সান্নিধ্যের অনুভবে কুরআন তেলাওয়াত / ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

328
কুরআন তেলাওয়াত

কুরআন মজীদ আল্লাহর কালাম। আমরা আল্লাহকে দেখি নি, এই দুনিয়াতে আল্লাহকে দেখা সম্ভবও নয়; তবে আল্লাহ পবিত্র বাণী কুরআন মজীদ আমাদের মাঝে আছে। এর একেকটি আয়াত আল্লাহর নিদর্শন। এর সাহায্যে আমরা আল্লাহর পরিচয় পেতে পারি। নগণ্য বান্দা আল্লাহর সঙ্গে গড়ে তুলতে পারে গভীর বন্ধন। এতবড় কাজ কীভাবে সম্ভব তার বাস্তব দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় আল্লাহর দু’জন বান্দার জীবনের অভিজ্ঞতা হতে। যারা এক হিসেবে আমাদের খুব কাছের লোক ছিলেন।

আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল উর্দু ও ফারসি ভাষার বিশ্ববিখ্যাত কবি ও দার্শনিক। তার কাব্যসমগ্রের দুই তৃতীয়াংশ রচিত হয়েছে ফারসি ভাষায়, মাত্র এক তৃতীয়াংশ লিখেছেন তার মাতৃভাষা উর্দুতে। তার জন্ম ৯ নভেম্বর ১৮৭৭ সালে পাকিস্তানের শিয়ালকোটে আর ইন্তিকাল ২১ এপ্রিল ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে লাহোরে।

কবির চেয়েও দার্শনিক হিসেবে ইকবালের মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে। গবেষকদের মতে গত ৫০০ বছরে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইকবালের সমকক্ষ কোন দার্শনিক জন্মান নি। বিগত শতাব্দীতে ইউরোপে রেনেসাঁ আন্দোলনের প্রভাবে চারদিকে যখন ধর্মহীনতার বিস্তার হয়, মানুষ তখন বস্তুবাদ তাড়িত হয়ে ধর্ম ও স্রষ্টার প্রতি অবিশ্বাসী ও সন্দিহান হয়ে পড়ে। স্রষ্টার প্রতি এই অবিশ্বাসের অভিশাপে তারা সবকিছুর প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে পড়ে। তারা সত্য-মিথ্যা, ভাল-মন্দ বা অবস্তুগত সবকিছু অস্বীকার করে বলেন যে, জগতের সবকিছুই আপেক্ষিক।

আমরা কোন জিনিসকে সুন্দর অসুন্দর ভাবি ও বলি বলেই তা সেরূপ। অন্যথায় সুন্দর অসুন্দরের স্বতন্ত্র কোন অস্তিত্ব নেই। তারা দর্শনের যুক্তিজাল বিস্তার কওে বোঝাতে থাকেন যে, আমাদের সামনে যে বস্তুজগৎ তারও কোন অস্তিত্ব নাই। সবই আমাদের মনের কল্পনার প্রতিভাস বা প্রতিচিত্র মাত্র। এমন কি নিজের মধ্যে যে রূহ আছে তার অস্তিত্বও অস্বীকার করেন। এভাবে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী জীবনদর্শন সংশয়বাদের গোলক ধাঁধায় পতিত হয় আর মানুষ নিজের প্রতিও আস্থা হারিয়ে ফেলে।

অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের অবস্থা ছিল এই যে, তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর নির্ভরের দোহাই দিয়ে নিজের কর্মক্ষমতা ও দায়িত্ব অস্বীকার করার প্রবণতা তাদের পেয়ে বসে। তাসাউফ সাধনার নামে ‘ফানা ফিল্লাহ’র ভাবাদর্শে দুনিয়া ও দুনিয়াবী সবকিছু বিসর্জন দিয়ে আল্লাহকে পাওয়ার মিথ্যা প্রবঞ্চনার ভয়াবহ বিস্তার ঘটে। এখানেও ইখলাসের নামে ব্যক্তির নিজস্ব সত্তাকে অস্বীকার করার দুরারোগ্য ব্যাধি সংক্রমিত হয়।

