সমকামিতা , যেসব কারণে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না – আলি মোস্তাফা

573

মহান বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন, “খারাপ মানুষদের কারনে সমাজ ধ্বংস হয় না, বরং সমাজ ধ্বংস হয় খারাপ কাজ দেখেও ভালো মানুষদের নীরবতায়।” এই উক্তিটা সমকামিতা-বিতর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সমকামিতা অবশ্যই খারাপ। এর কোনো উপকারিতা নেই, কিন্তু অপকারিতা প্রচুর। এমনকি যারা সমকামিতা সমর্থন করছেন, হয়ত তাদের অনেকেই সমকামের ধারেকাছেও যান নি, যাবেনও না। অথচ মুক্তমনা সাজতে তারা এই অপকর্মকে সমর্থন করছেন। আবার উল্টোটাও রয়েছে, কেউ কেউ মনের পশুত্বকে (সমকামের চাহিদা) এতদিন চাপা দিয়ে রাখলেও এই রায়ে তারা উৎফুল্ল, তাই সমকামিতার সপক্ষে বিতর্ক করেই যাচ্ছে, কিন্তু লজ্জাবশত তারা নিজেকে সমকামী বলে ঘোষণা করছে না! আসলে এরাও জানে, সমকামিতা খারাপ। কিন্তু দুঃখজনক হল, কেউ কেউ আবার মনে মনে ঘৃণা করলেও তাদের মতে, যার যা খুশি করুক, তাতে আমার কি? অথচ এই ধারণা ভুল। এই ধারণাই মানুষকে খারাপ কাজ করতে উৎসাহিত করে। তাই প্রত্যেকেরই উচিৎ খারাপের বিরুদ্ধে লড়াই করা। একটাবার ভাবুন তো, আজ যারা শিশু, তাদের জন্য আমরা কতটা সুস্থ সমাজ রেখে যাচ্ছি? তাদেরকে সুস্থ সমাজ উপহার দিতে আমরা কতটা সচেষ্ট?

কিন্তু বেশিরভাগ লোক চুপ করে থাকলেই তো আর আমি চুপ করে থাকতে পারি না।
“এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”

তাই আমার এই লেখা। লেখাটি পড়ার পর যদি সমকামীরা, সমকামিতার সমর্থকরা তাদের ভুল বুঝতে পেরে সঠিক পথ ও মত অনুসরণ করেন, তাহলেই আমার লেখা সার্থক মনে করবো।

যেসব কারণে সমকামিতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না

1.
কিছু সমকামীর দাবী হচ্ছে সমকামিতা বিষম-যৌনতার মতই প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক বিষয়। অথচ তাঁদের এইদাবী ভিত্তিহীন।

A) এরা দূরবীন দিয়ে খুঁজে খুঁজে কিছু প্রানী আবিষ্কারকরেছে যারা নাকি সমকামী। হয়ত তাদের এই দাবী সঠিক যে, কিছু প্রানী সমকামী।

i) কিন্তু ব্যতিক্রম কখনোই নিয়ম হতে পারে না। বরং ব্যতিক্রম ‘নিয়ম’কেই প্রতিষ্ঠিত করে। সুতরাং সমকামিতা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক নয়।

ii) তাছাড়া কিছু পশুর মধ্যে সমকামিতা থাকলেই তা মানুষের মধ্যেও প্রচলন করতে হবে? মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের মধ্যেও যদি জোর করে পশুত্ব আনা হয়, তাহলে আর মনুষ্যত্ব কোথায় থাকলো? সুতরাং পশুর পশুত্ব কখনো মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে না।

iii) কিছু পশু রয়েছে যারা নিজেদের বিষ্ঠা খায়। এটা তাদের জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই বলে মানুষও নিজেদের বিষ্ঠা খাওয়া শুরু করবে? তবে কেউ যদি খেতে চায়, তাহলে সভ্য সমাজের মানুষদের কিছুই করার নেই। কিন্তু যুক্তির নামে অযুক্তি দিয়ে সেটাকে বৈধ করার চেষ্টা অন্যায় ছাড়া কিছুই নয়।

