সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়্যুবির দিনগুলি – ইমরান রায়হান

366

সুলতান সালাহুদ্দিনের সভাকক্ষে তখন থমথমে নীরবতা বিরাজমান৷ সুলতানের চোখে প্রতিশোধের নেশা৷ তেল-জাযিরের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বাহ্যিক পরাজয় সুলতানের দেহের শিরায় শিরায় নড়ছে প্রচন্ড দাম্ভিমতায়৷ তিনি খবর পাঠালেন আমির-উজিরদের উপস্থিতি কামনা করে, সেনাপতি বরাবর নির্দেশ পাঠালেন অস্ত্র হাতে বল্ডউইনের কেল্লার দিকে যাত্রা করার৷ লেবাননের দক্ষিণে অবস্থিত মার্জেইন শহরে ক্রুসেডারদের সাথে সুলতানের তুমুল যুদ্ধ হলো৷ যুদ্ধে সুলতানের বাহিনীর পদচুম্বন করলো অভূতপূর্ব বিজয়ের গৌরব৷

এবারের যুদ্ধে ক্রুসেড বাহিনীর বড় বড় অমাত্যরা আটক হয়েছে৷ টাইবেরিয়ার গভর্নর, হুজের শাসক থেকে টেম্পলের সেনাপ্রধানও সুলতানের হাতে জিম্মি পড়েছে৷ নিয়মমতো বন্দিদের থেকে মুক্তিপণ নিয়ে সুলতান তাদের পথ ছেড়ে দিলেন৷ মুক্তিপণে ব্যর্থ বাকি বন্দিদের নিয়ে দামেশকের পথে হাঁটলো মুসলিম বাহিনী৷

পরাজিত আটকদের মধ্যে এক যুবকের উপর সুলতানের চোখ আটকে গেলো৷ মনে হলো, একে তিনি দেখেছেন কোথাও৷ ইশারায় ডাকলেন তাকে৷ তিনি লক্ষ্য করলেন যুবকটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসছে৷ কাছে আসলে জানতে চাইলেন, নাম কী তোমার? যুবকের নির্দ্বিধ জবাব, কনরড আ’রাজ৷ সুলতানের কপাল কুঁচকে এলো, ফিলিপ আ’রাজের ছেলে? ছেলেটি হ্যাঁ বলে উত্তর করলো৷ তোমার বাবাকে আমি চিনি— সুলতান বললেন৷ ছেলেটি বললো, হ্যাঁ বাবাও আপনাকে জানেন৷ খুঁড়িয়ে হাঁটছো যে? কোন আঘাত লেগেছে নাকি রোগে পেয়েছে?সুলতানের কৌতূহলভরা প্রশ্ন৷ যুবক বললো, না; বরং আপনার বিরুদ্ধে তেল-জাযিরের যুদ্ধে আহত হয়েছিলাম৷

তেল-জাযির শব্দটি শুনতেই সুলতান সালাহুদ্দিনের মুখ ছেয়ে গেলো গাম্ভীর্যে৷ পরাজয়ের ঘ্রাণ ভেসে এলো তার নাকে৷ শব্দটি সুলতানকে প্রতিশোধের আক্রোশে ব্যাকুল করে তুললো৷ তাছাড়া কনরড সেই ফিলিপের ছেলে যে সেই যুদ্ধে পরাজয়ের মূল-নায়ক তিন ঘোড়সওয়ারের একজন৷

সুলতান জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি সেই যুদ্ধে আমাকে গোপনে হত্যা করতে চেয়েছিলে? কনরড বললো, যুদ্ধের ময়দানে হত্যা করাকে গুপ্ত হত্যা বলে না সুলতানে আজিজ৷ সেদিন আপনাকে হত্যা করতে পারলে আমার গোত্রকে আজ অনুতাপের ভারে ন্যুব্জ দেখতে হতো না; বরং তারা নিরাপদে থাকতো৷ কিন্তু আল্লাহ আপনাকে বাঁচিয়েছেন— কারণ তিনি চান, আপনি বেঁচে থাকুন৷

যুবকের কথাগুলো সুলতানকে আলোড়িত করলো৷ তিনি বললেন, তুমি বরং সেদিন তোমার দায়িত্বই পালন করেছো৷ কারণ, তোমার শরীরে বীরের রক্ত খলবলায়; এমনকি তোমার পায়েও বাবার মতো পঙ্গুত্ব লেগে আছে৷ কনরড বললো, আমার ভয় হয় সুলতান; আমার এই পঙ্গুত্ব আমাকে আসন্ন যুদ্ধ থেকে ফিরিয়ে দেয় কি না!

