নারী অধিকার আন্দোলন : ভুল পথে যার পথচলা।

468

‘অধিকার’ পাওয়ার অধিকার সকলেই সংরক্ষণ করে। চাই সে পুরুষ হোক বা নারী। কিন্তু বিশ্বব্যাপী সর্বত্র শুধু নারী অধিকারের কথা শোনা যায়। পুরুষের অধিকার নিয়ে কোথাও কোন মিছিল-মিটিং বা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয়েছে এমনটা শোনা যায় নি। এটা নিয়ে অবশ্য পুরুষদের মনে তেমন কষ্ট নেই। তাদের নিষ্ক্রিয় ভাব-ভঙ্গিই এর প্রমাণ। এর কারণ হয়ত পুরুষদের তুলনায় নারীদের বেশি অধিকার বঞ্চিত হতে হয়। তাই তারা প্রতিবাদ করবে ও নিজ অধিকার ফিরে পাওয়ার জোর চেষ্টা চালাবে এটাই স্বাভাবিক।

অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ সমাজের কিছু লোককেও দেখা যায় যারা নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলেন। পুরুষ শাসিত সমাজে তাদের বঞ্চনা ও নিগৃহীত হওয়ার নিষ্কৃতি চেয়ে রাজপথে বড় বড় ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে র্যায়লি করেন। পত্রিকার পাতায় মাঝে মাঝে এ বিষয়ে কলাম লিখেন। নারীদরদি হিসেবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংগঠন থেকে বাহবা পান। এদের মধ্যে বড় একটা অংশ কম্যুনিস্ট, যাদের বেশির ভাগ বক্তব্য আর লেখনি নারী অধিকার বিষয়ে হয়ে থাকে। কিছু কিছু নাস্তিকও এই দলে আছে।

‘কথা সত্য মতলব খারাপ’ বলে একটা প্রবাদ আছে। এই সমস্ত নারীবাদীদের কথা মনে হলেই এই প্রবাদটি স্মরণ হয়ে যায়। কারণ তারা নারীর জন্য যে অধিকারের কথা বলে সেটা আসলে তাদের নিজেদের স্বার্থে। নারীর অধিকার বলতে তারা বুঝায় নারীর অবাধ চলাফেরার স্বাধীনতা। যাতে তাদের কল- কারখানা আর মেইল- ফ্যাক্টরি চালানোর জন্য কমদামী নারীশ্রমিকদের সহজেই পাওয়া যায়। নারী অধিকার আন্দোলনের গোড়ার দিকে তাকালে বিষয়টা কিছুটা স্পষ্ট হবে।


এটা পড়ুন ইসলাম ও নারীবাদ বা ফেমিনিজম


ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পরে ব্যাপক হারে কারখানা গড়ে উঠায় শ্রমিক সংকট দেখা দেয়।তখন মালিক পক্ষ সেই ঘাটতি পূরণ করতে নারীশ্রমিক নিয়োগ দেওয়া শুরু করে। কম বেতনে খাটতে রাজি থাকায় এবং মালিকদের নানা রকম জুলুম নির্যাতন অম্লান বদনে সয়ে যাবার ক্ষমতা থাকায় খুব সহজে তারা নিয়োগ পেতে থাকে। এবং কিছুটা অর্থনৈতিক স্বাবালম্বি হওয়ায় পুরুষের নাগপাশ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে শুরু করে। দিন দিন এই জাতীয় নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিভিন্ন কোম্পানি তাদের সমর্থন দিতে থাকে। এবং সেটা পরিপূর্ণ নিজেদের স্বার্থে।

এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হল সেই সময়ে সিগারেট মুখে জিন্স পরা নারীর একটা ছবি পত্রিকার পাতায় আর রাস্তার পাশে বিল বোর্ডে ব্যাপক আকারে প্রচার করা হত। উদ্দেশ্য হল, পুরুষের যেমন সিগারেট খাওয়ার অধিকার আছে তেমনি নারীরও আছে। পরে জানা যায় এসব ব্যায়বহুল বিজ্ঞাপনের খরচ কিছু সিগারেট কোম্পানি বহন করত। কারণ পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে নারীরা অধিকারের নাম করে সিগারেট খাওয়া ধরলে তো তাদেরই লাভ।

চাকরির লোভ দেখিয়ে নারীদের অফিস পর্যন্ত আনা হল। কি চাকরি দেওয়া হল তাদের? কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রিসিপ্সন, পার্সোনাল সেক্রেটারি, বিমানবালা, নার্স ইত্যাদি ক্ষেত্রেই তাদের বিচরণ সীমাবদ্ধ। উচ্চ ও সম্মানি পদে তাদের দেখা খুব কমই পাওয়া যায়। বিল বোর্ড বা কোন কিছুর মোড়কের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কর্পোরেট দুনিয়ায় তাদেরকে কি পরিমানে পন্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে।

আমাদের নারীদের উচিত ছিল তারা পাশ্চাত্য ধোঁকায় না পড়ে প্রথমে ইসলাম তাকে যে অধিকার দিয়েছে সে অধিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল;
১; দেন মোহরের টাকা
২; বাবার রেখে যাওয়া মিরাস বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি।
৩; স্বামী কর্তৃক ভরণ-পোষণের দায়িত্ব।