আল্লামা ইকবাল এই দুই প্রান্তিক মতবাদের মাঝখানে নতুন জীবন দর্শন উপস্থাপন করে মানব সভ্যতার সামনে একটি মাইলফলক স্থাপন করেন, যা খুদি (আত্মসত্তা) দর্শন নামে প্রসিদ্ধ। অর্থাৎ ‘আমি নিজে আছি’ এ কথা তো অনস্বীকার্য সত্য। কাজেই আমার নিজস্ব অস্তিত্ব আছে। তাই আমার স্রষ্টাও আছেন এবং স্রষ্টার সূত্রে জগতের সবকিছুই অস্তিত্ববান। একই যুক্তিতে এ বিশ্বে আমার দায়িত্ব আছে এবং সে দায়িত্ব সূত্রে এখানে আমার অবস্থান – আমি পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা। আল্লাহর অভিপ্রায় বাস্তবায়ন ও আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী পৃথিবীকে সাজানোর দায়িত্ব নিয়ে আমি পৃথিবীতে এসেছি।

ইকবাল তার এই বিস্ময়কর চিন্তা ও দর্শনের রসদ সংগ্রহ করেছেন কুরআন মজীদ হতে। কুরআন মজীদের বড় বিশেষজ্ঞ না হয়েও প্রাণের সবটুকুন আবেগ দিয়ে প্রত্যহ কুরআন তেলাওয়াত তাকে মহাকবি ও কালজয়ী চিন্তানায়কে পরিণত করে। পিতার উৎসাহে ইকবাল কুরআন মজীদ হতে এমন অতুলনীয় সম্পদ কীভাবে সংগ্রহ করেন সে তথ্য বড় চমৎকার ও তাৎপর্যপূর্ণ।

উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুসলিম মনীষী মওলানা সুলায়মান নদভী ইকবালসহ আফগানিস্তান সফরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ইকবালের ছোটবেলার একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে : “কাবুল সফর থেকে ফেরার পথে কান্দাহারের বালুরাশির বিশাল প্রান্তর অতিক্রম করছি। সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের পাহাড়ের উপর আমাদের গাড়িগুলো দৌড়াচ্ছিল। সন্ধ্যা নেমেছিল। আমরা দু‘জন একই গাড়িতে বসা ছিলাম। আধ্যাত্মিকতা নিয়ে কথাবার্তা চলছিল। আলোচনা হচ্ছিল দিব্যদৃষ্টির বুযর্গদের প্রসঙ্গ নিয়ে। এসময় তিনি বড় আবেগ নিয়ে নিজের জীবনের দু’টি ঘটনা বর্ণনা করলেন। আমার মতে এই দু-টি ঘটনা তার (ইকবালের) জীবনের যাবতীয় সুকীর্তির আসল বুনিয়াদ।

তিনি বলেন – আমি যখন সিয়ালকোটে পড়ালেখা করছিলাম, তখন ভোরবেলা উঠে প্রতিদিন কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করতাম। মরহুম ওয়ালেদ সাহেব (বাবা) তার নিয়মিত দোয়া দরূদ হতে অবসর হয়ে আসতেন এবং আমাকে দেখে চলে যেতেন। একদিন ভোরে তিনি আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মুচকি হেসে বললেন : “কখনো সুযোগ হলে আমি তোমাকে একটি কথা বলব।” কথাটি বলার জন্য আমি দু-তিনবার অনুরোধ জানালে তিনি বললেন : “যখন পরীক্ষা দিয়ে নেবে, তখন।” যখন আমি পরীক্ষা দিয়ে ফেললাম এবং লাহোর থেকে ঘরে আসলাম, তখন বললেন : “যখন পাশ করে ফেলবে।” পাশ করার পর জিজ্ঞাসা করলাম। তখন বললেন যে :

“(ঠিক আছে) বলব।” একদিন ভোরে নিয়মমাফিক কুরআন তেলাওয়াত করার সময় তিনি আমার কাছে এলেন এবং বললেন : “বেটা, বলছিলাম যে, তুমি যখন কুরআন পড় তখন এরূপ যে, কুরআন তোমার উপরই নাযিল হচ্ছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তোমার সঙ্গে কথা বলছেন।”

ইকবাল বলছিলেন যে, বাবার এই উক্তি আমার অন্তরের মধ্যে বসে যায়। আর তার স্বাদ অন্তরে এখনো অনুভব করছি। এটিই ছিল সেই বীজ, যা ইকবালের অন্তরের মধ্যে বপন করা হয় আর তার পল্লবিত শাখা-প্রশাখা জগতের বিশাল আঙ্গিনায় মধুর বচনামৃতরূপে ছড়িয়ে আছে।

