সমাজে লক্ষ করলে দেখা যায়, আমরা অন্য অনেক কিছুর মত ঝাড়ফুঁক-তাবিজ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বেশ সীমালঙ্ঘন করে চলেছি। আবার ইদানীং কোনো কোনো মহল তাবিজকে ঢালাওভাবে শিরক বলে মুসলমানদের মাঝে এ বিষয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রয়াস চালাচ্ছে। তাই এ বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনামূলক দালীলিক আলোচনা জরুরি মনে হচ্ছে এবং সীমালঙ্ঘনগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে। আল্লাহ্ই তাওফীকদাতা।

মূল প্রসঙ্গে প্রবেশের আগে প্রথমে ভূমিকাস্বরূপ কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা মুনাসিব মনে হচ্ছে, যেগুলোর আলোকে বিষয়টি বোঝা সহজ হবে ইনশাআল্লাহ।

এক.

আল্লাহর কাছে সবচে’ ঘৃণ্য ও জঘন্যতম পাপ হল শিরক। কুরআন মাজীদে পুত্রের প্রতি লুকমান হাকীমের ওসিয়তগুলো বিশেষ গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে তিনি নিজ পুত্রকে ওসিয়ত করে বলেন-

وَ اِذْ قَالَ لُقْمٰنُ لِابْنِهٖ وَ هُوَ یَعِظُهٗ یٰبُنَیَّ لَا تُشْرِكْ بِاللهِ  اِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِیْمٌ.

স্মরণ কর, যখন লুকমান উপদেশচ্ছলে নিজ পুত্রকে বলেছিল, বৎস! তুমি আল্লাহ্র সাথে শরীক করো না। কেননা র্শিক নিশ্চয় মারাত্মক অবিচার ও পাপ। -সূরা লুকমান (৩১) : ১৩

আল্লাহ তাআলা নবীকে সতর্ক করে বলেছেন-

وَ لَقَدْ اُوْحِیَ اِلَیْكَ وَ اِلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِكَ  لَىِٕنْ اَشْرَكْتَ لَیَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَ لَتَكُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ.

নিশ্চয় আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি এই ওহী প্রেরণ করা হয়েছে যে, যদি আপনি শিরক করেন তাহলে অবশ্যই আপনার সকল আমল বরবাদ হয়ে যাবে এবং নিশ্চিত আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন। -সূরা যুমার (৩৯) : ৬৫

অন্যত্র আল্লাহ আরো বলেছেন-

اِنَّهٗ مَنْ یُّشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَیْهِ الْجَنَّةَ وَ مَاْوٰىهُ النَّارُ.

আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। -সূরা মায়েদা (৫) : ৭২

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-

اِنَّ اللهَ لَا یَغْفِرُ اَنْ یُّشْرَكَ بِهٖ وَ یَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذٰلِكَ لِمَنْ یَّشَآءُ وَ مَنْ یُّشْرِكْ بِاللهِ فَقَدِ افْتَرٰۤی اِثْمًا عَظِیْمًا.

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। এবং যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে এক মহাপাপ করে। -সূরা নিসা (৪) : ৪৮

একজন মানুষ যত ভালো কাজই করুক কিন্তু সে যদি র্শিক করে আল্লাহ তাআলার কাছে তার কোনো কিছুরই মূল্য নেই। এজন্য কিয়ামতের দিবসে মুশরিকরা যত ভালো কাজই নিয়ে আসুক আল্লাহ তাআলা সেগুলোকে ধুলিকণা-রূপ করে দিবেন। আল্লাহ বলেন-

وَ قَدِمْنَاۤ اِلٰی مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنٰهُ هَبَآءً مَّنْثُوْرًا.

তারা (দুনিয়ায়) যা-কিছু আমল করেছে, আমি তার ফায়সালা করতে আসব এবং সেগুলোকে শূন্যে বিক্ষিপ্ত ধুলোবালি (-এর মত মূল্যহীন) করে দেব।  -সূরা ফুরকান (২৫) : ২৩

যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, জীবন ধারণের সব উপকরণ দান করেছেন, আমাকে অগণিত নিআমত দান করেছেন; তাঁকে অস্বীকার করা বা তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করা এবং অবাস্তব বিশ্বাস করা যে, তারাও তাঁর মত ক্ষমতাবান ও দাতা, এটা শুধু আল্লাহর কাছেই নয়, যে কোনো বিবেকবানের কাছেই জঘন্যতম অপরাধ।

তাই মুশরিকরা যতই ভালো কাজ করুক শিরকের কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের কোনো ‘ভালো’ কাজই গ্রহণ করবেন না।

দুই.

