মহররম ও আশুরা : করণীয় ও শিক্ষা – মুফতী পিয়ার মাহমুদ

426

আরবী মাসসমূহের প্রথম মাসটি হলো মহররম। নানা কারণে এ মাসটি মুসলিম উম্মাহর কাছে খুবই গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। কুরআন-হাদীসের ভাষায় এ মাসটি আল্লাহর মাস এবং চার সম্মানিত মাসের অন্যতম। বিশেষ করে এ মাসের ১০ তারিখটির অর্থাৎ আশুরার রয়েছে ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও গুরুত্ব। এ দিনে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো, এ দিনে অসীম কুদরতের মালিক আল্লাহ তাআলা মুসা আ. ও তাঁর সঙ্গীদেরকে সাগরের মধ্যে রাস্তা করে পার করে দিয়েছিলেন। আর একই সাগরের একই রাস্তায় ফেরআউন ও তার অনুসারীদেরকে সলিল সমাধি করেছেন।

ইবনে আব্বাস রা. ইরশাদ করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আগমনের পর দেখলেন, মদীনাবাসী আশুরার দিন রোযা রাখেন। এ প্রসঙ্গে তারা বললেন, এ দিনটি একটি মহান দিন। এ দিনেই আল্লাহ তাআলা মুসা আ. ও তাঁর সঙ্গীদেরকে সাগরের মধ্যে রাস্তা করে পার করে দিয়েছেন। আর একই সাগরের একই রাস্তায় ফেরআউন ও তার অনুসারীদেরকে সলিল সমাধি করেছেন। এ অনুগ্রহের শুকরিয়া হিসাবে মুসা আ. এ দিনে রোযা রেখেছিলেন। (তাই আমরাও এ দিনে রোযা রাখি) এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাদের চেয়ে মুসা আ.-এর বেশি ঘনিষ্ঠ আমি। এ কথা বলে আশুরার দিন তিনি নিজেও রোযা রাখলেন এবং সাহাবাগণকেও রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন। [বুখারী  :  ১/৪৮১]

এ দিনের আরেকটি হৃদয়বিদারক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো, কারবালা প্রান্তরে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দৌহিত্র হযরত হুসাইন রা. এর মর্মমান্তিক শাহাদাত। এ জন্যও এ দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এ ছাড়াও মহররম মাস ও আশুরায় রোযা রাখার রয়েছে বিশেষ ফযীলত ও গুরুত্ব।

এ মাসে রোযা রাখার ফযীলত বর্ণনা করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘রমযানের পর আল্লাহর মাস মহররমের রোযা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ।’ [মুসলিম : ২/৩৬৮, হাদীস ১১৬৩; তিরমিযী : ১/১৫৭, হাদীস ৭৪০]

তিরমিযী শরীফের এক বর্ণনায় আছে, হযরত আলী রা.-কে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাস করলেন, রমযানের পর এমন কোন মাস আছে কি যাতে আপনি আমাকে রোযা রাখার নির্দেশ দেন ? আলী রা. বলেলন, জনৈক সাহাবী এই প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছেও করেছিলেন। তখন আমি তাঁর খিদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, রমযান ছাড়াও তুমি যদি রোযা রাখতে চাও, তাহলে মহররম মাসে রোযা রাখ। কারণ এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তাআলা একটি জাতির তওবা কবূল করেছিলেন এবং ভবিষ্যতেও  অন্যান্য জাতির তওবা কবূল করবেন। [তিরমিযী : ১/১৫৭]

এর মধ্যে আবার আশুরার রোযার গুরুত্ব ও ফযীলত আরো বেশি। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রমযান ও আশুরার রোযা যেমন গুরুত্বের সাথে রাখতে দেখেছি, অন্য সময়ের কোন রোযাকে এত গুরুতে¦র সাথে রাখতে দেখিনি।’ [বুখারী : ১/২১৮,হাদীস : ২০০৬]

অন্য বর্ণনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, আশুরার রোযার ফলে তিনি অতীতের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন।’ [তিরমিযী : ১/১৫৮,হাদীস  ৭৫২; মুসলিম : ১/৩৬৭]

ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রেখে ইহুদিদের সাদৃশ্য বর্জন কর।’ [মুসনাদে আহমাদ : ১/২৪১, হাদীস ২১৫৪; সহীহ ইবনে খুযাইমা : হাদীস ২০৯৫; শুআবুল ঈমান : হাদীস ৩৫১১]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেন, ‘যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে অবশ্যই ৯ তারিখেও রোযা রাখব।’ [মুসলিম : ১/৩৫৯]

বলা বহুল্য যে, নবী দৌহিত্র হযরত হুসাইন রা.-এর কারবালা প্রান্তরে আশুরার দিন মর্মমান্তিক শাহাদাত ছিল উম্মাহর জীবনের অনেক বড় কষ্ট ও অসহনীয় ব্যাপার। এ কথাও নির্মম সত্য যে, তাঁর সাহচর্যধন্য সাহবাগনের বিশাল এক জামাত জীবিত থাকতে তাঁর অনুসারীদের কর্তৃক শহীদ হওয়া ছিল আরো যাতনা ও কষ্টের। এই যাতনা ও কষ্টকে পুঁজি করে হযরত হুসাইন রা. ও আহলে বাইতের প্রতি অতি দরদ ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে এক শ্রেণীর বিপথগামী মানুষ ফযীলতে পরিপুষ্ট বর্ণিত আমলগুলোকে বর্জন করে আবিষ্কার করেছে ।

আশুরাকেন্দ্রিক নানা কুসংস্কার ও রসম-রেওয়াজ। যেগুলো কুরআন-হাদীসের আলোকে চরম নিন্দিত কাজ ও মারাত্মক অপরাধ বলে পরিগণিত। নিম্নে তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করছি।
এ সকল কুসংস্কারের অন্যতম হলো তাজিয়া। তাজিয়া মানে মহররমের শোক মিছিল বা র‌্যালিতে বাহিত হুসাইন রা. এর কাল্পনিক কবর। এ তাজিয়া কেন্দ্রিক ঈমান-আমল বিনষ্টকারী বহু পাপাচার হয়ে থাকে। একে কেন্দ্র করে কিছু শিরকী আকীদা ও আমলও প্রকাশ পায়। কোন কোন মূর্খ ও আপরিণামদর্শীর বিশ্বাস হলো, হযরত হুসাইন রা. নিজে হাজির হয়ে এ তাজিয়ায় সমাসীন হয়ে থাকেন। (নাউযুবিল্লাহ) এ আকীদা ও বিশ্বাসের বশবর্তী হয়েই তারা তাজিয়ার পাদদেশে বিভিন্ন রকমের নযর-নিয়ায পেশ করে থাকে। তাজিয়ার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ায়। এর দিকে পিঠ ফেরায় না। একে দেখতে যাওয়াকে যিয়ারত বলে আখ্যায়িত করে। এ সকল বিশ্বাস ও কর্ম মূলত শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এই যে তাজিয়ার পাদদেশে নযর-নিয়ায পেশ করে। হাত জোড় করে দাঁড়ায়। তার দিকে পিঠ ফিরায় না। এগুলো তো এ বিশ্বাসেই করে থাকে যে, এই তাজিয়ায় হযরত হুসাইন রা. উপস্থিত। আর এ কথা কে না জানে যে, উপস্থিত হওয়ার জন্য পৃথিবীর যত স্থানে তাজিয়া বানানো হয়েছে সকল স্থানেই তাকে হাযির হতে হবে। এ বিশ্বাসের মূলকথা হলো, হযরত হুসাইন রা. সর্বত্র উপস্থিত হতে পারেন। হাযির তথা ‘সর্বত্র উপস্থিত এমন’ হওয়ার জন্য আলিমুল গায়েব হওয়া অপরিহার্য। কেননা, সর্বত্র উপস্থিত হওয়ার জন্য সে সম্পর্কে তার ইলম থাকতে হবে। অন্যথায় সময়মত সেখানে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব। সে হিসাবে তাদের আকীদা মতে হুসাইন রা. আলিমুল গায়েবও।

