দেখতে মহানবী সাঃ যেমন ছিলেন ?

700
মুহাম্মদ সাঃ এর গঠন

আদনান ফয়সালঃ যে সৌন্দর্য বর্ণনা করা যায় না মানুষ যখন কোন কিছুকে চরম পর্যায়ের সুন্দর বলে মনে করে, ভাষায় যখন আর সে কোন কিছুকে বর্ণনা করতে পারে না, তখন সে অসম্ভবের আশ্রয় নেয়। আপনি যদি একজন মা কে জিজ্ঞেস করেন – তোমার সন্তান দেখতে কেমন? সে বলবে – আমার ছোট্ট সোনামনিটা চাঁদের মত সুন্দর। আবার আপনি যখন কোন তরুনকে তার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্বের কথা জিজ্ঞেস করবেন, সে হয়ত বলবে – তাঁর ব্যক্তিত্ব সূর্যের মত তেজদীপ্ত। সৌন্দর্য বর্ণনা করতে যেয়ে অসম্ভবের আশ্রয় নেয়া শুধু আমাদের মধ্যে আছে তা নয়, সাহাবীদের মধ্যেও ছিল।

রাসূলুল্লাহ ﷺ  এর ইন্তেকালের পরে সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে নিয়ে বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করত, আর তরুন তাবেঈরা দলে দলে এসে মুগ্ধ হয়ে সেই ঘটনাগুলোকে গিলে খেত। রুবাইয়া বিনতে মুয়াই-উইত (রা) নামক মহিলা সাহাবী যখন অনেক বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিল তখন তার ছেলে একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল  – “আচ্ছা মা, আল্লাহর রাসূল দেখতে কেমন ছিলেন?” জবাবে রুবাইয়া বলেছিল – “বাবা তুমি যদি তাকে দেখতে পেতে, তাহলে মনে করতে এই বুঝি সুর্য উঠেছে! ” (কাবির আত-তাবারানি, মানাকিব আল-বুখারী)

আবার অন্যদিকে কা’ব ইবনে মালিক (রা) রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে বলেছে –“আল্লাহর রাসূল যখন খুশী হতেন তখন তাঁর চেহারা এমন জ্বল-জ্বল করত যেন পূর্ণিমার চাঁদ!”

সবচাইতে শেষের দিকে যেসব কুরাইশ নেতা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে একজন ছিল আমর ইবনে আস (রা)। সে কুরাইশদের অন্যতম নেতা ছিল এবং পরবর্তীতে মুয়াউইয়ার (রা) উজির ছিল। এই আমর ইবনে আস তার বৃদ্ধ বয়সে বলেছিল – “আমার কাছে আল্লাহর রাসূলের চেহারার দিকে তাকানোর চেয়ে মিষ্টি আর কোন কিছুই ছিল না। আমি যতই তাকে দেখতাম আমার মন ভরত না। অথচ তুমি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করতে – উনি দেখতে কেমন ছিলেন? আমি বর্ণনা করত পারতাম না। কারণ, যদিও আমার চরমভাবে ইচ্ছা করত শুধুই তাঁকে দেখি, কিন্তু সম্মানের কারণে তাঁর দিকে আমি চোখ তুলে তাকাতাম না। ”

নবী ইউসুফ(আ) এর সৌন্দর্যের কথা আমরা সবাই জানি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন যে – “নবী ইউসুফ (আ) কে সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল” (মুসলিম ও আহমাদ)। কোন কোন আলেমের মতে এই অর্ধেক হলো সমস্ত মানবজাতির কাছে যে সৌন্দর্য আছে তার অর্ধেক; আর অন্য আলেমদের মতে এখানে বুঝানো হয়েছে – ইউসুফ (আ) এর সৌন্দর্য রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সৌন্দর্যের অর্ধেক ছিল, কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চেয়ে সুন্দর আর কোন মানুষকে সৃষ্টি করা হয়নি।

মহান আল্লাহর সুন্নাহ (অনুসরণকৃত নিয়ম) হলো যে তিনি নবী ও রাসূলদেরকে পাঠিয়েছেন সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ গুনাবলির আধার স্বরুপ – এই গুনাবলিগুলো যেমন বাহ্যিক, তেমনই আত্মিক। এর কারণ হলো – মানুষ যাতে মনের ভেতর থেকেই এই নবী/রাসূলদের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, তাদের অনুসরণ করতে আগ্রহ বোধ করে। প্রত্যেক নবী ও রাসূলই সকল রকম মানবীয় গুনাবলীতে গুণান্বিত ছিলেন, প্রত্যেকেই বাহ্যিক সৌন্দর্যে অলংকৃত ছিলেন। কিন্তু, এই সবার মধ্যেও সবচেয়ে বেশী সুন্দর, সবচেয়ে বেশী মানবীয় গুনের অধিকারি ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ দেখতে কেমন ছিলেন?

