ইব্রাহিম আ. প্রিয়তমা স্ত্রী-সন্তানের জন্য অনাবাদী বিজন মরুপ্রান্তে যে দোয়া করেছেন।

299
ইব্রাহিম

ইব্রাহিম আ. যখন প্রিয়তমা স্ত্রী আর প্রাণাধিক প্রিয় শিশুকে এক অনাবাদী বিজন মরুপ্রান্তে রেখে গেলেন- তখন তিনি তাঁদের জন্য রবের কাছে দোয়া করেছিলেন। সেই কাহিনী আল্লাহ্‌ কোরআনে আমাদের জানিয়েছেন।

যাতে আমরা শিক্ষা নিই। ইব্রাহিম আ. তাঁদের জন্য প্রথমেই এই দোয়া করেন নি যেন খাদ্য, সুখ ও স্বচ্ছন্দ্যের প্রাচুর্য্য আসে। বরং দোয়া করেছেন,

رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ
ও আমার রব, (তাদেরকে তোমার এই পবিত্র ঘরের কাছে রাখছি) যেন তারা নামাজ করে (আল-ইব্রাহিম, ৩৭)।

প্রথমেই নামাজের কথা বলেছেন। কারণ, নামাজ কায়েম হলে রিজিক্বের নিশ্চয়তা আসে, সুখ ও নিরাপত্তা তৈরি হয়। তাই ইবরাহীম আ. নামাজ কায়েমের প্রসঙ্গ নিশ্চিত করে এরপর বলছেন,

فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُم مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ
১। সুতরাং কিছু মানুষের অন্তরে তাদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিন
২। এবং তাদেরকে ফলফলাদির মাধ্যমে রুজির ব্যবস্থা করুন।
৩। যাতে তারা শুকরিয়া জ্ঞাপন করে।

অর্থাৎ তাঁরা যেন আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞচিত্ত থাকে সর্বদা। কারণ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় নেককার বান্দার বৈশিষ্ট্য, সর্বোত্তম ইবাদাত। কৃতজ্ঞতার বোধ মানুষের মধ্যে অন্যসব ইবাদাত ও আনুগত্যের শিক্ষা দেয়।

এখানে আরও একটা বিষয় অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নিহিত আছে। তা হচ্ছে, কিছু মানুষের অন্তরে ভালোবাসা সৃষ্টির প্রসঙ্গে। কখন সেই ভালোবাসা সৃষ্টির কথা বলা হচ্ছে? নামাজ কায়েমের পর।

অর্থাৎ নামাজের সাথে ভালোবাসা, অনুরাগের সম্পর্ক আছে। সে যদি নামাজের প্রতি যত্মবান হয়, তার প্রতি আপনার ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। আর সে যদি নামাজের সাথে সম্পর্ক না রাখে, তবে আপনার সাথে তার সম্পর্কেও ভাঁটা পড়া উচিত, অনুরাগের, ভালোবাসার বোধে টান পড়া উচিত।

আপনার বন্ধু, স্বজন নামাজ পরিত্যাগ করলেও আপনার তার প্রতি অনুরাগ সমান থাকা আপনার এবং তার উভয়ের জন্যেই অকল্যাণকর। কারণ এই সমান অনুরাগ বোধ তাকে নামাজের প্রতি দাওয়াত দেওয়া থেকে আপনাকে বিরত রাখে। আর আপনাকেও ক্রমে আপনার দ্বীনি দায়িত্ব সম্বন্ধে গাফেল করে দেয়।

আল্লাহ্‌ তাই প্রকারান্তরে শিক্ষা দিচ্ছেন, নামাজের সাথে ব্যক্তির সম্পর্কের উপরভিত্তি করে সেই ব্যক্তির সাথে অন্তরের ভালোবাসার সম্পর্ক থাকবে। নামাজীদের সাথে সুসম্পর্কের ব্যাপারে কোরআনে আরও বহু জায়গায় উৎসাহিত করা হয়েছে।

এখান থেকে এই শিক্ষা উঠে আসে, আপনি যার ফ্যান হবেন, যার প্রতি আপনার মুগ্ধতা জন্মাবে, যার প্রতি আপনার অন্তরের ভালোবাসা তৈরি হবে, যে আপনার বন্ধু হবেন, তার আবশ্যকগুণ হতে হবে, সে নামাজ নিজে পড়ে এবং সমাজে নামাজ কায়েমের শিক্ষা দেয়।

এবার আসুন নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি যার ফ্যান, আমি যাকে ভালোবাসি, আমি যার বন্ধু, তার কাজ কি আমাকে আল্লাহ্‌কে স্মরণ করায়? আল্লাহ্‌কে স্মরণের শিক্ষা দেয়? নাকি তার কাজ আমাকে আল্লাহ্‌র স্মরণ থেকে বিমুখ করে, আল্লাহকে ভুলিয়ে দেয়?

যদি তাই হয়, তবে সেই বিচারের দিনের অবস্থাটা ভাবুন যেদিন একমাত্র বিচারকার্যের অধিকার থাকবে আল্লাহ্‌র। আর তিনি বলবেন,

فَالْيَوْمَ نَنسَاهُمْ كَمَا نَسُوا لِقَاءَ يَوْمِهِمْ هَٰذَا
সুতরাং আজকে আমিও তাদেরকে ভুলে যাব, যেভাবে তারা (আমাকে) ভুলে গিয়েছিল (আল- আ‘রাফ ৫১)।.

বিচার দিবস কেমন হবে? আল্লাহ্‌ নিজে সে দিনের ব্যাপারে বর্ণনা করেছেন।

সেদিন সব হবে আত্মপক্ষের স্বীকারোক্তির মতন, কনফেশন। সেই কনফেশনের উপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে শাস্তি।

يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

যে দিন তারা যা করেছে সেসব বিষয়ই তাদের জিহ্বা, তাদের হাত, তাদের পা প্রকাশ করে দেবে (আন-নূর, ২৪)

শুধু কি জিহ্বা কিম্বা হাত-পা ? তা-ই নয়, বরং কানে কোন গান শুনেছি, কোন কথা শুনেছি পাপের সেসব সাক্ষ্যও কান দেবে। সব অঙ্গই সব ফাঁস করে দেবে।

কিছুই বাকিই থাকবে না। ফেসবুকের একটা লাইক, পোস্ট থেকে শুরু করে ম্যাসেঞ্জারের একটা কথা অবধি। কারণ

أحْصَاهُ اللَّهُ وَنَسُوهُ
আল্লাহ্‌ তো তা গুণে গুণে হিসেব রেখেছেন (আল- মুজাদালা, ৬)।

এমন কিছুই তো থাকবে না যা ভুলে যাবেন আল্লাহ্‌ তা’আলা, এমন কিছুই থাকবে না যা হিসেব থেকে বাদ যাবে। আল্লাহ্‌ বলছেন,

وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا
আপনার প্রতিপালক কিছুই ভুলে যাবার নন (মারয়াম, ৬৪)

সুতরাং যা কিছু আছে সব কিছুর ব্যাপারেই আমাদের সাবধান হওয়া উচিত, আরও অধিক।


লেখক – আরজু আহমদ

Facebook Comments