অথচ কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট ভাষ্য ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা মতে, হাযির ও আলিমুল গায়েব এই গুণ দুটি কেবল মাত্র আল্লাহর। মানুষ বা অন্য কোন সৃষ্টি সে যত উর্ধ্বেরই হোক না কেন, এই গুণগুলোর অধিকারী সে হতে পারে না। এ সম্পর্কে কুরাআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে রাসূল! আপনি বলুন, গায়েবের ইলম একমাত্র আল্লাহর জন্যই।’ [সূরা ইউনুস] অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী! আপনি বলুন, অদৃশ্যের সংবাদ আল্লাহ ছাড়া আকাশ-জমীনের আর কেউ জানে না।’ [সূরা নমল : আয়াত ৬৫]

আর শিরকের ব্যাপারে পরম দয়ালু আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তাআলা তাঁর সাথে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্য সকল অন্যায়-অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।’ [সূরা নিসা : ৪৮]
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করবে, অল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম।’ [সূরা মায়িদা : আয়াত ৭২]

এভাবে তাজিয়ার সামনে নযর-নিয়ায পেশ করাও হারাম, নাজায়িয ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কারণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে নযর-নিয়ায পেশ করা বাতিল, হারাম শিরকী কর্মের অন্তর্ভুক্ত। [রদ্দুল মুহতার : ২/৪৩৯; মাহমুদিয়া : ২/৪৩৪৯]

আশুরায় পালিত আরেকটি কুসংস্কার হলো, হযরত হুসাইন রা. এর শাহাদাতের শোকে মাতম করা আর শোকগাথা পাঠ করা। এক শ্রেণীর মানুষ এটি পালন করে অসীম গুরুত্ব ও বিপুল আগ্রহ নিয়ে। শরীয়তের দৃষ্টিতে কারো শোকে বা অন্য কোন কারণে এ জাতীয় কাজ-কর্ম হারাম ও নিষিদ্ধ। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আউফের রা. বর্ণনায় এসেছে, (তিনি ছিলেন বাইআতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহবীদের একজন) তাঁর একজন মেয়ে ইন্তিকাল করলেন। তিনি একটি খচ্চরে আরোহণ করে জানাযার পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় মহিলারা মাতম ও শোকগাথার মত করে কান্নাকাটি করছিলেন। তখন তিনি বললেন, ‘তোমরা মাতম ও শোকগাথার মত করে কেঁদো না। কেননা রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতম ও শোকগাথা পাঠ করতে নিষেধ করেছেন।’ [মুসনাদে আহমাদ : হাদীস ১৯১৪০; ইবনে মাজা : হাদীস ১৫৯২]

শোকপালনও আশুরা উদযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ। আশুরা উপলক্ষ্যে এ শ্রেণীর লোকেরা সাজ-সজ্জা থেকে বিরত থেকে এ দিন শোক পালন করে থাকে। শরীয়তে এর কোন ভিত্তি নেই। কুরআন-সুন্নাহের বিধান মতে, স্বামী মারা গেলে চার মাস দশ দিন আর গর্ভবতী হলে গর্ভপাত পর্যন্ত স্ত্রী শোক পালন করবে। অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুতে সর্বোচ্চ তিন দিন শোকপালনের অনুমতি রয়েছ। শরীয়তের বিধান এতটুকুই। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মাঝে যারা মৃত্যুবরণ করবে আর রেখে যাবে নিজেদের স্ত্রীদেরকে, তখন সে স্ত্রীদের কর্তব্য হলো তারা চার মাস দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে (অর্থাৎ সাজ-সজ্জা, আনন্দ-ফুর্তি, বিয়ে-শাদী ইত্যাদি বর্জন করে শোক পালন করবে)। [সুরা বাকারা : আয়াত ২৩৪]

