করেছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন কুফর, অজ্ঞতা ও মিথ্যা মুর্তিপূজা। ইসলাম শাসন করেছিল যা বর্তমানে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামে পরিচিত এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে।

ওরিয়েন্টালিস্টরা (প্রাচ্যবাদী) যে ভাবে ভারতের ইতিহাসে তুলে ধরে তার বিপরীতে আমাদের বুঝতে হবে যে ভারত খিলাফতের উইলায়া’হ ছিল। কিছু খলীফার অবহেলার কারণে কিছুকাল এটি অপর্যবেক্ষিত অবস্থায় ছিল এবং একে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তথাপী, শাসকবর্গ এখানে আহকাম শরী’আহ বাস্তবায়িত অবস্থায় রেখেছিলেন এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার পূর্ব পর্যন্ত এটি দার-উল-ইসলামের অংশ ছিল।

মুসলিম ইতিহাসবিদ, ইবনে কাসীর আল-দামিস্কি (মৃত্যু- ৭৭৪ হিজরী) তাঁর বিখ্যাত কর্ম ‘আল-বিদায়াহ-ওয়ান-নিহায়াহ’ তে ইন্ডিয়াকে দার-উল-ইসলামের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এর বিজয়ের ব্যাপারে কিছু হাদীসও উল্লেখ করেছেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত: “হে আমার সত্য বন্ধু, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “এই উম্মতের সেনাবাহিনী সিন্ধু ও আল-হিন্দ পর্যন্ত পৌঁছাবে। আমি যদি এতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই এবং শহীদ হই তবে তা একটি (মঙ্গলজনক) বিষয়, আর আমি যদি ফিরে আসি তবে আমি হব মুক্ত আবু হুরায়রা। মহিমান্বিত রব আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন”। (আহমাদ)

ভারতবর্ষ খিলাফতের অধিভূক্ত প্রদেশ ছিল সমগ্র দিল্লী সুলতানীয়াত (১২০৫-১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ) এবং মুঘল আমলে (১৫২৬ – ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ) শুধুমাত্র আকবরের শাসনামল ব্যতীত যেহেতু সে ইসলাম থেকে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল এবং দ্বীন-ই-ইলাহী নামে নতুন ধর্মের প্রবর্তন করেছিল।

বার শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশে মুহাম্মদ ঘূড়ি (Mohammad of Ghor) ইন্দো-গঙ্গা অববাহিকা (Indo-Gangetic Plain) আক্রমণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিজিত হয় গজনী, মূলতান, সিন্ধু, লাহোড় এবং দিল্লী। তাঁর একজন সেনাপ্রধান কুতুব উদ্দীন আইবেগ দিল্লীর সুলতান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তের শতাব্দীদে শামসুদ্দিন ইলতুতমিস (১২১১-১২৩৬), একজন অভিজ্ঞ তুর্কী দাস যোদ্ধা দিল্লীর ক্ষমতায় আসলে পরবর্তী সুলতানদের সাম্রাজ্য বৃদ্ধির পথ সুগম হয়। পরবর্তী ১০০ বছরে দিল্লী সুলতানীয়াত প্রসারিত হয়ে পূর্ব বাংলা এবং দক্ষিণ ডেক্কান (Deccan) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পাঁচ রাজবংশ দ্বারা দিল্লী সুলতানীয়াত শাসিত হয়েছিল) মামলূক বংশ (১২০৬-৯০) খলজী বংশ (১২৯০-১৩২০), তুঘলক বংশ (১৩২০-১৪১৩), সৈয়দ বংশ (১৪১৪-৫১) এবং লোদী বংশ (১৪৫১-১৫২৬)।

মধ্য এশিয়ার বংশোদ্ভূত বাবর ১৫২৬ সালে দিল্লী দখলে নেন এবং সর্বপ্রথম মুঘল শাসক হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৫৩০ সালে তার পূত্র হুমায়ুন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় (১৫৩০-৫৬)। ভোপাল কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত একটি ডকুমেন্ট থেকে জানা যায়, বাবর তার পূত্রকে নিম্নলিখিত অছিয়ত নামা দিয়ে গিয়েছিল। যা থেকে বুঝা যায় তার মধ্যে কিছু ভূল থাকলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন :-

“পূত্র! নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিও: কোন ধর্মের প্রতি ঘৃণা পোষণ করিও না। তুমি অব্যশই ন্যায় বাস্তবায়ন করবে তথাপী মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও আচার সমূহ মাথায় রেখে। কিছু সময় গরু জবাই করা থেকে বিরত থাকো। যাতে স্থানীয়দের অন্তরে স্থান করে নিতে পারো। এটি তোমাকে জনগনের আরো নিকটবর্তী করবে।

কোন ধর্মীয় বিশ্বাসের স্থান ধ্বংস করো না এবং সকলের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করো যাতে দেশে শান্তি সুনিশ্চিত হয়। ইসলামের দাওয়াত ভালোভাবেই পৌছে দেয়া সম্ভব দয়া ও ভালাবাসার তলোয়ার দিয়ে, জুলুম ও অত্যাচারের তলোয়ার বদলে। শিয়া সুন্নীর মধ্যকার বিভেদ সমূহ এড়িয়ে চলো। তোমার জনগণের বিবিধ বৈশিষ্ট্যসমূহ পর্যবেক্ষণ কর ঠিক যেভাবে ঋতু সমূহের বিবিধ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।”

আমাদের ইতিহাস নেয়ার ক্ষেত্রে যত্নবান হতে হবে কেননা ভারতবর্ষ ও ইসলামের বেশির ভাগ ইতিহাস লেখা হয়েছে ওরিয়েন্টালিষ্টদের (প্রাচ্যবাদী) দ্বারা। আমরা অবশ্যই স্বীকার করি যে, ভারতবর্ষের কিছু মুসলিম শাসক ইসলামী হুকুমের অপপ্রয়োগ করেছিলেন এবং কতিপয় অন্যায় সম্পাদন করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ভারতীয় উপমহাদেশ দার-উল-ইসলামের অন্তর্ভূক্ত ছিল যেহেতু ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়িত অবস্থায় ছিল। প্রধান শহরগুলোর আদালতের নথীসমূহ যা এখনো বিদ্যামান তাতে দেখা যায় যে ইসলামী শরীয়া ব্যতীত অন্য কোন, আইনের উৎসই গ্রহণযোগ্য ছিল না।

অপপ্রয়োগ খিলাফত, ওয়ালী (গভর্নর) কিংবা আমীল (মেয়র)-এর (শর’ঈ বৈধতা) বাতিলের দলীল হতে পারে না। অসংখ্য হাদীস রয়েছে যেখানে যদি অত্যাচারীও হয় তারপরও আমীরের আনুগত্য ফরয করা হয়েছে যতক্ষণ পযন্ত সে শরীয়া বাস্তবায়ন করে এবং কোন কুফর বাওয়াহ (সুস্পষ্ট কুফরী) সম্পাদন না করে।

আনাস বিন মলিক থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন। “শুন এবং মান্য কর, এমনকি যদিও তোমরা শাসিত হও একজন আবীসীনিয়ান দাস কর্তৃক যার মাথা কিসমিসের ন্যায়” অন্য এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত সে তোমাদের আল্লাহর কিতাব দিয়ে পরিচালনা করে।”

মুসলিম বর্ণনা করেছেন আউফ বিন মালিক থেকে বর্ণিত আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি, “তোমাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট নেতা হল সেই ব্যক্তি যাকে তোমরা ভালোবাসো এবং সে তোমাদের ভালোবাসে। তোমরা তার জন্য দোয়া কর এবং সে তোমাদের জন্য দোয়া করে। আর তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট নেতা হল সেই ব্যক্তি যাকে তোমরা ঘৃনা কর এবং সে তোমাদের ঘৃণা করে। তোমর তাকে অভিসম্পাত কর এবং সে তোমাদের অভিসম্পাত করে।” আমরা জিজ্ঞেস করলাম। “হে রাসূলাল্লাহ, আমরা কি তার বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব না? ? তিনি (সঃ) বললেন। “না! যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়েম করে। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ একজন ওয়ালী দ্বারা শাসিত হও এবং তাকে গুনাহে নিমজ্জিত দেখতে পাও, তবে সে যেন আল্লাহর বিরূদ্ধে কৃত গুণাহকে ঘৃণা করে। কিন্তু আনুগত্য হতে যেন হাত সরিয়ে না নেয়।”আহমাদ ও আবু দাউদ হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “হে আবু যর, তুমি কি করবে যদি কোন ওয়ালী গণীমত ভোগদখল করে ও তোমাকে তা থেকে বঞ্চিত করে?” তিনি বললেন, “সে সত্তার কছম যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন, আমি তরবারী তুলে নিব এবং ততক্ষণ যুদ্ধ করব যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনার সাথে মিলিত হই।” এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “আমি তোমাকে এমন কিছু বলব যা এর থেকে উত্তম। ধৈর্য্যশীল হও এবং সহ্য কর যতক্ষণ পর্যন্ত আমার সাথে মিলিত হও।”

