মদীনা সনদ – পৃথিবীর সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান ।

1054
মদীনা সনদ

হজরত মুহাম্মদ (সা.) দৃঢ় ভিত্তির ওপর ইসলামী রাষ্ট্রের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সাম্রাজ্যের সব সম্প্রদায়ের লোকের সহযোগিতা ও সমর্থন না পেলে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। যে দেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বাস সে দেশে সব ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা বিশেষ প্রয়োজন। এদিক থেকে হজরতের নীতি ছিল- ‘নিজে বাঁচ এবং অপরকেও বাঁচতে দাঁও।’ তিনি মদিনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের মুসলমান, ইহুদি ও পৌত্তলিকদের নিয়ে একটি সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তদনুসারে এ তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক সনদ স্বাক্ষরিত হয়। এটা ‘মদিনার সনদ’ নামে পরিচিত। এর ধারাগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো –

(০১) এটি নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) হতে (জারীকৃত) একটি দলিল, যার ভিত্তিতে মুমিন, কুরাইশ ও ইয়াসরিব (মদীনার) গোত্রভূক্ত মুসলিম, এবং যারা তাদের অনুসারী কিংবা তাদের সাথে কর্মের বন্ধনে (বা লেনদেনে) আবদ্ধ, তাদের সকলের পারষ্পরিক সম্পর্ক নির্ধারিত হবে। তারা সকলে মিলে এক জাতিগোষ্ঠী- একটি উম্মাহ হিসেবে পরিগণিত হবে।

(০২) কুরাইশ মুহাজিরগণ তাদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী রক্তপণ আদায় করতে থাকবে।

(০৩) যে কোন যুদ্ধে যুদ্ধবন্দীদেরকে দয়া এবং ইনসাফপূর্ণ রীতিতে ব্যবহার করা হবে, যা মুমীনদের স্বভাবসুলভ। (জাহেলীযুগের প্রচলিত সহিংসতা এবং শ্রেণীভেদ বর্জনীয়)

(০৪) বনি আউফ (মদীনার একটি মূল গোত্র) তাদের মধ্যকার রক্তপণ নির্ধারণ করবে, তাদের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী।

(০৫) যে কোন যুদ্ধে, যদিও তা মুসলিম বাদে অপর গোত্রগুলোর মধ্যেও সংঘটিত হয়, সে ক্ষেত্রেও যুদ্ধবন্দীদের প্রতি দয়াদ্র এবং ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতে হবে, ইসলামপূর্ব রীতিতে নয়।

(০৬) বনি সা’য়েদা, বনি হারিছ, বনি জুশাম এবং বনি নাজ্জারও উপরোক্ত মূলনীতি অনুযায়ী পরিচালিত হবে।

(০৭) বনি আমর, বনি আউফ, বানি আন-নাবিত এবং বনি আল আউসও একই মূলনীতি অনুসরণ করবে।

(০৮) বিশ্বাসী মুসলিমগণ তাদের যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করার জন্য মুক্তিপণের ব্যবস্হা করবে, এবং এ দায়িত্ব সামগ্রিকভাবে উম্মাহ (জাতিগোষ্ঠী)-এর সকলের উপরেই বর্তাবে, শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট পরিবারের উপরে নয়।

(০৯) কোন মু’মিন অপর মু’মিনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার আজাদকৃত দাসের সাথে মিত্রতা গড়ে তুলবে না।

(১০) আল্লাহকে ভয় করে এমন সকল মু’মিন, যেকোন ধরণের বিশ্বাসঘাতকদের প্রতিরোধ করবে। সেই সাথে যারাই (জুলম) বেইনসাফি, পাপাচার, দূর্নীতি কিংবা শত্রুতার ইন্ধনদাতা তাদেরকে প্রতিরোধ করবে।

(১১) এ ধরণের কার্যক্রমে জড়িত যে কেউ, এমনকি সে যদি আপন পুত্র বা স্বজনদের মধ্য হতেও হয়, তাকেও ছাড় দেয়া হবেনা।

(১২) কোন মু’মিন অপর কোন মু’মিন ভাইকে হত্যা করবে না, কোন কাফিরের স্বার্থে (এমনকি সে কাফির যদি তার নিকটাত্নীয়ও হয়)।

(১৩) কোন বিশ্বাসী মু’মিন কোন কাফিরকে অপর বিশ্বাসী মু’মিনের বিরুদ্ধে সহায়তা করবে না।

(১৪) আল্লাহর নামে দেয়া সুরক্ষা সকলের জন্যই মান্য এবং প্রযোজ্য হবে। মু’মিনদের মধ্যে দূর্বলতম কেউ যদি কাউকে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়, তা সকল মু’মিনের জন্য অবশ্যপালনীয় হবে।

