মানবাধিকার ও হযরত মুহাম্মদ সা. : আবদুল খালেক

812
Prophet-Muhammad মানবাধিকার

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা. হলেন কালজয়ী জীবন ব্যবস্থা ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক। যেহেতু ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান তাই স্বাভাবিক ভাবে মানবাধিকারের বিষয়টি ইসলামের অন্তর্ভূক্ত। জনগুরুত্বপূর্ণ  মানবাধিকারের মত সংবেদনশীল একটি বিষয় সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী, আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য। তিনি কথা ও কাজে সারাটি জীবন মানবাধিকার সংরক্ষণে আপোষহীন সংগ্রাম করে গেছেন। এমনকি নবুওত প্রাপ্তির পূর্বেও মানবাধিকার প্রশ্নে তাঁর সোচ্চার কণ্ঠ আজও নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের প্রেরণার উৎস।

মানবাধিকার সংরক্ষণে হযরত মুহাম্মদ সা. এর ভূমিকা  অবদান আলোচনার পূর্বে মানবাধিকার কাকে বলে সে বিষয়ে সামান্য আলোকপাত সমীচীন মনে করি।

সহজ কথায় মানবাধিকার হল- মানব পরিবারে জন্ম গ্রহণ করার কারণে প্রাপ্ত পরিবারের সকল সদস্যের জন্য সার্বজনীন, সহজাত, অহস্থান্ত যোগ্য এবং অলংঘনীয় কতিপয় অধিকার। যা জাতী, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, নারী পুরুষ নির্বিশেষে বিশ্বের সকল মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এই অধিকারগুলো কোন দেশ বা সময়ের পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ নয়।

যে কোন ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ করার সাথে সাথে এই অধিকারসমূহ দাবী করতে পারে। মানবমণ্ডলী মানবাধিকার ভোগ ব্যতীত নিজেকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। এক কথায় বলা যায় ‘প্রকৃতি প্রদত্ত আইনের আওতায় প্রাপ্য মানুষের অধিকার সমূহই মানবাধিকার”।

সাইয়েদুল মুরসালিন, রাহমাতুল্লিল আলামীন মুহাম্মাদ সা. কথা, কাজ ও অনুমোদনে মানবাধিকার সংরক্ষণে যে অবদান রেখেছেন তা বিশ্বের ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে লেখা রয়েছে। ৬২২ খ্রীষ্টাব্দে হযরত মুহাম্মদ সা. এর নেতৃত্বে প্রণীত বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনা সনদ’ মানবাধিকারের সর্বশ্রেষ্ঠ দলিল। যা আজো বিশ্বের মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। মদিনা সনদের অন্যতম একটি ধারায় বলা হয়েছে-

“মদিনায় বসবাসরত ইহুদী, নাসারা, পৌত্তলিক এবং মুসলমান সকলেই একদেশী এবং সকলেই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে। বর্ণিত সকল ধর্মের লোক স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করবে না। এমনকি মুহাম্মদ সা. এর অনুমতি ব্যতীত কারো সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারবেনা। সকলের নিকট মদিনা নগরী পবিত্র বলে গণ্য হবে। মদিনা নগরী বহি:শত্র“ দ্বারা আক্রান্ত হলে সকলেই সম্মিলিতভাবে শত্র“র আক্রমণ প্রতিরোধ করবে। নিজেদের মধ্যে কোন বিরোধ দেখা দিলে আল্লাহ ও রসুল সা. এর ফায়সালা সকলকে মেনে নিতে হবে।


এটা পড়ুন – রোম সম্রাটের প্রতি রাসুলুল্লাহর(স) দাওয়াত


 তাহলে দেখা যায় মানবাধিকার রক্ষা কবচ মদিনা সনদ দিয়ে মহানবী সা. মদিনায় বসবাসরত বহুমাত্রিক ধর্মাবলম্বী ইহুদী, নাসারা, পৌত্তলিক ও মুসলমানদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মদিনায় আনসার ও মোহাজেরদের সম্মিলিত শক্তি দ্বারা মানুষের রক্ত, ইজ্জত, সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধানে সফল রাষ্ট্র নায়ক মুহাম্মদ সা. মদিনা প্রজাতন্ত্রে সাম্যের ভিত্তিতে সকলকে ন্যায্য অধিকার প্রদান করে মানবাধিকার সংরক্ষণে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নি:সন্দেহে।

হযরত মুহাম্মদ সা. এর সমগ্র জীবনাদর্শে প্রতিফলিত হয়েছে মানবাধিকার সংরক্ষণের বুলন্দ আওয়াজ। বিশাল জনসমূদ্রে প্রদত্ত বিদায় হজ্জের ভাষণে মুহাম্মদ সা. মানবাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি সর্বোচ্চে স্থান দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- “আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহর যেমন তোমাদের নিকট পবিত্র, তেমনি তোমাদের জীবন, ধনসম্পদ তোমাদের নিকট পবিত্র। একজন মুসলমানের রক্ত অপর মুসলমানের জন্য হারাম। অধিকন্তু কোন মুসলমানের সম্পদ আত্মসাৎ করা অবৈধ।”

