ইসলামে মধ্যপন্থা-বাড়াবাড়ি ছাড়াছাড়ির অবকাশ নাই !

635
ইসলামে মধ্যপন্থা-বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি

ইসলামে মধ্যপন্থা বাড়াবাড়ি বা ছাড়াছাড়ির ভয়াবহতা !

একবার উমার (রদিআল্লাহু আ’নহু) এর সাথে এক ইহুদির দেখা হল। সেই ইহুদি তাঁকে তাওরাতের একটি বাণী পড়ে শোনালে সেটি উমারের (রদিআল্লাহু আ’নহু) কাছে খুব ভাল লাগে। তখন তিনি ওই ইহুদিকে বাণীটি লিখে দিতে বলেন।

অতঃপর সে বাণীটি লিখে দিলে উমার (রদিআল্লাহু আ’নহু) সেটা নিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহর ﷺ কাছে চলে আসেন ও পড়ে শোনান। রাসূল ﷺ খেয়াল করলেন উমার (রদিআল্লাহু আ’নহু) রীতিমত মুগ্ধ।

এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ কী বললেন? তার আগে দু’টি বিষয় লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণঃ

এক. বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে আল্লাহর কালামের উপর কিছু হতে পারে না। তাওরাত, যাবূর, ইঞ্জিল – এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকেই ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলোর বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। কিন্তু তবুও যদি তাওরাত / ইঞ্জিলের কোনও একটি অংশ অবিকৃত আছে বলে ধরে নিই, তাহলে সেটি হবে বিশুদ্ধতার দিক থেকে সেরা; কারণ সেটি আসলে আল্লাহর কালাম!

দুই. এখানে আমরা তাওরাতের এমন একটি বাণীর কথা বলছি যেটি শুনে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমার (রদিআল্লাহু আ’নহু) অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন! এ সেই উমার (রদিআল্লাহু আ’নহু) যার কথা সমর্থন করে স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা তিনবার আয়াত নাযিল করেছেন, এ সেই উমার যে কিনা কোনও পথ দিয়ে হাঁটলে সে পথ শয়তান মাড়াত না।

সেই উমার (রদিআল্লাহু আ’নহু) যখন তাওরাতের একটি বাণী শুনে অভিভূত হয়ে অন্য কারো কাছে না গিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এনে পড়ে শোনালেন সেটি কি তাওরাতের সামান্য অবিকৃত অংশের একটুখানি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না! আর সেটা অবিকৃত অংশ কিনা তা তো রাসূল ﷺ তখনই নিশ্চিত করে দিতে পারতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ কী বললেন?

রাসূল ﷺ প্রচন্ড রেগে গেলেন। বললেন,

ওহে খাত্তাবের পুত্র উমার, আমরা কি এখন এটা পরখ করে দেখব! সেই সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, আমি তোমাদের কাছে এই শরীয়াত স্বচ্ছ ও পরিষ্কার অবস্থায় নিয়ে এসেছি। অতএব তাদেরকে কোনও বিষয়ে জিজ্ঞেসই করো না। কারণ হতে পারে তারা সত্য বর্ণনা করছে আর তোমরা তাতে অস্বীকার করে বসছো, অথবা তারা মিথ্যা বর্ণনা করবে কিন্তু তোমরা তা সত্য মনে করবে।

আবারও সেই সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, যদি মূসা (আ’লাইহিস সালাম) ও এখন জীবিত থাকতেন, তবে তিনিও আমার শরিয়ত অনুসরণ না করে পারতেন না। [মুসনাদে আহমাদ, ১৪৭৩৬]

একটু চিন্তা করুন। তাওরাতের একটি বাণী যেটা কিনা বিশুদ্ধতায় সর্বোত্তম (অর্থাৎ আল্লাহর অবিকৃত বাণী) হওয়ার সুযোগ থাকতেও রাসূল ﷺ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে দিয়ে স্পষ্ট করে দিলেন মুসলিমদের অবস্থান, পরিষ্কার করে দিলেন ‘সন্দেহযুক্ত বিষয়’ থেকে কীভাবে বেঁচে থাকতে হবে। তাদের থেকে কোনও কিছু নেওয়াই যাবে না।

এবার আরেকটি হাদিসের দিকে মনোযোগ দেওয়া যাক –

“একটি বিষয়কে আমি উম্মতের জন্য দাজ্জালের ফিতনা থেকেও বেশি ভয় করি।” রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করা হল সেটা কী? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “ভ্রান্ত এবং পথভ্রষ্ট উলামা” [মুসনাদে আহমাদ ২১৩৩৪, ২১৩৩৫]

ভ্রান্ত উলামাদের সাথে সাথে ফেসবুক দ্বীনদারিতা আর অ্যাক্টিভিটির বদৌলতে আমাদের বর্তমান সময়ে কিছু ইসলামিক(!) সেলিব্রেটি দাঈর আবির্ভাব হয়েছে। সময়ে সময়ে এদের চরম নিফাকপূর্ণ আচরণ আল্লাহ প্রকাশ করে দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু তারপরও অনেকে বলছে ‘আমরা তার থেকে কেবল ভালটা নিই, খারাপগুলো বাদ দিই…’ যেন ভাল দাওয়াহ সোর্সের খুব অভাব পড়ে গেছে।