ভারত যে বৈশ্বিক খিলাফতের অংশ ছিল তা অমুসলিম লেখকরাও বর্ণনা করেছেন। যেমন হিন্দু লেখক শশী এস শর্মা তার বই ‘Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis’ এ বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:

“দিল্লী সুলতানীয়াত (১২০৫-১৫২৬) তার সর্বশেষ অস্তিত্ব পর্যন্ত বিশ্ব মুসলিম সাম্রাজ্যের বৈধ অংশ ছিল যার কার্যক্রম আব্বাসীয় খলিফাদের বৈধ অধিরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুলতানগন নিজেদেরকে খলীফার ডেপুটি মনে করতেন এবং তাদের নির্বাহী ও আইনী কর্তৃত্ব (খলীফার দেয়া) প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমেই বৈধতা পেত। যেহেতু সকল সম্প্রদায়ের (উম্মাহর) সামগ্রিক কর্তৃত্বের বৈধতা খলীফার ছিল। তাই প্রত্যেক রাজা ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি ইসলামের ইমামের জন্য ও তার প্রতিনিধি হিসেবে শাসনক্ষমতা পালন করার দাবী করত। “[Shashi S. Sharma, Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis, pg. 247]

মুহাম্মদ শাহ বাহমান (১৪৬৩-৮২), উসমানীয় সুলতান মুহাম্মদ ২য়কে একমাত্র যোগ্য খলীফা বলে সম্বোধন করত। বিজাপুর রাজ্য তুর্কী (উসমানী) প্রতীককে রাজ্যের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল। গুজরাটের নেতৃস্থানীয় উচ্চ বংশীয় মালিক আয়ায সুলতান সেলিম ১মকে পৃথিবীর খলীফা বলে সম্বোধণ করেছেন। মূঘল সম্রাটেরা যে তুর্কীর সুলতানের প্রতি অতি উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন যার প্রমান পাওয়া যায় দিল্লী ও ইস্তাম্বুলের মধ্যে আদান প্রদানকৃত কিছু চিঠিপত্রে। সুলতান সুলাইমানকে লেখা একটি পত্রে, হুমায়ুন (ভারতের সম্রাট) তাঁকে সর্বোৎকৃষ্ট গুণাবলী সমৃদ্ধ খলীফা বলে সম্বোধন করেছেন এবং তার খিলাফতের শাশ্বত চিরস্থায়িত্বের জন্য দোয়া করেছিলেন। তিনি সুলতানকে ইঙ্গিত করে একটি কোরআনের আয়াত ও উল্লেখ করেছিলেন “তিনি (আল্লাহ) আপনাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করেছেন। সুলতান ইব্রাহীম শাহজাহানকে একটি চিঠি লিখেছিলেন যেখানে তিনি নিজেকে বিশ্বের সম্রাটদের নিরাপত্তা ও আশ্রয়স্থল রূপে উল্লেখ করেছেন যিনি খিলাফতের আসনে আসীন হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। আহমাদ আকা, একজন তুর্কী প্রতিনিধি সুলতানের পক্ষ থেকে ১৬৯০ সালে একটি সরকারী পত্র নিয়ে আওরঙ্গজেবের মহলে এসেছিল যা কুরআনের আয়াত দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল এবং সুলতান নিজেকে ইসলামের খলীফা বলে উল্লেখ করেছিলেন। ১৭২৩ সালে মুহাম্মদ শাহ (১৭১৯-১৭৪৮) মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে ইস্তাম্বুলের তুর্কী সম্রাটের সাথে চিঠি আদান-প্রদান বজায় রাখেন। তাঁর চিঠিতে মুহাম্মদ শাহ সুলতানকে মহান সম্রাটদের আশ্রয়দাতা ‘মর্যাদাবান সম্রাটের নিরাপত্তাদানকারী’, ‘সম্মানীত খিলাফতের রূপকার’ এবং ‘শরীয়তের আদর্শ প্রচারকারী’ বলে সম্বোধন করেছিলেন,” [Shashi S. Sharma, Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis, pg. 248-249]

কিছু প্রাচীন নিদর্শন খিলাফত ও ভারতের মধ্যে সংযোগের চিত্রও তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ সুলতান শামসুদ্দীন আলতামাশ (১২১১-৩৬) যিনি ভারতের ওয়ালী ছিলেন, তাঁর সময়কার রৌপ্য মূদ্রার একপাশে খলীফা আল মুসতানসীরের নাম এবং অন্য পাশে খিলাফতের সাহায্যকারী হিসেবে নিজের নাম খোদাই করেছিলেন।

এমনকি ১২৫৮ খৃষ্টাব্দে বাগদাদ ধ্বংস হওয়ার পর যখন খলীফা আল-মুসতা’সীমের মৃত্যু হয়, তারপরও ভারতের মূদ্রায় তাঁর নাম ব্যবহার অব্যাহত ছিল।

ভারত ইসলামী শাসনামলে মহান আলেমদের জন্ম দিয়েছে যেমন শেখ আহমাদ সিরহিন্দী (দীল্লীতে মৃত্যু বরণ, ১৬২৪ খ্রিঃ) যিনি মুজাদ্দিদে আলফে সানী নামেও পরিচিত। তিনি ফিকহ শাস্ত্রের সুপ্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন। তিনি উসমানী শাসকদের নিজের মতামত পেশ করে ৫৩৬ টি চিঠি লিখেছিলেন যে গুলোকে একত্রে ‘সংগৃহীত পত্র’ বা ‘মাকতুবাত’ বলা হয়।

শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (১৭০৩-১৭৬২ খৃঃ) ভারতের সবচেয়ে সম্মাণিত আলেমদের মধ্যে একজন এবং তিনি দক্ষিণ এশিয়া ও এর বাইরের প্রায় সকল দল ও মাযহাবের কাছে সমান ভাবে গ্রহণীয় ও সম্মানিত। তিনি তার উর্বর লেখনী ক্ষমতার দ্বারা অসংখ্য ইসলামি বিষয়ে বিস্তৃতভাবে লিখেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে কুরআনের আয়াত থেকে উর্দু অনুবাদকর্ম যা অন্যতম পুরোনো ও মাধূর্য্যময় একটি অনুবাদকর্ম। এছাড়া তিনি কোরআন অনুবাদ করেছেন সংস্কৃত ভাষায়, যদিও সমসাময়িক মুসলিম আলেমরা কুরআন কে তার প্রকৃত ভাষায় রাখার পক্ষে ছিলেন তবে পরবর্তীতে ভারতের ইসলামি আলেমরা তাঁর এই কর্মকে গ্রহণ করে নিয়েছেন এবং সমালোচনার পরিবর্তে স্বাগত জানিয়েছেন। এছাড়াও তারঁ বিখ্যাত কর্মের মধ্যে রয়েছে হুজ্জাত-আল-বালিগাহ এবং আল-তাফহীমাত আল-ইলাহীয়া’। শাহ ওয়ালী উল্লাহ ‘ইজালাত আল খীফা’ তে খিলাফত সম্বদ্ধে বলেছেন-“খিলাফত হচ্ছে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির নেতৃত্ব যার উত্থান হয়েছে দ্বীন বাস্তবায়নের জন্য তথাপী ইলমের শাখা সমূহ পুণর্জাগরণ, ইসলামি আচার-অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, জিহাদ পরিচালনা, সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, যোদ্ধাদের পুরস্কৃতকরণ বিচার ব্যবস্থা তৈরী ও আইন প্রয়োগ অপরাধ দমন এই সবগুলো কাজ বাস্তবায়ন এর দ্বারা করতে হবে যেন তা রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতিনিধিত্ব করে”।

ইসলামের উলাইয়া আম্মা (আম বা সাধারণ প্রতিনিধিত্ব) গ্রহণযোগ্য:

ভারতীয় উপমহাদেশকে খলীফাদের পক্ষ থেকে উলাইয়া আম্মা (সাধারণ প্রতিনিধিত্ব) দেয়া হয়েছিল যা শরী’আর হুকুম অনুযায়ী একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিত্ব। এটা সত্য যে খলীফাগণ উলাইয়াত বা প্রদেশগুলোর ব্যাপারে অনুসন্ধান, সরাসরি প্রতিনিধি নিয়োগ ও অপসারনের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন। এটি একটি রীতিতে পরিণত হয়েছিল যে সরাসরি নিয়োগের পরিবর্তে যেই প্রাদেশিক ক্ষমতা গ্রহণ করতো তাকেই মেনে নেয়া হত। তা সত্ত্বেও যেহেতু তাদেরকে গ্রহণ করা হত তাই তাদের কর্তৃত্ব খলীফা কর্তৃক সমর্থিত ছিল।