সুতরাং কিছু প্রাণী সমকাম করে বলে এটা মানুষের মধ্যেও চালু করার মধ্যে মধ্যে কোনো যৌক্তিকতা নেই।

B] পশুদের মধ্যে জোর করে যৌন সঙ্গম খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। গ্রামে যাদের বাড়ি, তারা হয়ত খেয়াল করে দেখেছেন যে মোরগ অনেকসময়েই মুরগীর সাথে জোর করে সঙ্গম করে থাকে। তাহলে কি মানুষের মধ্যেও এটা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক বিষয় হওয়া উচিৎ? কিংবা এইসব প্রানীকে অনুসরণ করা উচিৎ।
বরং জীবগজগতে যত সমকামী পশু রয়েছে, তার চেয়ে অনেকগুণ পশু রয়েছে যারা জোর করে যৌন সঙ্গম করে। এমনকি শুকরের মত কিছু প্রানী আবার সঙ্গীনির সাথে যৌনসঙ্গমের সময় তার আরও বেশকিছু পুরুষ সঙ্গীকে ডেকে আনে, মানবসমাজে যেটা গ্যাংরেপ হিসেবে পরিচিত ও ঘৃণিত।
অর্থাৎ পশুজগতে এসব খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তাহলে তো এই যুক্তিতে বলতে হয় ধর্ষণও স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক নিয়ম। কিন্তু মানুষের জন্য আসলেই কি তাই?

C) সমীক্ষা করলে দেখা যাবে গ্রামের চেয়ে শহরে সমকামিতার হার বেশী। এই তথ্যটাই প্রমাণ করে সমকামিতা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক নয়, বরং তা হতে পারে রাজনৈতিক। হতে পারে সুস্থ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে একটি পুঁজিবাদী চাল। কিংবা হতে পারে মানসিক অসুস্থতা।

D) এদের একটা অংশ এব্যাপারে দাবী করে যে মানুষের মধ্যে জন্মগতভাবেই ‘Gay Gene’ থাকে। যার কারণে একটা সময় এরা সমকামী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সমকামিতা সহজাত ও জন্মগত বৈশিষ্ট্য। অথচ তাঁদের এই দাবীও ভিত্তিহীন। বিশ্বের একাধিক বিজ্ঞানীই দাবী করেছেন এরকম কোনো জিনের অস্তিত্ব নেই। কয়েকবছর আগে আমেরিকার বিখ্যাত জনহপকিন্সের দুই বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিক প্রায় ২০০সায়েন্টিফিক জার্নাল ঘেটে নিউ অ্যাটলান্টিক নামকজার্নালে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যেখানে তাঁরাদেখিয়েছেন, সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের সাথে সহজাত, জন্মগত বা বায়োলজিক্যাল যে সম্পর্ক এতদিন ভাবাহত, তার বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। কিছুবায়োলজিক্যাল ফ্যাক্টর রয়েছে যার সাথে লৈঙ্গিকআচরণগত সম্পর্ক আছে কিন্তু সেটা কোনোমতেইসেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনে ভূমিকা রাখে না। অর্থাৎসমকামিতা কোনোমতেই জীনগত, জন্মগত, প্রাকৃতিকবিষয় নয়।

সাথে উল্লেখ্য, ভারতের কিছু বিজ্ঞানী (এমনকি খড়গপুর আইআইটি-এর এক অধ্যাপকও) দাবী করেছেন গোমূত্রের মধ্যে অনেক গুণ রয়েছে। বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে গোমূত্র পান করা প্রমোট করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবেই কি গোমূত্র পান করা মানুষের পক্ষে ভালো? ভেবে দেখুন তো। আসলে নিজেদের মানবতাবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কখনো কখনো বিজ্ঞানীদেরকে কাজে লাগানো হয়।

2.