শিরক দুই প্রকার: এক. শিরকে জলী, দুই. শিরকে খফী। শিরকে জলী সবচেয়ে মারাত্মক। শিরকে জলীর অনেক প্রকার রয়েছে। যেমন ইবাদত, যা একমাত্র আল্লাহ তাআলার হক, তাতে আল্লাহ ছাড়া কাউকে শরীক করা, উপায়-উপকরণের ঊর্ধ্বের বিষয়ে গাইরুল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা, উপায়-উপকরণকে উপায়-উপকরণের সৃষ্টিকর্তার মান দেওয়া, গাইরুল্লাহকে উপকার ও ক্ষতির ক্ষমতাধারী মনে করা ইত্যাদি।

এ বিষয়গুলি এবং এ ধরনের আরো অনেক বিষয় শিরকে জলীর অন্তর্ভুক্ত। ‘তাকবিয়াতুল ঈমান’ গ্রন্থে দলীলসহ বিস্তারিতভাবে বিষয়গুলি আলোচনা করা হয়েছে আর সংক্ষিপ্তাকারে ‘বেহেশতী জেওর’ প্রথম খণ্ডেও আলোচনা আছে। গ্রন্থদ্বয় দেখে এ বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করা, অতপর এগুলো থেকে বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করা কর্তব্য।

তিন.

কিছু বিষয় আছে এমন, যা তাওহীদ-পরিপন্থী তো নয়, তবে তা ‘তাওয়াক্কুলে’র সর্বোচ্চ স্তর থেকে নিম্নস্তরের। এ ধরনের বিষয়গুলোকে শিরক বলা স্পষ্ট ভুল। যে বিষয়ে যতটুকু কমতি আছে তাতে ততটুকু কমতির কথাই বলা উচিত। বাড়াবাড়ি করে বিদআতকে শিরক বলে দেওয়া অথবা তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরিপন্থী বিষয়কে তাওহীদের পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে শিরক বানিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।

চার.

দুআ (আল্লাহকে ডাকতে থাকা, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে যাওয়া) এবং ইস্তেআনাত (আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকা) তাওহীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা এবং অনেক বড় ঈমানী আমল। যা প্রতিটি মুমিনের কাছে সবসময় কাম্য। এই দুআ ও ইস্তেআনার একটি অংশ হল, কুরআন-হাদীসে শেখানো ঝাড়ফুঁকের দুআসমূহ। এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করাকে তাওয়াক্কুল পরিপন্থী মনে করা মূর্খতা। কারণ, এটি তো দুআ ও ইস্তেআনার অংশ, যা ঈমান ও তাওহীদ এবং তাওয়াক্কুলের গুরুত্বপূর্ণ প্রকার। তাই এক্ষেত্রে অবহেলা করা বাস্তবেই অনেক বড় লোকসানের কারণ।

পাঁচ.

যে-ঝাড়ফুঁক ‘মা’ছূর’ নয়, কিন্তু তার উপকারিতা অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রমাণিত এবং তাতে ঈমানবিরোধী ও শরীয়তবিরোধী কোনো বিষয় নেই তা মুবাহ উপায়-উপকরণের পর্যায়ে। যেমনিভাবে অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রমাণিত উপকারী ওষুধ-পথ্য ব্যবহার করা মুবাহ, তেমনিভাবে এই ঝাড়ফুঁকও মুবাহ।

ছয়.

তাবীযের (تعويذ) হাকীকত হল, আশ্রয় প্রার্থনা করা। তাবীয ব্যবহারকারী যদি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার নিয়তেই তাবীয ব্যবহার করে এবং তাবিজের লেখা যদি কুরআন-হাদীসেরই কোনো দুআ হয় তাহলে এই তাবিজ ব্যবহার মুবাহ হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যেহেতু তাবীয ব্যবহারকারীর পক্ষ থেকে তার নিজের কোনো আমল পাওয়া যাচ্ছে না, আবার এই আশঙ্কাও থাকে যে, তাবিজ ব্যবহারকারী অবচেতনভাবে দুআ ও ইস্তেআনার বদলে তাবিজের উপরই নির্ভর করে বসবে, তাই সালাফের কতক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব একে পছন্দ করেননি, কিন্তু এমন নয় যে, তারা একে না-জায়েয বলেছেন। তাইতো সালাফের একটি বড় জামাত এটি মুবাহ হওয়ার প্রবক্তা।

সাত.