নিম্নে দুই ধরণের উইলায়াতের পক্ষে ইসলামি দলীল তুলে ধরা হল, যা নেয়া হয়েছে শেখ তাকী উদ্দীন আন নাবহানী ও শেখ আব্দুল কাদীম যাল্লুম কর্তৃক লিখিত বই The Ruling System in Islam (ইসলামী শাসন ব্যবস্থা) এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে,

“ওয়ালী (গভর্নর) হচ্ছেন খলীফার প্রতিনিধি। তিনি সেই সকল কার্যই সম্পাদন করেন যে সকল কাজের জন্য খলীফা তাকে নিজের পক্ষে কর্তৃত্ব দান করেন। শরী’য়ায় উইলায়ার কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই। সুতরাং খলীফার পক্ষ থেকে কোনো হুকুমের ব্যাপারে যিনিই নিয়োগ প্রাপ্ত হবেন তিনিই হবেন ওয়ালী। পাশাপাশি সে সকল শর্তের ভিত্তিতে খলীফা তাকে নিয়োগ দিবেন। তবে কোন একটি দেশের উইলায়াহ ভৌগলিক ভাবে নির্দিষ্ট। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) ওয়ালী নিয়োগের ক্ষেত্রে আয়তন নির্ধারন করে দিয়েছেন অর্থাৎ যেখানে তিনি (সা) আমীরকে ইমারত (শাসনকর্তৃত্ব) সহকারে নিয়োগ দিয়েছেন।

দুই ধরনের উইলাইয়া রয়েছে: সাধারণ ও বিশেষ। সাধারণ উইলায়াতে সকল ধরনের হুকুমি ব্যাপার সমূহ নিযুক্ত থাকবে। উক্ত উইলায়ার কাউকে নিয়োগের অর্থ দাঁড়ায় খলীফা উক্ত ওয়ালীকে নির্দিষ্ট দেশ বা প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব স্বরূপ ইমারাহ প্রদান করেছেন। যিনি উইলায়ার জনগণের সকল স্বাভাবিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের জন্য, নিয়োগ প্রাপ্ত। সুতরাং তিনি সাধারণভাবে পর্যবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত। অন্যদিকে বিশেষ ইমারা হচ্ছে যেখানে আমীর নির্দিষ্ট দেশ বা প্রদেশে সীমাবদ্ধ বিষয়ের উপর নিয়োগপ্রাপ্ত যেমন- সৈন্য পরিচালনা, নাগরিকদের শাসনকার্য পরিচালনা, ভুমি প্রতিরক্ষা আর নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দান। কিন্তু বিচার বিভাগ পরিচালনা, খারাজ ও সদকা আদায়ের ব্যাপারে তার কর্তৃত্ব থাকবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাধারণ দায়িত্ব (উইলায়া আম্মা) সহকারে ওয়ালী নিয়োগ দিয়েছেন। যেমন তিনি (সা) যখন আমরু বিন হাযমকে ইয়েমেনে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তেমনি ভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) বিশেষ দায়িত্ব (উইলায়া খাসসা) সহকারে ওয়ালী নিয়োগ দিয়েছেন। যেমন তিনি (সা) আলী বিন আবি তালিবকে ইয়েমেনের বিচার বিভাগের দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন। খলীফাগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। উমার ইবনুল খাত্তাব মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ানকে আল-শামের সাধারণ ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলন। অন্যদিকে আলী বিন আবি তালিব আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসকে বসরায় শাসনকার্য পরিচালনার জন্য বিশেষ ক্ষমতা (উইলায়া খাসসা) সহকারে নিয়োগ দিয়েছিলেন, বায়তুল মালের দায়িত্ব ব্যতিত, যেখানে নিয়োগ দিয়েছিলেন যিয়াদকে।

শুরুর দিকে দুই ধরনের উইলায়াহ প্রচলিত ছিল: উইলায়াহ সালাহ্ এবং উইলায়াহ খারাজ। তাই ইতিহাসে উইলায়ার আমীরের ক্ষেত্রে দুই ধরণের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়: প্রথমটি হচ্ছে সালাতের উপর ইমারাহ্ আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সালাহ ও খারাজের উপর ইমারাহ। অন্য কথায় আমীর নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন সালাত ও খারাজ উভয়ের উপর অথবা শুধুমাত্র সালাতের উপর। এখানে উইলায়াহ বা ইমারাহ এর ক্ষেত্রে সালাহ শব্দটি শুধুমাত্র নামাযে নেতৃত্ব দেয়া বুঝাচ্ছে না কারণ হচ্ছে সালাহ শব্দটি শাসনকার্যের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয় যেখানে বায়তুল মালের খাজনা বা কর অন্তর্ভূক্ত নয়। তাই ওয়ালী যদি সালাহ এবং খারাজ উভয়ের উপর নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তবে ঐ উইলায়াহ হবে সাধারণ (উইলায়াহ আম্মা)। আর তার উইলায়াহ যদি সীমাবদ্ধ হয়, শুধুমাত্র সালাহ অথবা শুধুমাত্র খারাজের জন্য, তবে ঐটি বিশেষ উইলায়াহ (উইলায়াহ খাসসা) উভয় ক্ষেত্রেই এটি সম্পূর্ণরূপে খলীফার এখতিয়ারভূক্ত, যেহেতু তাঁরই অধিকার রয়েছে উইলায়াহকে সীমাবদ্ধ করার যা হতে পারে খারাজের ক্ষেত্রে, বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে, অথবা খারাজ, বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনী ছাড়াও অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে। তিনি প্রদেশ উইলায়াহ পরিচালনায় যা ভাল মনে করবেন তাই করবেন। কারণ শরী’য়াহ ওয়ালীর কার্যক্রম নির্দিষ্ট করে দেয় নি এবং তিনি শাসনব্যবস্থার সকল কার্য পরিচালনায়ও বাধ্য নন। তবে এটি অবশ্যই নির্ধারিত যে ওয়ালী বা আমীর শাসনকার্যের কর্তৃত্বের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তিনি খলীফার প্রতিনিধি এবং তিনি অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আমীর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। এই সকল বিষয় উঠে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কর্মকান্ডের মধ্যে। তবে শরী’আহ খলীফার জন্য ওয়ালী নিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে, হোক সে সাধারণ উইলায়াহ (উইলায়াহ আম্মা) বা বিশেষ উইলায়া (উইলায়া খাসসা) যা তাঁর (খলীফার) নিজস্ব এখতিয়ারভূক্ত এবং এর সবই রাসূলুল্লাহ (সা) এর কার্যকলাপ দ্বারা প্রমাণিত।

সীরাত ইবনে হিশাম থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফারওয়া বিন মুসাইককে মুরাদ, যুবাইর ও মিজহাজ গোত্রের উপর নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর তাঁর সাথে খালিদ বিন সাইদ বিন আল আসকে সদাকার ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) যিয়াদ বিন লবীদ আল-আনসারীকে হাদারামাউতে সদাকাহর ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি (সা) আলী বিন আবী তালিবকে নাযরানে পাঠিয়েছিলেন সদাকাহ ও যিজিয়া আদায়ের জন্য। এছাড়াও তিনি (সা) তাকে (আলী) (রা) ইয়েমেনে কাজী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যেভাবে আল- হাকিম থেকে বর্ণিত হয়েছে।

কিতাবুল ইসতিয়াব থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) মুয়ায বিন জাবালকে আল-জানাদে নিয়োগ দিয়েছিলেন মানুষকে কুরআন ও ইসলামি আইন শিক্ষা দেয়ার জন্য এবং তাদের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য। তিনি (সা) তাকে ইয়েমেনের আমিলদের নিকট থেকে সদাকাহ আদায়ের জন্যও নিয়োগ দিয়েছিলেন। সীরাত ইবন হিশাম থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) উহুদ যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বে ইবনে উম্মে মাকতুমকে আল-মদীনায় সালাতের দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন। [The Ruling System in Islam, Sheikh Taqi-ud-deen-an-Nabhani & Sheikh Abdnl Qadeem Zalloom, Al-Khilafah Publications]

ভারতে বৃটিশ আগ্রাসন ও মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া:

ঔপনিবেশিকদের ক্রমাগত কুটচাল ও মুসলিম উম্মাহর বহুলাংশে বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের দরুণ, কুফফাররা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রভাব বিস্তারের সুপ্ত ইচ্ছার প্রতিফলনের সুযোগ খুঁজে পায়। ১৬০০ খ্রিঃ বৃটিশরা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করে। এটা ছিল বেদনাদায়ক যুগের সূচনা যখন বৃটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা উম্মাহর ভূমি ও সম্পদ লুন্ঠন করা শুরু করে। তারা মুসলিম ও অমুসলিমদের মাঝেও ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশের আক্রমণ করে ১৮১৯ সালে, যখন তারা মুসলিমদের শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এই যুদ্ধ উপমহাদেশে ইসলামি কর্তৃত্ব ও আক্রমণকারী বৃটেনের মধ্যে কিছু কুফর শক্তি যথা হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য কুফর শক্তির সাহায্যে পাল্টাপাল্টি সফলতার মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। বৃটেন মুসলিমদের সাথে ২৭ বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৮৪৬ সালে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নেয়।

এই সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন অংশে যেহেতু মুঘল উইলায়াহ দূর্বল হয়ে পড়েছিল, তাই এর অন্যান্য অংশের শাসকবর্গ ইস্তাম্বুলে খলীফার কাছ থেকে সাহায্য ও (শাসনকতৃত্বের) বৈধতা চেয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ কান্নুরের রাণী ১৭৭৯ সালে সুলতান আব্দুল হামিদকে উদ্দেশ্য করে একটি কুটনীতিক পত্র লিখেছিলেন, যেখানে তিনি, খলীফার কাছে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে নিরাপত্তার আরজি করেছিলেন। মাইসুরের টিপু সুলতান (বৈধতা) অন্বেষণের পর খলীফার কাছ থেকে একটি স্বীকৃতি পত্র পেয়েছিলেন যেখানে তাকে মাইসুরের শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

বৃটিশ ঔপনিবেশিকরা ভারত থেকে ইসলামি শাসন সরিয়ে দেয়ার পরও মুসলিমরা ইস্তাম্বুলের খলীফার প্রতি অনুগত ছিল। অনেকে জিহাদ পরিচালনা অব্যাহত রেখেছিল যেমন বিখ্যাত সায়্যিদ আহমাদ শহীদ। অন্যান্যরা বিশেষ করে ইয়াগিস্তানের (আফগানিস্তানের পূর্বে পশতুন উপজাতীয় অঞ্চল, সংযুক্ত হেয়াট, কান্দাহার, কাবুল, গাজনী ও কাবুল যা বৃটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত ছিল) আলেমগণ ঔপনিবেশিকদের বিরূদ্ধে জিহাদ পরিচালনা ও সংগঠিত করেছিলেন।

গ্রীক-তুর্কী যুদ্ধের ফলাফল যখন উসমানী খিলাফতের পক্ষে এসেছিল, তখন ভারতের মুসলিমেরা মওলানা আব্দুল বারীর নেতৃত্বে লাখনৌতে একটি সৌজন্য বৈঠক করে সুলতানকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত যখন বলকান এবং ত্রিপোলী যুদ্ধে দূর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন মুসলিমেরা পশ্চিমা শক্তির খিলাফতকে দূর্বল করে দেয়ার ষড়যন্ত্রের বিরূদ্ধে গর্জে উঠেছিল।

মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর, যিনি খিলাফতের পক্ষের একজন অবিসংবাদিত কর্মী এবং বৃটিশ বিরোধী অবস্থানের জন্য সুপরিচিত, তিনি বৃটেনের লিংকন কলেজ থেকে মাত্র স্নাতক শেষ করে ফিরেছিলেন। ১৯১৪ সালে লন্ডন টাইমসে প্রকাশিত একটি অনুচ্ছেদের প্রতিউত্তরে তিনি ছত্রিশ ঘন্টা বৈঠকের সম্পাদকীয় ‘The Choice of Turks’ লিখেছিলেন। ১৯১২ তে বলকান যুদ্ধ শুরু হলে তিনি অর্থ যোগানের সনির্বন্ধ আবেদন করেছিলেন এবং তুর্কীর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি মেডিকেল মিশন প্রেরণ করেছিলেন।

ভারতের সুপ্রসিদ্ধ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, দারুল-উলুম-দেওবন্দের প্রধান, শাইখ-উল-হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসান, বলকান ও ত্রিপোলী যুদ্ধে খিলাফতের সাহায্যার্থে অর্থ-সংগ্রহের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করেছিলেন। মওলানা হোসাইন আহম্মদ মাদানী তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, “বলকান ও ক্রিপোলীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ মওলানা মাহমুদ হাসানের মনে ও হৃদয়ে দুঃখের ছাপ ফেলেছিল। এটিই তাঁকে তার পূর্বসূরী মওলানা কাসিম নানুতভির (যিনি দারুল-উলুম-দেওবন্দের সহকারী প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং সোভিয়েত-তুর্কী যুদ্ধে খিলাফতের পক্ষে সহযোগীতা করেছিলেন) দেখিয়ে দেওয়া পথে পরিচালিত করে। মওলানা মাহমুদ হাসান ইসলামের স্বার্থে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং উসমানী সাম্রাজ্যের পক্ষে সম্ভাব্য সকল সাহায্য বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি দারুল-উলুম-দেওবন্দ বন্ধ রাখার ফতোয়া দিয়েছিলেন, উসমানী সাম্রাজ্যের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন, তুর্কীতে ছাত্র প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন, নিজেই একটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এরপরও তিনি উসমানী সাম্রাজ্যকে তাঁর পক্ষ থেকে দেয়া সাহায্যে সন্তুষ্ট ছিলেন না। এর মূল কারণ ছিল বলকান যুদ্ধের ফলাফল যা তাঁর মত মুসলিম স্বপ্নদর্শীদের বিচলিত করে দিয়েছিল। তাঁরা জানতেন যে ইউরোপের শ্বেতাঙ্গরা ইসলামের মশাল থেকে বিচ্ছুরিত আলো নিভিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। তার উপর মিঃ স্কুইবদের মত বৃটিশ শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতা, মুসলিমদের উপর রাশিয়ার পরিচালিত নৃশংসতা এবং তুর্কীর বিভাজন এই বিশ্বাসকে আরো পাকাপোক্ত করেছিল যে, বহুদিনের প্রতিপালিত গ্ল্যাডস্টোনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সময় শ্বেতাঙ্গদের চলে এসেছে।” [Naqsh-E- Hayat, Vol.2, pg.140]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, কুফর শক্তির ধ্বংস কামনা করে, (তুরস্কের) সুলতান ও তাঁর আর্মির সফলতার জন্য আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে ভারতের মসজিদগুলোর খুতবা উষ্ণ দোয়ায় প্রতিধ্বনিত হতো। যখন মওলানা শওকত আলী, যিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কেন তিনি তুরস্কের সুলতানের নামে খুতবা পড়েছিলেন, তিনি উত্তরে বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে দোষ দিতে পারো না যদি ইসলামের খলীফা একই সাথে তুর্কীর সুলতানও হয়।” [The Khilafat Movement, Gail Minault, Oxford University Press, 1982, p.55]

খিলাফত রাষ্ট্র ভারতের মুসলিমদের এই প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং তাদের একে (খিলাফতকে) সাহায্য করতে ও বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে আহ্বান করেছিল।

খিলাফত রাষ্ট্রের রাজধানী ইস্তাম্বুল থেকে আরবী সংবাদপত্র ‘আল-জাওয়াইত’ প্রকাশিত হত। এই ‘আল-জাওয়াইত’ এর পরিচালক ভারতের দারুল-উলুম-দেওবন্দের ছাত্রদের জন্য একটি ‘শুভেচ্ছা কপি’ পাঠিয়েছিলেন যা ইস্তাম্বুল থেকে প্রায় আট হাজার মাইল দূরে [Saweaneh Qasmi, Vol.2, p.329]

শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদুল হাসান যার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, খিলাফতের প্রত্যক্ষ সমর্থক ছিলেন এবং তা রক্ষার জন্য জোর প্রচেষ্ঠা চালিয়েছিলেন। তিনি হিযাজে ভ্রমন করে মক্কায় নিযুক্ত খিলাফতের ওয়ালী (গভর্নর) ও খলীফার সহকারীদের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। উক্ত ওয়ালী বৃটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতের মুসলিমদের আন্দোলনের সহযোগীতার স্বার্থে শায়খের হাতে কিছু নথিপত্র দিয়েছিলেন। ভারতের মুসলিমদের উদ্দেশ্যে ওয়ালীর এক আবেদন এই নথিপত্রের মধ্যে অন্যতম ছিল। উক্ত আবেদনে মক্কার ওয়ালী শাইখুল হিন্দকে ঔপনিবেশিক বৃটিশদের বিরূদ্ধে আন্দোলনের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছিলেন এবং ভারতের মুসলিমদেরও একে পূর্ণ সমর্থনের দেবার জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি ভারতীয় মুসলিমদের আন্দোলনে খিলাফত কর্তৃক সকল ধরনের পার্থিব সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। মক্কার গর্ভনরের লিখিত এই নথিপত্র ইতিহাসে ‘গালিব নামা’ নামে খ্যাত। এছাড়াও শায়খ ১৩৩৪ হিজরীতে হজ্জ্ব পালনের পর আনোয়ার পাশা ও জামাল পাশার সাথেও সাক্ষাত করেন, যারা খিলাফত রাষ্ট্রের কর্মকর্তা ছিলেন। আনোয়ার পাশাও বৃটিশদের বিরুদ্ধে ভারতের মুসলিমদের অবিরত আন্দোলনের প্রশংসা করে একটি আবেদন পত্র লিখেন। এই পত্রের লেখাগুলো গালিব নামার সাথে মিল ছিল, যেমন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে উসমানী খিলাফতের পক্ষ থেকে ভারতের মুসলিমদের পার্থিব সহযোগীতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল। এছাড়াও উক্ত পত্রে উসমানী খিলাফতের সকল নাগরিক ও কর্মচারীদের শাইখুল হিন্দের প্রতি পুর্ণ আস্থা রাখতে ও পার্থিব সহায়তা প্রদানের উৎসাহ দেয়া হয়েছিল। এ পত্রসমূহ বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থার শত বাধার মূখে গোপনে ভারতে পাচার করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সমগ্র ইয়াগিস্তান জুড়ে বিলি করা হয়েছিল। [The prisoners of Malta (Asiran-e-Mallta), Maulana Syed Muhammad Mian. jamiat ulama –I-Hind]

ভারতের মুসলিমরা শরীফ হোসাইনের বিশ্বাসঘাতকতা ও বৃটিশদের সহযোগিতায় (খিলাফতের বিরুদ্ধে) তার বিদ্রোহের ব্যাপারে সচেতন ছিল। তারা বৃটিশ কর্তৃক হিযাজ অঞ্চলের খাদ্য রসদ সরবরাহ বন্ধের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

কর্নেল টি. ই. লরেন্স কর্তৃক ছড়ানো প্রপাগান্ডা, তার চটকদার ও আবেগপ্রবণ আরবী বক্তৃতা এবং শরীফ হোসেন ও হেনরী মেকমোহান কর্তৃক সম্পাদিত গোপন চুক্তি সত্ত্বেও, হিযাজ অঞ্চলের সাধারণ নাগরিক তুর্কীদের বিপরীতে সংগঠিত বিদ্রোহের বিরূদ্ধে ছিল না। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৃটিশ সরকার খুবই অমানবিক ও একটি নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছিল। শাইখুল ইসলাম মওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন: “হিযাজে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ কর দেয়া হযেছিল। জাহাজযোগে হিযাজে শেষ খাদ্য চালানটি পৌঁছেছিল ১৩৩৪ হিজরীর সফর মাসে। যেহেতু খাদ্য সরবরাহ বন্ধ ছিল, মূল্য বৃদ্ধি পেল এবং মানুষ অনাহারে মরতে লাগল ভারতের মুসলিমদের আন্দোলনের দরূণ, ১৩৩৪ হিজরীর জমাদিউল-সানী মাসে ফায়রোজী আগানবোট কয়েক হাজার বস্তা চাউল নিয়ে কলকাতা ছেড়ে যায়। কিন্তু তাও জোরপূর্বক এডেন বন্দরে খালাস করা হয়। এটি শুধুমাত্র তখনই জেদ্দায় পৌঁছানোর অনুমতি দেয়া হয়, যখন হিযাজ থেকে উসমানী সাম্রাজের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়েছিল।” [The Prisoners of Malta (Asiran-e-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiatul-I-Hind, English Edition, P.45]

পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান, শাইখুল হিন্দ, মওলানা মাহমুদ হাসান তাঁর সত্যের প্রতি অবিচলতা ও উসমানী খিলাফতের সমর্থন বর্জন না করার দরূন বৃটিশ কর্তৃক মাল্টায় বন্দী ছিলেন। বৃটিশরা চেয়েছিল তাঁর দ্বারা উসমানী খিলাফত বর্জন করতে এবং শরীফ হোসেনকে সমর্থন করে একটি ফতোয়া জারি করতে। শাইখুল হিন্দ ১৩৩৫ হিজরীর ২৩ সফর হিযাজে (মক্কায়) বিশ্বাসঘাতক শরীফ হোসেন কর্তৃক গ্রেফতার হন। তিনি এবং অন্যান্য অনেক আলেমকে ১৩৩৫ হিজরীর ২৯ রবিউল সানী (২১ ফেব্রুয়ারী, ১৯১৭) একটি জাহাজে করে কায়রো হয়ে মাল্টায় প্রেরন করা হয়। অন্যান্য ভারতীয় উলামাদের মধ্যে ছিলেন মওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী, মওলানা আজিজ গুল, মওলানা হাকিম নূসরাত হুসেন ও মওলানা ওয়াহিদ আহমেদ যাদের প্রত্যেককেই বৃটিশরা কারাগারে চাপ সৃষ্টি করেছিল। মওলানা মাহমুদ হাসান ৩ বছর ৪মাস জেলবন্দী ছিলেন। তিনি ১৯২০ সালের ৪ঠা জুলাই মুক্ত হয়ে বোম্বে ফিরে আসেন। এই সময়টি মালটা থেকে ফিরে আসার পাশাপাশি ছিল খিলাফত আন্দোলনের সূচনালগ্ন। [The Prisoners of Malta (Asiran-e-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiat ulama-I-Hind]

১৩২১ হিজরীতে নিজারাতুল মারিফ (কুরআন শিক্ষা একাডেমী) প্রতিষ্ঠিত হয়। মুজাহিদ মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধির নেতৃত্বে যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম চিন্তাবিদ তৈরী করে ইসলাম বিরোধী প্রচারণার বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং ইসলামি চিন্তা ছড়িয়ে দেয়া। বৃটিশরা এই হুমকির প্রভাব বুঝতে পেরেছিল। যা বৃটিশ সরকারের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ (CID) কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়। যার শিরোনাম ছিল (The Petition of British Queen Vs Maulana Obaidullah Sindhi), সেখানে বলা হয়েছে-

“মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধী দারুল উলুম দেওবন্দকে তাঁর মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারছিলেন না। এই লক্ষ্যে তিনি দিল্লীতে একটি মাদরাসা (নিজারুতুল মা’আরিফ) প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ………… যা এটির নাম থেকে স্পষ্ট, মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কুরআনের ব্যাখ্যা ও সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা শিক্ষা দেয়ার জন্য। এটি আরবী ভাষাও শিক্ষা দিত।” (The Petition of British Queen Vs Maulana Obaidullah sindhi, Section 17)

“নিজারাতুল মারিফ এর এই শিক্ষাদানের পাশাপাশি, যা ছিল বেআইনী, এটি ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন সাক্ষাতস্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হত।” [The Petition of the British Queen vs Maulana Obaidullah Sindhi, Section 20]

বৃটিশরা এই বিষযটির প্রতি ইঙ্গিত করছিল যে নিজারাতুল মারিফ মুসলিম বিদ্রোহীদের সাক্ষাত স্থান ও কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যারা ভারতে বৃটিশ সরকারের শাসন উৎখাত করতে চেয়েছিল। এদের মধ্যে ছিল হাকীম আজমল খান, ড. মুখতার আহমদ আনসারী, মওলানা শওকত আলী, মওলানা মুহাম্মাদ আলী জওহর, মওলানা জাফর আলী খান ও মওলানা আবুল কালাম আজাদ।

মুসলিম আলেমগণ, চিন্তাবিদ ও মাঠকর্মীগণ বিদেশি পণ্য বয়কট ও বৃটিশ সরকারের সাথে অসহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিল। এই ইস্যুগুলোকে সমর্থন করে জনগণকে জড়ো করার লক্ষ্যে বৈঠকাদির আয়োজন করা হতো। এই বৈঠকগুলো পরিচালিত হতো ‘মু‘তামার আল-আনসার’ (The Workers Conference) নামক ব্যানারে এবং বিভিন্ন পত্রিকায় তা প্রকাশিত হত যেমন মওলানা আবুল কালাম আজাদ পরিচালিত আল-হিলাল ও মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর পরিচালিত ‘দ্যা কমরেড’ পত্রিকায়। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর উভয়কেই সংবাদপত্রে বৃটিশ বিরোধী প্রবন্ধ ছাপার দরুণ কারারূদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। শেষের জন ১৯১১ থেকে ১৯১৫ খৃঃ পর্যন্ত চার বছর জেল খেটেছিলেন।