যুবকের দ্বিধাহীন কথার খই শুনে সুলতান বললেন, তোমার কি এই ভয় হয় না এই মুহূর্তে চাইলে আমি কল্লা উড়িয়ে দিতে পারি? কনরড বললো, না— আমি জানি আপনি সেটা করবেন না৷ কারণ আমি এখন নিরস্ত্র সৈনিক, আমাকে হত্যা করাটা কারুপুষতার পরিচায়ক৷ আর যে সালাহুদ্দিনকে আমি চিনি, সে কাপুরুষ নয়৷ অথচ আমি তাকে পরাজিত করেছি সম্মুখ সমরে; যখন সে উৎকৃষ্ট আরবী ঘোড়ায় বসে দু’হাতে দ্বিধারী তলোয়ার চালাচ্ছিলো৷

সুলতান কনরডের হাতের বাঁধন খুলে দিলেন৷ হত্যা বা বন্দি না করে তাকে ছেড়ে দিলেন তার নিজের সিদ্ধান্তে৷ কোন অদৃশ্য ইশারায় কনরড প্রতিজ্ঞা করে বসলো, সে গোত্র-পরিবার ছেড়ে ইসলামী রাষ্ট্রে থেকে যাবে৷ পালিয়েও কখনো নিজ শহরে যাবার চেষ্টা করবে না৷ এদিকে তখনকার মানুষ সংকল্পে শুদ্ধ এবং প্রতিজ্ঞা-পূরণে দৃঢ়পদ হতো৷ তার এমন অদ্ভূত সিদ্ধান্ত উপস্থিতদের হতবাক করে দিলো৷

সুলতান সালাহুদ্দিন জানতে পারলেন কনরড সেই নির্বাচিত শতজনের একজন যারা জর্ডান নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা ক্রুসেডারদের প্রসিদ্ধ দুর্ভেদ্য দূর্গের কলকাঠি জানে৷ সে জানে দূর্গে প্রবেশের সুড়ঙ্গ এবং গোপন পথগুলোর ব্যাপারে, দূর্গের ভেতরকার প্রতিটি অদৃশ্য রহস্য এবং ইট-কাঠের ব্যাপারেও কনরডের জানাশোনা আছে৷ সুলতান ভেবে রাখলেন, এই দুর্জেয় দূর্গ জয়ের সময় কনরডকে কাজে লাগাবেন তিনি৷

২৪শে আগষ্ট, ১১৭৯—
কনরড সুলতানের বাহিনীর সহযোগী হয়ে দূর্গের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য দিতে প্রস্তুত হয়েছে৷ মুসলিম বাহিনী কেল্লা জয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে নদীর পাড় ধরে, নেতৃত্বে খোদ সুলতান সালাহুদ্দিন৷ দীর্ঘ পনেরো দিন ধরে ক্রুসেড বাহিনীর সাথে যুদ্ধ চললো৷ ২৯শে আগস্ট দূর্গের দক্ষিণপার্শ্বের দেয়াল ধসে পড়লো কেল্লার ভেতরদিকে৷ দূর্গরক্ষী বাহিনীর বড় অংশের প্রাণ নাশ হলো তাতে৷ মুসলিম সেনারা তরবারি উঁচিয়ে ঢুকে গেলেন কেল্লার অন্দরে৷ কনরড তাদেরকে দূর্গের পুরোটায় পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলো; তার সহায়তার সুলতানের বাহিনী দূর্গের ইটে ইটে পৌঁছে গেলো সহজেই৷ শক্ত বাহুর অবিরত আঘাতের তোড়ে দূর্গের দেয়ালগুলো ধুলো করে দিলো ইসলামের সৈনিকেরা৷ এদিকে সুলতান বেঁচে যাওয়া রক্ষীদের কল্লা ফেলছেন তখনও, যারা অস্ত্র ফেলে দিচ্ছে তাদেরকে আটক করছেন চরম লাঞ্ছনায়৷

সুলতানের কাছে খবর এলো ধ্বসে যাওয়া প্রাসাদের পড়ে থাকা ইট-সুরকিতে এখনো লটকে আছে কয়েকজনের টিমটিমে প্রাণ৷ তারা মৃত্যুর আগে অন্তত একটিবার সুলতানের সাক্ষাত চায়— হয় বাহিনী তাদের এখানে আনুক; নতুবা সুলতানকে কষ্ট করে সেখানে যেতে হবে৷