এ জাতীয় আরো তথ্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, কুরআন তেলাওয়াতের সময় আল্লামা ইকবালের অনুভব ছিল, এখনই বুঝি পবিত্র কুরআন মজীদ তার উপর নাযিল হচ্ছে। কুরআন মজীদের প্রতি তার এ আসক্তি ছিল আশৈশব। এ প্রসঙ্গে হাকীম মুহাম্মদ হাসান কুরেশী লিখেছেন, কুরআনে হাকীমের প্রতি তার সীমাহীন আসক্তি ছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি উচ্চৈঃস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতে অভ্যস্ত ছিলেন। কুরআন তেলাওয়াতকালে মনে হত, তিনি এর দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন। কণ্ঠস্বর বসে যাওয়ার ফলে তার মধ্যে সবচে অস্বস্তির কারণ ছিল, তিনি কুরআনে হাকীম উচ্চৈঃস্বরে পড়তে পারছিলেন না। অসুস্থতার দিনগুলোতেও কেউ তার সম্মুখে মধুর কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত করলেই তার অশ্রু প্রবাহিত হত এবং শরীরে কম্পনের অবস্থা সৃষ্টি হয়ে যেত।
হৃদয়ের জ্বলন ও আসক্তি নিয়ে তিনি কুরআন তেলাওয়াত করতেন। তিনি পড়তে থাকতেন আর কেঁদে সারা হতেন। এমনকি কুরআন মজীদের পাতাগুলো একেবারে ভিজে যেত। আর তা রোদে শুকানো হত। তিনি যে কুরআন মজীদটি নিয়মিত তেলাওয়াত করতেন, তা লাহোরের ইসলামিয়া কলেজের লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে এবং এই বর্ণনার বাস্তব প্রমাণ হয়ে রয়েছে।

কুরআন মজীদ কতখানি গভীর মনযোগ ও হৃদয়ের আবেগ ও একাগ্রতা নিয়ে তেলাওয়াত করা উচিত তা বিভিন্ন রেওয়ায়াত থেকেও অনুমান করা যায়। যেমন : হযরত খাব্বাব ইবনুল আরাত রা. বলেন, তুমি যতদূর সম্ভব আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য অর্জন কর আর তুমি এমন কোন জিনিস দিয়ে তার সান্নিধ্য অর্জন করতে পারবে না, যা তার কাছে তার কালাম (কুরআন)-এর চেয়ে অধিক প্রিয়।”

এ মর্মে সুনানে দারেমীতে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হযরত আতিয়া (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহর কাছে তাঁর কালাম (কুরআন)-এর চাইতে মর্যাদাসম্পন্ন আর কোন বাক্য নাই। আর এমন কোন বাক্য বান্দাকে আল্লাহর সান্নিধ্য দান করে নি, যা তার কাছে তার কালামের চেয়ে অধিক প্রিয়। [সুনানে দারামী]

কুরআনে হাকীমে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন : “নিশ্চয়ই মু‘মিন তারা, আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে যাদের অন্তরসমূহ প্রকম্পিত হয় এবং যখন তাদের কাছে তার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হয় তখন তা তাদের ঈমানকে বৃদ্ধি করে আর তাদের প্রভুর উপর তারা নির্ভরশীল হয়।” [সূরা আনফাল : আয়াত-২]
এই আসক্তি নিয়ে ইকবাল অন্যদেরকেও কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। যেমন নিয়াজ উদ্দীন খানকে লেখা এক পত্রে ইকবালের এই দৃষ্টিভঙ্গি এভাবে ব্যক্ত হয়েছে।

“কুরআন বেশি বেশি পাঠ করা চাই। যাতে অন্তর মুহাম্মদী সম্বন্ধ লাভ করতে পারে। এই মুহাম্মদী সম্বন্ধ (ইকবালের ভাষায় নিসবতে মুহাম্মদীয়া) লাভ করার জন্য “কুরআনের অর্থও জানতে হবে – তা জরুরী নয়। হৃদয়ের নিষ্ঠা নিয়ে কেবল পাঠ করাই যথেষ্ট।”