সমকামীদের আর একটা অংশ অবশ্য প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক ইত্যাদি যুক্তি দিতে চায় না। বরং তাদের দাবী হল আমাদের ইচ্ছে, তাই আমরা সমকামী, পায়ুকামী। এটাকে তারা স্বাধীনতা মনে করে। অথচ অবাধ স্বাধীনতা কখনোই সমাজ ও দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। সমকামীদের এই যুক্তির সাহায্যে মদ খাওয়া, সিগারেট খাওয়া, জোর করে সঙ্গম ইত্যাদির স্বাধীনতার দাবী তোলা অস্বাভাবিক নয়। যেমন কয়েকবছর আগে কেউ (সে যেই হোক না কেন, সেটা বড় কথা নয়) টুইটারে টুইট করেছিল “Rape is surprise sex.” বাস্তবেই ধর্ষকরা ধর্ষণকে বিনোদন বলেই মনে করে। এমনকি অনেক মেয়েও তাই মনে করে! সুতরাং এই ধর্ষণকে লিগ্যাল করার দাবীটা কি খুব অযৌক্তিক? একইভাবে সিগারেট ও মদের ব্যাপারটাও। দেশের অনেক জায়গাতেই সিগারেট ও মদ নিষিদ্ধ। সেখানেও কি স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে এগুলি চালু করা উচিৎ? আমি মনে করি, না, কখনোই না। মানবিক কারণেই সিগারেট ও মদ নিষিদ্ধ হওয়া উচিৎ। সিগারেট ও মদে যিনি আসক্ত, তার শারীরিক ক্ষতি হয়, পারিবারিক অশান্তি হয়, খুন, ধর্ষণের মত অনেক অপরাধই হয় মদের কারণে। সুতরাং মদ নামক তরলটি কিছু মানুষের প্রিয় হলেও তা নিষিদ্ধ হওয়াই উচিৎ।

অবশ্য সমকামীদের বেশিরভাগই মদ ও সিগারেটে আসক্ত। সুতরাং তারা স্বাধীনতার নামে মদ-সিগারেটও নিষিদ্ধ হওয়ার বিরোধিতা করবেন, তা স্বাভাবিক। কিন্তু যারা সমকামী নন, তারা ভেবে দেখুন তো আসলেই কি স্বাধীনতার নামে এগুলি সমাজে চালু থাকা উচিৎ?

আবার ফ্রান্সে স্বাধীনতার নামে পেডোফিলিয়া বা শিশুদের সাথে যৌনমিলনকেও বৈধ করা হয়েছে। তাহলে কি ভারতেও স্বাধীনতা ও আধুনিকতার নামে শিশুদের সাথে যৌনমিলন বৈধ করা হবে? নাস্তিকদের গুরু রিকার্ড ডকিন্সও ‘হালকা লেভেলের শিশুকামিতা’কে ক্ষতিকর মনে করেন না। তারমানে এটা অন্যায় নয়?

“সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে পায়ুকামিতার চেয়ে ‘ক্রাইম; তথা চুরি, ডাকাতি, খুন খারাবি অধিকতর যৌক্তিকভাবে বৈধতার দাবী রাখে। পায়ুকামিতার সাথে কোনো ধরণের জেনেটিক ব্যাপার নেই, অন্যদিকে ‘ক্রাইম’ এর জন্য দায়ী জিন শনাক্ত করা হয়েছে।

অর্থাৎ বিজ্ঞানের দাবী অনুযায়ী ক্রাইম তথা সহিংসতার জন্য আপনি দায়ী না, বরং আপনার জিন দায়ী। যত ক্রাইমই করেন না কেন, বলে দিবেন এটা আপনি নিজের ইচ্ছায় করেন নি, আপনার জিন আপনাকে দিয়ে করিয়েছে…সুতরাং পায়ুকামিতা বৈধতা পেল, ‘ক্রাইম’ কেন বৈধ হবে না? বিজ্ঞানের আলোকে জবাব চাই।“ন [সাইফুর রহমান, গবেষক, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি]

3.