প্রথমত, উল্লিখিত ঘটনাটির কথা স্মরণ করুন। সন্দেহযুক্ত বিষয়াদির ব্যাপারে মূলনীতি স্পষ্ট ও কঠোর। আহলে কিতাব… যাদের থেকে আপনি কোনও কিছু নিলে নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছেন সেগুলো বাতিল তাওরাতে বা ইঞ্জিলে আছে। তবুও ওদের থেকে কিছু নেওয়া নিষেধ করা হয়েছে। আর এখানে তো আমরা ভ্রান্ত উলামা আর দাঈ’ শ্রেণির কথা বলছি যারা দ্বীনের মধ্যে থেকেই অগোচরে দ্বীনকে ছেঁটে দিতে থাকবে, কিন্তু আপনি তা বুঝতেও পারবেন না। একারণেই সালাফগণ বলতেন যে মুরজিয়ারা খুরুজদের থেকেও মারাত্নক!

বেছে বেছে খুঁটে খুঁটে নেওয়ার চেয়ে বরং ভ্রান্তি (তাও আবার ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোতে) সুস্পষ্ট হওয়ার পরে সেইসকল উলামা আর তথাকথিত দাঈদের থেকে কোনোকিছুই না নেওয়া সহজ। কারণ ভাল নিচ্ছেন ভাবতে ভাবতে কখন যে খারাপটাও গ্রহণ করে ফেলবেন তা টেরও পাবেন না। মজার ব্যাপার হল এমনসব মানুষদের ভুলগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার পরও সাধারণত সেটা স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে দেখা যায় না, বরং তারা তাদের ভুলের উপর অটল থাকে, যুক্তি দেখায়।

দ্বিতীয়ত, এ ধরনের ভ্রান্ত আলেম আর দাঈদের প্রমোট করলে নতুন নতুন দ্বীনে আসা ভাইবোনেরা এদেরকে ভাল বলে জানতে থাকে এবং এদের সব কথা একবাক্যে গ্রহণ করতে থাকে। পরবর্তীতে চরম গোমরাহি প্রচার করলেও সেগুলোকে তাদের ফলোয়াররা দ্বীনের অংশ বানিয়ে নেয়। সবকিছু সহজভাবে রেডিমেড পাবার ফিতরাত থেকে এমনটা হয়। তাই দেখবেন পীরের কাছে গিয়ে যে অন্তরে শান্তি পেয়েছে তার কাছে পীর যা বলেছে সেটাই ঠিক, এমনকি সেগুলো আকিদাহ বিধ্বংসী বা অপব্যাখ্যাপূর্ণ হলেও।

এই নয়া জামানার ফেসবুক সেলিব্রিটি দাঈ আর তাদের ফলোয়ারদের অবস্থাও যেন অবিকল পীর মুরিদদের মতই। তাগুত অস্বীকারে ছাড়াছাড়ি, আল্লাহর রাসূলের ﷺ শাতিমদের ব্যাপারে ছাড়াছাড়ি, নব্যুওয়াতের আগের জীবনকে ‘ইসলাম’ বলে চালিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে কো-এডুকেশন, বিভিন্ন স্তরের স্পষ্ট গোমরাহির আহ্বান করে বেড়ালেও নয়া জামানার পীরদের অন্ধ মুরিদেরা অন্ধ অনুসরণ বন্ধ করতে চায় না।

ভাই বা বোন আমার, আপনি এখানে বুদ্ধিমানের মত সিদ্ধান্ত নিন। আল্লাহকে ভয় করুন। কিয়ামতের দিন তাদের জবাব আপনাকে দিতে হবে না, বরং আপনার জবাব আপনাকে দিতে হবে। ভ্রান্তি স্পষ্ট হওয়ার পর কেবল দুইটা জিনিস ঘটতে পারে। এক, তারা জেনেশুনে দ্বীনকে ছাটাছাটি করছে। দুই, তারা না বুঝে অজ্ঞতার কারণে করছে কিন্তু তাদের অন্তরের নিয়্যাত পরিষ্কার। ভাল করে লক্ষ্য করুন, প্রথম ক্ষেত্র সত্য হলে তো সাথে সাথেই তারা বাতিল। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্র সত্য হলেও অজ্ঞ মানুষদের অনুসরণ বর্জন বাঞ্চনীয়। আর বাস্তবতা হল, তাদের অন্তরের নিয়্যাত পরিষ্কার ছিল কি ছিল না সেটা একমাত্র আল্লাহ বিচার করবেন। আমাদের বাহ্যিক দিক দেখেই বিচার করে সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

পরিশেষে বলি, আপনি কাকে বা কাদেরকে অনুসরণ করবেন তা কিন্তু মোটেও ঢিল করে দেখার বা ছাড়াছাড়ি করবার বিষয় নয়। কোনও আলেম বা দায়ী ভুল করলে সেটার জবাব সে আল্লাহকে দেবে ঠিক, কিন্তু তাদের ভুল স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে অনুসরণের যে সিদ্ধান্ত আপনি নিচ্ছেন, সেটার জবাব কিন্তু আপনাকেই দিতে হবে… তাই যা কিছু নিয়ে আপনি আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারবেন বলে মনে করেন, তাই প্রস্তুত করুন।

আল্লাহ আমাদেরকে সহিহ বুঝ দান করুন এবং সর্বপ্রকার বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি থেকে মুক্ত হয়ে সিরতল মুস্তাকিমে চলার তাওফিক দিন।

–তানভীর আহমেদ

Facebook Comments