(১৫) সকল বিশ্বাসী মু’মিন (গোত্র নির্বিশেষে) পরষ্পর বন্ধু হিসেবে পরিগণিত হবে।

(১৬) যে সকল ইহুদী মু’মিনদের মিত্র হবে, তাদেরকে সকল প্রকার সহায়তা করা হবে, এবং তাদের সমানাধিকার স্বীকৃত হবে। (রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার সাপেক্ষে তারা অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আইনগত সকল অধিকার ভোগ করবে)

(১৭) কোন ইহুদীকেই ইহুদী হওয়ার জন্য কোন প্রকার বৈষম্য করা হবেনা।

(১৮) ইহুদীদের শত্রুদের (এমনকি সে যদি বিশ্বাসীদের মিত্রও হয়) সহায়তা করা হবে না।

(১৯) মদীনার অধিবাসীদের সাথে আংশিক শান্তিচুক্তি অগ্রহনযোগ্য। (অর্থ্যাৎ মদীনার অধিবাসী সকলে একই শত্রুতা বা মিত্রতার অধীন, আলাদা আলাদা ভাবে নয়)

(২০) মু’মিনগণ যখন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে লিপ্ত থাকবে, সে যুদ্ধাবস্হায় মদীনার কারো সাথে আলাদাভাবে মিত্রতা চুক্তি করা যাবেনা।

(২১) যুদ্ধাবস্হা বা শান্তির সময়কার সকল শর্তাবলী, এবং অবস্হাসমূহ মদীনার সকলের উপরেই সমভাবে প্রযোজ্য হবে।

(২২) যে কোন যুদ্ধযাত্রায়, একজন ঘোড়সওয়ার একজন সহযোদ্ধার সাথে তার বাহন ভাগাভাগি করবে।

(২৩) একজন মু’মিন আল্লাহর পথে লড়াই রত অপর বিশ্বাসী মু’মিনের রক্তের প্রতিশোধ নেবে।

(২৪) বিশ্বাসী মু’মিনগণ ঈমানের বলে বলীয়ান এবং কুফরের বিরুদ্ধে দৃঢ়পদ, এবং ফলশ্রুতিতে আল্লাহর প্রদত্ত হিদায়েতের সম্মানে ভুষিত। অপরাপর গোত্রসমূহও এ মর্যাদা অর্জনে অভিলাষী হওয়া উচিৎ।

(২৫) কোন কাফির মক্কার কুরাইশদের (যুদ্ধলব্ধ) শত্রুসম্পত্তি নিজ আওতায় রাখার অধিকার রাখেনা। যেকোন শত্রু সম্পত্তি রাষ্ট্রের জিম্মায় প্রত্যার্পন করতে হবে।

(২৬) কোন কাফির/অবিশ্বাসী কুরাইশদের সপক্ষে সুপারিশ করবে না কেননা কুরাইশগন মদীনা নিবাসীদের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

(২৭) যদি কোন কাফির কোন মু’মিনকে হত্যা করে, কোন যথাযথ কারণ ব্যতীত- তবে তাকেও হত্যা করা হবে, যতক্ষণ না তার স্বজনেরা সন্তষ্ট হয়। সকল মু’মিন এ ধরণের খুনীর বিপক্ষে থাকবে এবং হত্যাকারীকে কখনোই আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেবেনা।

(২৮) কোন ব্যাপারে পারষ্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে সে’টি সমাধানের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূল (সাঃ)- এর কাছে ন্যস্ত করা হবে।

(২৯) ইহুদীরাও যে কোন যুদ্ধে সহযোগিতায় মু’মিনদের সাথে সমভাবে অবদান রাখবে।

(৩০) বনি আউফ গোত্রের অধীন ইহুদীগণ মু’মিনদের সাথে একই সমাজের অধীন হিসেবে পরিগণিত হবে। তাদের মুক্ত গোলামদের জন্যও একই বিধান প্রযোজ্য হবে। যারা অন্যায় এবং পাপাচারে লিপ্ত, তাদের এবং তাদের পরিবারবর্গের জন্য এ ঘোষণা প্রযোজ্য হবে না।

(৩১) বনি নাজ্জার, বনি আল হারিস, বনি সায়েদা, বনি জুশাম, বনি আল আউস, সা’লাবা এবং জাফনা এবং বনি শুতাইবা গোত্রভূক্ত সকল ইহুদীদের জন্যও উপরোক্ত ঘোষণা প্রযোজ্য হবে।

(৩২) আস্হা এবং আনুগত্যই বিশ্বাসঘাতকতার দূর্বলতার প্রতিষেধক।

(৩৩) সা’লাবা গোত্রের আজাদকৃত দাস, সা’লাবা গোত্রের সমান মর্যাদার অধিকারী হবে। এ সমানাধিকার প্রযোজ্য হবে ভারসাম্যপূর্ণ লেনদেন, যথার্থ নাগরিক দায়িত্ব পালন এবং যুদ্ধে অংশগ্রহনে।