উম্মুল মুমিনীন উম্মে হাবীবা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,‘এমন নারী যে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে তার জন্য স্বামী ছাড়া অন্য কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোকপালন করা হালাল নয়। কেবল স্বামীর মৃত্যুতেই সে চার মাস দশ দিন পর্যন্ত শোক পালন করবে।’ [বুখারী :  হাদীস ১২৮১, ১২৮২, ১২৮৩, ১২৮৪; মুআত্তা মালেক : ২২১৫, ২২১৬, ২২১৯; মুসনাদে আহমাদ : হাদীস ২৭৩৯৮; ইবনে মাজা, হাদীস : ২০৮৫, ২০৮৬]

বর্ণিত আয়াত ও হাদীসের আলোকে এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীর উপর স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে চার মাস দশ দিন শোক পালন করা ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক। না করা বা কম করার কোন সুযোগ নেই। আর অন্যের মৃত্যুতে মৃত্যুর পর থেকে সর্বোচ্চ তিন দিন শোক পালনের অনুমতি রয়েছ। তিন দিনের পর বা এর বেশি করার কোন সুযোগ নেই। সুতরাং এখন যারা প্রায় দেড় হাজার বছর পর হযরত হুসাইন রা. এর জন্য ১০ মহররম শোক পালন করেন, তাদের উদ্দেশ্য কি তা বোধগম্য নয়। নেপথ্যের কুশীলবরা দীনের প্রতি অতি দরদ দেখিয়ে দীন ধ্বংসের চক্রান্তে লিপ্ত কি না, তা খতিয়ে দেখার যথেষ্ট প্রয়োজন অনুভব হয়।

আশুরার দিন হযরত হুসাইন রা. এর জন্য শোক পালনের উদ্দেশ্যে অনেকেই বিশেষ রঙের পোশাকও পরিধান করে থাকে। এটিও নাজায়িয ও নিষিদ্ধ। ইবনে মাজার এক বর্ণনায় আছে- ‘একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক জানাযায় গিয়ে দেখলেন যে, লোকজন শোক পালনের উদ্দেশ্যে এক বিশেষ ধরনের পোশাক পরিহিত অবস্থায় আছে। এ অবস্থা দেখে তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, তোমরা কি জাহেলী যুগের কাজ শুরু করেছ, নাকি জাহেলী প্রথার অনুসরণ করেছ ? আমার ইচ্ছা হচ্ছিল, তোমাদের জন্য এমন বদ দুআ করি, যেন তোমাদের চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। এ কথার সাথে সাথে সবাই নিজ নিজ শোকের পোশাক খুলে ফেলে দিয়ে তওবা করে নিলেন।’ [ইবনে মাজা]

শোক মিছিল ও শোক র‌্যালি বের করাও আশুরা দিবসের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এক শ্রেণীর মানুষ এ দিনে শোক পালনের উদ্দেশ্যে বিশেষ রঙের পোশাক পরিধান করে ঢাল-তলোয়ার, খঞ্জর, ঢোল-তবলা ইত্যাদি নিয়ে শোকমিছিল ও শোকর‌্যালি বের করে। সেই শোক মিছিল বা র‌্যালিতে হায় হুসাইন! হায় হুসাইন! এর রব উঠে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজের গায়ে নিজে আঘাত করে নিজেকে রক্তাক্ত করে। মুখ চাপড়ায়, গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে। অথচ এর প্রত্যেকটি কাজই ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর বাচনিক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তারা আমাদের দলভুক্ত নয়, যারা শোক ও বিপদাপদে মুখে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে বা জাহেলী যুগের কথাবার্তা বলে।’ [বুখারী : হাদীস ১২৯৭,  ১২৯৮; মুসলিম : হাদীস ১০৩; তিরমিযী : হাদীস ৯৯৯]

অন্য বর্ণনায় আছে-ইয়াযীদ ইবনে আউস র. বলেন, আমি আবু মুসা আশআরী রা. খিদমতে উপস্থিত হলাম। তখন তিনি কঠিন কোন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ফলে তাঁর স্ত্রী কাঁদতে উদ্যত হলেন। এটা দেখে আবু মুসা আশআরী রা. তাকে বললেন, তুমি কি শুননি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন ? স্ত্রী বললেন, হ্যাঁ, শুনেছি। এ কথা বললে তিনি চুপ হয়ে গেলেন।