আমরা যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শারীরিক গঠন সংক্রান্ত হাদিসগুলোর দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব এই হাদিসগুলোর বেশীরভাগই এসেছে অল্প-বয়সী সাহাবীদের কাছ থেকে। বয়স্ক সাহাবীরা সম্মান ও শ্রদ্ধার কারণে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চেহারার দিকে সরাসরি খুব বেশী তাকাতেন না, অন্যদিকে ‘বাচ্চা’ সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খুব কাছে চলে আসত, তাঁর সাথে খেলত, তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখত। এই যেমন আনাস বিন মালিক (রা) এর কথাই ধরা যাক। আনাস (রা) এর বয়স যখন মাত্র ৭ বছর ছিল তখন তার মা তাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে গিফট করেছিলেন।  বালক আনাস ﷺ সারাদিন রাসূল ﷺ এর সাথে থাকত, তাকে এটা-ওটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করত, আর রাতের বেলা মায়ের কাছে ফিরে যেত।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শারীরিক গঠন সম্পর্কে সুন্দর এক হাদিস পাওয়া যায় আনাস(রা) থেকে। তিনি বলেছেন – “নবী ﷺ এমন লম্বা ছিলেন না যে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে যেতেন, অথবা তিনি এত ছোট ছিলেন না যে তাঁকে চোখে পড়ত না।

তিনি অনেক বেশী ফর্সা ছিলেন না, না তিনি ছিলেন তামাটে বর্ণের। তাঁর চুল না ছিল কোকড়া, না ছিল সরল”। এই হাদিসের ব্যাখায় স্কলারেরা বলেন আল্লাহ্‌র রাসূলের সব কিছুই মাঝামাঝি প্রকৃতির ছিল – তিনি মধ্যম উচ্চতার ছিলেন, তাঁর গায়ের রঙ ছিল উজ্জ্বল বাদামী। লক্ষ্যণীয় যে, সাহাবীরা রাসূলুল্লাহর ﷺ শারীরিক গঠনের বর্ণনায় খুবই সতর্ক ছিলেন।  আর তাই তিনি দেখতে কেমন ছিলেন জিজ্ঞেস করা হলে অনেক সময় তারা – তিনি  ﷺ কেমন ছিলেন তা সরাসরি না বলে তিনি ﷺ কেমন ছিলেন না তা বর্ণনা করতেন।

আনাস (রা) আরো বলেন –  “আমি কখনো এমন কোন ভেলভেট বা সিল্ক স্পর্শ করিনি যা আল্লার রাসূলের ﷺ হাতের চাইতে নরম।  আর আমি কখনো এমন কোন সুগন্ধীর ঘ্রাণ নেইনি যার সুবাস আল্লাহর রাসূলের ﷺ ঘামের চেয়ে মিষ্টি। ” অন্য হাদিস থেকে আমরা জানি রাসূলুল্লাহﷺ এর স্ত্রী উম্মে সালামা ও অন্য সাহাবীরা বোতলে করে তাঁর ﷺ ঘাম জমিয়ে রাখতেন এবং পরে তা সুগন্ধী ও ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করতেন।

আল-বারা ইবনে আযিব (রা) বলেন: “আল্লাহর রাসূল ﷺ ছিলেন মাঝারি গঠনের। তাঁর ﷺ প্রশস্ত কাঁধ ছিল। তাঁর ﷺ চুল ছিল মোটা (অর্থাৎ পাতলা না), তাঁর ﷺ দাড়ি ছিল ঘন। ” অন্য হাদিস থেকে আমরা জানি রাসূলুল্লাহ ﷺ কানের লতি পর্যন্ত তাঁর চুল বড় করতেন। আর উমরা/হজ্ব বা অন্য সময় যখন চুল কাটতেন তখন পুরো চেঁছে ফেলতেন। জীবনের শেষের দিকেও তাঁর খুব বেশী পাকা চুল ছিল না। আনাস(রা) বলেছেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মোট ১৭টি পাকা চুল-দাড়ি ছিল।

আল-বারা ইবনে আযিব (রা) আরো বলেন: “রাসূলুল্লাহকে ﷺ আমি একবার লাল রঙের হুল্লা পরা অবস্থায় দেখেছিলাম (হুল্লা = ওভারকোটের মত এক ধরনের আরবীয় পোশাক)।  এর চেয়ে সুন্দর কোন কিছু আমি আমার জীবনে দেখিনি!”