আমাদের দেশের যেসব পুরুষ নারী অধিকারের নাম করে নারীকে পণ্যে পরিণত করতে ব্যস্ত ভাল করে খোঁজ নিলে দেখা যাবে তারা এখনও নিজের স্ত্রীকে তার মোহরের টাকাটাই ঠিকমত পরিশোধ করে নি। ভবিষ্যতে যে আদায় করবে সে লক্ষণও নেই। মহিলাগুলোও নাদান। অধিকার নিয়ে আন্দোলন যখন করবি তো স্বামীর থেকে নিজের পাওনা বুঝে নেওয়ার মাধ্যমেই শুরু কর। তা না করে এরা অন্যান্য অধিকার নিয়ে ব্যস্ত। স্বামীরাও হাত তালি দিয়ে তাদের উৎসাহ দেয়। তাহলে না আর স্ত্রীর মোহরের টাকা চাওয়ার কথা খেয়াল হবে না।

ইসলাম ভাইকে দুই ভাগ আর বোনকে এক ভাগ দিয়েছে। এটা নিয়ে সমালোচনার শেষ নাই। সমঅধিকারের নামে তাই কোরআনের ফয়সালা উলটিয়ে দিতে কিছু লোক জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভায়েরা যে ঐ এক অংশও ছলে বলে কৌশলে মেরে দিচ্ছে, বোনদের মিরাস থেকে বঞ্চিত করছে সেটা নিয়ে কোন উচ্চ-বাচ্চ নাই। এই মেরে দেওয়াটাকে সহজ করতে নানা রকম গল্পও তারা ফাঁদে। যেমন মিরাস নিতে নাই , এতে নাকি ভাই-বোনের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। আরও কত কি! এই সেদিনও আমার মেঝো বোন আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘বাপের বাড়ি থেকে হক নিয়ে আসলে নাকি আর হয় না?’ আমি বললাম, ‘কী হয় না?’ সে আবারও বললো, ‘হয় না। নষ্ট হয়ে যায়।’ পরে বুঝলাম সে আসলে বাচ্চার কথা বলতে চাচ্ছে। মানে, মেয়েরা বাপের বাড়ির ওয়ারেসি সম্পত্তি নিয়ে আসলে তাদের আর বাচ্চাকাচ্চা হয় না। হলেও নষ্ট হয়ে যায় বা মরে যায় কিংবা কোন না কোন ক্ষতির স্বীকার হয় বাচ্চা। আমি বললাম, ‘এগুলো তো ভাওতাবাজিমার্কা কথাবার্তা। যারা বোনদের ঠগাতে চায় তারাই এসব ফালতু কথাবার্তা সমাজের বুকে ছড়িয়েছে। বোন কী অন্যের জিনিস মেরে খাচ্ছে? সে তো নিজের পাওনাটুকুই শুধু নিচ্ছে। অতিরিক্ত কিছু না।’

স্ত্রী সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্বামীকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু মহিলা তাতে সন্তুষ্ট না। তাই সে নিজের সন্তানকে নার্সিং হোমে বা কাজের বুয়ার কাছে রেখে চলে যায় চাকরিতে। এখানে এসে নারী খেই হারিয়ে ফেলে। তার অধিকারের কথা মনে থাকে না। সে ভাবে না, আরে এটা তো আমার দায়িত্ব না। আমি তো পায়ের উপর পা তুলে শুধু খাব আর ঘুমাব। আমি কেন রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে চাকরি নামক অন্যের ফুট-ফরমাশ খাটতে যাব?

সেদিন সিসিটিভিতে ক্যাপচার হওয়া একটা ভিডিও দেখে আঁতকে উঠেছিলাম। এসজন মা তার বাচ্চাকে বেবি-কেয়ারের এক মহিলাকে দিয়ে বের হয়ে গেলেন। ওই মহিলা বাচ্চাকে লিফটের বদ্ধ রুমে আচ্ছা মতো চড়-থাপ্পড় দিলো। অপরাধ কিছুই না। বাচ্চাটা কেন কান্না থামাচ্ছে না এটা ছিলো তার ক্ষোভ। মায়ের মমতা অন্যের কাছে কি কখনও আশা করা যায়!

রাস্তায় বের হলে যখন দেখি পাবলিক বাসে ঠেলাঠেলি করে মা বোনরা বাসে উঠছে তখন সত্যিই করুনা হয়। ইসলাম তো চাকরি করাকে হারাম করে নি। কেউ করতে চাইলে করবে। তবে সেক্ষেত্রে নারীদের জন্য আলাদা অফিস হবে। আলাদা বাস হবে। তারা যাবে তাদের মত।পুরুষরা যাবে পুরুষদের মত। পুরুষের সাথে বাসে লটকা-লটকি করে অফিসে যাবার কোনই দরকার হবে না তাদের জন্য। কিন্তু আজ পর্যন্ত এমন দাবি নিয়ে কেও আন্দোলনে নামে নি। ভায়েরা কেন বাবার মিরাস মেরে দেয় বা স্বামীরা কেন মোহরের টাকা ঠিক মত দেয় না এটা নিয়ে কোন সেমিনারের আয়োজন করেনি। এরা ইসলাম সমর্থিত এইসব অধিকার না চেয়ে পশ্চিমাদের বাতিয়ে দেয়া অধিকার চাওয়ায় তাদের একূলও যাচ্ছে ওকূলও যাচ্ছে।
—————
লেখক – আবদুল্লাহ আল মাসউদ, বহু গ্রন্থপ্রনেতা ।

Facebook Comments