(৩৪) যারা ইহুদীদের সাথে মিত্রতা চুক্তিতে আবদ্ধ, তাদের সাথে সেমতেই আচরণ করা হবে।

(৩৫) এ চুক্তিনামায় অংশীদার কেউই মুহাম্মাদ (সাঃ)- এর অনুমতি ব্যতিরেকে যুদ্ধ যাত্রা করতে পারবে না। যে কোন অন্যায়ের প্রতিবিধান করা হবে।

(৩৬) যে কেউ কোনধরণের সতর্কবার্তা ব্যতীত অন্যায়ভাবে অপরকে হত্যা করলে সে নিজেকে এমনকি তার পরিবারবর্গকে হত্যার যোগ্য করে তুলবে।

(৩৭) মুসলিম এবং ইহুদী, উভয়েই তাদের নিজ নিজ যুদ্ধযাত্রার খরচ বহন করবে।

(৩৮) যেকোন বহিঃশত্রুর আক্রমণে, উভয়েই একে অপরের নিরাপত্তাবিধানে এগিয়ে আসবে।

(৩৯) চুক্তিবদ্ধ সকল পক্ষই পারষ্পরিক মন্ত্রণা এবং পরামর্শে অংশ নেবে।

(৪০) আস্হা এবং আনুগত্যই বিশ্বাসঘাতকতার দূর্বলতার প্রতিষেধক। যারা পারষ্পরিক পরামর্শকে অবজ্ঞা করে তারা মূলতঃ আস্হা এবং আনুগত্যের সংকটে ভুগে।

(৪১) কোন ব্যক্তি তার মিত্রদের কাজের দায় বহন করবে না।

(৪২) কারো প্রতি জুলম করা হলে তার সহায়তা করা সকলের অবশ্যকর্তব্য।

(৪৩) ইহুদীরা কোন যুদ্ধে অংশ না নিলেও সে যুদ্ধের খরচ বহনে সহায়তা করবে।

(৪৪) চুক্তিবদ্ধ সকলের জন্য ইয়াসরিব (মদীনা) হবে নিরাপত্তার শহর।

(৪৫) কোন অপরিচিত ব্যক্তি চুক্তিভুক্ত যে গোত্রের মিত্রতায় আবদ্ধ, তাকে সে গোত্রের একজন হিসেবেই আচরণ করা হবে, যতক্ষন পর্যন্ত সে কোন অন্যায় অথবা বিশ্বাসঘাতকতা না করছে। রাষ্ট্রবিরোধী যে কোন উস্কানীমূলক কার্যকলাপ শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

(৪৬) কোন নারীকে কেবলমাত্র তার গোত্রের অনুমতিক্রমেই অপর কেউ নিরাপত্তাধীন করতে পারবে।

(৪৭) কোন ধরণের মতবিরোধ কিংবা মতদ্বৈততার ক্ষেত্রে, যা পারষ্পরিক বিবাদের কারণ হতে পারে, সে’টি আল্লাহ এবং তার রাসূলের (সাঃ) নিকট সমাধানের জন্য ন্যস্ত করা হবে। তিনি এ দলীলের মধ্যকার যথার্থ কল্যাণকর অংশ অনুসরণ করবেন।

(৪৮) কুরাইশ এবং তাদের মিত্রদের সাথে কোন প্রকার নিরাপত্তাচুক্তি নয়।

(৪৯) মদীনার উপরে যেকোন আক্রমন, এ চুক্তিবদ্ধ সকলেই সমভাবে প্রতিহত করবে।

(৫০) যদি এ চুক্তির মুসলিম ব্যতীত অপর পক্ষসমূহ কারো সাথে কোন প্রকার শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়, তবে তারা তা মান্য করবে। যদি মুসলিমদেরকেও এ শান্তিচুক্তি মান্য করতে আহবান করা হয়, তারা সেটাকে মান্য করবে, শুধুমাত্র যখন তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে লিপ্ত সে সময় ব্যতীত।

(৫১) প্রত্যেকেই তার নিজস্ব দল বা গোত্রের কর্মকান্ডের দায়িত্ব বহন করবে, ভালো কিংবা মন্দ। গোত্রীয় শৃংখলা রক্ষায় এর বিকল্প নেই।

(৫২) আল আউস গোত্রভুক্ত ইহুদী এবং তাদের আজাদকৃত দাসগণ, যতদিন এ চুক্তি মান্য করবে, ততদিন পর্যন্ত সমানাধিকার ভোগ করবে। আস্হাই বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিষেধক।