ইকবালের আরেকজন গবেষক ফকির সৈয়দ ওয়াহিদুদ্দীন ‘রূযেগারে ফকির’-এর ১ম খ-ে আল্লামা ইকবালের জীবনের কুরআন সম্পর্কিত ঘটনাবলীর বর্র্ণনা দিয়েছেন। তাতে ইকবালের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন : একবার লাহোরে ফোরমিন ক্রিশ্চিয়ান কলেজের বার্ষিক সভা হচ্ছিল। কলেজের প্রিন্সিপাল ড. লুক্স আমাকেও সে সভায় আমন্ত্রণ জানান। সভার প্রোগ্রামাদি শেষে চা আপ্যায়নের আয়োজন ছিল। আমরা চা পান করতে বসলাম। এ সময় ড. লুক্স আমার পাশে এলেন এবং বলতে লাগলেন, চা পানের পর চলে যাবেন না কিন্তু। আপনার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে। আমাদের চা পান শেষ হলে ড. লুক্স এসে আমাকে এক কোণায় নিয়ে গেলেন এবং বলতে লাগলেন যে, ইশবাল, আমাকে বলুন তো, আপনাদের নবীর উপর কুরআনের কি ভাবার্র্থ অবতীর্ণ হয়েছিল এবং যেহেতু তিনি শুধু আরবি ভাষাই জানতেন, সেহেত কুরআন মজীদকে (সেই ভাবার্থ) তিনি আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করে দিয়েছেন? নাকি বর্তমান ভাষ্যই এভাবে নাযিল হয়েছে? আমি বললাম, এই ভাষ্যই নাযিল হয়েছে। ড. লুক্স বিস্মিত হয়ে বললেন, ইকবাল আপনার মত লেখাপড়া জানা লোক কীভাবে একথা বিশ্বাস করেন যে, কুরআনের ভাষ্যই এভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। আমি বললাম, ড. লুক্স! নিশ্চয়ই আমার অভিজ্ঞতা আছে। আমার উপর কবিতা তো পূর্ণাঙ্গরূপে অবতীর্ণ হয়। তাহলে পয়গাম্বর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর ভাষ্য কেন পূর্ণাঙ্গরূপে অবতীর্ণ হবে না?
ইকবাল গবেষক ইবাদুল্লাহ ফারুকী লিখেছেন, আল্লামা ইকবাল তার বিখ্যাত ‘খুতবাত’ এর এক জায়গায় বলেন, সূফিয়ায়ে কেরামের মধ্যকার একজন বুযর্গ বলেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত মু‘মিনের অন্তরের উপর কিতাব (কুরআন মজীদ) সেভাবে নাযিল না হবে, যেভাবে আঁহযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাযিল হয়েছিল ততক্ষণ তাকে বোঝা সম্ভব নয়। …ইকবাল তাঁর অনবদ্য রচনা ‘বালে জিব্রিল’ (জিব্রাঈলের ডানা)Ñএর মধ্যে এ অভিব্যক্তিটি এভাবে ব্যক্ত করেছেন : তোমার অন্তঃকরণে যতক্ষণ না হবে অবতরণ কিতাবের, জট খুলতে পারবে না রাজি কিংবা রচয়িতা কাশশাফের।
রাজি মানে বিখ্যাত বিশাল তাফসীর গ্রন্থ ‘তাফসীরে কবির’-এর রচয়িতা ইমাম ফখরুদ্দীন রাজি। আর ‘রচয়িতা কাশশাফে’র মানে ইসলামী জাহানে কুরআন মজীদের অলৌকিত্বের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে সর্বমহলে সমাদৃত তাফসীরগ্রন্থ ‘কাশশাফ’Ñএর রচয়িতা আল্লামা জারুল্লাহ যামাখশারী। ইকবাল বলছেন যে, কুরআন তেলাওয়াতকারীর অনুভবে যদি এখনই কুরআন তেলাওয়াত হচ্ছে এমন উপলব্ধি না আসে তাহলে ইমাম রাজি বা আল্লামা যামাখশরীর তাফসীর পড়লেও তা তোমার অন্তরের জট খুলতে পারবে না।
মনে হবে কুরআন তেলাওয়াতে আল্লামা ইকবালের নিমগ্নতা ইসলামের ইতিহাসের নতুন অভিজ্ঞতা। কিন্তু না। অন্যান্য বুযর্গের জীবনেও এর নজির বিদ্যমান। এ সম্পর্কে সাম্প্রতিককালের একজন বুযুর্গের অভিব্যক্তি এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।
বাংলাদেশের অন্যতম আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মীর মুহাম্মদ আখতার (রহ.)। তিনি আত্মপরিচয় লুকিয়ে রাখলেও তার স্থলবর্তী খলিফা মওলানা আব্দুল জব্বার (রহ.) বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। মওলানা মুহাম্মদ আব্দুল জব্বার (রহ.)-এর অনুলিখনে মওলানা মীর মুহাম্মদ আখতর (রহ.)-এর একটি কিতাবের নাম ‘বেশারাতুল ইখওয়ান ফী খাওয়াচ্ছিল কুরআন’। কুরআন ও হাদীস ভিত্তিক দোয়া দরূদ সংক্রান্ত এই কিতাবের শেষভাগে কুরআন তেলাওয়াতের আদব ও নিয়ম সম্পর্কিত বর্ণনাটি সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি কথাগুলো বলেছেন, হযরত আব্দুল আযীয দেহলভী (রহ.)-এর বরাতে। তিনি বলেন, “এই স্থানে বরকতের জন্য খাতিমূল মুফাছছিরীন হজরত শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিছ দেহলবী (রা)-এর কতেক ভাষ্য উদ্ধৃত করা হইল। তিনি ফরমাইয়াছেন : পাক কোরআন তেলাওয়াতের নিয়মাবলী এই যে, সভ্য শায়েস্তাভাবে যথাসম্ভব কেবলামুখী হইয়া তেলাওয়াত করা এবং অক্ষরকে যথাস্থান হইতে বাহির করিয়া প্রত্যেকটি শব্দের উচ্চারণ করা এবং মদ্দা ও তশদীদকে সঠিক আদায় করা, ছাড়িয়া না যাওয়া আর ওয়াকফের জায়গায় ওয়াকফ করা। এই সমস্ত হইতেছে কোরআন পাঠের যাহেরী আদব। আর বাতেনী আদাবের মধ্যে অবশ্য তেলাওয়াতকারীর শ্রেণী হিসাবে পার্থক্য বিদ্যমান। যদি তিনি তরীকত মা‘রেফতের প্রাথমিক শ্রেণীর লোক হন, তবে তাহার তেলাওয়াতের বাতেনী আদব এই যে, তিনি মনে প্রাণে এইরূপ ধারণা করিয়া লইবেন যে, আমি আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সম্মুখে তেলাওয়াত করিতেছি এবং তিনি স্বয়ং ওস্তাদের জায়গায় বসিয়া আমার তেলাওয়াত শ্রবণ ফরমাইতেছেন। আর যাঁহারা মা‘রেফতের উচ্চাসন লাভ করিয়াছেন তাঁহাদের তেলাওয়াতের বাতেনী আদব এই যে, যখন তিনি পড়িতেছেন যদিও নিজ মুখে পাঠ করিতেছেন, কিন্তু তিনি নিজকে হারাইয়া ফেলিয়া এই খেয়ালের বশীভূত হইয়া যাইবেন যে, আল্লাহর বাণী আল্লাহরই দরবার হইতে প্রচার হইতেছে অথবা আল্লাহর বাণীর প্রচার আল্লাহর তরফ হইতে এবং শ্রবণের কর্তব্য আমার কর্ত দ্বারা আন্জাম্ হইতেছে। হজরত জা‘ফর সাদিক (রহ.) এই মাকামের দিকে ইঙ্গিত করিয়াছেন। যেমন শায়খুশ শুয়ুখ আওয়ারিফ কিতাবে তাঁহার বক্তব্য উদ্ধৃত করিয়াছেন : “অবশ্য (আমি তেলাওয়াতকালে) ততক্ষণ কোন আয়াত তেলাওয়াত করি না, যতক্ষণ সেই তেলাওয়াত উহার ভাষ্যকার হইতে আমি না শুনি।” (বেশারাতুল ইখওয়ান ফী খাওয়াচ্ছিল কুরআন, পৃ. ১৯৪-১৯৫)

