বিশ্বাসের রসায়ন

178

আমি কখনোই রসায়ন পছন্দ করতাম না, কারণ আমি এটাতে ভালো করতে পারতাম না। এমনকি এখনও আমি পুরোপুরি স্বীকার করছি যে, আমার ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা দ্বারা এই হ-য-ব-র-ল বিষয়টির মূল্যায়ণ করা একেবারেই অন্যায়। এখনও প্রতিবার ল্যাব শব্দটি শোনার পর কিংবা কাউকে গগল্‌স (বিশেষ চশমা) পড়া দেখলে আমি প্রচণ্ড চাপ অনুভব করি।

অধিকাংশ মানুষই বিভিন্ন জিনিস মেশাতে পছন্দ করে; এটিএকটি সহজাত প্রবৃত্তি যা শুরু হয় ছোটবেলা থেকেই। হতে পারে এটি বিস্কিট তৈরির বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন উপাদান মেশানো কিংবা বিভিন্ন রঙ মিশিয়ে নতুন রঙ তৈরি করা। আর এই সহজাত প্রবৃত্তিকে আমি খুব কাছ থেকেই দেখছি আমার সন্তানদের মাঝে। একটি ছোট্ট শিশুও বুঝতে পারে যে মিশ্রণটির ফলাফল নির্ভর করে এর উপাদানগুলো কতটা ভালো তার উপর এবং কিছু উপাদান আছে যেগুলো এমনিতেই মিশে না। তারপরেও, এদের মধ্যে সেরা উপাদান তো সম্ভবত সেগুলো যেগুলো পরস্পরের সাথে মিশ্রিত হয়ে তৈরি করে শক্তি।

একদিন যখন তারা বড় হবে, আমি তাদের কাছে এটা ব্যাখ্যা করতে ভালোবাসবো যে, ভৌত জগতের বিভিন্ন উপাদানের এই মিশ্রণ আধ্যাত্মিক জগতের বিভিন্ন উপাদানের মিশ্রণেরই একটি প্রতিরূপ।

আন্তরিকতা (ইখলাস) নামে একটি বিশেষ যৌগ আছে যা অসংখ্য চমৎকার বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটায়।সর্বপ্রথম, এর খুব নিম্নমাত্রার একটি স্ফুটনাঙ্ক আছে; যে কোন ধরনের পতিত আলোকরশ্মি (রিয়া- লোক দেখানো ইবাদাহ্‌) একে খুব সহজেই বাষ্পীভূত করে দেয়। এটা এতটাই বিস্মৃতিপ্রবণ (ইলূসিভ্‌) যে, অসংখ্য বিজ্ঞানী একে বোঝার জন্য নিজেকে সকল প্রকার পারিপার্শ্বিক প্রভাব থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন (আধ্যাত্মিক সাধনা)। তরল অবস্থায় এটি বিভিন্ন ধরনের যৌগ গঠন করতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটি তার আসল রূপ থেকে প্রায় পুরোপুরি অজ্ঞাত হয়ে যায় (মিশ্র বা দুর্বল নিয়্যাহ্‌)।

কঠিন অবস্থায় এটি সর্বাধিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এর এত উচ্চমাত্রার একটি গলনাঙ্ক রয়েছে যে একে তরলে পরিণত করতে অতি উচ্চমাত্রার তাপের প্রয়োজন হয়। কঠিন অবস্থায় আন্তরিকতা (ইখলাস) কোন কিছুর সাথেই মিশ্রিত হতে চায় না এবং স্বাভাবিকভাবেই এটি সকল প্রকার অপবিত্রতাকে নির্মূল করে দেয়। আন্তরিকতার কঠিন অবস্থার অভেদ্য বিশুদ্ধতা এতটাই অনন্য যে, রসায়ন শাস্ত্রে বিজ্ঞানীগণ এর একটি বিশেষ নাম দিয়েছেন; তাওহীদ (এক আল্লাহ্‌-কে বিশ্বাস করা)। বিজ্ঞানীগণ এই নামটি দিয়েছেন এর অপরিবর্তনীয় ও স্বাধীন অবস্থাকে নির্দেশ করার জন্য, আর এটা এমনই যে বস্তু জগতে এমন কোন উপাদান নেই যা একে পরিবর্তন করে দিতে পারে।

অদ্ভুত ব্যাপার হল দুনিয়াতে শুধুমাত্র একটি বস্তু আছে যা কঠিন তাওহীদের সাথে বিক্রিয়া করে। এটি জ্ঞান নামে পরিচিত। জ্ঞান সাধারণত গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। মানুষ এ গ্যাসটি নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করতে পারে (সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে) এবং প্রতিনিয়ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও করে যাচ্ছে। কিন্তু এর প্রতক্রিয়ায় বিভিন্ন বিষয়ের বিকাশ মানুষ থেকে মানুষে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। গ্যাসটি অধিক মাত্রায় গ্রহণ করলে এর প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে ক্রিয়া করে, গবেষণায় দেখা গেছে এর জন্য কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

গ্যাসটির প্রতি নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে প্রতিটি বিষয় একজন মানুষকে চিন্তা করতে, কথা বলতে এমনকি ভিন্নভাবে পোশাক পড়তে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু, এটা উল্লেখ্য যে, জ্ঞানের প্রতি প্রতিক্রিয়া ও পৃথিবীর কিছু নির্দিষ্ট স্থানের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে জ্ঞানের গ্যাস সংরক্ষিত আছে (সভ্যতাগত ঐতিহ্য)। বিজ্ঞানীরা এটা আবিষ্কার করে হতভম্ব হয়ে গিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি দৈনিক ৫ টি করে কঠিন তাওহীদের বড়ি (পিল) গ্রহণ করে, সে জ্ঞানের বিরূপ প্রভাব থেকে প্রায় পুরোপুরি মুক্ত।

