আল-কুরআন ও নাস্তিকতা

632
আল-কুরআন ও নাস্তিকতা
(أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ ٱلۡقُرۡءَانَ أَمۡ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقۡفَالُهَآ (٢٤
তারা কি কোরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ? [সূরা মুহাম্মাদ, ২৪]
আল-কুরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামীন সকল ধরনের মানুষের বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু অনেক বান্দা মনে করেন যে নাস্তিকদের নিয়ে কুরআনে কিছু বলা নেই। আদতে এমন ধারণা সহিহ নয়। নাস্তিকতা হল কুফর, নাস্তিকেরা হল কাফির। আর আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনে কাফিরদের স্বরূপ তুলে ধরে বহু আয়াত নাযিল করেছেন। একারণে অবিশ্বাসী নাস্তিকদের অনেক বৈশিষ্ট্যই কুরআনে বর্ণিত কাফিরদের বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে হুবহু মিলে যায়। ওদের জন্য আলাদা করে আয়াত নাযিল আল্লাহ কোনোই প্রয়োজন মনে করেন নাই।
আজকের লিখাটি এমন কিছু বান্দাদের নিয়ে যারা ঈমানদার হয়েও নিজেদের ঈমানকে, নিজেদের আখিরাতকে আগুনের ওপর দোদুল্যমান করে রেখেছে। কারণ কাফির নাস্তিকদের ব্যাপারেও আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন যেসব আয়াত নাযিল করেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ­ যেসব দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন তাও মুমিন বা বিশ্বাসীদের জন্যই। কিন্তু আজ ঈমানদার হয়েও নিজেদের ঈমানকে দোদুল্যমান করে রাখা অভাগাদের সংখ্যা অগণিত। অনেক মুসলিমরাও, এমনকি পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায়কারী, হালাল-হারাম দেখে শুনে চলা ঈমানদাররাও প্রবৃত্তির এক রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তাই তাদের জন্য কিছু নাসীহার সাথে সাথে কুরআনের সেই আয়াতগুলো উল্লেখ করব, যা আজকের যুগের কাফির নাস্তিকদের সাথে মিলে যায় এবং একইসাথে সাবধান করে দেয় মুমিনদের।
মুমিনরা আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং তাঁর দেওয়া বিধিনিষেধ মেনে চলে। স্বাভাবিকভাবেই তার দিন কাটতে থাকে। এর মধ্যে হঠাৎ কেউ নিজেকে নাস্তিক দাবি করলে কৌতুহলী সেই মুমিন ঘাঁটিয়ে দেখতে চায়। কিন্তু তখন তার শয়তানের ধোঁকার কথা খেয়াল থাকে না। খেয়াল থাকে না যে, বারসিসার কাহিনীর প্রথম ও মূল শিক্ষাটা আসলে নারীর ফিতান নিয়ে ছিল না, ছিল শয়তানের ধীরে পদক্ষেপে অত্যন্ত কৌশলে পদস্খলন করানোর ব্যাপারটা উপলব্ধি করা। তাই সে যে শয়তানের ফাঁদের দিকে প্রথম পদক্ষেপ দিয়ে ফেলেছে তা সে বোঝে না।
অল্প কয়েকজন ওইসব নাস্তিকদের তোলা প্রশ্নের কিছু জবাব খুঁজে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়। হয়তো কিছুক্ষণের জন্য তার ঈমান কিছুটা বাড়ে। এরপর ধীরে ধীরে সে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একটা সময় চলে আসে যখন নাস্তিকদের কথাবার্তা আর প্রশ্নের দেওয়া জবাবে সে আসক্ত হয়ে পড়ে। মনের অজান্তে অবস্থা এমন হয়ে যায় যে, নাস্তিকদের কথাবার্তার বিজ্ঞানভিত্তিক আর যুক্তিভিত্তিক উত্তরই তার ঈমান বাড়ার একমাত্র অবলম্বন হয়ে যায়। অনেকে তো তা আবার সজ্ঞানে দাবিও করে।

লেখকের এ লেখাটি পড়তে পারেন  প্রবৃত্তি


কিন্তু তারা আসলে বোঝে না তারা রাসূলের শিক্ষার, সাহাবাদের আর সলফে সলেহীনদের হাঁটা পথের উল্টো পথেই হাঁটছে। ঈমান আনার পর যখন দায়িত্ব ছিল আমল বাড়িয়ে ঈমানকে তরতাজা করা, সেখানে নাফসের তাড়নায় এই মানুষগুলো নিজেদের ঈমানকে বরবাদ হওয়ার দিকে ঠেলে রাখে, নিজেকে জাহান্নামের উপর দোদুল্যমান করে রাখে। হয়তো ফেসবুকের কোনো গ্রুপে বা কোনো নাস্তিকের লিখা ফলো করে তারা প্রতিনিয়িত মানব শয়তান হয়ে উঠা নাস্তিকদের সংস্পর্শে থাকে…।
এরপর একদিন এমন কোনো এক প্রশ্ন বা বিষয়াদি যখন চলে আসে, যার উত্তর সে আর খুঁজে পায় না, তখন তার বিশ্বাসে একটু ফাটল ধরে। প্রথমে খুবই সূক্ষ হয় এই ফাটল, এর প্রভাব খুব বেশি হয় না, কিন্তু এরপর আরও কয়েকদিন পর হয়তো আরেকটা প্রশ্ন বা বিষয়… এভাবে শেষমেশ কতজন ঈমানহারাই হয়ে যায়!
