প্রেমিক-প্রেমিকা : চোখের মণি থেকে চোখের বালি

487

দোস্ত, তোরা প্রেম করিস না ভালোই আছিস। প্রেম করলে বুঝতি, কী যে প্যারা!

প্রেমিক বন্ধুগুলো তাদের ‘অপ্রেমিক’ বন্ধুদেরকে প্রায় সময়ই এই কথাগুলো বলে। কথাগুলো যে তাদেরকে প্রেম না করার জন্য সতর্ক করার জন্য বলে এমন না। বরং নিজের বুকের চাপা নিশ্বাস থেকে কথাগুলো বলে।

আসলেই যদি সতর্ক করার জন্য তারা কথাগুলো বলতো, তাহলে তো প্রথমে নিজেদের বেলায়ই বলতো, That’s end.

যে প্রেমিক-প্রেমিকার রাতপ্রহরের কথোপকথনগুলো ভোর অব্ধি গড়াতো, চ্যাটলিস্টের প্রথম সাড়িতে যার নাম থাকতো, বিশেষ দিনগুলোতে তাকে ছাড়া চিন্তাও করা যেতো না সেই মানুষটা ব্রেকাপের পর ফেসবুকে তার ব্লকলিস্টে চলে যায়, তার নাম্বার চলে যায় ব্লাক লিস্টে।

জান থেকে সে হয়ে যায় জানোয়ার আর কিউটী থেকে সে হয়ে যায় কুত্তী!

একসময়ের প্রেমিক পুরুষ তখন হয়ে যায় পৃথিবীপৃষ্ঠের সবচেয়ে ঘৃণিত পুরুষ, আর সেই সুন্দরীতমা হয়ে যায় নিকৃষ্টতম লোভাতুর।

যে মানুষটা একসময় ‘চোখের মণি’ ছিলো হুট করে সে কেন ‘চোখের বালি’ হয়ে যায় এই বিষয়টা ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) খুব সুন্দর করে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

“When people help one another in sin and transgression, they finish by hating each other.”
মানুষ যখন একে অন্যকে পাপ কাজে সাহায্য করে তখন তাদের সম্পর্কের শেষ হয় একে অন্যকে ঘৃণা করার মাধ্যমে।

রাতবিরাতের প্রেমালাপ আর ডেটিংয়ের সময় চোখ, হাত-পা সবকিছু লিপ্ত হয় নিজ নিজ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যিনায়। এরকম পাপ কাজে সাহায্য করা মানুষটির সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার পর তো আপনাআপনিই ঘৃণা জন্মাবে।

পছন্দের মানুষকে পছন্দ করার পর থেকে মন আনচান করে, নানারকম প্রশ্ন মনে উদয় হয়। আচ্ছা তার কি বয়ফ্রেন্ড আছে? তাকে কি প্রপোজ করেই ফেলবো? সে যদি রিজেক্ট করে?

এইসব প্রশ্নবাণে মন অস্থির হয়ে উঠে। তারপর যখন সে প্রপোজাল এক্সেপ্ট করে ফেলে তখন আরেক ধরণের উদ্বেগ শুরু হয়। তার ফোন ওয়েটিং এ ক্যান? সে কি আমাকে প্রায়োরিটি দিচ্ছেনা? তার বাবা-মা তার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন, সে কি তাহলে তাদের পছন্দমতো বিয়ে করে ফেলবে?

প্রশ্নগুলোর সমাপ্তি এখানেই নয়। তারপর যদি ব্রেকাপ হয়ে যায় তাহলে কষ্ট তো আছেই, এই কষ্টের পরিণতি এক সময় রূপ নেয় নিজের হাত-পা কাটা থেকে শুরু করে আত্মহত্যায়। বর্তমান সময়ের বেশিরভাগ আত্মহত্যার কারণ খুঁজলে দেখা যাবে তার মেক্সিমামই লাভ-কেইস।

প্রিয় মানুষকে পাবার আগে, পাবার পর এবং হারানোর পর দেবদাস হবার যে কষ্ট সেটা একপ্রকার শাস্তি।

ইবনুল কায়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বিষয়টা বেশ গুছিয়ে বলেছেন এভাবে,

“যে ভালোবাসা আল্লাহর জন্য হবে না তাতে তিনটি শাস্তি অবশ্যই থাকবে। যতক্ষণ না সে তা না পাচ্ছে ততক্ষণ সে কষ্ট পাবে। যখন পাবে তখন কষ্টে থাকবে কয়েক ধরনের, তা হারানোর, তা চলে যাবার, নষ্ট হওয়ার কিংবা তার বিরুদ্ধে যাওয়ার ইত্যাদি। তারপর যখন তা হাতছাড়া হবে তার কষ্ট বহু গুণ বেড়ে যাবে। এ হচ্ছে দুনিয়ার বুকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুকে ভালোবাসার তিন শাস্তি।”

