আমরা রোজা রাখি কেন?

527
রোজা

আদনান ফায়সালঃ  আচ্ছা বলুন তো – আমরা রোজা রাখি কেন? ছোটবেলায় আমরা অনেকেই শুনেছি যে – গরীব মানুষেরা না খেয়ে কত কষ্টে থাকে তা যেন আমরা বুঝতে পারি এর জন্যই রোজা রাখা। কিন্তু আমরা যদি কুরআনে বর্ণিত রমজান মাস ও রোজা বিষয়ক আয়াতগুলোর দিকে তাকাই তাহলে বুঝতে পারব – এটা কখনোই রোজার মূল উদ্দেশ্য না।  হ্যাঁ রোজা রাখার একটা সুফল হয়তো এটা যে আমরা না-খেয়ে থাকা মানুষের কষ্ট বুঝতে পারব, কিন্তু এটা মোটেও রোজার মূল উদ্দেশ্য নয়!

আমরা যখন গরীব মানুষের কষ্ট বুঝতে পারাকে রোজার মূল উদ্দেশ্য করে ফেলব তখন সমস্যা কি? এর সমস্যা হলো আমরা যদি কোন রকমে না খেয়ে দিন কাটিয়ে দিতে পারি, তাহলেই আমরা ধরে নিব যে আমরা সফল ভাবে রোজা রেখেছি। ‘আরে ভাই গরীবের কষ্ট বুঝে গেসি, রোজার উদ্দেশ্য সফল’! হয়তো আমাদের দিন শুরু হয়েছিল ফজর নামাজ না পড়ে, সকাল কেটেছে যাকে দেখতে পারি না তার গীবত করে, দুপুর কাটিয়েছি অফিসের কাজে ফাঁকি মেরে, বিকাল কাটিয়েছি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইফতারী কিনে, আযান পড়তেই ধুমসে ইফতার খেয়ে ‘ফাটিয়ে ফেলেছি’ – রোজা তো অবশ্যই সফল! কারণ? ঐ যে, রোজার উদ্দেশ্য ছিলো গরীবের না খেয়ে থাকার কষ্ট বুঝা – ঐ বুঝ তো দিনের বেলা বুঝা হয়ে গেছে!

প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাহলে রোজার উদ্দেশ্য কি? রোজার উদ্দেশ্য আল্লাহ ‘আযযা ওয়াজাল স্পষ্টভাবে কুরআনুল কারিমে বলে দিয়েছেন:

হে ইমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হলো, যেভাবে ফরয করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীগনদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া  অর্জন করতে পারো। – (সূরা বাকারাহ্‌ ২:১৮৩)

সুতরাং আল্লাহ আমাদেরকে কেন রোজা রাখতে হুকুম করেছেন তা স্পষ্ট – যাতে আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারি।

রমজানের উদ্দেশ্য ১: তাকওয়া অর্জন করা।

এখন তাহলে জানা দরকার তাকওয়া শব্দের অর্থ কি?

তাকওয়া অর্থ হলো আল্লাহ-সচেতনতা (God Consciousness), তাকয়া মানে ঢাল (Protection)। তাকওয়া আমাদের আর যাবতীয় পাপ কাজের মধ্যে ঢালস্বরূপ। যার তাকওয়া আছে, আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট; যার তাকওয়া নেই তার উপর আল্লাহ অসন্তুষ্ট।

প্র্যাকটিকাল ভাবে বলতে গেলে – আমরা যা ভাবছি, যা করছি, যা বলছি, যা শুনছি – আল্লাহ তার সবকিছু দেখছেন, শুনছেন, রেকর্ড করে রাখছেন, বিচার দিবসে সবার সামনে আমাদের গোপন-প্রকাশ্য সমস্ত কাজ দেখানো হবে, ভাল-মন্দ সব কাজের প্রতিদান দেয়া হবে – এই চিন্তাগুলো মাথায় রেখে যে কোন কিছু করার নামই তাকওয়া।

ব্যাপারটা আসলে খুব ভয়ংকর। আমি আজ সকালে ফজরের নামাজ পড়েছিলাম কিনা তার জবাব আমাকে দিতে হবে, ঠিক মত হিসাব করে যাকাতের টাকা গরীব মানুষকে দিয়েছিলাম কিনা তার জবাব দিতে হবে, সুদের টাকায় বাড়ি-গাড়ি করলে তার জবাব দিতে হবে, কোন বন্ধুর সাথে অন্য কোন বন্ধুর বদনাম করলে তার জবাব দিতে হবে, রিকশাওয়ালাকে অকারণে ধমক দিলে তার জবাব দিতে হবে, অফিসে বসে কাজে ফাঁকি দিলে জবাব দিতে হবে, জবাব দিতে হবে আমাদের প্রতিটা কাজের, কথার, চাহনির!

