ট্যাক্সি ভ্রমণে তওবাহ (একটি ফিরে আসার গল্প)

316

২০০৪ সাল থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে আমি যখন কোন কাজ খুঁজে পাচ্ছিলাম না তখন সাময়িকভাবে একজন ট্যাক্সি চালক হিসেবে কাজ করতাম।

একদিন যখন আলেক্সান্দ্রিয়ার (মিশর) রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছিলাম, আর শাইখ মিশরী রশিদ আল-আফাসির কণ্ঠে সূরা আল হাদীদের (৫৭ নং সূরা) কিছু আয়াতের তিলাওয়াত শুনছিলাম, তখন ৬০ বছর বয়স্ক এক লোক আমাকে থামালো এবং বললো তাকে কারমুয (আলেক্সান্দ্রিয়ার নিকটবর্তী একটি প্রাচীন শহর) পৌঁছে দিতে। তিনি গাড়ীতে উঠে বসলে আমি তার গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করলাম।

রাস্তার প্রতি মনোযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি বুঝতে পারছিলাম লোকটি খুব বিরক্ত বোধ করছে। যার জন্য তিনি তার হাঁটু নাড়ছেন, হাত চুলকাচ্ছেন এবং বার বার ক্যাসেট প্লেয়ারটির দিকে তাকাচ্ছেন। শাইখ নিম্নোক্ত আয়াতগুলো পাঠ না করা পর্যন্ত তিনি একই কাজ করতে থাকলেন।

যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবর্তীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মত যেন না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের উপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।
[সূরা আল-হাদীদঃ ১৬]

আর গল্পটির শুরু এখানেই।

লোকটি হঠাৎ কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং হিস্টোরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো কাঁদতে লাগলেন। তিনি একেবারেই থামছিলেন না, আর তাই বাধ্য হয়েই তাকে শান্ত করার জন্য আমি রাস্তার পাশে গাড়ি থামালাম। আমি তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তিনি কোন উত্তর দিচ্ছিলেন না; বরং তিনি শুধু ডুকরে ডুকরে কেঁদেই যাচ্ছিলেন।

আমি ভাবলাম কুর’আন তিলাওয়াতই হয়তো তার কান্নার কারণ, তাই আমি ক্যাসেট প্লেয়ারটি বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু লোকটি আমাকে সর্বশেষ আয়াতটি পুনরায় বাজাতে বললো। আর যখন আমি পুনরায় তিলাওয়াতটি বাজাতে শুরু করলাম লোকটি আবার কাঁদতে শুরু করলো।

শাইখ সম্পূর্ণ সূরাটির তিলাওয়াত শেষ না করা পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হলো। আর তারপরই লোকটি শান্ত হলো এবং তার ঘটনা বলতে লাগলোঃ

বাবা, আমাকে মাফ করো। আমার নাম মুস’আদ। এক সময় আমার হার্টের অসুখ ছিল এবং যখনই আমার হার্ট অ্যাটাক হতো আমার সন্তানেরা আমাকে পাশের বাড়ির ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতো। এক রাতে আমার হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হলো এবং বরাবরের মতোই আমরা তার কাছে গেলাম, কিন্তু তিনি ঘুমের ভান করে দরজা খুললেন না।

তাই আমার সন্তানেরা আমাকে একটি সরকারী হাসপাতালে নিয়ে গেলো। আর সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসার অবস্থা সম্পর্কে তুমি তো জানোই। যাই হোক, আমি আমার সন্তানদের বললাম আমার অবস্থা ভালোর দিকে। কারণ, পরদিন সকালে তাদের কাজ ছিলো, তাই আমি চাচ্ছিলাম তারা বাড়ি ফিরে যাক। বাড়িতে পৌঁছার পর আমার ব্যথা আরো বেড়ে গেল এবং আমি আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। তাই আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে মাহাম্মাদিয়াহ্‌ (আলেক্সান্দ্রিয়ার একটি প্রাচীন খাল)- এর পাড়ে গিয়ে বসলাম।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি সালাত আদায় করে আল্লাহর কাছে দু’আ করতে থাকলাম এবং কাতরভাবে চাইলাম তিনি যেন আমাকে এই অসুখ থেকে সুস্থতা দান করেন। আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম এবং বললাম,

“হে আল্লাহ, তুমি আমাকে অসুস্থতা দিয়েছো কারণ আমি সালাত আদায় করি না; দয়া করে আমাকে সুস্থ্য করে দাও এবং আমি আর কোনোদিন এক রাকা’আত সালাতও ছাড়বো না।”

আমার ব্যথা আরো বেড়ে গেলো। আমি চিৎকার দিয়ে বললাম, “বন্ধ কর এটা! আমার জন্য কী তোমার খারাপ লাগছে না?!”

কিছুক্ষণ পর আমি কিছুটা স্বাভাবিক বোধ করলাম এবং ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লাম। জেগে ওঠার পর আমি আগের চেয়ে অনেক ভালো বোধ করলাম। সেদিন থেকে আমি আর কোন ব্যথা কিংবা হার্টের সমস্যায় পড়িনি।

কিন্তু সেদিনের পর আমি এক রাকা’আত সালাতও আদায় করিনি।

তুমি যখন তিলাওয়াতটি বাজাচ্ছিলে, আমার মনে হচ্ছিলো আল্লাহ যেন আমার সাথে কথা বলছেন। সালাতের প্রতি আমার অবহেলার জন্য তিনি আমাকে কঠোরভাবে তিরষ্কার করছেন।

তুমি কি ভাবছো, তিনি আমাকে আবার অসুস্থ করে দিবেন এ ভয়ে আমি কাঁদছিলাম? নাহ! আল্লাহর কসম, আমি সে কারণে কাঁদছিলাম না। আমি শুধু নিজের সম্পর্কে বিভ্রান্ত ও লজ্জাবোধ করছিলাম। আল্লাহ আমার ইচ্ছাকে পূরণ করেছেন, কিন্তু আমি কখনোই আমার কথা রাখিনি।

উপলব্ধিঃ উপর্যুক্ত লোকটির মতো আমাদের অনেকেই বিপদের সময় আল্লাহকে স্মরণ করি এবং তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করি। কিন্তু যখনই আমাদের বিপদ কেটে যায় আল্লাহর কথা আমাদের আর মনে থাকে না। আর একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য এমন হওয়া উচিত নয়। সর্বাবস্থায় আমাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করতে হবে, তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে হবে এবং বার বার আমাদের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ রাখবো এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর;অকৃতজ্ঞ হয়ো না।

Facebook Comments