উপরিউক্ত পয়েন্টগুলি থেকে এটা স্পষ্ট যে সমকামিতা কোনো প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক বিষয় নয়। বরং এটাএকটা মানসিক বিকৃতির পরিণাম। কিন্তু অনেকে আবার এটাকে আধুনিকতা ভাবেন। পত্রপত্রিকায় প্রচার করা হচ্ছে, মধ্যযুগীয় নিয়ম বাতিল করে আধুনিকতার পথে ভারত। অথচ সমকামিতা আদৌ আধুনিক বিষয় নয়, বরং প্রাচীনযুগীয়। ইউরোপে হয়ত এটা হাল আমলে প্রচলন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইজরায়েল/প্যালেস্তাইনে সমকামিতার প্রচলন হয় কয়েক হাজার বছর আগেই, লুত আঃ-এর আমলে। পরবর্তীতে বৈদিক যুগের বিভিন্ন সাহিত্য থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায় যে সেসময় অর্থাৎ আজ থেকে ৩ হাজার বছর আগে ভারতে সমকামিতার প্রচলন ছিল। তারপর মধ্যযুগে এটা বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং সমকামিতা বৈধ করে ভারত আধুনিক যুগে নয়, বরং মধ্যযুগ ছাড়িয়ে প্রাচীনযুগে পৌঁছে গেল!

এখানে উল্লেখ্য, প্রাচীনযুগে ভারতে সমকামিতা থাকার পাশাপাশি ছিল যথেচ্ছ যৌনাচার, অশ্লীলতা। নারীদেরকে দেবদাসী হিসেবে রাখা হত। এক নারী একাধিক পুরুষের সাথে কিংবা এক পুরুষ একাধিক নারীর সাথে, বাবা মেয়ের সাথে জোর করে, গুরুর ছাত্র গুরুর স্ত্রীর সাথে জোর করে যৌনমিলন করতো। সমাজে নারীদের কোনো সম্মান ছিল না। বিশেষ করে যৌনতার ক্ষেত্রে তো নয়ই। আজ আমরা ইউরোপ, আমেরিকাতেও এটাই দেখতে পাই। নারীদেরকে পণ্য ছাড়া আর কিছু ভাবা হয় না। সমকামিতা বৈধ করার ফলে এদেশেও এরকম সমস্যা দেখা দেবে, যা সমাজ ও দেশের পক্ষে খুবই ক্ষতিকারক।

অন্যদিকে এদেশের বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই ইউরোপ-আমেরিকা-জাপানকে আধুনিকতার মাপকাঠি হিসেবে দেখেন। ইউরোপের উন্নত দেশগুলিতে চালু হয়েছে, সুতরাং এখানেও চালু হতে হবে, ভাবখানা এমন। অথচ এটা কোনো যৌক্তিক কারণ হতে পারে না। আগেই বলা হয়েছে, ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলিতে নারীকে ‘পণ্য’ মনে করা হয়। এর হাজার উদাহরণ দেওয়া যায়। এবিষয়ে নাহয় অন্য সময় আলোচনা করা যাবে। শুধু জাপানের মত উন্নত দেশের একটা উদাহরণ দেই। সেদেশের অনেক বড় বড় অনুষ্ঠানে, বড় বড় হোটেলে অতিথিদেরকে খাবার দেওয়া হয় উলঙ্গ নারীর ‘উন্মুক্ত শরীরের উপরে’। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। উন্মুক্ত শরীরের উপর খাবার রাখা হয়, আর সেই নারী থাকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ, সেই নারীর শরীর থেকে খাবার তুলে খান অতিথিরা। এটা কি নারীর অপমান নয়? এখানে কি তাঁকে পণ্য হিসেবে জাহির করা হচ্ছে না? কিন্তু না, জাপানে এটাকে অসম্মানজনক মনে করা হয় না। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে সবক্ষেত্রেই আমেরিকা, ফ্রান্স, জাপানের অনুসরণ আধুনিকতা নয়। অথচ সেই ভুলটাই করে চলেছেন বাংলার কিছু বুদ্ধিজীবী।

4.
আদালতের অনুমোদন কখনোই ‘যুক্তি’ হতে পারে না। “আদালত নিশ্চয় ভালো মনে করেছে, তা নাহলে এটা কেন বৈধ করবে? আপনি কি সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের থেকেও বেশী জ্ঞানী?” এই ধারনা চূড়ান্ত ভুল। কেননা কোনো আদালতই কখনোই ‘চুড়ান্ত সঠিক’ রায় দিতে পারে না। ২০১৩ সালে সুপ্রিমকোর্ট এক রায়ে জানায়, সমকামিতা বৈধ নয়। ২০১৮ সালের রায়ে আবার বৈধ! তাহলে সুপ্রিমকোর্ট ২০১৩ সালে ভুল রায় দিয়েছিল, ২০১৮ তে ঠিক, নতুবা ২০১৩ তে ঠিক রায় দিয়েছিল, ২০১৮ তে। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে আদালতের রায় কখনোই চিরসত্য হতে পারে না এবং সমকামিতার পক্ষে আদালতের রায় কোনো যুক্তি হতে পারে না।