ইয়াযীদ ইবনে আউস রহ. বলেন, এরপর আবু মুসা আশআরী রা. ইন্তিকাল করলে আমি তাঁর স্ত্রীর খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে বললাম, আপনি কাঁদতে গেলে ‘তুমি কি শুননি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন ? এ কথা বলে আবু মুসা আশআরী রা. আপনাকে কি বলেছেন যে আপনি না কেঁদে একেবারে চুপ হয়ে গেলেন। স্ত্রী বললেন, সে কথাটি হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,‘তারা আমাদের দলভুক্ত নয়, যারা শোক ও বিপদাপদে চুল ছেঁড়ে, আহাজারী করে আর চিল্লিয়ে চিল্লেয়ে কান্নাকাটি করে এবং কাপড় ছেঁড়ে ।’ [আবু দাউদ, হাদীস : ৩১৩০; বুখারী, হাদীস : ১২৯৬; মুসলিম, হাদীস : ১০৪]

যে দীনের জন্য হুসাইন রা. প্রাণ দিয়ে গেলেন, সেই দীনের প্রাণপুরুষ, স্বয়ং হুসাইন রা.-এর নানা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মুখনিসৃত এত কঠোর ও সতর্কমূলক বাণী সত্ত্বেও কি মতলবে, কিশের নেশায় এই নিষিদ্ধ কাজগুলো তারা মহা আয়োজনে করেন, তা কোটি টাকার প্রশ্ন। অথচ শোক-দুঃখ ও বিপদাপদে দয়াল নবীর শিক্ষা হচ্ছে, (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পুত্র ইবরাহীমের মৃত্যুর সময় বলেছিলেন আর তখন তাঁর দু-চোখ দিয়ে কান্নার অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল) ‘নিশ্চয় চোখ অশ্রুসজল হয়, হৃদয় ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না, যা আমাদের রবের কাছে পছন্দনীয় নয়। হে ইবরাহীম! তোমার শোকে আমরা কাতর ও ব্যাকুল।’
[বুখারী, হাদীস : ১৩০৩; মুসলিম, হাদীস : ২৩১৫;আবু দাউদ, হাদীস : ২৩১৫; আহমাদ, হাদীস : ১৩০১৪; ইবনে মাজা, হাদীস : ১৫৮৯]

অনেকেই আবার (বিশেষ করে মহিলারা) আশুরার দিন হুসাইন রা. এর শোকে আহাজারী করেন, বিলাপ করে কান্নাকাটি করেন। এটিও নাজায়িয ও নিষিদ্ধ। সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী রা বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহাজারী-বিলাপকারী এবং তা শ্রবণকারীর উপর অভিশাপ করেছেন।’ [আবু দাউদ,হাদীস : ৩১২৮; মুসলিম,হাদীস : ৯৩৪; আহমাদ, হাদীস :   ১১৬২২; ইবনে মাজা, হাদীস : ১৫৮২]

আশুরায় অন্য সকল আয়োজনের সাথে গান-বাজনার আয়োজনও কারা হয়। এ দিন বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢোল-তবলা ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে হুসাইন রা. ও আহলে বাইতের নামে বিভিন্ন রকমের শোক প্রকাশক গান-বাজনা করা হয়। অথচ ইসালামে গান-বাজনা হারাম ও ভয়াবহ অপরাধ। কোন নবীর যুগেই তা জায়িয ছিল না। এ উম্মতের জন্যও কোনক্রমেই জায়িয নয়। কুরআন-সুন্নাহয় গান-বাজনাকারীর ও শ্রবণকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির হুসিয়ারী এসেছে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এক শ্রেণীর লোক এমন রয়েছে, যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশে ‘লাহওয়াল হাদীস’ তথা অবান্তর কথাবার্তা ক্রয় করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে করে ঠাট্টা-বিদ্রপ। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ [সূরা লুকমান : ৬]