কারো কারো অভ্যাস হল, আপদ-বিপদে নিজে দুআ ও ইস্তেআনাতের প্রতি গুরুত্বারোপ না করে কারো কাছ থেকে তাবীয গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হয়। জানা উচিত যে, এটি অনেক বড় মাহরূমি। আর এই দৃষ্টিভঙ্গি -কোনো সন্দেহ নেই- তাওয়াক্কুল পরিপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি, যা নিঃসন্দেহে সংশোধনযোগ্য।

মূল কাজ হতে হবে, দুআ ও ইস্তেআনার প্রতি নিজেই যত্নবান হওয়া। এই বিষয়ের মা’ছূর দুআ ও আমলগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া। তারপর ঝাড়ফুঁক নেওয়া হলে তাও ভালো। আর মা’ছ‚র তাবীয নিলে তাও নিষিদ্ধ নয়।

আট.

কেউ কেউ তাবীয নেওয়ার ক্ষেত্রে এত বাড়াবাড়ি করে যে, অনেক সময় বে-দ্বীন ও বে-শরা লোকদের কাছ থেকেও তাবীয নিতে যায়। স্পষ্টতই এ ধরনের লোকের তাবীযে লিখিত শব্দ-বাক্য শিরকী হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। মহিলারা অনেক সময় পর্দার হুকুম লঙ্ঘন করে গায়রে মাহরামের সামনেও চলে যায়, যা স্পষ্ট হারাম। এই কার্যাবলি এবং এ ধরনের সকল বাড়াবাড়ি থেকে বেঁচে থাকা ফরয।

নয়.

তাবীযে যদি কুফরী বা শিরকী কোনো কথা লেখা থাকে অথবা তাবীযের নামে যাদু করা হয় বা তাবীয প্রদানকারী/তাবীয গ্রহণকারীর কেউ -আল্লাহ মাফ করুন- তাবীযকেই সরাসরি সমস্যা সমাধানকারী এবং প্রয়োজন পূরণকারী মনে করে। তেমনি যদি তাবীযের সঙ্গে গাইরুল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কৃত মান্নতকে জুড়ে দেওয়া হয় কিংবা অন্য কোনো শিরকী কাজ তাবীযের সাথে যুক্ত থাকে, তাহলে এই তাবীয কুফর ও শিরক হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এ থেকে যদি খালেস দিলে তওবা করে সম্পূর্ণরূপে তা পরিত্যাগ না করা হয়, তাহলে ঈমান ও ইসলামের নিআমত থেকেই মানুষ মাহরূম হয়ে যাবে।

দশ.

আমাদের এই আলোচনা কেবল মা’ছূর ও মুবাহ তাবীয সম্পর্কে। যারা বাড়াবাড়ি করে একে শিরক বলে দেয় এবং যারা التمائمشرك -এই হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা বুঝে বসে আছে, দলীলসহ তাদের খণ্ডন করাই কেবল এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। এ প্রবন্ধকে কোনো ‘মুনকার’ তাবীয অথবা কোনো মুনকার দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থন মনে করা ভুল হবে।

এগার.

শিরক যেমন আল্লাহর কাছে  সবচেয়ে ঘৃণিত বিষয় তেমনিভাবে তাওহীদে বিশ্বাসী কোনো মুসলিমকে মুশরিক বলা বা শিরকের অপবাদ দেয়াও আল্লাহর কাছে জঘন্য অপরাধ। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু   আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أَيّمَا امْرِئٍ قَالَ لِأَخِيهِ: يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا، إِنْ كَانَ كَمَا قَالَ، وَإِلا رَجَعَتْ عَلَيْهِ.

কোনো ব্যক্তি তার অপর ভাইকে যদি বলে, ‘হে কাফের!’, তাহলে একথা এ দুজনের কোনো একজনের উপর পতিত হবেই হবে। যে ব্যক্তিকে কাফের বলা হয়েছে সে যদি  কাফের হয় তাহলে তো হলোই, অন্যথায় যে বলেছে (কথাটি) তার দিকেই ফিরে আসবে। -সহীহ মুসলিম হাদীস ৬০; সহীহ বুখারী হাদীস ৬১০৪

আরেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-

مَنْ رَمَى مُؤْمِنًا بِكُفْرٍ فَهُوَ كَقَتْلِهِ.