তাছাড়া আদালত প্রায়ই ভুল কিংবা অযৌক্তিক কিংবা জনবিরোধী/জনগণের অকল্যাণকর রায় দিয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, যশোর রোড চওড়া করার উদ্দেশ্যে কলকাতা হাইকোর্ট যশোর রোডের প্রাচীন গাছগুলি কাটার অনুমতি দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। অথচ এই গাছগুলি কাটার অনুমোদন দেওয়া অন্যায় ছাড়া কিছুই নয়।

আবার বাবরী মসজিদ বিষয়ক মামলায় আদালত ওই জমিটিকে বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগ করে দেয়। এই রায় নিয়ে দেশজুড়েই সমালোচনা হয় এবং রায় প্রত্যাখ্যান করে মামলার সাথে যুক্ত প্রায় সব সংগঠনই। এছাড়া কিছুদিন আগে সুপ্রিমকোর্ট রায় দেয়, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী স্ত্রীদের সাথে (বিয়ে করেও) যৌনমিলন করলে তা ধর্ষণ হিসবে ধরা হবে! এই রায়টি নিয়েও সমালোচনা হয়। প্রশ্ন ওঠে, আদালত কি মানুষের বেডরুমে নজর রাখার জন্য লোক নিয়োগ করবে? আরও প্রশ্ন ওঠে বিয়ে না করেই যেখানে ১৫/১৬ বছর বয়সী মেয়েদের সাথে শারীরির মিলন করা যাচ্ছে, সেখানে বিয়ে করে মিলনে বাধা কেন? উল্লেখ্য, ভারতে কিছু জাতিকে ১৫ বছর বয়সী মেয়েদেরকে বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

সুতরাং, আদালতের রায় চরম সত্য নয়, কখনও কখনও তা বিতর্কিত হতে পারে, কখনও কখনও তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।

5.
সমকামিতা যে মানসিক অসুস্থতা, তা এদের জীবনযাপন পদ্ধতি দেখলেই বোঝা যায়। এদের এশিরভাগই নানারকম ড্রাগে আশক্ত। এদের মধ্যে হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা প্রবল। প্রকৃতপক্ষে এরা রোগী ছাড়া কিছুই নয়। আর অন্যান্য রোগে মত এই রোগেও এরা নিজেরা কষ্ট পায়। সুতরাং এদেরকে সুস্থ করার দায়িত্ব নেওয়া উচিৎ। কাউন্সেলিং করিয়ে এদেরকে সুস্থ করা যায়।

6.
মধ্যযুগে এক প্রজাহিতৈষী শাসক জনগনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, একটা জাতীকে ধ্বংস করে দেওয়ার উপায় হল অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়া। আর এই নিয়মটাই মেনে চলেছে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী পশ্চিমা দেশগুলি। উদাহরণস্বরূপ লিবিয়ার প্রসঙ্গ আনা যেতে পারে। লিবিয়ায় গদ্দাফির পতনের পর বেশ কিছু গোষ্ঠী আমেরিকা ও ফ্রান্সের সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। এসময় পশ্চিমা সেনারা পরীক্ষামূলকভাবে তাদের মধ্যে কিছু সিনেমা ও গান (অশ্লীল তো বটেই) ছড়িয়ে দেয়। দেখা যায় এরফলে বিদ্রোহীদের অনেকেই সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই বাদ দিয়ে সেইসব সিনেমা ও গান নিয়েই মেতে থাকে। বিদ্রোহ নির্মূল করতে পরবর্তীতে আরও ব্যাপকভাবে বিদ্রোহীদের মধ্যে সিনেমা ও গান ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ভারতীয় সংবাদমধ্যমের দাবী অনুযায়ী সেগুলি বলিউডের সিনেমা ও গান ছিল। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলি তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কখনো কখনো অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয়।