ঈমানকে হারিয়ে যখন সে আল্লাহর দাসত্ব ছেড়ে দিয়ে নাফসের দাসত্ব শুরু করে, তখন শয়তান তার সেইসব কাজগুলোকে মোহনীয় করে তোলে… এভাবে সে দিন দিন আরও দূরে সরে যেতে থাকে। অথচ একেবারে শুরুতেই ওইসব নাস্তিকদের সংস্পর্শে না থাকলে হয়তো কোনোদিনই তার মনে এমন প্রশ্নের উদ্ভবই হতো না।
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ ٱلۡقُرۡءَانَ أَمۡ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقۡفَالُهَآ (٢٤) إِنَّ ٱلَّذِينَ ٱرۡتَدُّواْ عَلَىٰٓ أَدۡبَـٰرِهِم مِّنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ ٱلۡهُدَى‌ۙ ٱلشَّيۡطَـٰنُ سَوَّلَ لَهُمۡ وَأَمۡلَىٰ لَهُمۡ (٢٥)
“তারা কি কোরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ? নিশ্চয়ই যারা সরলপথ ব্যক্ত হওয়ার পর তা থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, শয়তান তাদের জন্যে তাদের কাজকে সুন্দর করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়।” [সূরা মুহাম্মাদ, ২৪-২৫]
তাই মুমিনদের জন্য নাসীহা –
প্রথমত, আমরা আল্লাহ সুবহানাহুর ওপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করেছি তাঁকে না দেখেই। কোনও প্রমাণ ছাড়াই। আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন কুরআনের শুরুতেই সূরা বাকারাহের ২য় ও ৩য় আয়াতে বলেছেন তাঁর কিতাব তাদেরই পথপ্রদর্শক ‘যারা অদেখা বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে’, এর তাৎপর্য হল এই যে, কিছু মানুষ কখনোই বিশ্বাস করবে না। এমনকি তাদেরকে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করে দেখালেও তারা বলবে যে সেটা যাদু ছিল… হেন ছিল, তেন ছিল – কিন্তু বিশ্বাস স্থাপন করবে না। শেষমেশ বিশ্বাস ওই ‘না দেখা বিষয়েই’ গিয়ে পড়বে।
ذَٲلِكَ ٱلۡڪِتَـٰبُ لَا رَيۡبَ‌ۛ فِيهِ‌ۛ هُدً۬ى لِّلۡمُتَّقِينَ (٢) ٱلَّذِينَ يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡغَيۡبِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَمِمَّا رَزَقۡنَـٰهُمۡ يُنفِقُونَ (٣)
এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য,যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। [সূরা বাকারাহ, ২-৩]
তাই আল-কুরআন আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন পুরো মানবজাতির জন্য নাযিল করলেও তা সাধারণভাবে গায়েবে বিশ্বাস স্থাপনকারীদের পথ প্রদর্শন করে থাকে। এমনটাই তো স্বাভাবিক যে, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না বা করতেও চায় না তারা কুরআন থেকে দিকনির্দেশনা নিবে না। তবে সত্যিকারের সত্যান্বেষী আর ইখলাসপূর্ণ মানুষদের অনেককে আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন সরাসরি কুরআন দিয়েও হিদায়াত করেন, সেগুলো ব্যতিক্রম আর আশ্চর্যজনক ঘটনা বলে বিবেচিত হলেও আলাহ রব্বুল আলামীন তা কুরআনে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর কালামের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল তা মানুষ যেদিকে ধাবিত হতে চায়, তা সেদিকেই ঘুরিয়ে দেয়। তাই একই কুরআন পড়ে কেউ হিদায়াতের দিকে ধাবিত হয়, তো কেউ ধাবিত হয় গোমরাহির দিকে।