সুলতান কষ্টটুকু করলেন৷ সেখানে এক পৌঢ় যোদ্ধাকে দেখলেন খুন-বালুতে গড়াগড়ি করছে৷ দেহের পুরোটায় নেযার আঘাত, ক্ষতগুলো তখনও টপটপে রক্ত ঝরাচ্ছে৷ ব্যথায় থেকে থেকে আপাদমস্তক নাড়িয়ে কেঁপে উঠছে সে৷ সুলতান তার চোখ বরাবর এগিয়ে গেলেন৷ বুকের কাছে মাথা নামিয়ে জানতে চাইলেন, কে আপনি?

বৃদ্ধের তখন চকিত কণ্ঠস্বর, বললো— আমি মহাবীর ফিলিপ আ’রাজ! সুলতানের চোখে বিস্ময়; জিজ্ঞেস করলেন, কনরডের পিতা ফিলিপ কি? বৃদ্ধ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো৷ সালাহুদ্দিন বললেন, আপনি তাকে দেখতে চান? বৃদ্ধ সম্মতি জানালো৷ বললো, তবে আমাকে সত্য জানান মহামান্য— আমার ছেলে কনরড কি তার জাতি-আদর্শের সাথে গাদ্দারি করেছে? সে কি সালাহুদ্দিনের বাহিনীর সাথে মিশে বেদুঈনের পোশাকে আজকের ময়দানে প্রতারণার কদম ফেলেছে?

সুলতানের চোখে প্রশ্ন— কে আপনাকে এসব বলেছে? বৃদ্ধ বলে, মুখ-চর্চায় আমার কানে পড়েছে এই খবর৷ সুলতান শুধালেন, আপনার ধারণা যদি অমূলক হয়, তাহলে কী হবে? বৃদ্ধ তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললো— প্রফুল্ল ও কৃতজ্ঞচিত্তে ছেড়ে যাবো ইহজগতের মায়া; একজন প্রতারক ধুর্তের পিতা হয়ে বাঁচার চেয়ে স্বজাতির জন্য লড়ে যাওয়া বীরের বাবা হয়ে মৃত্যুর মদিরা চাখা আমার জন্য গৌরবের— শৌর্যের, বীর্যের৷

সুলতানের বুকে সংশয়, বাস্তবতা জানালে একজন বীর পিতার অকৃতজ্ঞ মউত দেখতে হবে তার৷ তিনি বললেন, যে আপনাকে এই খবর দিয়েছে সে বরং ধোঁকা দিয়েছে৷ আপনার ছেলে একজন দুঃসাহসী এবং বিচক্ষণ বীর; আপনার সন্তুষ্টি তার প্রাপ্য৷

বৃদ্ধের ঠৌঁটে রেঙে উঠলো আনন্দ-সকালের মিহি রোদ— এক টুকরো মুচকি হাসি৷ সুলতানের হাতে চুমু খেয়ে স্রষ্টার প্রশংসায় তার প্রাণ উড়ে গেলো অজানা কোথাও৷

কনরড কয়েক কদম দূরত্বে ঠায় দাঁড়িয়ে তখন৷ বাবার কাছে আসার সাহস সে হারিয়ে ফেলেছে৷ সুলতান বললেন, আমি তোমার স্বাধীনতাকে চড়া মূল্যে খরিদ করেছিলাম কনরড৷ তুমি বরং তোমার গোত্রে ফিরো, তাদের কাছে কর্মের মাফি চাও— যদি তোমার খিয়ানত তাদের জানায় থাকে৷ আর তারা অজ্ঞাত হলে, বরং তুমি ঘটনাকে চেপে যাও তোমার মাথার কোটরে৷ ভুলে যাও কোন বিকেল শীতল হয়ে উঠেছিলো তোমার প্রতারণার মিশেলে৷ জলদি যাও তুমি!

তথ্যসূত্র—
১৷ আন-নাসের সালাহুদ্দিন
ড. সাঈদ আব্দুল ফাত্তাহ (২০১—২০৪)
২৷ হায়াতু সালাহুদ্দিন
মাহমুদ শিবলি (৬৪—৬৫)
৩৷ মাফরাজুল কারুব ফি-আখবারি বনি আইয়ূব
জামালুদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে সালিম (২/২১৪)

Facebook Comments