আবু হুরায়রা(রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: যে মানুষ রোজা রেখে মিথ্যা কথা এবং খারাপ কাজ ছাড়তে পারে না, তার না খেয়ে থাকার প্রয়োজন আল্লাহর কাছে নাই (অর্থাৎ তার রোজা আল্লাহ্‌ কবুল করবেন না)। – (বুখারী)

 

স্কলারেরা বলেছেন – এই পৃথিবীটা হলো জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলা একটা রাস্তার মতো যার প্রতি পদে পদে পাপের কাঁটা বিছানো। তাকওয়া মানে হলো এই কাঁটাগুলোকে সর্ন্তপণে এড়িয়ে সঠিক পথে চলা। সঠিক পথ কোন্‌টা? আল্লাহ্‌ যা করতে আমাদের নিষেধ করেছেন তা না করা, আর যা করতে আদেশ করেছেন সেটা করাই হলো সঠিক পথ। আল্লাহর এই আদেশ-নিষেধগুলো যে যত বেশী মেনে চলবে, আমরা বলব যে তার তাকওয়া তত বেশী, অর্থাৎ সে তত বেশী মুত্তাকী।

কিন্তুরোজা রাখার সাথে তাকওয়া অর্জনের সম্পর্ক কি?

রোজাকে আরবীতে ‘সাওম’ বলে, যার অর্থ হলো বিরত থাকা। রোজা রাখলে আমরা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেই, এমনকি যখন একা ঘরে থাকি, বাথরুমে থাকি তখনও কিন্তু আমরা খাই না। আমরা খাই না কারণ কেউ না দেখলেও তো আল্লাহ্‌ দেখছে, অর্থাৎ আমরা তাকওয়ার কারণেই রোজার সময় খাই না। এখন দেখুন, এই খাবার খাওয়া কিন্তু আমাদের মৌলিক চাহিদা। কিন্তু, গীবত করা, গান-নাচ দেখা, দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা, কাজের লোকের সাথে খারাপ ব্যবহার , মানুষের উপকার করে খোঁটা দেয়া – এগুলো একটাও কি আমাদের মৌলিক চাহিদা? না। রোজার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ ‘আযযা ওয়া জাল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন – হে মানুষ! তোমরা যদি তাকওয়ার কারনে তোমার মৌলিক চাহিদা থেকেই বিরত থাকতে পারো, তাহলে যেই কাজগুলো অপশনাল সেগুলো থেকে কেন বিরত থাকতে পারবে না?

আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন: রোজা ঢালস্বরুপ। – (বুখারী-১৮৯৪)

আবার ভেবে দেখুন, রোজার সময় না খাওয়ার কারণে আমাদের শরীর দুর্বল থাকে। আর দুর্বল শরীরে আমাদের নফসের বা অন্তরের কু-চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। আর নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহর হুকুম মেনে চলার নামই তো তাকওয়া।

এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাকওয়া অর্জন করব কিভাবে?

যে কোন পরীক্ষায় পাশ করতে হলেই আগে জানা লাগে পরীক্ষার সিলেবাস কি। ঠিক তেমনি তাকওয়া বা আল্লাহ-ভীতি অর্জন করতে হলে আমাদের জানা লাগবে কোন্‌ কাজে আল্লাহ্‌ শাস্তি দিবেন আর কোন্‌ কাজে আল্লাহ্‌ পুরস্কার দিবেন।