কোনো ব্যক্তি কোনো মুমিনকে কুফরীর অপবাদ দিল সে যেন মুমিন ব্যক্তিটিকে হত্যাই করে ফেলল। (অর্থাৎ কুফরীর অপবাদ দেওয়াটা হত্যার সমানই অপরাধ।) -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬১০৫

তাই এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, বাড়াবাড়ির শিকার হয়ে তাওহীদে বিশ্বাসী কারো উপর কুফর বা শিরকের অপবাদ না দেওয়া।

মূল প্রসঙ্গ

এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। ইসলামের আগমনের পূর্বে জাহিলিয়্যাতের যুগে রোগ-বালাই থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে কয়েক ধরনের উপায় ও পন্থা অবলম্বন করা হত। তন্মধ্যে একটি হল ঔষধের মাধ্যমে চিকিৎসা। ঐ যুগে যেহেতু আল্লাহপ্রদত্ত কোনো ধর্ম তারা অনুসরণ করত না তাই তাদের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই তাওহীদ-পরিপন্থী কর্ম ও চরিত্র এবং মানবতা বিবর্জিত বহু বিষয় তাদের ধর্ম বা রীতিতে পরিণত হয়েছিল। ইসলাম এসে তাদের পূর্বের সকল রীতিনীতি পর্যবেক্ষণ করে; যেগুলো তাওহীদ-পরিপন্থী সেগুলো নিষিদ্ধ করে আর যেগুলো এসব থেকে মুক্ত সেগুলোকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেয়। ঔষধ-পত্রের মাধ্যমে চিকিৎসাতে যেহেতু তাওহীদ-পরিপন্থী তেমন কিছু নেই তাই ইসলাম এসে তা পূর্বের ন্যায় বহাল বা বৈধ রাখে।

তবে, ইসলাম তাতে এ সংশোধনী অবশ্যই এনেছে যে, ঔষধকে সুস্থতাদানকারী  মনে করা যাবে না; বরং সুস্থতাদানকারী হলেন একমাত্র আল্লাহ আর ঔষধ মাধ্যমমাত্র। আর যারা এ চিকিৎসাকর্মে  নিজেকে নিয়োজিত করবে সে যেন পরিপূর্র্ণরূপে চিকিৎসা-জ্ঞান অর্জন করে এবং পুরো পারদর্শী হয়ে এ কাজে ব্রত হয়; আংশিক বা ভুল জ্ঞান ও অপরিপক্ক জ্ঞান নিয়ে যেন এ কাজে অগ্রসর না হয়। নিম্নে এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস পেশ করা হল :

হযরত আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি চিকিৎসাজ্ঞান অর্জন করা ছাড়া চিকিৎসা শুরু করে, আর তার চিকিৎসায় কেউ মারা যায় বা ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে এর দায় ঐ ব্যক্তির উপরই বর্তাবে (তার ক্ষতিপূরণ তাকেই বহন করতে হবে)। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৫৭৭

হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম থেকে বর্ণিত, নবীজীর যুগে এক ব্যক্তির শরীর যখম হয় এবং ফুলে রক্ত-পুঁজ জমে যায় তখন লোকটি বনী আনমারের চিকিৎসক দুই ভাইকে ডাকলেন। নবীজী তাদের উভয়জনকে দেখে বললেন, চিকিৎসায় তোমাদের মধ্যে কে বেশি পারদর্শী? তারা দুজনে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! চিকিৎসা কর্ম কি ভালো? তখন নবীজী বললেন, যিনি রোগ নাযিল করেছেন তিনি চিকিৎসাও নাযিল করেছেন। -মুয়াত্তা মালেক, হাদীস ১৭৫৭

হযরত সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. বলেন, আমি একদা অসুস্থ হই, তখন নবীজী আমাকে দেখতে আসেন এবং তাঁর হাত আমার বক্ষে রাখেন। আমি তাঁর হাতের শীতলতা আমার কলিজা পর্যন্ত অনুভব করি। তখন নবীজী  আমাকে বললেন, তুমি হৃদরোগী, তুমি হারেস ইবনে কালদার কাছে যাও, সে চিকিৎসক। সে যেন সাতটি আজওয়া খেজুর নেয় এবং তা বিচিসহ চূর্ণ করে, অতপর যেন তোমাকে পান করায়। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৭১

হযরত আবুদ দারদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ রোগও নাযিল করেছেন এবং তার নিরাময়কও। আর তিনি প্রত্যেক রোগের জন্য নিরাময়কও রেখেছেন তাই তোমরা চিকিৎসা কর,  তবে হারাম বস্তু দিয়ে চিকিৎসা করো না। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৭০