(৫৩)যে কেউ আস্হার সাথে কাজ করবে, তা তার নিজের জন্যই কল্যানকর হবে।

(৫৪) আল্লাহ এই চুক্তিকে অনুমোদন দিয়েছেন।

(৫৫) কোন অপরাধী কিংবা অন্যায়কারীকে এ চুক্তি নিরাপত্তা দেয় না।

(৫৬) এ চুক্তির আওতাধীন যে কেউ, চাই সে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকুক কিংবা স্বগৃহে অবস্হান করুন, নিরাপত্তাধীন হবে যতক্ষণ পর্যন্ত কোন অন্যায় অপরাধ সংঘটন করে (ব্যক্তিগত দূর্বলতার কারণে যুদ্ধে অংশ না নিলে তা শাস্তিযোগ্য হবে না)।

(৫৭) আল্লাহ তাদেরকেই রক্ষা করেন যারা সৎ এবং তাঁকে ভয় করে, এবং মুহাম্মাদ সাঃ তাঁর প্রেরিত রাসূল।

সনদের ফলাফল : মদিনার সনদ মদিনার রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নাগরিক জীবনে বিরাট পরিবর্তন আনে। প্রথমত, এ সনদ রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনে সাহায্য করে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে নিয়ত যুদ্ধরত গোত্রগুলোর শহর শান্তিপূর্ণ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর রসুলের দেওয়া নতুন সংবিধান অনুযায়ী এটা গৃহযুদ্ধ ও অনৈক্যের স্থলে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে। নবী কারিম (সা.) মদিনার প্রত্যেক মানুষের (মুসলমান বা ইহুদি) জানমালের নিরাপত্তা বিধান করেন। তৃতীয়ত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মদিনার সব নাগরিককে এ সনদ সমানাধিকার দান করে। চতুর্থত, এটা মদিনার মুসলমান ও অমুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলে এবং মোহাজেরদের মদিনায় বসবাসের জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা করে। পঞ্চমত, মদিনায় ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, এ সনদ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।

মদিনার সনদের গুরুত্ব : মদিনার সনদ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় বহন করে। তার প্রণীত সনদ ‘দুনিয়ার ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র’। এটা নাগরিক সাম্যের মহান নীতি, আইনের শাসন, ধর্মের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ঘোষণা করে। তাই এটাকে ইসলামের ‘মহাসনদ’ বলা হয়।

মদিনার সনদে সব সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা ও সহযোগিতার প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গোত্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত না করে প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ন রেখে এ সনদ উদারতার ভিত্তিতে একটি বৃহত্তর জাতি গঠনের পথ উন্মুক্ত করে।

এ সনদের দ্বারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা হয়। রাষ্ট্র ও ধর্মের সহাবস্থানের ফলে ঐশীতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বস্তুত, মদিনার সনদ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বীজ বপন করে। ঐতিহাসিক বার্নার্ড লুইসের মতে, এ দ্বৈত সনদ (ধর্ম ও রাজনীতি) তখন আরবে অপরিহার্য ছিল। সে সময়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যম ছাড়া ধর্ম সংগঠিত হওয়ার উপায় ছিল না। রাজনৈতিক দিক থেকে পশ্চাৎপদ আরবদের কাছে ধর্ম ছাড়া রাষ্ট্রের মূলভিত্তি গ্রহণীয়ও হতো না। অধ্যাপক হিট্টি বলেন, ‘পরবর্তীকালের বৃহত্তর ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল ছিল মদিনার প্রজাতন্ত্র।’

মদিনার সনদের দ্বারা হজরতের ওপর মদিনার শাসনতান্ত্রিক কর্তৃত্ব অর্পিত হয়। কুরাইশদের বিরুদ্ধে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে এটা তার ক্ষমতা ও মর্যাদাকে যথেষ্ট বৃদ্ধি করে। সনদের শর্ত ভঙ্গ করার অপরাধে নবী কারিম (সা.) ইহুদিদের মদিনা থেকে বহিষ্কৃত করেন। এ সনদে সংঘর্ষ বিক্ষুব্ধ মদিনার পুনর্গঠনে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত আরব জাহানকে একতাবদ্ধ করার একটি মহৎ পরিকল্পনাও এতে ছিল। মদিনার সনদ দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়, হজরত মুহাম্মদ (সা.) শুধু ধর্ম প্রচারকই ছিলেন না, তিনি পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিজ্ঞও ছিলেন। উইলিয়াম মূরের মতে, ‘হজরতের বিরাট ব্যক্তিত্ব ও অপূর্ব মননশীলতা শুধু তৎকালীন যুগের নয়, বরং সর্বযুগের ও সর্বকালের মহামানবের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক।

Facebook Comments