প্রশ্ন আসতে পারে, মানুষ আল্লাহর কাছ থেকে কুরআনের বাণী শ্রবণ করবেন, তা কীভাবে সম্ভব? অথবা মানুষের মুখ দ্বারা কীভাবে সরাসরি আল্লাহর বাণী উচ্চারিত হওয়া সম্ভব। এর ব্যাখ্যায় কুরআন মজীদে বর্ণিত আল্লাহর সঙ্গে  মূসা (আ.)-এর কথাবলার একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। মূসা (আ.) স্ত্রী বিবি সারাকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি হযরত শোয়াইব (আ.)-এর কাছ থেকে আসছিলেন। পথিমধ্যে দেখা দেয় তার স্ত্রীর প্রসব বেদনা। মুসাফিরির হালতে এমন কষ্টকর পরীক্ষা হয়ত আল্লাহর নবীদের জন্যই বরাদ্দ ছিল। বিজন প্রান্তর, আঁধার রাত, শীতের মওসুম। মূসা (আ.) একটুও বিচলিত হলেন না। স্ত্রীকে সান্তনা দিয়ে বললেন, ঐ দূরে পাহাড়ের গায়ে আগুন দেখা যায়। আমি যাই। হয়ত সেখান থেকে আগুন পাব অথবা আগুনের কোন ব্যবস্থা হবে। মূসা আ. আগুনের আশায় পাহাড়ের কাছে গেলেন তো অবাক। যে গাছটিতে আগুন জ্বলছিল, তা কথা বলে উঠল।