আমরা যখন জানব নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ না পড়লে আমরা কাফের হয়ে যেতে পারি তখন ইসলামের প্রতি সত্যিই যদি আমাদের ভালোবাসা থাকে তো আমরা আর কোন উসিলাতেই নামাজ ছাড়ব না। যখন জানব কবরে লাশ রাখার পর তা দুইদিক থেকে এমনভাবে চাপ দেয় যে এক পাশের পাঁজরের হাড় আরেক পাশের পাঁজরের হাড়ের উপরে উঠে যায়, আর কবরে আজাবের একটা কারণ হলো দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করা, আমাদের ঈমান থাকলে সেদিন থেকে আমাদের পক্ষে আর দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা সম্ভব হবে না। যখন জানব মিথ্যা বললে আমাদের চোয়ালের চামড়া আংটা ঢুকিয়ে টেনে ছিড়ে ফেলা হবে তখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বিশ্বাসী হলে ঘূনাক্ষরেও মিথ্যা বলব না। যখন জানব গীবত করলে মৃত মানুষের মাংস হবে আমাদের জাহান্নামের খাবার তখন গীবত করতে গেলে আমাদের গলায় কাঁটা বিধবে। যখন শুনব ব্যভিচারী নারী-পুরুষকে উলংগ করে আগুনে পোড়ানো হবে তখন এই কাজের চিন্তা আমরা আর কিছুতেই করব না। যখন জানব সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা মানুষের বিপদে সাহায্যের জন্য এগিয়ে না যাই, তাহলে কেয়ামতের দিনে আমাদের দু’পা তার জায়গা থেকে নড়বে না, শক্ত হয়ে আটকে থাকবে, তখন আমরা নিজের সামর্থ্যের শেষবিন্দু দিব মানুষকে সাহায্য করার জন্য।

অন্যদিকে আমরা যখন জানব, প্রতিবার সুবহানআল্লাহ্‌ বললে জান্নাতে আমার জন্য একটা গাছ লাগানো হবে তখন বেশী করে আমরা সুবহানআল্লাহ্‌ বলব, যখন জানব মা-বাবার সেবা জান্নাতে যাওয়ার সবচেয়ে বড় উপায় তখন আমরা আমাদের পড়াশুনা, চাকরী, ব্যবসার চাইতে মা-বাবার সেবায় বেশী মন দিব, যখন জানব মানুষকে ক্ষমা করলে আল্লাহ্‌ আমাকে ক্ষমা করবেন তখন অনায়াসে অন্য মানুষের ভুল ক্ষমা করতে পারব।

মোদ্দা কথা হলো, তাকওয়া অর্জন করতে হলে আমাদের আগে লাগবে  কি করা উচিত, আর কি করা উচিত না তার জ্ঞান। এই জ্ঞান কোথায় পাব? এক আয়াত পরেই আল্লাহ্‌ এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন:

রমযান মাস, এতে মানবজাতির জন্য পথ-প্রদর্শক , সঠিক পথের স্পষ্ট প্রমাণ এবং সঠিক ও ভুলের পার্থক্য নির্ণয়কারী কুরআন নাজিল করা হয়েছে। অতএব তোমাদের তোমাদের মধ্যে যে কেউ এই মাস পাবে, সে যেন রোজা রাখে। – (সূরা বাকারাহ্‌ ২:১৮৫ আয়াতাংশ)

 

সুতরাং কোন্‌ কাজটা ভালো কোন্‌ কাজটা মন্দ, এইটা বুঝার জন্য মুসলমানের মানদন্ড হলো কুরআন। কুরআন শুধু আরবীতে পড়লেই চলবে না, যে ভাষায় আমরা এর অর্থ বুঝতে পারবো সেই ভাষাতে কুরআন অনুবাদ পড়তে হবে, ব্যাখা পড়তে হবে, স্কলারদের লেকচার শুনতে হবে, শুধুমাত্র তাহলেই আমরা জানতে পারবো আল্লাহর কাছে কোন্‌ কাজটা সঠিক, কোন্‌ কাজটা ভুল। আর আল্লাহর দেয়া মানদন্ড অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার মানেই হলো তাকওয়া অর্জন করা।

 রমজানের উদ্দেশ্য ২: কোরআন থেকে সঠিক ও ভুল পথের নির্দেশনা নেয়া।

রমজান মাসে কুরআনের এই গুরুত্বের কারণেই আমরা তারাবীহ্‌ এর নামাজে কুরআন পড়ে শেষ করি। কিন্তু, আমরা যেটা করি না সেটা হলো কুরআন থেকে পরামর্শ গ্রহণ করা, অথচ আল্লাহ্‌ এই উদ্দেশ্যে কুরআন নাজিল করেছেন।