হাদীস ও আসারের কিতাবে এ বিষয়ে বহু হাদীস, সাহাবা-সালাফের উক্তি ও নির্দেশনা রয়েছে। এখানে মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করা হল।

ঝাড়ফুঁক

রোগ-বালাই নিরাময়ে জাহেলিয়্যাতের যুগে যেসব উপায় অবলম্বন করা হত তন্মধ্যে আরেকটি হল ঝাড়ফুঁক অর্থাৎ কিছু পড়ে রোগীর গায়ে দম করা। এ ঝাড়ফুঁকের প্রচলন সে যুগে বেশি ছিল। এমনকি অনেক রোগের জন্য বিশেষ বিশেষ মন্ত্রও ছিল, যা পড়ে এ রোগের রোগীকে দম করা হত। সাপে কাটলে এক মন্ত্র, জ্বরের জন্য আরেক মন্ত্র, বদ নজরের জন্য এক মন্ত্র, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপনে আরেক মন্ত্র ইত্যাদি। এ ঝাড়ফুঁককে আরবীতে বলা হয় الرقية (আররুকইয়া)। বলাবাহুল্য, জাহিলিয়্যাতের যুগে এসব তন্ত্র-মন্ত্রের অধিকাংশই ছিল কুফর আর শিরক সম্বলিত। আর ইসলামের প্রধান ভিত্তি হল তাওহীদ। তাই ইসলাম এসেই কোনো প্রকার শর্র্ত ছাড়াই এ ধরনের সকল ঝাড়ফুঁককে নিষিদ্ধ করে দেয়। নবীজী তখন ঘোষণা করেন-

إِنّ الرّقَى، وَالتّمَائِمَ، وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ.

নিশ্চয় ঝাড়ফুঁক, তামীমা (পাথরবিশেষ) ও তিওয়ালা (স্বামীকে আকৃষ্ট করার মন্ত্রবিশেষ) শিরক । -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৭৯

এবং ঝাড়ফুঁকের ব্যাপারে কঠোরভাবে শর্ত করে দিলেন যে, তাতে কোনো শিরকী-কুফরী শব্দ বা বিষয় থাকতে পারবে না। এ ধরনের শিরকমুক্ত ঝাড়ফুঁক হলে নবীজী তার অনুমোদন তো দিয়েছেনই সাথে সাথে যারা এসব ঝাড়ফুঁক জানে তাদের তা চালিয়ে নিতে এবং অন্যকে শেখাতেও বলেছেন। আর স্বয়ং নবীজীও ঝাড়ফুঁককারীদের মন্ত্রগুলো শুনতেন এবং দেখতেন তাতে কোনো কুফরী কথা আছে কি না, থাকলে তা নিষিদ্ধ করে দিতেন আর না থাকলে তার অনুমোদন দিতেন।

হযরত আউফ ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা জাহিলিয়্যাতের যুগে ঝাড়ফুঁক করতাম। আমরা নবীজীকে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বিষয়টি কেমন মনে করেন? তখন নবীজী বললেন-

اعْرِضُوا عَلَيّ رُقَاكُمْ لَا بَأْسَ بِالرّقَى مَا لَمْ تَكُنْ شِرْكًا.

তোমরা ঝাড়ফুঁকে কী বল তা আমাকে শোনাও। যতক্ষণ পর্যন্ত ঝাড়ফুঁক শিরকমুক্ত হবে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৮৬

হযরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসমা বিনতে উমাইস রা.-কে বললেন-

مَا شَأْنُ أَجْسَامِ بَنِي أَخِي ضَارِعَة أَتُصِيبُهُمْ حَاجَةٌ قَالَتْ لَا وَلَكِنْ تُسْرِعُ إِلَيْهِمْ الْعَيْنُ أَفَنَرْقِيهِمْ قَالَ وَبِمَاذَا فَعَرَضَتْ عَلَيْهِ فَقَالَ ارْقِيهِمْ.