ڪَثِيرً۬ا وَيَهۡدِى بِهِۦ كَثِيرً۬ا‌ۚ وَمَا يُضِلُّ بِهِۦۤ إِلَّا ٱلۡفَـٰسِقِينَ (٢٦)
এ দ্বারা আল্লাহ তা’আলা অনেককে বিপথগামী করেন, আবার অনেককে সঠিক পথও প্রদর্শন করেন। তিনি অনুরূপ উপমা দ্বারা অসৎ ব্যক্তিবর্গ ভিন্ন কাকেও বিপথগামী করেন না। [সূরা বাকারাহ, ২৬]
দ্বিতীয়ত, আমাদেরকে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জানানো হয় নাই। কারণ আমাদের সেগুলোর প্রয়োজন নাই। ‘আল্লাহ কেন মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলেন, কীই বা হতো কিছু না সৃষ্টি করলে? এমনই একটি প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ ফেরেশতাদেরই বলেছিলেন ‘আমি যা জানি, তোমরা তা জান না’। সুতরাং আমরা জানি না তো কী হয়েছে, আল্লাহ সুবহানাহু হলেন ‘আল-আলীম’ অর্থাৎ সর্বজ্ঞ, The All Knowing, তাঁর জ্ঞানের উপর কোনো জ্ঞান বা প্রশ্ন নেই। আর নাস্তিকদের প্রশ্ন তো কিছুই না।
তৃতীয়ত, সেদিন নাস্তিকদের সাথে অবিচারও করা হবে না। এ অবস্থায় মারা গেলে সেদিন তারা কী বলে কান্নাকাটি করবে? তারা বলবে যে তারা নিজেরাই নিজেদের সাথে জুলুম করেছে। আর আল্লাহর কাছে পুনরায় সুযোগ চাইবে; কিন্তু কেউ সেদিন একথা বলবে না যে ‘আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর পাই নি’ বা ‘আমার উপর জুলুম করা হয়েছে’।
না না, আসলে তাও না। আল্লাহ হচ্ছেন আমাদের রব! তিনি তো বাধ্য নন তাঁরই এক নগন্য সৃষ্টির প্রশ্নের উত্তর দিতে! আল্লাহকে অবিশ্বাস করে কোনো বড় কিছু হয়ে যায় নি কেউ যে আল্লাহ তাকে উত্তর দিতে বাধ্য। বরং আমরা তাঁর বান্দা! আমরাই না আল্লাহর কাছে বাধ্য! আল্লাহু আকবার! তাই নাস্তিকদেরকে কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই জাহান্নামে ফেলে দেওয়াও হতে পারে। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায়বিচারক। স্বয়ং আল্লাহ নিজেই এমন ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, যা নাস্তিকদের সাথে মিলে যায় বলে শুরুতেই উল্লেখ করেছিলাম –
وَلَوۡ تَرَىٰٓ إِذۡ وُقِفُواْ عَلَى ٱلنَّارِ فَقَالُواْ يَـٰلَيۡتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِـَٔايَـٰتِ رَبِّنَا وَنَكُونَ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ (٢٧)
“আর আপনি যদি দেখেন, যখন তাদেরকে দোযখের উপর দাঁড় করানো হবে! তারা বলবেঃ কতই না ভাল হত, যদি আমরা পুনঃ প্রেরিত হতাম; তা হলে আমরা স্বীয় পালনকর্তার নিদর্শনসমূহে মিথ্যারোপ করতাম না এবং আমরা বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম।” [সূরা আনআম, ২৭]
بَلۡ بَدَا لَهُم مَّا كَانُواْ يُخۡفُونَ مِن قَبۡلُ‌ۖ وَلَوۡ رُدُّواْ لَعَادُواْ لِمَا نُہُواْ عَنۡهُ وَإِنَّہُمۡ لَكَـٰذِبُونَ (٢٨)