প্রশ্ন দাঁড়ায় – এই পরামর্শ কি শুধু মুসলমানেরাই গ্রহন করবে? দেখুন তো আরেকবার আল্লাহ্‌ সূরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াতে কি বলেছেন? আল্লাহ্‌ বলেছেন – “কুরআন মানবজাতির পথ-প্রদর্শক”! অর্থাৎ, রমজানে এই কোরআন শুধু আমি নিজেই পড়লেই হবে না, আমার আশে পাশের নামাজী, বেনামাজী, হিন্দু, খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ, নাস্তিক, সবাইকে কুরআন পড়ার জন্য বলতে হবে।

 এখন প্রশ্ন হলো, আমি মুত্তাকী হলে আল্লাহর লাভ কি?

আল্লাহ্‌ হলেন আল-গণি বা প্রয়োজনমুক্ত, আবার তিনি আর-রাহমান বা পরম দয়ালু।  আল্লাহ্‌ আমাদেরকে ভালবাসেন আর তাই তিনি চান আমরা ইহজীবনে শান্তি এবং পরজীবনে জান্নাত পাই।  ইহজীবনে শান্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করা, তাকওয়া অর্জন করা।

যার তাকওয়া নাই তার অন্তরে শান্তি নাই, সে যত পায় তত চায়, তাও তার মন ভরে না। আর যখন মৃত্যু তার কাছে চলে আসে তখন সে গভীর হতাশায় ডুবে যায়, ‘হায় আমি এতকাল কি করলাম!’ বলতে বলতে তার কলজে ফেটে পড়ে। নিজেকে বার বার প্রশ্ন করে, ‘যেই দুনিয়ার পিছনে সারা জীবন দৌড়েছি তাকে ছেড়ে এখন আমি কিভাবে যাবো?’ আল্লাহ্‌ মানুষকে অন্তরের এই ছটফটানি থেকে মুক্তি দিতে চান, এই মুক্তির একমাত্র পথ হলো তাকওয়া অর্জন করা।

আল্লাহ্‌ তো তোমাদের জন্য সহজটাই চান, তোমাদের জন্য যা কষ্টকর তিনি তা চান না। – (সূরা বাকারাহ্‌ ২:১৮৫ আয়াতাংশ)

 

হুমম, বোঝা গেল যে আল্লাহ্‌ আমাদের মংগলের জন্যই চান যে আমরা রোজা রাখি, তাকওয়া অর্জন করি। কিন্তু, আল্লাহ্‌ যদি আসলেই আমাদের জন্য জীবনকে সহজ করতে চান, তাহলে কি তিনি রমজান মাসে আমাদের জন্য এমন বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করেছেন, যা আমাদের তাকওয়া অর্জনে সাহায্য করবে?

রমজানের স্পেশাল প্যাকেজ!

রমজানে আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের জন্য আছে বিশেষ সুবিধা, স্পেশাল প্যাকেজ। যে শয়তান আমাদের জন্মলগ্ন থেকে আমাদের কানে কুমন্ত্রণা দিয়ে আসছে আল্লাহ্‌ সেই শয়তানকে রমজানে শেকল-বন্দি করে রাখেন। কাজেই, রোজার মাসে কোন পাপ করে ফেললে শয়তানকে দোষ দেয়ার কোন উপায় নাই! রোজার মাসে কোনও পাপ করলে সেটা আমরা করি আমাদের অন্তরের কু-চাহিদা থেকেই।

সুসংবাদ আরো আছে। রমজানের মাসে জাহান্নামের দরজাগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হয়, আর জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ মানুষের অন্তরে এমন অবস্থা তৈরী করেন যে খারাপ কাজ করা খুব কঠিন হয়ে যায়, আর ভালো কাজ করা সহজ হয়ে যায়।

আবু হুরায়রা(রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: যখন রমজান মাস শুরু হয়, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, আর জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, আর শয়তানকে শেকল-বন্দি করা হয়। – (বুখারী)