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আসমা বিনতে উমাইস রা.-কে বললেন, (আসমা নবীজীর চাচাতো ভাই ও প্রসিদ্ধ সাহাবী জাফর তাইয়ার রা.-এর সহধর্মিণী) আমার ভ্রাতুষ্পুত্রদের কী হল, তারা সকলে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তারা কি অভাবে রয়েছে? আসমা বললেন, না, তবে তাদের প্রতি বদ নযর বেশি লাগে; আমরা এর জন্য কি ঝাড়ফুঁক করব? নবীজী বললেন, কী পড়ে তোমরা বদ নযরের জন্য ঝাড়ফুঁক কর- তা আমাকে শোনাও। তখন আসমা রা. তা পড়ে শোনালেন। তখন নবীজী বললেন, অসুবিধা নেই এ দিয়ে ঝাড়ফুঁক কর। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৪৫৭৩

হযরত উবাদা ইবনে সামেত রা. বলেন-

كنت أرقي من حمة العين في الجاهلية فلما أسلمت ذكرتها لرسول الله صلى الله عليه و سلم فقال : ” اعرضها علي ” فعرضتها عليه فقال : “ارق بها فلا بأس بها” . ولولا ذلك ما رقيت بها إنسانا أبدا. (رواه الطبراني وإسناده حسن)

আমি জাহিলিয়্যাতের যুগে বদ নযরের   ঝাড়ফুঁক করতাম। যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন নবীজীকে বিষয়টি বলি, নবীজী বললেন, তুমি যা বলে ঝাড়ফুঁক কর তা আমাকে শোনাও। আমি তাঁকে শোনালাম। তখন নবীজী বললেন-

ارق بها، ليس بها بأس.

অসুবিধা নেই এ দিয়ে ঝাড়ফুঁক করতে পার ।

আল্লাহর কসম, নবীজী আমাকে অনুমতি না দিলে আমি কোনো এক লোককেও ঝাড়ফুঁক করতাম না। -মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস ৮৪৪৪ (তবারানীর বরাতে। হায়ছামী বলেছেন, এর সনদ হাসান।)

হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كَانَ خَالِي يَرْقِي مِنَ الْعَقْرَبِ، فَلَمّا نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ عَنِ الرّقَى، أَتَاهُ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنّكَ نَهَيْتَ عَنِ الرّقَى، وَإِنِّي أَرْقِي مِنَ الْعَقْرَبِ، فَقَالَ: ” مَنْ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْفَعَ أَخَاهُ فَلْيَفْعَلْ “.

আমার মামা বিচ্ছুর দংশনের ঝাড়ফুঁক করতেন। যখন নবীজী ঝাড়ফুঁক নিষিদ্ধ করেন তখন তিনি নবীজীকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি ঝাড়ফুঁক থেকে নিষেধ করেন, আমি তো বিচ্ছু কাটার ঝাড়ফুঁক করি। নবীজী বললেন কেউ তার ভাইয়ের উপকার করতে পারলে সে যেন তা করে। -মুসনাদে আহমাদ ৩/৩০২, হাদীস ১৪২৩১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২১৯৯

আমর ইবনে হাযম-এর পুরো পরিবার ঝাড়ফুঁক করত। নবীজী যখন ঝাড়ফুঁক নিষেধ করেন তখন আমর ইবনে হায্ম-এর পরিবার নবীজীর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি ঝাড়ফুঁক নিষেধ করেছেন, আমরা বিচ্ছুর দংশনের ঝাড়ফুঁক করি; এই বলে তারা তাদের পঠিত কথাগুলো পড়ে শোনায়। তখন নবীজী বললেন, কেউ তার ভাইয়ের উপকার করতে পারলে সে যেন তা করে। -মুসনাদে আহমাদ ৩/৩০২, হাদীস ১৪৩৮২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২১৯৯

যেহেতু হযরত জাবেরের মামা এবং  এই আনসারী সাহাবীর ঝাড়ফুঁকে পঠিত কথাগুলোতে শিরক ছিল না তাই নবীজী তাদেরকে এমন বলেছেন।

হযরত আয়েশা রা. বলেন-

رخص رسول الله صلى الله عليه و سلم لأهل بيت من الأنصار في الرقية من كل ذي حمة.

নবীজী আনসারী এক পরিবারকে বিষাক্ত প্রাণীর ঝাড়ফুঁকের অনুমতি দিয়েছেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২১৯৩

অর্থাৎ তাদের পরিবার এ ঝাড়ফুঁক করত।

হযরত আয়েশা রা.আরো বলেন-

كان رسول الله صلى الله عليه و سلم يأمرني أن أسترقي من العين.

নবীজী আমাকে বদ নযরের জন্য ঝাড়ফুঁক নিতে বলেছিলেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২১৯৫

একবার উম্মে সালামার বাদীর মুখ হলদে বর্ণ হয়ে যায়, তখন নবীজী বলেন-

بها نظرة فاسترقوا لها.