উপরোক্ত  কথাগুলো পর্যালোচনা করলে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় মহানবী সা. মানবাধিকার লংঘনের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করেছেন এবং ঐ পথসমূহ বন্ধ করার প্রয়াস পেয়েছেন।  তিনি বুঝতে পেরেছেন সার্বজনিন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন ভূ-মন্ডলে বসবাসকারী মানব গোষ্ঠির মধ্যে পরস্পরের একনিষ্ঠ আন্তরিকতা, সহমর্মীতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ। তাই নবী করিম সা. ঘোষণা করেছেন- “সকল মুসলমান পরস্পরের ভাই।” সুতরাং দেখা যায় একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার উপর পরিচালিত এক ভাইয়ের পক্ষেই সম্ভব অপর ভাইয়ের মান সম্মান, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান।

মানুষের মধ্যে শ্রেণী বৈষম্য হল মানবাধিকার লংঘনের অন্যতম কারণ। তাই তিনি ভাইকে ভাইয়ের আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দাস প্রথা বিলুপ্তির সূচনা করেছিলেন। তিনি দাস প্রথার বিরুদ্ধে কতটা কঠোর মনোভাব পোষণ করতেন তা নীচের হাদিস থেকে সহজে বুঝা যায়। তিনি বলেছেন- “যে ব্যক্তি কোন স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার প্রাপ্ত মূল্য ভোগ করে কেয়ামতের দিন আমি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেব।” মহানবী সা. আরেকটি হাদিসে বলেছেন- “যে ব্যক্তি কোন স্বাধীন মানুষকে দাসে পরিণত করে তার নামাজ আল্লাহর নিকট কবুল হবে না।

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের ভারসাম্য শক্তি হল ন্যায় বিচার। ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত উচ্চ মানের। ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত আপনজনের সুপারিশ বা কোন অশুভ শক্তি তাঁকে দুর্বল বা আদর্শচ্যুত করতে পারে নি। হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা রা. বর্ণনা করেন- “মাখযুমী গোত্রের এক মহিলা চোরের হাতকাটা শাস্তি রহিত করার জন্য হযরত উসামা রা. রসুল সা. এর নিকট সুপারিশ করলেন। এর প্রত্যুত্তোরে তিনি বললেন হে উসামা! তুমি আল্লাহর আইন কার্যকরী করার বিষয়ে সুপারিশ করছ? অতপর মহানবী সা. দাঁড়িয়ে বললেন-“তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস হওয়ার কারণ ছিল অভিজাত বংশের লোক চুরি করলে তাকে ছেঁড়ে দিত এবং দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তাকে শাস্তি দিত। আল্লাহর কসম মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করে তবে তার হাত কর্তিত হবে।

ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে এহেন দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সক্ষম হওয়ায় দুনিয়াব্যাপী ইসলাম মানবতার ধর্ম হিসেবে অপ্রতিরোধ্য গতিতে প্রসার ও প্রচার লাভ করেছিল।
সার্বজনিন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় শিক্ষা হল আরেকটি রক্ষাকবচ।
সার্বজনীন শিক্ষা বিস্তারে মহানবী সা. এর অবদান সকল ধর্মের শিক্ষানুরাগীদের নিকট করেছেন- “প্রত্যেক মুসলমান নরনারীর উপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।” সে ক্ষেত্রে তিনি নারী পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য প্রদর্শন করেননি। মানবাধিকারের সার্বজনীন স্বীকৃতি পাওয়া যায় মহানবী সা. এর নিম্নোক্ত বাণীর মধ্যে। তিনি বলেছেন- “তোমরা দুলনা হতে কবর পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন কর।”

১৪০০ বছর পূর্বে বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসুল সা. ঘোষিত মানবাধিকার যুগে যুগে বিভিন্নভাবে লংঘিত হয়েছে। বনী আদম বঞ্চিত হয়েছে তাদের প্রাপ্য মৌলিক অধিকার থেকে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যুগে যুগে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের জন্য সম্পাদিত হয়েছে বিভিন্ন চুক্তি, দলিল, বহুপক্ষীয় সমঝোতা। সর্বশেষ ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত ২৫টি বিষয়ে সার্বজনীন মানবাধিকার (টহরাবৎংধষ উবষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং) ঘোষণা করা হয়।
তবুও দুনিয়াতাবৎ একবিংশ শতাব্দিতে অহরহ মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার চাক্ষুষ পর্য্যবেক্ষক ছয়মত কোটি বনি আদম।

মানবাধিকার পুরোপুরি সংরক্ষণ, ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির জন্য আজ প্রয়োজন হযরত মুহাম্মদ সা. এর আদর্শের অনুসরণ ও অনুকরণ। পরিশেষে ঐতিহাসিক অধ্যাপক হিট্টির ভাষায় বলতে হয় “মুহাম্মদ সা. কে দুনিয়াবাসী একমাত্র নেতা মেনে নেয়, তাহলে তার দ্বারাই সম্ভব সকল সমস্যার সমাধান পূর্বক পৃথিবীতে শান্তি পূর্ণ:স্থাপিত করা।” মহান আল্লাহ আমাদেরকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর আদর্শ অনুসরণ ও অনুকরণের মাধ্যমে তার সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ করে দিন। আমিন।
লেখক : প্রধান শিক্ষক,
আধুনগর উচ্চ বিদ্যালয়,
লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।

Facebook Comments