স্বর্গ চ্যুতি – বন্দে আলী মিয়া

605
কুরআনের গল্প আদম আঃ ও শয়তান

স্বর্গ চ্যুতি । মাটির দ্বারা প্রস্তুত তুচ্ছ মানব আদমের জন্য আজাযিলের এই দুর্দশা ঘটলো। আজাযিল সেই নিরপরাধ আদমকে জব্দ করবার জন্য সুযোগ খুঁজতে লাগলো।

খোদাতা’লা বেহেশতে বিচিত্র উদ্যান রচনা করে নানারকম সুন্দর সুন্দর ফল ও ফুলের গাছ সৃষ্টি করলেন। সেই বাগানের দু’টি গাছ সৃষ্ট হলো –তার একটি নাম জীবন-বৃক্ষ, অপরটির নাম জ্ঞান-বৃক্ষ। খোদা আদমকে সেই বাগানে বাস করবার অনুমতি দিলেন। খোদা আদমকে অনুমতি দিলেন –বাগানের সমস্ত গাছের ফল সে খেতে পারে, কিন্তু জীবন-বৃক্ষ ও জ্ঞান-বৃক্ষের ফল সে কখনো যেন ভক্ষণ না করে। এই গাছের ফল আহার করামাত্র তার মৃত্যু ঘটবে।

এর পরে অনেক দিন চলে যাবার পর খোদা মনে করলেন আদমেরন একজন সঙ্গিনী সৃষ্টি করা প্রয়োজন। একদিন তিনি সমস্ত পশুপক্ষীকে আদমনের নিকটে এনে তাদের প্রত্যেকের নামকরণ করতে বললেন। আদম প্রত্যেক জীবের আলাদা আলাদা নাম রাখলেন। তারা চলে গেলে আদম চিন্তা করতে লাগলেন, খোদাতা’লা সকল জীবজন্তুকে জোড়া করে সৃষ্টি করেছেন কেবল মাত্র তিনিই একাকী রয়েছেন।

সেই রাত্রে আদ ঘুমিয়ে পড়লে খোদা তাঁর বাম পাঁজড় থেকে একটা হাড় বের করে নিয়ে তা দিয়ে একটি নারী সৃষ্টি করে তাঁর পাশে শুইয়ে রাখলেন। ঘুম ভাঙলে পাশে একটি সুন্দরী নারীকে দেখে তিনি মনে মনে পরম বিস্ময়বোধ করলেন। এমন সময়ে খোদা বললেনঃ এর নাম বিবি হাওয়া। এ হলো তোমার সঙ্গিনী। তোমরা দু’জনে একত্রে বেহেশতের বাগানে থাকবে, খেলবে, বেড়াবে। কিন্তু সাবধান সেদিন তোমাকে নিষেধ করেছি –আজ আবার তোমাকে ও তোমার সঙ্গিনীকে বলছি, যখন ইচ্ছে হবে এই বাগানের সকল রকম ফল আহার করবে, কিন্তু এই জীবন-বৃক্ষ ও জ্ঞান-বৃক্ষের ফল কখনো আহার করবে না!

সেই দিন থেকে আদম ও হাওয়া মনের সুখে সেই বাগানের নানা রকম ফলমূল খেয়ে বেড়াতে লাগলেন।

একদিন হাওয়া একা একা বাগানে বেড়াচ্ছেন। এই সুযোগে শয়তান একটা সাপের মূর্তি ধরে তাঁর কাছে এলো। সে সময়ে সিংহ, বাঘ, সাপ, গরু, হরিণ, ভেড়া, ছাগল সকলে একসঙ্গে খেলা করতো। কেউ কাউকে হিংসা করতো না। সাপ হাওয়াকে জিজ্ঞাসা করলোঃ তোমরা কি এই বাগানের সব গাছের ফল খাও।


এটা পড়ুন –  আদি মানব ও আজাযিল


হাওয়া জবাব দিলেনঃ না, দু’টি গাছের ফল খাওয়া আমাদের নিষেধ!