ভারতের মুসলিম চিন্তাবিদগণ (Intelligentsia) খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। মওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৯১২ সালের ৬ই নভেম্বর তাঁর আল-হিলাল পত্রিকায় তাঁদের দর্শন সমূহের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে লিখেছিলেন যে, উসমানী সুলতানই মুসলিমদের নিরাপত্তার সর্বশেষ তরবারী ধারণ করেন। এতদূর পর্যন্ত লিখেছিলেন যে, “খিলাফত মূলত শরীআহকে ধর্মীয় সমগ্রতা প্রদানকারী (শক্তি)” এটি “ওহীর মাধ্যমে জরুরী হয়ে পড়েছে যে, এটি আল্লাহর প্রতিষ্ঠান এবং এর কর্তৃত্বের প্রতি আনূগত্য ফরয বা ইতিবাচক নির্দেশনা।”

খিলাফত আন্দোলন:১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে, মওলানা মুহাম্মদ আলী ও তাঁর ভাই শওকত আলী, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, ড. মুখতার আহমেদ আনসারী ও হাসরাত মোহানী সহ খিলাফত আন্দোলন (১৯১৯-১৯২৪) নামে একটি নতুন সংগঠনের যাত্রা শুরু করেন। খিলাফত রক্ষায় সাধ্যানুযায়ী যেকোনো সুযোগের সদ্ব্যবহার করা তাদের সংকল্পবদ্ধ লক্ষ্য ছিল। তাঁরা ভারতে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে খিলাফত কনফারেন্সের আয়োজন করেছিলেন। এটি লক্ষণীয় যে, খিলাফত আন্দোলনের উলামা ও কর্মীগণ বিভিন্ন মাযহাব ও প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেছিলেন, উদাহরণস্বরূপ মওলানা আবুল কালাম আজাদ গায়ের তাকলীদি (যারা মাযহাবের তাকলীদ হারাম মনে করেন) হিসেবে পরিচিত এবং মওলানা মাহমুদুল হাসান ছিলেন দেওবন্দী যারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী, তা সত্ত্বেও তাঁরা খিলাফত সুরক্ষার লক্ষ্যে একতাবদ্ধ ছিলেন।১৯১৯ সালে বোম্বে খিলাফত কমিটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক লক্ষ্যে একমত হয়; “প্রথমতঃ তুর্কী সুলতানের প্রতি খলীফা হিসেবে পার্থিব ক্ষমতা ধরে রাখার জোরালো দাবি জানানো, এবং দ্বিতীয়ত, ইসলামের পবিত্র ভুমিসমূহে তাঁর অব্যাহত কর্তৃত্ব সুনিশ্চিত করা।”

১৯২০ সালে বেঙ্গল প্রাদেশিক খিলাফত কনফারেন্সের কলকাতা সভায় সভাপতির বক্তব্যে মওলানা আবুল কালাম আজাদ খিলাফতের গুরুত্ব আলোচনা করে ঘোষণা দেন, “এই প্রতিষ্ঠানের (খিলাফতের) লক্ষ্য হচ্ছে মুসলিম জাতিকে সঠিক পথে সংগঠিত করা ও নেতৃত্ব দেয়া, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং আল্লাহর বাণীকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া। এই সকল বিষয়ের জন্য খলীফার পার্থিব কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা অত্যাবশ্যক।” মওলানা আযাদের এই ব্যাপারে কোন কোন সন্দেহ ছিল না যে, “একজন ইমাম ব্যতীত তাদের জীবন অনৈসলামিক হয়ে পড়বে এবং মৃত্যুর পরে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।”

মওলানা আযাদ ১৯২০ সালে মাসআলা-এ-খিলাফত (খিলাফতের মাসাআলা সমূহ) নামে একটি বই প্রকাশ করেন যেখানে তিনি বলেন, “খিলাফত ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব সম্ভব না তাই ভারতের মুসলিমদের উচিত তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ও ক্ষমতা দিয়ে এর জন্য কাজ করা।”

একই বইয়ের ১৭৬ নম্বর পৃষ্ঠায় মওলানা আজাদ বলেন; “দুই ধরণের আহকাম শরীআহ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে ব্যক্তি সম্পর্কিত যেমন আদেশ ও নিষেধ, ফরজ (বাধ্যতামূলক) ও ওয়াজিবসমূহ যা নিজেদের পরিপূর্ণতার জন্য। দ্বিতীয়টি ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত নয় বরং উম্মাহর সাথে, জাতির সাথে সম্পর্কিত, সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা এবং রাষ্ট্রের রাজনীতি যেমন ভুমি জয় করা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালা।”

Peter Hardy’ র মতে, মওলানা আজাদ বিশ্বাস করতেন যে, “যে মুসলিম ধর্ম ও রাজনীতিকে মুসলিমদের থেকে আলাদা করবে সে নিঃশব্দে কর্মসম্পাদনকারী মুরতাদ।”

ভারত থেকে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হারানো ও খলীফার সমসাময়িক ক্ষমতার প্রতি যৌথ বাহিনীর হুমকি, মুসলিম জাতির নেতাদের এতটাই চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছিল যে, তাদের অনেকেই ভারত থেকে হিজরতের (Migration) পক্ষে ফতোয়া দেয়ার তাগিদ অনুভব করেন।

মওলানা আবুল কালাম আজাদ একটি ফতোয়া জারি করেছিলেন যা ১৯২০ সালের ৩০ জুলাই অমৃতসরের দৈনিক আহল-এ-হাদীস এ প্রকাশিত হয়েছিল। উক্ত ফতোয়ায় তিনি বৃটিশদের বিরুদ্ধে অসহযোগের বিকল্প হিসেবে ভারত থেকে হিজরতের জোর দাবি জানিয়েছিলেন ।

মওলানা আব্দুল বারী তাঁর ফতোয়ায় বলেছিলেন, “প্রত্যেক মুসলিম যারা এখানে বসবাস করছেন তাদের অসহযোগে সংযুক্ত হওয়া উচিত। আর তা যদি সম্ভব না হয় তবে হিজরত করা উচিত।” মওলানা শওকত আলী কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির পক্ষে একটি ফতোয়া জারি করেন, যেখানে প্রত্যেক নিষ্ঠাবান মুসলিমকে ভারতে অবস্থান করার এবং অসহযোগের জন্য কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। শুধুমাত্র এটি সম্ভব না হলেই তারা হিজরতের ব্যাপারটি আমলে নিতে পারেন। এই ফতোয়ার চমৎকার প্রভাব তৈরি হয়েছিল এবং হাজার হাজার মুসলিম ভারতের দার-উল-হারব ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যেহেতু তুর্কী খলিফার পদ যা তাদের ধর্মীয় অধিকার হিসেবে চিহ্নিত ছিল, তা খর্ব হয়েছিল।”

খিলাফতের প্রশ্নটি শুধু একটি রাজনৈতিক প্রশ্নই ছিল না বরং এই ব্যাপারটি ছিল মুক্তি অথবা ধ্বংসের” প্রশ্ন। তুর্কী যদি শাসনাঞ্চল হারায়, ইসলাম মতাদর্শ হিসেবে হুমকির মুখে পড়বে।

মওলানা শওকত আলী এই অনুভূতির পক্ষেই ১৯২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর সমগ্র ভারত খিলাফত কনফারেন্সের দশম অধিবেশনে তার সভাপতি বক্তব্যে বলেছিলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত জাজিরাত-উল-আরব এর এক ইঞ্চি ভূমিও অমুসলিমদের প্রভাবে রয়েছে, একজন মুসলিমের অন্তরে শান্তি থাকতে পারে না। [The Indian Muslims, Shan Muhammad, Meenakshi Prakashani, 1981, Vol. VII; p.209]

মোহাম্মদ আসাফ আলী কর্তৃক ১৯২১ সালের ২রা নভেম্বর ‘কমরেড’ পত্রিকার সম্পাদককে লিখিত একটি চিঠিতে খিলাফতের ইসলামি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়,” তুরস্কের সম্মান ইসলামের সম্মানের সাথে সমার্থক, উসমানী সাম্রাজ্যের অস্ত্বিত্ব মুসলিম জাতির পার্থিব উন্নতির জন্য আবশ্যক …. উসমানী সাম্রাজ্য বিলুপ্তির সাথে সাথে সভ্যতা হিসেবে ইসলামের শক্তি হারিয়ে যাবে… তুরস্কের পতন ঘটলে ইসলাম দাঁড়াতে পারবে না। তাই তুরস্কই হচ্ছে ইসলামের মেরূদন্ড।” মওলানা মুহাম্মদ আলী এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন দিয়েছিলেন যিনি গুরুত্বারোপ করেছিলেন যে তা সাধারণ মুসলিমদের মতকে প্রতিফলিত করে।