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, জাবের রা., ইমাম বুখারী, বায়হাকী, ইবনে জারীর প্রমুখ আয়াতে উল্লেখিত ‘লাহওয়াল হাদীস’ এর তাফসীর করেছেন গান-বাজনা করা। অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও তাফসীরবিদগণ এর তাফসীর করতে গিয়ে বলেছেন, ‘গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্র, অনর্থক গল্প, উপন্যাস ও কিস্যা-কাহিনীসহ যে সকল বিষয় মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়, সে সবই ‘লাহওয়াল হাদীস’ এর অন্তর্ভুক্ত।’ [মাআরিফুল কুরআন : ৭/৪] মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম বলেন, ‘আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। তাদের সামনে গায়িকারা গান করবে বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে। আল্লাহ তাআলা এদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিবেন আর কতকের আকৃতি বিকৃত করে বানর ও শূকরে পরিণত করে দিবেন।’
[তাবরানী-কাবীর : ৩৪১৯; শুআবুল ঈমান,বায়হাকী হাদীস : ৪৭৫৯; ইবনে মাজা : ২/ ৪০২০; ইবনে হিব্বান, হাদীস :  ৬৭৫৮]

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ইবনে আব্বাসের রা. বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা মদ, জুয়া-তবলা ও সারেঙ্গী হারাম করেছেন।’ [আবু দাউদ,হাদীস : ৩৬৮৫]

এছাড়াও বহু প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য হাদীস রয়েছে যাতে গান-বাদ্য হারাম ও নাজায়িয বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে রয়েছে বিশেষ সতর্কবাণী ও কঠিন শাস্তির ঘোষণা। তাই এ ব্যাপারে সকলের সতর্ক থাকা উচিত। অনেক স্থানে এ দিনে নিজ বাচ্চাদেরকে ভিক্ষুক সাজিয়ে ভিক্ষা করানো হয়। তাদের বিশ্বাস হলো, এ কাজ করালে বাচ্চা দীর্ঘায়ু হয়। এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত আকীদা ও ভিত্তিহীন বিশ্বাস। ইসলামে এ সকল আকীদা-বিশ্বাসের কোন স্থান নেই। আশুরায় উদযাপিত কুসংস্কারগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হলো খিচুড়িভোজ। হযরত হুসাইন রা. এর জন্য ঈসালে সাওয়াব করার উদ্দেশ্যে এ দিন পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে টাকা-পয়সা, চাল-ডাল ইত্যাদি উঠিয়ে খিচুড়িভোজের আয়োজন করা হয়। এই খিচুড়ি বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও ফকীর-মিসকীনদের মাঝে বিলানো হয়। এভাবে এই আয়োজন করা নিষিদ্ধ। কারণ এতে আহলে বাইতের চরম মানহানী হয়। কারণ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন দুজাহানের বাদশা আর তাঁর বংশের লোকজন হলেন বাদশার পরিবার। বিশেষ করে নবী দৌহিত্র হাসান-হুসাইন রা. হলেন জান্নাতের যুবকদের সরদারও। সুতরাং বাদশার পরিবারের জন্য বিশেষত হুসাইন রা. এর জন্য এভাবে চাঁদা তোলে ঈসালে সওয়াব করা অবশ্যই চরম মানহানিকর। এ ছাড়াও যিনি জান্নাতের যুবকদের সরদার হবেন তিনি কি এভাবে মেগে চাঁদা উঠিয়ে ঈসালে সওয়াব করার মুহতাজ হবেন? মোটেই নয়। এদের বিবেক-বুদ্ধি দেখে সত্যিই বড় করুণা জাগে। দ্বিতীয়ত এটা করাকে জরুরী মনে করা হয় আর কোন মুস্তাহাব বা মুবাহ কাজকে জরুরী মনে করলে তা যে নিষিদ্ধ কাজে পরিণত হয় তা তো সকলেরই জানা। তৃতীয়ত এটা মূলত মৃত্যুবাষির্কী পালন। আর মৃত্যুবাষির্কী পালন যে ইসলামে নিষিদ্ধ তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
[রদ্দুল মুহতার :  ৩/১৩৮-১৩৯। আরও দেখুন, বাযযাযিয়া আলা হামিশিল হিন্দিয়া :  ৪/৮১]