সমকামিতার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই। আর সমকামিতা বাড়লেই সমাজে অশ্লীলতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের কথাই ধরুন। আজ থেকে দশ বছর আগেও সেদেশে সমকামিতা নিয়ে কোনো আলোচনা হত না। তারপর মূলত DW Bangla ও বাংলা ট্রিবিউন নামের মিডিয়াদুটি সমকামিতার প্রচার শুরু করে। এখন সেদেশে আরও কয়েকটি মিডিয়াও সমকামিতা প্রমোট করে। উল্লেখ্য উপরিউক্ত মিডিয়া দুটি জার্মানি থেকে পরিচালিত হয় ও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য বাংলাদেশে জার্মান সংস্কৃতির প্রবেশ ঘটানো। এমনকি বাংলাদেশে যেসব তথাকথিত মুক্তমনারা নাস্তিকতা ও সমকামিতার পক্ষে কথা বলেন, তারাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জার্মানি থেকে সহায়তা পেয়ে থাকেন। এভাবে চলতে থাকলে ১০ বছর পর বাংলাদেশে সমকামিতার প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে৷ সুতরাং সমকামিতা স্বাভাবিক নয়, বরং পরিকল্পিতভাবেই এর প্রসার ঘটানো হচ্ছে। ভারতের ক্ষেত্রে এটা শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকে এবং ৩৭৭ ধারা তুলে দিয়ে এই পরিকল্পনা পরিপুর্ণতা পেল।

কিন্তু দেশ ও সমাজকে সুস্থ রাখতে সমকামিতা নিষিদ্ধ করার দাবী তুলতে হবে।

7.

উপরে যৌক্তিকভাবেই দেখানো হয়েছে যে সমকামিতা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক নয়। বরং এটি একটি মানসিক অসুস্থতা। এখন, সমকামিতার বৈধতা, সমাজ ও দেশের জন্য কি কি ক্ষতি করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

A) সমকামিতার ফলে এইডস সহ অন্যান্য যৌন রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। সমকামীরা কনডম ব্যবহার করুন আর নাই করুন, সতর্কতা অবলম্বন করুন কিংবা নাই করুন, একই থালায় খান কিংবা একই টুথব্রাশে দাঁত মাজুন (তসলিমা নাসরিনের ‘ফরাসী প্রেমিক’-এর সমকামী দানিয়েল-এর মত), যাই করুন না কেন, যৌন রোগের সম্ভবনা অত্যন্ত বেশী। তাছাড়া এরা পায়ুকামী বলে এদের গনোরিয়া ও অন্যান্য রোগ হয়ে থাকে। [এবিষয়ে গুগল সার্চ করে নামীদামি ওয়েবসাইটগুলিতে প্রচুর আর্টিকেল পাবেন। সমকামিতা কুফল নিয়ে Jakaria Masud ও Miraj Gazi এর টাইমলাইনে তাঁদের লেখা পড়তে পারে। কমেন্টবক্সে লিঙ্ক দিলাম।] এরফলে সরকারের স্বাস্থ্যবিভাগকে যৌন রোগের প্রতি বেশী গুরুত্ব দিতে হয়। এছাড়া বেশিরভাগ সমকামী আসলে উভকামী। এরা সমকামী হিসেবে পরিচত হলেও কখনো কখনো বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সাথেও যৌনমিলন করে। এরফলে এইসব রোগের বিস্তার আরও বেশী সংখ্যক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সমাজটাকেই রোগাক্রান্ত করে তুলবে।

B] মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য শুধু যৌনতা নয়, সুস্থভাবে, পরিবারের মধ্যে, সমাজবদ্ধ হয়ে বেঁচে থাকা। কিন্তু সমকামীদের অন্যতম উদ্দেশ্যই হল যৌনতা। এমনকি এজন্য তারা পরিবার, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনকেও ত্যাগ করতেও পিছপা হয় না। এমনকি এমনটা দেখা যায় ইউরোপের ক্ষেত্রেও। যে স্বাধীনতা এত আপনজনদেরকে দূরে থাকতে বাধ্য করে, কি প্রয়োজন সেই স্বাধীনতাকে প্রমোট করার?