অন্যদিকে, তরল অবস্থায় জ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রভাব তৈরি করে। এটি একটি উচ্চমানের উদ্বায়ী রাসায়নিক যা অন্য সকল পদার্থের সাথে যুক্ত হতে চায় (কাল্পনিক, তাত্ত্বিক, অপ্রমাণিত জ্ঞান)। এসব যৌগেরমধ্যে অনেকেই দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস নিঃসরণ করে, কিছু যৌগ অল্প পরিমাণ শক্তি নির্গত করে, আর কিছু যৌগ তৈরি করে অত্যন্ত বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ। যখন সামান্য পরিমাণ কঠিন তাওহীদ তরল জ্ঞানের সাথে মেশানো হয় তখন এটা জমাট বেঁধে যায় এবং অপবিত্রতা নির্গত করে।

আরেকটি মজার মিশ্রণ হল তরল জ্ঞান (কাল্পনিক জ্ঞান) ও তরল আন্তরিকতার (দুর্বল বা মিশ্র নিয়্যাহ্‌) মিশ্রণ। সাধারণ পর্যবেক্ষকের কাছে এর প্রভাবের কোন অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয় না; কিন্তু দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, তরল জ্ঞান আন্তরিকতার স্ফুটনাঙ্ক মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয় (উদাহরণস্বরূপ, অতি নিম্ন তাপমাত্রায়ও আন্তরিকতার বাষ্পীভবন ঘটানোর মাধ্যমে) এবং হিমাঙ্কও বাড়িয়ে দেয় (যেমনঃ আন্তরিকতাকে তার কঠিন অবস্থায় ফিরে যাওয়ায় বাঁধা প্রদানের মাধ্যমে)।

অধিকাংশ বিজ্ঞানী এ ব্যাপারে একমত যে, জ্ঞান তার কার্যকারিতা এবং স্থিতিশীলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যখন এটি কঠিন অবস্থায় থাকে। কঠিন জ্ঞান সাধারণত বিভিন্ন স্থাপনার ভিত্তিপ্রস্থ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়; কারণ, চাপের মধ্যেও এটি স্থিতিশীল থাকতে পারে। চিকিৎসা শাস্ত্রেও এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। কঠিন জ্ঞানকে নিজের ইচ্ছেমত কাজে লাগানো প্রায় অসম্ভব, কারণ, বাস্তব জগতে এটি শুধু একটিমাত্র পদার্থের সাথে বিক্রিয়া করে, কঠিন তাওহীদ! অধিকন্তু, কঠিন তাওহীদ এবং কঠিন জ্ঞানের মিশ্রণই মানব ইতিহাসে বিজ্ঞানীদের দেখা সবচেয়ে সেরা বিস্ময়।

এমনকি তাদেরকে মেশানোর পূর্বে যখন শুধুমাত্র পরস্পরের নিকটে আনা হয় তখনই তারা একটি অদ্ভুত কিন্তু প্রশান্ত গুঞ্জন নিঃসরণ করা শুরু করে (কুর’আন তিলাওয়াতকারীর মতো)। যদি তাদেরকে আরও নিকটে আনা হয় তবে তাদের মধ্য থেকে এক ধরনের আভা এবং একটি সুমিষ্ট গন্ধ নির্গত হয়। বিজ্ঞানীরা যখন কঠিন তাওহীদ ও কঠিন জ্ঞানকে পরস্পরের সাথে মেশার সুযোগ দেন তখন তারা একত্রিত হয়ে একটি একক বস্তু গঠন করে। এই বস্তুটি থেকে যে আলো নির্গত হয় তা এতটাই শক্তিশালী যে, কাজ করার সময় বিজ্ঞানীরা চোখ সুরক্ষাকারী সরঞ্জাম ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এটা ধারণা করা হয় যে, প্রথম দিকের কিছু সম্প্রদায় (সালাফগণ) তাওহীদ-জ্ঞান নামক বস্তুটি ব্যবহার করতেন তাঁদের সম্প্রদায়ের প্রতিটি মানুষকে শক্তি (এবং আলো) সরবরাহের জন্য।

বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তিটির কার্যকারীতার ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। অনেকেই ধারণা করছেন যে, মানুষ পৃথিবীর প্রাকৃতিক শক্তির সঞ্চয় নিঃশেষ করে ফেললেও, তাওহীদ-জ্ঞান নামক বস্তুটি সমগ্র পৃথিবীর টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট শক্তির যোগান দিতে পারবে। বর্তমানে একটি গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে এই শক্তির উৎস উৎপাদনের সম্ভাবনা ও তাকে কীভাবে মানব জাতির কল্যাণে কাজে লাগানো যায় সে ব্যাপারে।

তাওহীদের রাসায়নিক গঠনটি পাওয়া যায় সূরা আল-ইখলাস এ।

এবং জ্ঞানের রাসায়নিক গঠনটি পাওয়া যায় সূরা আল-আসর এ।


মূল লেখকঃ ইমান বাদাওয়ী
উৎসঃ suhaibwebb.com
অনুবাদ সম্পাদকঃ নাজমুস সাকিব

 

Facebook Comments