জনসংখ্যা ও বিশ্বাস

663
জনসংখ্যা সমস্যা

ইসলামের যেসব বিষয়ে আজ বহু মুসলিমদের মধ্যেই দোটানা কাজ করে, তার মধ্যে অন্যতম একটি হল ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ’। বিশেষ করে ছোটবেলা থেকেই যে বান্দারা ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’, ‘Population Problem’ ইত্যাদি রচনা-প্যারাগ্রাফ লিখে বড় হয়েছে, তারা দ্বীনদার হওয়ার পরও এবিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটুখানি খটকা যেন অনেকেরই থেকে যায়। আজ সে বিষয়েই একটু ঝাড়ফুঁক করা যাক।

পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি জনবহুল দেশ চীন; ১৪১ কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস সেখানে। জীবনব্যবস্থা, প্রযুক্তি, চিকিৎসা প্রভৃতির উন্নতির সাথে সাথে হু হু করে জনসংখ্যা বেড়ে চলে। এই বিষয়টিকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নিয়ে চীন ১৯৭৯ তে One Child Policy চালু করে অর্থাৎ, কেউ একের অধিক সন্তান নিতে পারবে না। প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল এই তো চুকে যাবে জনসংখ্যা সমস্যা। তাহলে এর পরের গল্পে চোখ বুলানো যাক।

চীনা দম্পতিরা যখন দেখল একজনের বেশি সন্তান নিতে পারবে না, তারা ছেলে সন্তানকেই প্রাধান্য দিল। ‘বাবামায়ের বৃদ্ধ বয়সে ছেলে দেখেশুনে রাখবে’, ‘মেয়েকে তো পরের সংসারেই পাঠিয়ে দিতে হয়’ – এমনসব স্বাভাবিক ধারণা থেকেই একমাত্র সন্তানটি ছেলেই হোক চেয়েছিল চীনা দম্পতিরা। আর সেকারণে মেয়ে সন্তান হলে অ্যাবরশন করিয়ে ফেলতেও দ্বিধা করতো না। এভাবে করেই চলল দুই দশকেরও বেশি সময়।

ফলাফলে নিদারুণভাবে নষ্ট হয়ে গেল জেন্ডার রেশিও। এখন চীনে প্রতি ১০০ জন মেয়ের জন্য ১০৬ জন ছেলে। প্রথমে মনে হতে পারে মাত্র ৬ জন… তাহলে মোট জনসংখ্যার বিশালতার দিকে তাকান। আসল হিসাবে প্রায় ৬ কোটি নারী সংকটে পড়েছে চীন। এতটুকুতেই কাহিনী শেষ হতে পারতো। কিন্তু না, আরও এক জেনারেশন আগে থেকেই পুরুষেরা নারীর অভাবে বিয়ে করতে পারছে না। এখন বিয়ের বাজারে নারীদের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। অনেকে বিয়ের জন্য ষাট বছর পর্যন্ত টাকা জমিয়েছে এমনও নাকি হদিস রয়েছে। বিয়ে না করতে পারায় আর্থসামাজিক চরম অবক্ষয়ের মুখে রয়েছে চীন। অবশেষে ২০১৫ সালে চীন বাধ্য হয়ে উঠিয়ে দিয়েছে One Child Policy। কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হবার তা হয়েছে ভালভাবেই। 

ইকোনোমিস্টের একটি রিপোর্টে উঠে এসেছিল চীনের এইসমস্ত তথ্য। International Food Policy Research Institute (IFPRI) এ গত বছরের নভেম্বরে ইকোনোমিস্টের রিপোর্ট উল্লেখ করা হয়েছিল। [১] এছাড়া জার্নালগুলোতে ঘাঁটলে Gender Ratio সামান্য এদিক ওদিক হলেই সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কত ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে তা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাবেন। [২]