C) ভারতে সমকামীরা আগেও ছিল। কিন্তু এই আইন তৈরি হওয়ার ফলে সমকামিতার প্রচার হল। এরফলে আরও বেশী মানুষ সমকামিতায় ঝুঁকবে যা সমাজ ও দেশের জন্য কোনোমতেই ভালো নয়। প্রকৃতপক্ষে এই দাবীকে খারিজ করে দিলে মামলাকারীদের কিছুই ক্ষতি হত না। কারণ তারা যতক্ষণ না প্রকাশ্যে পায়ুকাম বা এরকম কিছু করছে, ততোক্ষণ পর্যন্ত আইনের কোনো ক্ষমতা ছিল না তাঁদেরকে কিছু করার। সোজা কথায় সমকাম বৈধ না হলেও তাদের কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু এটি বৈধ হওয়ায় এখন অন্যদের, স্বাভাবিক সমাজের অনেক অসুবিধা হবে।

D) যৌন হয়রানির সংখ্যা বাড়বে। আইনও আরও জটিল হয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দেশে বিচারব্যবস্থায় ৯২ মাসেও একবছর হয় না। সুতরাং বিচারব্যবস্থা ও আইনি ব্যবস্থায় এর ব্যাপক কুপ্রভাব পড়বে। পুরুষ যৌন হয়রানি বাড়ার সাথে সাথে মিথ্যে অভিযোগে ফাঁসানোও বাড়বে।

E) সমকাম যেহেতু লিগ্যাল। তাই সমকামীরা এখন সমলিঙ্গের যে কাউকে প্রকাশ্যে প্রেমের, বিয়ের বা সমকামের প্রস্তাব দিতে পারবে। যা অনেকের কাছেই লজ্জাজনক হতে পারে।

F) দুজন পুরুষ বা দুজন মহিলা একসাথে থাকলেই তাদের মধ্যে সমকাম করার ইচ্ছে জাগতে পারে। এভাবে ক্রমেই এই মানসিক অসুস্থতা বাড়বে। আবার দুজন পুরুষ বা দুজন মহিলা (বিশেষ করে কলেজ স্টুডেন্টদের ক্ষেত্রে) একই ফ্ল্যাট বা ভাড়া বাড়িতে থাকলেই লোকে সন্দেহ করতে পারে, যা তাদের মানসিক চাপের কারণ হতে পারে।

G) একটি অন্যতম বিষয়। স্কুল হোস্টেলগুলির ক্ষেত্রে এই নিয়মের কি হবে? মিডিয়ার মাধ্যমে স্কুল ছাত্র-ছাত্রীরাও জানে যে দুজন ছেলে্র মধ্যে বা দুজন মেয়ের মধ্যে যৌনতা অপরাধ নয়। স্বাভাবিকভাবেই হোস্টেলে অভিভাবকরা না থাকায় এসবের প্রতি তারা ইন্টারেস্টেড হবে। ক্রমে তারা সুস্থ জীবন থেকে অসুস্থতার দিকে এগিয়ে যাবে। যতই বলা হোক, যার যা খুশি করতেই পারে, অন্যদের তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, বাস্তবে ছোটরাই এই অযৌক্তি ও মনুষত্ব বিরোধী আইনের শিকার হবে। এমনকি জোর করে পায়ুকাম করার ঘটনাও বাড়বে। এর বিচার কিভাবে হবে? আসলে আমরা ছোটদের জন্য একটা অসুস্থ পৃথিবী রেখে যাচ্ছি, যা চরম অন্যায়।

[কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ যাদের লেখা থেকে তথ্য, তত্ত্ব, যুক্তি নিয়েছি বা যাদের লেখা চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে। তারা হলেন, Saifur Rahman (Researcher, Cambridge University), আরিফ আজাদ (লেখক, প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ), Jakaria Masud (Writer), Ahmed Ali (Writer)
এছাড়াও সামান্য হলেও যাদের থেকে উপকৃত হয়েছি, Shamsul Arefin Shakti (Writer), Ahmed Hassan Barbhuiya, Imran Nazir Kousar Alom Byapari Mira Gazi প্রমুখ]


আলি মোস্তাফা
কোচবিহার
০৯/০৯/২০১৮

Facebook Comments