এ সকল কারণে এই খিচুড়িভোজের আয়োজন নাজায়িয ও নিষিদ্ধ হবে। তবে কেউ যদি স্বউদ্যেগে বর্ণিত নিষিদ্ধ পন্থা এড়িয়ে সহীহ পন্থায় হুসাইন রা. এর জন্য ঈসালে সাওয়াব করেন, তাহলে তা জায়িয হবে এবং নিঃসন্দেহে ঈসালে সাওয়াবকারীও নেকী প্রাপ্ত হবেন। এ দিন এ উপলক্ষ্যে গণহারে শরবত পান করানো হয়। এতে তাদের বিশ্বাস হলো, কারবালার শহীদগণ যেহেতু পিপাসিত অবস্থায় শহীদ হয়েছেন, তাই তাদের পিপাসা নিবারণের জন্য শরবত পান করানো উচিত। এ বিশ্বাসও সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন। এ সকল বোধ-বিশ্বাসের ইসলামে কোন স্থান নেই। পাঠক! আত্মবিস্মৃত ও গাফেল মুসলিম উম্মাহ ফযীলতে পরিপুষ্ট মহররম ও আশুরাকে এভাবেই অপসংস্কতি ও রসম-রেওয়াজের নষ্ট জালের অক্টোপাসে আবদ্ধ করেছে বড় নির্দয়ভাবে। সকল ক্ষেত্রেই উম্মাহর এই দুর্দশা দেখে বড় কষ্ট হয়। সেই কষ্টের তাকাদা থেকেই বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধের অবতারণা। উদ্দেশ্যে, উম্মাহ যেন হক-বাতিলের পার্থক্য বুঝতে পারে। উপলব্ধি করতে পারে এ ক্ষেত্রে ইসলমের শিক্ষা এবং হৃদয়াঙ্গম করতে পারে নিম্নের বিষয়গুলো।

১. মহররম আল্লাহর মাস। ফলে এ মাসের গুরুত্ব অভাবনীয় এবং তাতে নফল ইবাদতের ফযীলত অতুলনীয়। তাই এ মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদত করা দরকার। বিশেষ করে ৯-১০ বা ১০-১১ তারিখে দুটি রোযা রাখা এ মাসের বিশেষ আমল। যা আমরা পূর্বেই জানতে পেরেছি।

২. বর্ণিত রসম-রেওয়াজ ও কুসংস্কারগুলো নিজে পরিহার করা এবং সমাজ থেকে এগুলো নির্মলে সবিশেষ যত্নবান হওয়া।

৩. আশুরায় হুসাইন রা. এর শোকে ব্যাকুল ও কাতর হয়ে বর্ণিত রসম-রেওয়াজ ও কুসংস্কারগুলোতে না জড়িয়ে তাঁর শাহাদাতের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করা। তাঁর শাহাদাতের প্রকৃত শিক্ষা হলো, বাতিল ও তাগুতি শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে তা প্রতিহত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করা। এতেই নিহিত রয়েছে উম্মাহর মুক্তি ও শক্তি। তাই বলি, বিদূরিত হোক সকল মহররমী রসম-রেওয়াজ আর কুসংস্কার। নির্মল ও সজিব হয়ে উঠুক বিশ্বদরবার। মুহাম্মাদী আভায় আলোকিত হোক মুমিনের প্রাণ। হুসাইনী চেতনায় ঝলসে উঠুক মুমিনের ঈমান।


মুফতী পিয়ার মাহমুদ
ধর্মীয় গবেষক, গ্রন্থ প্রণেতা ও মুহাদ্দিস
জামিয়া মিফতাহুল উলুম, নেত্রকোনা

Facebook Comments