এটা পড়তে পারেন এক মূহুর্তের রাগ, সারা জীবনের কান্না।


শুধু চীন নয়, ভারত, ফ্রান্স, জার্মানি সহ অনেক দেশই Gender Ratio এর এই সমস্যায় মারাত্নক আক্রান্ত। রাশিয়ায় নাকি মেয়েরা বর খুঁজে পায় না। ‘দুইটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভাল হয়’ ধরনের ক্যাম্পেইন যখন এখানে জোরেশোরে চালানো হতো আর যুক্তি (অপ) দেখানো হতো, এ ব্যাপারে ইসলামের সাধারণ বিধান (অধিক সন্তান গ্রহণ) নিয়ে মুসলিমরা চুপসে থাকা শুরু হয়েছিল; আর আজ অবধি অনেকে চুপসেই আছে।

কাফিরদের যুক্তি আর লাইফস্টাইলে মুগ্ধ হয়ে ওদের থেকে ধার করা হয়েছিল এই বিষয়টি। এখনই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ না করলেও এমন অবস্থা চলতে থাকলে সব অঞ্চলই ধীরে ধীরে আর্থ সামাজিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অতিপ্রাকৃতিক সত্ত্বা তথা আল্লাহর উপর বিশ্বাসকে ছাঁটাই করে যখন মানুষ নিজ বুদ্ধিতে কাজ করতে যায় তখন এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক

হ্যাঁ, মূল সমস্যা এটাই। কিছু বিষয়ই আছে যেগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা অসার বৈ কিছু নয়। কিছু বিষয়ই আছে যেগুলো সৃষ্টিকর্তার জিম্মাদারিতে ছেড়ে দিতে হয়। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা ও ধর্মব্যবস্থাকে রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে আলাদা করে ফেলা নাস্তিক্যবাদী সিস্টেম যুক্তি থেকে পণ্ডিতি করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। বড় বড় জায়ান্টরাই যে এখন সমস্যায় কুপোকাত হচ্ছে সেটা তো প্রত্যক্ষ। আর আমাদের সমস্যা হল, আমরা পরাজিত মনোভাব নিয়ে কাফিরদের ফালতু যুক্তিগুলোই বারবার শুনতে শুনতে সত্য ভেবে ওদেরকেই অনুসরণ করতে শুরু করি। একটা মিথ্যাকে বারংবার সত্য হিসেবে প্রচার করতে থাকলে সেটা একসময় সত্য হিসেবেই প্রচলিত হয়ে যায়। আর জনসংখ্যার এই ব্যাপারটা তারই একটা উদাহরণমাত্র।

কনভিন্সড না তাই না? বিশ্বাসের ব্যাপারটা এমনই, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে চাইলে কনভিন্সড হওয়া গেলে সেটাকে ‘বিশ্বাস’ বলা হতো না। আরেকটি ছোট্ট বিষয় অবতারণা করেই তাহলে শেষ করি। সেটা হল The Returning Soldier Effect phenomenon : যুদ্ধ বিগ্রহ আর Stress এর সময় মেয়ে সন্তানদের তুলনায় ছেলে সন্তান অধিক হারে জন্ম নেয়। যুদ্ধ বিগ্রহ, আন্দোলন ইত্যাদিতে ছেলেরা সাধারণত বেশি মারা যায়, একইসাথে সেসময় জন্মগ্রহণ করা শিশুদেরও বেশিরভাগ হয় ছেলে! এমন ঘটনার সত্যতায় কোনো ভুল নেই, কিন্তু কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না কেন এমনটা হয়। একদিন হয়তো সাইকোলজির বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবষকেরা এই হরমোন, ঐ হরমোন ইত্যাদি বলে কয়ে কীভাবে হয় সেটার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাবে। কিন্তু ‘কেন হয়?’ সেই উত্তর ‘আল্লাহর বিশ্বাস’কে বাদ দেওয়া বোকারা কখনও ঠাহর করতে পারবে না।

References:

[১] https://tinyurl.com/y6wvalv4

https://twitter.com/TheEconomist/status/953312804622229505

https://tinyurl.com/yazylmhu

[২] http://www.pnas.org/content/103/36/13271.full

================

লেখক তানভীর আহমেদ

Facebook Comments