মহানবীর ﷺ কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য


আলী (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চাচাত ভাই। ছোটবেলা থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ঘরেই তিনি বড় হয়েছেন, আর তাই তাঁকে ﷺ অনেক কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল তার। আলী(রা) বলেন: “নবী ﷺ এর মুখে অনেক বেশী মাংস ছিল না। তাঁর মুখ গোলাকৃতির ছিল না, বরং কিছুটা ওভাল আকৃতির ছিল। তাঁর গায়ের রঙ ছিল লালচে ফর্সা / উজ্জ্বল বাদামী। তাঁর ডাগর চোখ ছিল, চোখের মণি ছিল নিকষ কালো, পাপড়ি ছিল লম্বা। তাঁর হাড়ের গাঁটগুলো উন্নত (স্পষ্ট) ছিল, কাঁধের পেছনটা ছিল প্রশস্ত। তাঁর সারা শরীরে পশম ছিল না, কিন্তু তাঁর বুক থেকে নাভী পর্যন্ত পশমের একটা পাতলা লম্বা রেখা ছিল।

হাঁটার সময় তিনি ﷺ দ্রুত হাঁটতেন, মনে হত যেন তিনি কোন ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নামছেন। কারো দিকে তাকানোর সময় তিনি (আড়চোখে না তাকিয়ে) শরীর সহ মাথা ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাতেন।  তাঁর দুই কাঁধের মাঝে নবুওয়তের ‘খাতম’ ছিল, আর তিনি নিজেও ছিলেন নবুওয়তের খাতম (খাতম = চিহ্ন বা সীল। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুই কাঁধের মাঝখানে ভিন্ন রঙের কিছু চুল ছিল এবং এটা ওভাল আকৃতির ছিল – এটাই ছিল তাঁর ﷺ নবুওয়তের খাতম)।

কারো চোখ যদি অনভিপ্রেতভাবে (unexpectedly) রাসূলুল্লাহর ﷺ উপর পড়ে যেত, সে সমীহ করে থমকে যেত। তাঁর ﷺ সাথে যে সাক্ষাত করত, তাঁকে যে জানত, সে-ই তাঁকে ভালবাসত। তাঁর সম্পর্কে যে-ই কথা বলবে সে-ই বলবে যে, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দেখার আগে বা পরে তাঁর মত আর কাউকে দেখিনি”। (শামায়েলে তিরমিযী)

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চেহারার মধ্যে আল্লাহ্‌ এক ধরনের মায়া, এক ধরনের আকর্ষণ দিয়েছিলেন। জাবির বিন সামুরা (রা) পূর্ণিমার এক রাতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে তার দেখা হয়ে গেল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে। রাসূলুল্লাহ ﷺ সেদিন তাঁর লাল হুল্লাটি পরে ছিলেন (হুল্লা = ওভারকোটের মত এক ধরনের আরবীয় পোশাক)। জাবির (রা) বলেন: “আমি একবার আল্লাহর রাসূলের চেহারার দিকে তাকাচ্ছিলাম আরেকবার পূর্ণিমার চাঁদের দিকে দেখছিলাম। শেষে আমি এই উপসংহারে আসলাম যে, আল্লাহর রাসূল পূর্ণিমার চাঁদের চাইতেও বেশী আকর্ষণীয়, সুন্দর, উজ্জ্বল। ”

বহু মানুষ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শুধু চেহারা দেখেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম ছিল মদীনার ইহুদীদের প্রধান র‍্যাবাই (ইহুদীদের ধর্মযাজক)। রাসূলুল্লাহ ﷺ যেদিন মক্কা থেকে মদীনায় আসলেন তখন আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দেখতে গিয়েছিল – তার মনে রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে কৌতুহল ছিল – কে এই ব্যক্তি যে নিজেকে নবী বলে দাবী করছে? রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দেখামাত্র বিমোহিত হয়ে পড়ল আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা), তাঁর নিজের ভাষায় : “যেই মাত্র আমি তাঁকে ﷺ দেখেছি তখনই আমি বুঝেছি যে এটা কোন মিথ্যুকের মুখমন্ডল নয়। (বুখারী)” রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে মাত্র একবার কথোপকথনের পরেই আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা) ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
===========
লেখক- আদনান ফয়সাল

রেফারেন্স  টীকা:

  • সিরাহ সংক্রান্ত ড. ইয়াসির কাযির লেকচার – পর্ব ২
  • শামায়েলে তিরমিযী – মাহমুদিয়া লাইব্রেরী
  • জাবির বিন সামুরার (রা) হাদিস http://ahadith.co.uk/hadithbynarrator.php?n=Jabir&bid=12&let=J
Facebook Comments