এর প্রতি কারো বদ নযর লেগেছে, তাই বদ নযরের ঝাড়ফুঁক করাও । -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২১৯৭

শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ বলেন-

دخل علي رسول الله صلى الله عليه و سلم وأنا عند حفصة فقال لي ” ألا تعلمين هذه رقية النملة (النملة قروح تخرج في الجنبين ) كما علمتها الكتابة؟

একদা আমি হাফসা রা.-এর কাছে বসা ছিলাম। নবীজী ঘরে আসলেন এবং আমাকে বললেন, তুমি হাফসাকে যেভাবে লেখা শিখিয়েছ তাকে ‘নামলা’ (এক ধরনের গোটা বিশেষ)-এর ঝাড়ফুঁক  শিখিয়ে দাও। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৮৭

যেহেতু এতে পঠিত কথাগুলোতে শিরক নেই এবং এর দ্বারাও মানুষের উপকার হয়, তাই হাফসাকে তা শিখিয়ে দিতে বললেন।

সাহাবী উমায়ের বলেন-

عرضت على النبي صلى الله عليه و سلم رقية كنت أرقي بها من الجنون فأمرني ببعضها ونهاني عن بعضها وكنت أرقي بالذي أمرني به رسول الله صلى الله عليه و سلم.

আমি উন্মাদের ঝাড়ফুঁক করতাম। নবীজীকে আমার পঠিত কথাগুলো শোনালাম। তখন নবীজী কিছু বাক্যের অনুমোদন দিলেন (অর্থাৎ এগুলো পড়ে ঝাড়ফুঁক করা যাবে) আর কিছু বাক্য থেকে নিষেধ করলেন (এগুলো পড়ে ঝাড়ফুঁক করা যাবে না)। নবীজী যেগুলোর অনুমতি দিয়েছিলেন পরবতীর্তে আমি শুধু তা দিয়েই ঝাড়ফুঁক করতাম। -শরহু মাআনিল আসার, হাদীস ৭০৪৫

কুরায়ব আলকিন্দি বলেন-

أخذ بيدي علي بن الحسين، فانطلقنا إلى شيخ من قريش يقال له : ابن أبي حثمة يصلي إلى أسطوانة، فجلسنا إليه، فلما رأى عليا انصرف إليه، فقال له علي : حدثنا حديث أمك في الرقية قال : حدثتني أمي أنها كانت ترقي في الجاهلية فلما جاء الإسلام قالت : لا أرقي حتى أستأذن رسول الله صلى الله عليه و سلم فأتته فاستأذنته.

একদা আলী ইবনুল  হাসান আমাকে কুরায়শের এক বৃদ্ধ লোকের কাছে নিয়ে যান। তিনি তখন মসজিদের এক খুঁটির কাছে নামায পড়ছেন। আমরা তার কাছে গিয়ে বসলাম। আলীকে দেখার পর তিনি তার দিকে ফিরলেন, তখন আলী তাকে বললেন, আপনি আমাদেরকে ঝাড়ফুঁকের বিষয়ে আপনার আম্মার হাদীসটি শোনান। তিনি বললেন, আমার আম্মা আমাকে বলেছেন, তিনি জাহিলিয়্যাতের যুগে ঝাড়ফুঁক করতেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি বললেন, আমি নবীজী  থেকে অনুমতি নেওয়া ব্যতীত আর কোনো ঝাড়ফুঁক করব না। তাই তিনি নবীজীর কাছে আসলেন, এবং বিষয়টি বললেন। তখন নবীজী উত্তরে বললেন-

ارقي ما لم يكن فيها شرك.

শিরক-কুফর ব্যতীত অন্য সবকিছু  দিয়ে ঝাড়ফুঁক করতে থাক। -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৬০৯২

ইমাম ইবনে হিব্বান রাহ. এই হাদীসের শিরোনাম দেন-

ذِكْرُ الْخَبَرِ الدّالِّ عَلَى أَنّ الرّقَى الْمَنْهِيّ عَنْهَا إِنّمَا هِيَ الرّقَى الّتِي يُخَالِطُهَا الشِّرْكُ بِاللهِ جَلّ وَعَلَا دُونَ الرّقَى الّتِي لَا يَشُوبُهَا شِرْكٌ.