১৯১৯ সালের ২৬ জানুয়ারী লক্ষনৌতে ফিরাঙ্গী মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় আঞ্জুমান মুইদ-উল-ইসলামের সভায় সমাধানস্বরূপ বলা হয়: “ফিরাঙ্গী মহলের আলেমদের এই সভায় সুলতান মুহাম্মদ ষষ্ঠ-এর প্রতি একনিষ্ট ও সচেতন আনুগত্যের পাশাপাশি জোরালোভাবে এ ঘোষণা দিচ্ছে যে সঠিক ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, বর্তমান তুর্কী সুলতানই হচ্ছে আইনসম্মত খলীফা এবং (আলেমগণ) এও ঘোষণা দিচ্ছে যে, ইসলাম কখনই খিলাফতের প্রশ্নে অমুসলিমদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না।

প্রকৃতপক্ষে, সৈয়দ সুলাইমান নদভীর মতো সেসময়কার অনেক আলেমই খিলাফত থাকার বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে জোর দিয়েছেন। মওলানা নদভী বলেন: “…….অন্যান্য বিশিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আল্লামা নাসাফী, ইমাম রাজি, কাজী উযুদ, এই ব্যাপারে তাদের বইগুলোতে বিশদ আলোচনা করেছেন এবং উক্ত ব্যাপারে সর্বশেষ কর্তৃপক্ষ ধরে নেয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা) হতে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে সহীহ মুসলিমে সুষ্পষ্ঠভাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, কোন মুসলমান যদি তার সময়ের ইমামকে স্বীকার করা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করে তাবে সে কাফেরের মতো অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।” [The Muslim outlook march 1920]

মওলানা মুহাম্মদ আলী ১৯২০ সালে প্যারিসে একটি বক্তৃতায় বলেন, “খিলাফত হচ্ছে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তুরস্কের সুলতানকে ঈমানদারদের নেতা ও তাদের নবীর খলীফাদের উত্তরসূরী হিসেবে মেনে দিয়েছে। এই বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ এই যে খলীফার, যিনি বিশ্বাসীদের নেতা, অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণ সীমানা, পর্যাপ্ত পরিমাণ সামরিক ও নৌ সম্পদ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থনৈতিক সম্পদ থাকতে হবে।”

সৈয়দ হুসেইন যিনি প্যারিস-এর সভায় মুহাম্মদ আলীর সাথে একই মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন বলেছেন, “যদি পৃথিবীতে ইসলাম টিকে থাকতে হয়, তবে এটি অত্যাবশ্যক যে ইসলামের অবশ্যই একটি খিলাফত থাকবে। যেটি চৌদ্দশ বছর পূর্বে যখন থেকে ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে তখন থেকেই তা ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।”

মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর আরও বলেন, “তুর্কী সুলতান ছিলেন খলীফা বা নবীর উত্তরসূরী এবং আমির উল-মুমিনীন বা বিশ্বাসীদের নেতা, এবং খিলাফত আমাদের সেইরূপ গুরূত্বপূর্ণ ব্যাপার ঠিক যেমনি কুরআন কিংবা নবীর সুন্নাহ। “[My life a Fragnent, Mohammed Ali Johar, pg.41]

বস্তুতঃ আলেমগণ খিলাফত আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় ভুমিকা নিয়েছিলেন। নিম্নোক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ন দফা যা ১৯২০ সালের ৫ ও ৬ ই এপ্রিল ভারতের উলেমাদের জন্য অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের ঘোষণা থেকে নেয়া হয়েছে, যেখানে অনেক উলেমাই অংশগ্রহণ করেছিলেন:

ঘোষিত দফা ১: আলেমদের অবশ্যই খিলাফত বিষয়ে জনমত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

দফা ২ : কপটাচারি (মুনাফিক) আলেম এবং এই বিষয়ের বিরুদ্ধবাদী আলেমদের বয়কট করতে হবে।

দফা ৭ : উলেমাদের অবশ্যই তাদের অনুসরণকারীদের নিকট থেকে প্রতিজ্ঞা নিতে হবে যে, তারা খিলাফতের বিষয়ে বলতে ও লিখতে গিয়ে তাদের মন-প্রাণ উৎসর্গ করবেন।

দফা ৯ : মুসলিমদের অবশ্যই সাংবিধানিক নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে হবে।

১৯২০ সালের ১৯ ও ২০ নভেম্বর দিল্লীতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত সম্মেলনে জামিয়াত আল উলেমা হিন্দ কর্তৃক ঘোষিত নিম্নোক্ত কয়েকটি দফা থেকে খিলাফতের ব্যপারে তাদের সমর্থনকেও তুলে ধরে:

– ইংরেজরা ইসলাম এবং মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং তাদের বিরুদ্ধচারন করা ফরয।

– উম্মাহর নিরাপত্তা দেয়া এবং খিলাফতের নিরাপত্তা দেয়া একটি পবিত্র ইসলামি জরুরত। যদি এই দেশের ভাইয়েরা এই ব্যাপারে সাহায্য ও সহযোগীতা করেন, তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসান, দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান, যার কথা এর আগে উল্লেখ করা হয়েছিল, তিনি ১৩৩৮ হিজরীর ২০ রমযান জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বোম্বে ফিরে আসেন। ফিরে আসার পর তিনি একনিষ্টভাবে খিলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর উত্তরসূরী মওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী লিখেছেন, “জেল ও নির্বাসনের কষ্ট সহ্য করে যখন হযরত শাইখুল হিন্দ রহমতুল্লাহ আলাইহি ভারতে ফিরে আসলেন, আমরা তাঁর বৃটিশদের প্রতি ঘৃণা ও উপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতি স্পৃহার কোনো কমতি দেখতে পেলাম না। দেশে জারি করা মার্শাল আইন, দেশের অভ্যন্তরে রওলাট অ্যাক্ট কার্যকরণ ও জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যা, উসমানী খিলাফতের বিভাজন এবং ভারতের বাইরে তুর্কীদের সাথে অমানবিক ব্যবহার তাঁকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেছিল। তিনি বোম্বেতে পা রাখা মাত্রই মওলানা শওকত আলী এবং খিলাফত কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সাথে সাক্ষাত করেন। ফিরাঙ্গী মহল, লক্ষনৌ-এর মওলানা আব্দুল বারী এবং আহমেদাবাদ থেকে মহাত্মা গান্ধী শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসানকে বোম্বেতে গ্রহণ করতে এসেছিলেন। তাঁদের সাথে এবং খিলাফত কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে প্রকাশ্যে ও নির্জনে আলোচনার পর, শাইখুল হিন্দও ভারত মুক্তির দাবীতে অহিংস আন্দোলন শুরু করার পক্ষে মত দিয়েছিলে।” [Naqsh-e-Hayt, Vol.2,p.247]

শায়খের একটি ফতোয়ার বইতে খিলাফত রাষ্ট্রের উপনিবেশিকদের প্রতি সহযোগীতার বিষয়টি উঠে আসে। যদিও তা ১৯২০ সালে ইস্যু করা হয়েছিল তাঁর উল্লেখিত অনেক দফাই আজ অবধি প্রয়োগযোগ্য। তিনি বলেন:

“ইসলামের শত্রুরা ইসলামের বিরূদ্ধে আঘাত হানতে এবং ইসলামের সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করতে কোনো কিছু করাই অবশিষ্ট রাখেনি। ইরাক, ফিলিস্তিন ও সিরিয়া যা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাহাবা এবং তাঁদের অনুসারীদের দ্বারা বিজিত হয়েছিল, আজ আবার ইসলামের শত্রুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে । খিলাফতের মার্যাদা ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলা হয়েছে। খলীফাতুল-মুসলিমীন (মুসলিমদের খলীফা), যিনি এই গ্রহে সকল মানুষকে একতাবদ্ধ রাখবেন, যিনি এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বস্বরূপ ইসলামের বিশ্বজনীন আইন বাস্তবায়ন করবেন, যিনি মুসলিমদের অধিকার ও স্বার্থের নিরাপত্তা দিবেন। যিনি এই বিশ্বে আল্লাহর বাণীর মহিমা অক্ষুন্ন রাখবেন এবং বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করবেন, আজ শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং তাঁকে আজ অপ্রয়োজনীয় করে তোলা হয়েছে…………ইসলামের পতাকা আজ নিচুতে উড়ছে। হযরত আবু উবাইদা (রা) সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা), খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা) এবং আবু আইয়ুব আনসারী (রা)-এর আত্মারা আজ অস্থির। কেন তা হল? এর কারণ মুসলমানরা তাদের সম্ভ্রম, মর্যাদা ও আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলেছে। সাহসিকতাও ধর্মীয় শক্তিমত্তা ছিল যাদের দূর্গ ও উত্তরাধিকার তারা তা আজ হারাতে বসেছে তাদের অজ্ঞতা এবং অতিমাত্রায় অবহেলার দরুণ।