সাপ জিজ্ঞাসা করলোঃ কোন কোন গাছের ফল তোমরা খাও না?

হাওয়া গাছ দু’টি দেখিয়ে দিলেন।

সাপ বললোঃ কেন তোমরা এ দু’টি গাছের ফল খাও না?

হাওয়া বললেনঃ জানি না খোদা বারণ করেছেন।

সাপ বললোঃ খোদা তোমাদের বোকা বানিয়ে এখানে রেখেছেন। এই গাছের ফল খেলে তোমাদের জ্ঞান-চক্ষু খুলে যাবে, তোমাদের ওপরে খোদার আর কোন কারসাজি চলবে না, তাই খোদা তোমাদের এই গাছের ফল খেতে বারণ করেছে, কি সুন্দর আর মিষ্টি এই ফল তা তোমরা জানো না।

সাপের কুপরামর্শে হাওয়ার মন দুলে উঠলো। তিনি ভাবলেন –তাইতো, অমন সুন্দর ফল না জানি কেমন মিষ্টি! তিনি লোভ সামলাতে পারলেন না। একটা ফল ছিঁড়ে নিলেন। আধখানা নিজে খেয়ে অর্ধেক আদমের জন্য নিয়ে গেলেন। আদম হাওয়ার হাত থেকে সেই নতুন রকমের ফলটুকু নিয়ে সাগ্রহে খেলে ফেললেন।

শয়তান উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে মনে মনে হাসতে লাগলো। ফল খাবার পরে তাঁরা সর্বপ্রথম মুঝতে পারলেন যে নিজেরা বস্ত্রহীন। তখন বড় বড় ডুমুরের পাতার সঙ্গে লতা গেঁথে তাঁরা লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করতে লাগলেন। এমন সময়ে খোদাতা’লা আদম ও হাওয়াকে নিকটে ডাকলেন, কিন্তু তাঁরা প্রতিদিনের মতো সমুখে গেলেন না। গাছের আড়ালে গিয়ে লুকোলেন।

খোদাতা’লা বললেনঃ আমি বুঝতে পেরেছি তোমরা জ্ঞান-বৃক্ষের ফল খেয়েছো।

আদম বললেনঃ হাওয়া আমাকে দিয়েছে।

খোদা ক্রুব্ধ কণ্ঠে বললেনঃ আমার আদেশ অমান্য করে যে পাপ আজ তোমরা করলে, বংশ পরম্পরাক্রমে এর ফল সকলকে ভোগ করতে হবে। ত

হাওয়াকে উদ্দেশ্য করে তিনি অভিশাপ দিলেনঃ তুমি প্রসব বেদনায় অত্যন্ত যন্ত্রণা ভোগ করবার পর তোমার সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। চিরকাল তোমাকে পুরুষের অধীন হয়ে থাকতে হবে। পুরুষ তোমায় শাসন করবে।

আদমকে তিনি অভিশাপ দিলেনঃ তোমার শস্যক্ষেত্র আগাছা কুগাছা ও নানা কাঁটা গাছে ভর্তি হয়ে যাবে। এক মুষ্টি অন্নের জন্য আ-মরণ তোমাকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হবে।

সাপকে অভিশাপ দিয়ে বললেনঃ নির্বোধ নারীকে কুপরামর্শ দিয়ে পাপ করিয়েছ –এর শাস্তি তোমাকে সারা জীবন ভোগ করতে হবে। যে মাটিতে মানুষ পা দিয়ে চলবে সেই মাটিতে সর্বদা বুক পেতে তুমি চলবে এবং সেই খেয়ে তোমাকে জীবনধারণ করতে হবে। এই নারী বংশই হবে তোমাদের পরম শত্রু! তারা যখনই তোমাকে দেখবে তখনই বধ করার চেষ্টা করবে।

এই কথা বলে খোদা দু’খানা চামড়া তাঁদের পরিয়ে বাগান থেকে বের কের পৃথিবীতে নির্বাসন দিলেন।

লেখকের  কোরাণের গল্প নামক বই থেকে নেওয়া হয়েছে ।

Facebook Comments