এতো গেলো কষ্টের কথা। অনেক সময় এমনও হয়, প্রিয় মানুষকে পেতে গিয়ে কেউ ধর্মচ্যুত-মুরতাদ হয়ে যায়। যে ছেলেটা একসময় নামাজ পড়তো, আল্লাহর যিকির করতো সেও দেখা যায় সবকিছু বাদ দিয়ে প্রিয়তমার গুণগানে লিপ্ত। প্রিয়তমার চুলের ঘ্রাণ নিয়ে কবিতা লিখছে, তার রূপের কাছে চাঁদও যেনো হার মানে এইসব কম্পলিমেন্ট করে তার হাসির ঝিলিক দেখছে।

যে অন্তর একসময় লিপ্ত ছিলো আল্লাহর গুণগানে, সেই অন্তর তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে প্রিয়তমার রূপের প্রশংসায়।

এর পরিণতি সম্পর্কে ইবনুল কায়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
“If a heart becomes attached to anything other than Allah, Allah makes him dependent on what he is attached to. And he will be betrayed by it.”

যখন কোনো হৃদয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, আল্লাহ তাকে সেই জিনিসের মুখাপেক্ষী করে দেন এবং এর দ্বারা সে প্রতারিত হয়।

প্রতারিত হবার এমন দুঃখজনক একটা ঘটনা হাসান আল-বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন।

একজন লোক সবসময় আল্লাহর ইবাদত করতো। আল্লাহর ইবাদতে বাধা হয়ে না ধারায় এজন্য সে দুনিয়াবি ভোগবিলাস থেকে বিমুখ হয়।

একদিন মসজিদে যাবার সময় সে এক সুন্দরী মেয়েকে দেখলো। মেয়েটি ছিলো খ্রিস্টান। মেয়েকে বিয়ের প্রপোজাল দিলে মেয়েটি জানালো, “যদি সে সত্যিই তাকে বিয়ে করতে চায়, তাহলে তাকে খ্রিস্টান হতে হবে।”

লোকটি মেয়ের প্রস্তাবে রাজি না হয়ে মসজিদের দিকে রওয়ানা দিলো। কিন্তু মনের মধ্যে সেই সুন্দরী মেয়েকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সে পরাজিত হলো এবং মেয়ের কথামতো খ্রিস্টান হয়ে তাকে বিয়ে করলো।

কিছুদিন পর সেই খ্রিস্টান মেয়েটি এসে তাকে বললো, “তুমি আল্লাহর প্রিয় একজন বান্দা ছিলে।
তোমার মনের লিপ্সা পূরণের জন্য তুমি সেই ধর্ম ত্যাগ করলে, যে ধর্ম তোমার ইহকাল এবং পরকালের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

তুমি যেমন তোমার ধর্মত্যাগ করেছো, আমিও এখন আমার ধর্মত্যাগ করছি। তবে তোমার মতো নিজের কামনা চরিতার্থ করার জন্য নয়, বরং সেই সুখময় জীবনের জন্য, যার কোনো শেষ নাই।”

এই বলে খ্রিস্টান মেয়েটি সূরা ইখলাস তেলাওয়াত করলো।

খ্রিস্টান মেয়ের মুখে আল্লাহর পরিচয় বিশিষ্ট এই সূরা শুনে লোকটির চোখ যেনো কপালে উঠলো। সে অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি এটা শিখলে কিভাবে?”

এবার মেয়েটি বললো, “আমাকে স্বপ্নে জাহান্নাম দেখানো হয়েছে এবং জাহান্নামে যেখানে থাকবো সেই জায়গাটুকুও। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তখন মালিক (জাহান্নামের পাহারাদার ফেরেশতা) আমাকে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না, আল্লাহ তোমাকে এই জায়গা থেকে বাঁচিয়েছেন এবং জাহান্নামের তোমার এই জায়গাটুকু তোমার স্বামীর জন্য নির্ধারণ করেছেন।’ এই বলে মালিক আমার হাত ধরে আমাকে জান্নাতে আমার ঘরে নিয়ে যান। সেখানে আমি একটা লেখা দেখলাম :

يَمْحُوا اللَّهُ مَا يَشَآءُ وَيُثْبِتُ ۖ وَعِندَهُۥٓ أُمُّ الْكِتٰبِ

আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন মিটিয়ে দেন এবং যা ইচ্ছা করেন স্থির রাখেন, আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল কিতাব।” (সূরা আর রা’দ ১৩:৩৯)

তারপর মেয়েটা ইসলাম গ্রহণ করলো আর ধর্মত্যাগের কারণে লোকটাকে হত্যা করা হলো।
[Glimpse From The Life Of Righteous People, Page 53-55]

যে প্রেম আল্লাহর স্মরণ থেকে মানুষকে ভুলিয়ে দেয়, চারিদিকে শুধু সেই প্রেমের প্রচারণা। অথচ সেই প্রেমে না সুখী প্রেমিক, না সুখী প্রেমিকা। দিনশেষে দুজনই ‘অপরাধী’।

আর সেই অপরাধের পথে আমরা হাত-পা বাড়াচ্ছি…


লেখক – আরিফুল ইসলাম,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।

Facebook Comments