“এবং তারা ইতি পূর্বে যা গোপন করত, তা তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। যদি তারা পুনঃ প্রেরিত হয়, তবুও তাই করবে, যা তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী।” [সূরা আনআম, ২৮]
وَقَالُوٓاْ إِنۡ هِىَ إِلَّا حَيَاتُنَا ٱلدُّنۡيَا وَمَا نَحۡنُ بِمَبۡعُوثِينَ (٢٩)
“তারা বলেঃ আমাদের এ পার্থিব জীবনই জীবন। আমাদেরকে পুনরায় জীবিত হতে হবে না।” [সূরা আনআম, ২৯]
وَلَوۡ تَرَىٰٓ إِذۡ وُقِفُواْ عَلَىٰ رَبِّہِمۡ‌ۚ قَالَ أَلَيۡسَ هَـٰذَا بِٱلۡحَقِّ‌ۚ قَالُواْ بَلَىٰ وَرَبِّنَا‌ۚ قَالَ فَذُوقُواْ ٱلۡعَذَابَ بِمَا كُنتُمۡ تَكۡفُرُونَ (٣٠)
“আর যদি আপনি দেখেন; যখন তাদেরকে প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে। তিনি বলবেনঃ এটা কি বাস্তব সত্য নয়? তারা বলবেঃ হ্যাঁ, আমাদের প্রতিপালকের কসম! তিনি বলবেনঃ অতএব, স্বীয় কুফরের কারণে শাস্তি আস্বাদন কর।” [সূরা আনআম, ৩০]
قَدۡ خَسِرَ ٱلَّذِينَ كَذَّبُواْ بِلِقَآءِ ٱللَّهِ‌ۖ حَتَّىٰٓ إِذَا جَآءَتۡہُمُ ٱلسَّاعَةُ بَغۡتَةً۬ قَالُواْ يَـٰحَسۡرَتَنَا عَلَىٰ مَا فَرَّطۡنَا فِيہَا وَهُمۡ يَحۡمِلُونَ أَوۡزَارَهُمۡ عَلَىٰ ظُهُورِهِمۡ‌ۚ أَلَا سَآءَ مَا يَزِرُونَ (٣١)
“নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎকে মিথ্যা মনে করেছে। এমনকি, যখন কিয়ামত তাদের কাছে অকস্মাৎ এসে যাবে, তারা বলবেঃ হায় আফসোস, এর ব্যাপারে আমরা কতই না ক্রটি করেছি। তার স্বীয় বোঝা স্বীয় পৃষ্ঠে বহন করবে। শুনে রাখ, তারা যে বোঝা বহন করবে, তা নিকৃষ্টতর বোঝা।” [সূরা আনআম, ৩১]
আল্লাহর আয়াত আল্লাহর ওয়াদাস্বরূপ। আর নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য।
চতুর্থত, আমরা জানি যে আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন তাঁর জান্নাতি বান্দাদের সাথে সরাসরি দেখা করবেন ও কথা বলবেন। আর এটাই হল জান্নাতিদের সবচেয়ে বড় পাওয়া – তাঁদের রবের সাথে সাক্ষাত, যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাঁকে বান্দারা না দেখেই, কোনো অকাট্য প্রমাণ ব্যতিরেকেই, প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেয়েই বিশ্বাস করেছিল। অথবা হয়ত সে সৃষ্টির মধ্যেই যথেষ্ট প্রমাণ মেনে নিয়েছিল বা প্রশ্নগুলোর জানা উত্তরেই সন্তুষ্ট ছিল – কারণ সে মূলত বিশ্বাস করতে চেয়েছিল।
যদি সত্যিই এমন কোনো প্রশ্ন থাকে যেগুলোর উত্তর তুমি সত্যিই জানতে চাও তাহলে তুমি জান্নাতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহুতা’লাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেই পার! সুতরাং তোমারও ওই একটাই পথঃ সিরতল মুস্তাকিম! এর জন্য নিজের ঈমানকে নিয়েই টানাহেঁচড়া তো চূড়ান্ত বোকাদের কাজ।