বিষয়টি শুধু এই নয় যে এক মুসলিম কষ্টের সময় আরেক মুসলিম ভাইকে সাহায্য করছে না। বরং দুঃখজনকভাবে, সুনাম কুড়ানো ও কাফিরদের সাথে বন্ধুত্বের অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এক ভাইকে আরেক ভাইয়ের মাথা কাটতে ঠেলে দিয়েছে। মুসলিম মুসলিমের রক্ত পান করছে। মুসলিমগণ তাদের নিজেদের ভাইদের রক্তে হাত রঞ্জিত করছে।

হে ইসলামের সন্তানেরা! এবং হে মহান এ জাতির প্রেমিকেরা। তোমরা আমার চেয়ে ভালো জানো, যেই গর্জন ও আগুন ইসলামি বিশ্বের তাঁবুগুলোকে জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং ইসলামি খিলাফতের দূর্গে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে তা নির্গত হয়েছে আরব ও ভারতীয়দের তাজা রক্ত থেকে। যে সম্পদের ক্ষমতাবলে খ্রিষ্টানরা মুসলিম জাতিকে আয়ত্তে আনতে সমর্থ হয়েছে তার একটি বৃহৎ অংশ তোমাদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল।

তাই কোনো নির্বোধ ও মাথামোটা মুসলিম কি থাকতে পারে যে বুঝে না খৃষ্টানদের সহযোগীতার ফলাফল কী ? এবং এটাও কি বুঝে না যে, একজন ডুবন্ত মানুষ যদি একটি খঁড়কুটোকে আঁকরে ধরে এবং সহযোগীতার পথ খুঁজতে থাকে তবে কি তা তাকে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারবে? “ [From the Fatwa of Maulana Mahmood Hossan on 16th Safar 1339 Hijri, Corresponding to October 29th 1920 Gregonina year, The Prisoners of Malta (Asira’n-E-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiat ulama-I-Hind. English edition p.78-79]

যেভাবে আজকের উলেমাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনীতি ও ইসলামকে আলাদা বলতে চান তাদের মত নয়, বরং তৎকালীন উলেমারা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই দুটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খিলাফত ধ্বংসের মাত্র কিছুকাল পূর্বে ১৯২৩ সালের ২৪ শে ডিসেম্বর গয়া’তে জামিয়াত-উল-উলামা-হিন্দের ৪র্থ অধিভেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে ইসলামের জ্ঞানী আলেম ও শিক্ষকেরা ভারতের সকল অংশ থেকে একত্রিত হয়ে মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্নে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলে। সামগ্রিক সকল তর্ক-বিতর্কের পর এই অধিবেশন সর্বসম্মত মতামত দিয়েছিল যে, রাজনীতি ও ধর্ম ইসলামের অবিচ্ছেদ্য উপাদান।

খিলাফত আন্দোলন এমনকি হিন্দুদের উপরও যেরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল তা দেখে বর্তমান ইন্ডিয়ার জনক, মোহনদাস করমাচাঁদ গান্ধী এতে অংশ নিয়েছিলেন এবং কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির সদস্য হয়েছিলেন।

তবে ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের হাতে খিলাফত ধ্বংসের পর এই আন্দোলনের পতন হয়। অনেকেই তখন খিলাফতের পুনঃস্থাপন অসম্ভব মনে করে এবং বৃটিশ ঔপনিবেশিকদের থেকে ভারতকে মুক্ত করাকেই কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে শুরু করেন।

খিলাফত ধ্বংসের একদিন পরে মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর বলেছিলেন, যা ১৯২৪ সালের ৪ঠা মার্চ টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। “এটা নির্ধারণ করা কঠিন হবে যে খিলাফতের পতন ভারতের মুসলমানদের অন্তরে ঠিক কী পরিমাণ প্রভাব ফেলবে। আমি শুধু নিশ্চিতভাবে এতুটুকুই বলতে পারি যে এটি ইসলাম ও সভ্যতা উভয়ের জন্যই ধ্বংস প্রমাণিত হবে। এই সম্মানিত প্রতিষ্ঠান যা ছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইসলামের ঐক্যের প্রতীক, এর দমন ইসলামের (শক্তির) ভেঙে পড়ার কারন হবে………..।

তিনি কত সত্যই না বলেছিলেন। এটি ধ্বংসের পর মুসলিম বিশ্ব ঠিক তা-ই প্রত্যক্ষ করেছে, যা তিনি বলেছিলেন। আজ এটি ধ্বংসের প্রায় আশি বছরেরও বেশি সময় পরে এসে, খিলাফত আবার গণমাধ্যমগুলোর গুঞ্জনধ্বণিতে পরিণত হয়েছে যেহেতু পশ্চিমা রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ ও নেতারা এর ফিরে আসার ভয়ে ভীত এবং মুসলিম উম্মাহ এর পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাকুলভাবে আকাংক্ষিত। ২০০৬ সালের ১১ই অক্টোবর বুধবার হোয়াইট হাউসের সামনে একটি সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের (তৎকালীন) প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছিল, “চরমপন্থীরা মুক্তমনা লোকদের ভীতি প্রর্দশনের চেষ্টা করছে যাতে উদারপন্থী সরকারগুলোকে উৎখাত কার যায় এবং যাতে খিলাফতের বিস্তৃতি ঘটানো যায়। এর চেয়ে বেশি ঝুকির বাস্তবতা আর হতে পারে না। যা আমি আগেই বলেছি, আমরা যে পৃথিবীতে বসবাস করি, তাতে চরমপন্থী উপাদান রয়েছে যারা লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। এবং তারা চায় যাতে আমরা (তাদের পথ হতে) সরে পড়ি। তারা সরকার উৎখাত করতে চায়। তারা একটি আদর্শিক খিলাফতকে বিস্তৃত করতে চায় যার বিশ্বাসের মধ্যে স্বাধীনতার কোন ধারণার অন্তর্ভুক্তি নেই।”

পশ্চিমাদের বুঝা উচিত যেহেতু খিলাফত ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই ঘৃণা করার পরিবর্তে তাদের একে প্রণিধান করা উচিত যাতে তারা এর সাথে (প্রয়োজনীয় চুক্তিতে) আবদ্ধ হতে পারে যখন এটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা খিলাফতের প্রয়োজনীয়তা ভুলে যায় নি। এই উপমহাদশের অনেক দল, আলেম ও চিন্তাবিদরা এটিকে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছেন। এ বিষয়টি হিযবুত তাহরীর থেকে শুরু করে পাকিস্তানে ড. ইসরার আহমেদ-এর তানজীম-ই-ইসলামি, বাংলাদেশের খিলাফত আন্দোলন ও খিলাফত মজলিস সহ বর্তমানে নিষিদ্ধ Students Islamic Movement of India (SIMI) সহ আরো অনেক আন্দোলনের এর আহ্বান থেকে পরিষ্কার।

খিলাফত আবার ফিরে আসবে এবং এর শাসন আবার ভারত উপমহাদেশকে মুক্ত করবে যা নিম্নোক্ত হাদীসসমূহ পাশাপাশি আরও হাদীস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।

আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে একটি দল ভারতবর্ষ জয় করবে। আল্লাহ তাদের জন্য (ভারতবর্ষকে) মুক্ত করে দিবেন, এমনকি তারা এর শাসকদের শিকল পরিহিত অবস্থায় নিয়ে আসবে। আল্লাহ তাদের গূনাহসমূহ মাফ করে দিবেন- যখন তারা ফিরে আসবে (ভারতবর্ষ থেকে) তারা সিরিয়াতে ইবনে মরিয়মকে খুঁজে পাবে” [Naim b. Hammad in Al-Fitan]

ছাওবান থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “আমার উম্মতের দুটি দলকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন – একটি দল যারা ভারতবর্ষ জয় করবে এবং অন্য দলটি যারা ঈসা ইবন মরিয়মের সাথে থাকবে।” [Ahmad and An-Nasai]

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আমাদেরকে আজকের খিলাফত আন্দোলনে শরীক হওয়ার তৌফিক দিন, যে ভাবে আমাদের পূর্বসূরীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন।

আবু ইসমাইল আল-বেইরভী
রমযান ১৪২৭; অক্টোবর, ২০০৬

অনুবাদ : সোহান ইয়াসির ইকবাল।

Facebook Comments