মূসাকে নাম ধরে ডাক দিয়ে বলল, হে মূসা! আমি তোমার প্রভু আল্লাহ। তুমি তো এক পবিত্র প্রান্তরে উপনীত। কাজেই তোমার পাদুকা খুলে ফেল। কাজেই গাছ যেভাবে দাবি করল যে, আমি আল্লাহ আর একই সঙ্গে আল্লাহর হয়ে কথা বলল, তেমনি কুরআন তেলাওয়াতকারীরও এরূপ অনুভবে আত্মহারা হওয়া সম্ভব। মওলানা মীর মুহাম্মদ আখতর (রহ.) শেখ শাহাব উদ্দীন সোহরাওয়ার্দী প্রণীত আওয়ারেফুল মাআরেফ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।

তিনি বলেন : আওয়ারিফ কিতাবে বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করা হইয়াছে যে, তেলাওয়াতের সময় হযরত ইমাম জাফর সাদিক (রা) হজরত মূসা (আ.)-এর সেই বৃক্ষের পর্যায়ে হইতেন, যাহা হইতে বাণী প্রচার হইয়াছিল : “নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ সমগ্র বিশ্বের প্রভু পালনকর্তা। (হজরত মূসা আ. ) যদিও উক্ত বাণী বৃক্ষ হইতে শ্রবণ করিলেন কিন্তু আসলে প্রচার হইতেছিল আল্লাহর তরফ হইতে। উচ্চ পর্যায়ের আউলিয়াগণ কোরআন তেলাওয়াতকালে সেই বৃক্ষের মতই হইয়া যান।(বেশারাতুল ইখওয়ান, পৃ. ১৯৫)

কারো সঙ্গে সম্পর্ক করতে চাইলে করণীয় কী? এ প্রশ্নের জবাব হবে, তার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। আবার যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, কারো সঙ্গে পরিচিত হওয়ার উপায় কী? তাহলে উত্তর হবে, কারো সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সবচে সহজ ও একমাত্র পথ হচ্ছে তার সঙ্গে কথা বলা। যদি কল্পনা করা হয় যে, কোন একজন বিদেশী লোক, তার সঙ্গে পরিচয় ও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তাহলে সবচে কার্যকর পথ হচ্ছে, তার ভাষাতেই কথা বলা।

এমনকি অর্থ না বুঝেও যদি কোন বিদেশীকে তার কোন উক্তি শুনিয়ে দিতে পারে তাহলে তার মনযোগ আকর্ষণ করতে মোটেও কষ্ট হবার কথা নয়। এই উপমাটি পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত এবং তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও সান্নিধ্য অর্জনের দর্শন বোঝার ক্ষেত্রে শতভাগ প্রযোজ্য। তেলাওয়াতের সময় যে যতখানি আল্লাহর জন্য নিবেদিতপ্রাণ হতে পারবে তার পক্ষে ততখানি আধ্যাত্মিক উন্নতি ও আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। কেননা, আরেক রেওয়ায়াত অনুযায়ী কুরআন মজীদ হচ্ছে আল্লাহকে পাওয়ার রশি।

শুধু তাই নয়, এটি এমন রশি যার একপ্রান্তে আছেন মহান আল্লাহ তাআলা আর অপর প্রান্তে আল্লাহর বান্দা।
ইরশাদ হয়েছে : “হযরত আবু শুরাইহ আল-খাযায়ী (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে উপস্থিত হলেন। তখন তিনি বললেন : তোমরা সুসংবাদ নাও, সুসংবাদ নাও। তোমরা কি সাক্ষ্য দাও না যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই। আর আমি আল্লাহর রাসূল। তারা বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এই কুরআন হচ্ছে এমন অবলম্বন (রশি) যার এক প্রান্ত রয়েছে আল্লাহর হাতে, আরেক প্রান্ত তোমাদের হাতে। কাজেই তোমরা একে মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধর। একে মজবুতভাবে ধরার পরে তোমরা কখনো ধ্বংস হবে না এবং পথহারাও হবে না।” [বুখারী ও মুসলিম]

Facebook Comments