পঞ্চমত, হিদায়াত কেবল আল্লাহরই হাতে আর নাস্তিকদের উত্তর দেওয়া সবার কাজ না। রাসূলুল্লাহকে ﷺ তাকদির নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে এগুলো নিয়ে কথা বলতে নিষেধ করেছিলেন। আর বলেছিলেন পূর্ববর্তীরা এগুলো নিয়ে মেতে থাকতো বলেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কথাগুলো রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন সাহাবাদের! আর সেখানে তুমি আমি কত বড় পণ্ডিত হয়েছি যে আমরা এসব নিয়ে অযথা মেতে থাকি। যুগে যুগে নাস্তিক নামক কাফিরদের উত্তর দিতে গিয়েই যত্তসব বিভ্রান্ত আকিদাহের সূত্রপাত হয়েছিল।
এছাড়া ওদের বোঝাতে গিয়ে অনেক যুগে যুগে অনেকেও সজ্ঞানে-অজ্ঞানে আকিদাহের আবশ্যক আল-ওয়ালা ওয়াল বারা’ নষ্ট করে ফেলেছে, কুরআনের আয়াতের বিজ্ঞানভিত্তিক তাউয়িল করে ফেলেছে। আবার অনেকেই পরিবর্তনশীল বিজ্ঞানকেই আল্লাহর দ্বীনের সত্যতা যাচাইয়ের মানদন্ড বানিয়ে বিজ্ঞানকে আল্লাহর দ্বীনের উপরে স্থান দিয়ে ফেলেছে। দ্বীন ইসলামের আহ্বান করতে গিয়ে দ্বীন ইসলামেরই বিকৃতি কখনোই কাম্য নয়। ভাল নিয়্যাত রেখেও ক্ষণে ক্ষণে নাস্তিকদের সংস্পর্শে থাকলে একটি দু’টি প্রশ্ন থেকে সংশয়, আর সেই সংশয়ের উত্তর দিতে গিয়ে এমন আকিদাহ বিচ্যুত হওয়া মুহুর্তের ব্যাপার মাত্র। তাই যাদের ঈমান আনা সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন নেই, এমন প্রশ্ন যা তাকে সত্যিই অস্থির করে দিচ্ছে – এমন অবস্থা না হলে কেবল প্রবৃত্তির তাড়নায় নাস্তিকতা নিয়ে পড়ে থাকা চরম নিন্দনীয়।
গোঁড়া নাস্তিকদেরকে প্রয়োজনের অধিক প্রাধান্য দিলে, ওদের সমস্ত কথার উত্তর দিতে গেলে আকিদাহ বিচ্যুতির সাক্ষ্য ইতিহাসই দেয়। ওদের বেশিরভাগ তো বিশ্বাস করবে না বলেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। অতএব, লেখক এবং চিন্তাশীলদের জন্যও কাফিরদের পিছনে প্রয়োজনের অধিক সময় ব্যয় করা কখনোই কাম্য নয়, এমনকি ওদের বিমুখতা আমাদের জন্য কষ্টকর হলেও।
وَإِن كَانَ كَبُرَ عَلَيۡكَ إِعۡرَاضُہُمۡ فَإِنِ ٱسۡتَطَعۡتَ أَن تَبۡتَغِىَ نَفَقً۬ا فِى ٱلۡأَرۡضِ أَوۡ سُلَّمً۬ا فِى ٱلسَّمَآءِ فَتَأۡتِيَہُم بِـَٔايَةٍ۬‌ۚ وَلَوۡ شَآءَ ٱللَّهُ لَجَمَعَهُمۡ عَلَى ٱلۡهُدَىٰ‌ۚ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡجَـٰهِلِينَ (٣٥)
“আর যদি তাদের বিমুখতা আপনার পক্ষে কষ্টকর হয়, তবে আপনি যদি ভূতলে কোন সুড়ঙ্গ অথবা আকাশে কোন সিড়ি অনুসন্ধান করতে সমর্থ হন, অতঃপর তাদের কাছে কোন একটি মু’জিযা আনতে পারেন, তবে নিয়ে আসুন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে সবাইকে সরল পথে সমবেত করতে পারতেন। অতএব, আপনি নির্বোধদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।” [সূরা আনআম, ৩৫]
আল্লাহু আকবার! এমন কথা আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন বলছেন তাঁর রাসূলকে ﷺ­!
ওহে আব্দুল্লাহ! ওহে আমাতুল্লাহ! তুমি আকিদাহ বিচ্যুত হলে বা ঈমানহারাই হয়ে গেলে তোমার সেই দ্বীনহীনতায় মহান রব্বুল আ’লামীনের কিছুই আসে যায় না। কিন্তু তোমার অনন্তকালের যে চরম ক্ষতি হয়ে যাবে তা কিন্তু রক্তকান্না কেঁদেও ফল হবে না। তাই তুমি নিজের ঈমান-আকিদাহের হিফাজত করো। তুমি আগুন নিয়ে খেলো না।
========================
লেখক তানভীর আহমেদ
Facebook Comments