আল্লাহ্‌ কেন এমন করেন? আল্লাহ্‌ এরকম করেন যাতে আমরা নিজেদের এই মাসে ট্রেইন-আপ করে নিতে পারি, বাকী ১১ মাস শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই এর জন্য। আমরা যখন ড্রাইভিং শিখি তখন যেমন আমাদের ইন্সট্রাক্টর আমাদের এমন রাস্তায় নিয়ে যান যে রাস্তায় গাড়ি, মানুষ নাই – যাতে আমরা ভালো মতো করে আগে চালানো শিখতে পারি, রমজানও তেমনি আমাদের ট্রেনিং টাইম। আল্লাহ্‌ এক মাস ধরে শয়তানকে আমাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে রাখেন যাতে আমরা নিজের তাকওয়াকে মজবুত করে নিতে পারি বাকী ১১ মাস শয়তানের সাথে লড়াই এর জন্য।

রমজানের উদ্দেশ্য ৩: সারা বছর শয়তানের সাথে লড়াই করার জন্য নিজেকে ট্রেইন-আপ করা।

ভেবে দেখুন, আমরা আমাদের ড্রাইভিং ট্রেনিং এর সময় প্যারালাল পার্কিং, ব্যাক-ইন, ড্রাইভ-ইন কোনও ধরনের পার্কিং প্র্যাকটিসই কিন্তু বাদ রাখতে চাই না, কারণ ট্রেনিং শেষে পরীক্ষায় কোন্‌ প্রশ্নটা আসবে আমাদের তো সেটা জানা নাই। ঠিক তেমনি রমজান মাসের এই ট্রেনিং টাইমে সব ধরনের ভালো কাজ বেশী বেশী করে করতে হবে, একদম ছোটখাটো খারাপ কাজ, যেমন খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ না বলা, ডানপায়ে বাথরুমে প্রবেশ করা – এগুলো থেকেও বিরত থাকতে হবে। বলা তো যায় না, ট্রেনিং টাইম শেষে শয়তান যখন আবার মুক্তি পাবে তখন সে কোন্‌ দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে!

আর তাই রাসূলুল্লাহ(সা) রমজান মাস এলেই ভালো কাজ করার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন। ঝোড়ো বাতাস যেমনি সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যায়, তেমনি ভাবে তিনি তার বাসার সবকিছু ঝেড়ে-ঝুড়ে দান করে দিতেন!

রাসূলুল্লাহ(সা) এমনিতেই দানশীল ছিলেন, কিন্তু রমজান মাস আসলে তার দানশীলতা ঝোড়ো বাতাসকেও ছাড়িয়ে যেত (বুখারী)।  

রমজান মাসে জিব্রিল(আ) এসে রাসূলুল্লাহ(সা) কে কুরআন শিক্ষা দিতেন। রাসূলুল্লাহ(সা) নিজে রমজানে রাতে অনেক বেশী নামাজ পড়তেন, আর তাঁর পরিবারে সদস্য, সাহাবাদেরকেও পড়তে বলতেন। আর, এর জন্য আমরাও রমজানের রাতে তারাবীহ পড়ি। রমজানের এই তারাবীহ পড়া হলো সারা বছর তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার প্র্যাকটিস। রমজান মাসে যদি আমরা ৮ বা ২০ রাকআত তারাবীহ পড়তে পারি, তাহলে ট্রেনিং শেষে সারা বছর কেন কমপক্ষে দুই-চার রাকআত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে পারবো না?

রমজানের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে সুন্দর ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেছেন, এর জন্য আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব। তাই আল্লাহ রমজান মাস সংক্রান্ত এই আয়াতটি শেষ করেছেন এভাবে:

এজন্য যে, তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করবে, এবং তোমাদের যে সুপথ দেখিয়েছেন  তার জন্য তোমরা তাঁর (আল্লাহর) তাকবীর পাঠ করবে, যাতে তোমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পারো। –  (সূরা বাকারাহ্‌ ২:১৮৫ আয়াতাংশ)

আর তাই সারা রমজান মাস রোজার রাখার পর আমরা ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার’ (হে আল্লাহ্‌ তুমি সবচেয়ে মহান, হে আল্লাহ্‌ তুমি সবচেয়ে মহান) বলতে বলতে ঈদের নামাজ পড়তে যাই, এটা আল্লাহর প্রতি মুসলমানদের কৃতজ্ঞতার বহি:প্রকাশ। হে আল্লাহ্‌ আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ – তাকওয়া অর্জনের জন্য, শয়তানের সাথে লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়ার জন্য, নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য – তুমি আমাদেরকে ট্রেনিং নেয়ার জন্য এত চমৎকার ব্যবস্থা করে দিয়েছ, আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ, আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ!

আর কোনো বোনাস আছে কি?

আমরা রোজা রাখব আমাদের নিজেদেরই প্রয়োজনে। কিন্তু পরম করুনাময় আল্লাহ্‌ এই রোজার বিনিময়ে আমাদেরকে অনেক পুরষ্কার, আর পুরষ্কারের উপর পুরষ্কার দিবেন। যেমন, আমরা রমজানের এই গিফটকে কাজে লাগিয়ে অতীতের সব গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারি।

আবু হুরায়রা(রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে আল্লাহর কাছে পুরষ্কার পাওয়ার উদ্দেশ্যে রমজান মাসে রোজা রাখবে, আল্লাহ্‌ তাঁর আগের সব গুনাহ মাফ করে দিবেন। (বুখারী, মুসলিম)

তাহলে শর্ত হলো, রোজা রাখতে হবে শুধুই আল্লাহর কাছ থেকে পুরষ্কার পাওয়ার উদ্দেশ্যে। কেউ যদি রোজা রাখে তার বাবা খুশী হবে এই ভেবে, বা শ্বশুর বাড়ির লোকেরা কি বলবে এই ভেবে, অথবা বন্ধুরা বা প্রতিবেশীরা ‘রোজাদার’ বলবে ভেবে, বা বাসার সবাই রাখে তাই আমাকেও রাখতে হয় এই ভেবে – তাহলে গুনাহ মাফ হবে না। কারণ, একজনের বাবা/বন্ধুরা হয়তো রোজা রাখলে খুশী হয় আবার আরেকজনের বাবা/বন্ধুরা রোজা রাখলে অখুশী হয়। যার বাবা/বন্ধুরা রোজা রাখলে অখুশী হয় তার কখনো রোজাও রাখা হবে না, তাকওয়াও অর্জন করা হবে না।

রোজাদারেরা বিচার দিবসে ‘রাইয়ান’ নামক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে (বুখারী)।

রাইয়ান শব্দের একটা অর্থ হলো, পানির উৎস। যেহেতু, রোজাদারেরা দুনিয়াতে তৃষ্ণায় কষ্ট পেতে থাকার পরেও শুধু আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার জন্য পানি না খেয়ে ধৈর্য ধরত, তাই সেইদিন আল্লাহ্‌ তাদেরকে পুরষ্কারস্বরুপ নিয়ে যাবেন অনন্ত পানির উৎসের কাছে!  আল্লাহ আমাদের সব ভালো কাজের পুরষ্কার ৭০০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়ে থাকেন, কিন্তু রোজা রাখার পুরষ্কার আল্লাহ্‌ যত গুণ ইচ্ছা ততগুণ বাড়াবেন!

শেষ কথা:

আসুন আমরা সবাই এই রোজায় তাকওয়া অর্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, তারাবীহ নামাজ পড়ি, অর্থ বুঝে কোরআন পড়ার ও শুনার চেষ্টা করি। আর খুব বেশী বেশী করে আল্লাহর কাছে তাওবাহ করি। মানুষ মাত্রই পাপী, এই পাপী মানুষদের মাঝে তারাই শ্রেষ্ঠ যারা বেশী বেশী তাওবাহ করে।

 কা’ব ইবনে উজরাহ(রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) একবার তাঁর মিম্বরে আরোহন করার সময় প্রতি ধাপ পার হওয়ার সময় বললেন – ‘আমিন’। আমরা রাসূলুল্লাহ(সা) কে জিজ্ঞেস করলে উনি বললেন – আমি যখন মিম্বরে প্রথম ধাপ উঠলাম, জিব্রিল(আ) আমার কাছে আসলেন এবং বললেন – ‘ধ্বংস হোক সেই ব্যক্তি যে রহমতের মাস রমজান পেল কিন্তু তার পাপগুলো মাফ করিয়ে নিতে পারলো না’, আর আমি বললাম – ‘আমিন’।  – (হাকিম, বায়হাকী)

আল্লাহ্‌ যেন আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত না করেন যারা রমজান মাস পেল, অথচ এর উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব  অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলো, তাওবাহ করলো না এবং নিষ্পাপ হয়ে বেরিয়ে আসতে পারলো না।

 

 

 

Facebook Comments