আপাতত এখানে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করেই এ প্রসঙ্গ সমাপ্ত করা হচ্ছে। হাদীসের কিতাবে এ সংক্রান্ত আরো বহু হাদীস আছে, যা উদ্ধৃত করলে  আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। এসব হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, যেসব ঝাড়ফুঁকে শিরক আছে তা হারাম ও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ আর যে সবে কুফর-শিরক নেই সেসব দিয়ে ঝাড়ফুঁক জায়েয। বিষয়টি যেহেতু হাদীসের মধ্যেই ফয়সালাকৃত তাই এটাই পরবর্তী সকল ইমামদের মত। ইমাম মুহাম্মদ রাহ. লেখেন-

لا بأس بالرقي بما كان في القرآن و ما كان من ذكر الله، فأما ما كان لا يعرف من الكلام فلا ينبغي أن يرقى به.

কুরআনের আয়াত এবং আল্লাহর যিকির দ্বারা ঝাড়ফুঁক করতে অসুবিধা নেই। হাঁ, যেসব শব্দাবলীর অর্থ অস্পষ্ট তা দিয়ে ঝাড়ফুঁক করা নিষেধ (কেননা তা শিরকমুক্ত কি না জানা নেই)। -মুয়াত্তা মুহাম্মাদ, পৃ. ৩৭৩-৩৭৪

ইমাম তহাবী রাহ. লেখেন-

فدل ذلك أن كل رقية لا يشرك فيها فليست بمكروهة

(এসব) হাদীস প্রমাণ করে, যেসব ঝাড়ফুঁকে শিরক নেই তা বৈধ। -শরহু মাআনিল আসার ৪/১৫৩

ইমাম বায়হাকী রাহ. লেখেন-

وهذا كله يرجع إلى ما قلنا من أنه إن رقى بما لا يعرف أو على ما كان أهل الجاهلية من إضافة العافية إلى الرقى لم يجز، وإن رقى بكتاب الله أو بما يعرف من ذكر الله متبركا به وهو يرى نزول الشفاء من الله تعالى فلا بأس به، وبالله التوفيق.

যেসব হাদীসে ঝাড়ফুঁক করতে নিষেধাজ্ঞা এসেছে সেসব হাদীস উল্লেখ করার পর ইমাম বায়হাকী রাহ. বলেন, এসব হাদীসের অর্থ হল, যদি অস্পষ্ট কোনো শব্দাবলি দ্বারা ঝাড়ফুঁক করে অথবা জাহেলী যুগের মনোভাব নিয়ে ঝাড়ফুঁক করে যে, আল্লাহ নয় এ ঝাড়ফুঁকই রোগ ভালো করে তাহলে তা জায়েয নেই।

হাঁ, যদি কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর যিকিরের দ্বারা ঝাঁড়ফুক করে এবং এটা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহই সুস্থতা দানকারী তাহলে এ ঝাড়ফুঁকে কোনো অসুবিধা নেই। -সুনানে কুবরা, বায়হাকী ৯/৫৮০

ইমাম বায়হাকী এ সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের শিরোনাম দেন এভাবে-

باب إباحة الرقية بكتاب الله عز وجل وبما يعرف من ذكر الله.

আল্লামা ইবনে আবদুল বার রাহ. বলেন-

لا أعلم خلافا بين العلماء في جواز الرقية من العين أو الحمة، وهي لدغة العقرب وما كان مثلها، إذا كانت الرقية بأسماء الله عزوجل، ومما يجوز الرقي به.

এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মাঝে কোনো মতভেদ নেই যে, বদনযর সাপ-বিচ্ছুর দংশন বা এ ধরনের আরো যত বিষয় আছে সেগুলোতে ঝাড়ফুঁক করা বৈধ। যদি সে ঝাড়ফুঁক আল্লাহর নাম দ্বারা হয় অথবা এমন কথা দিয়ে হয়, যা দিয়ে ঝাড়ফুঁক বৈধ। -আলইসতেযকার ৮/৪০৫

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন-

وقد أجمع العلماء على جواز الرقي عند اجتماع ثلاثة شروط: أن يكون بكلام الله أو بأسمائه وبصفاته. وباللسان العربي أو بما يعرف معناه من غيره، وأن يعتقد أن الرقية لا يؤثر بذاتها بل بذات الله تعالى…

এ ব্যাপারে সকল উলামায়ে কেরাম একমত যে, তিনটি শর্তে ঝাড়ফুঁক বৈধ। এক. আল্লাহর কালাম বা তাঁর নাম-সিফাত দিয়ে হতে হবে। দুই. (আল্লাহর নাম-সিফাত বা আল্লাহর কালাম দিয়ে না হলে) আরবী ভাষায় বা এমন শব্দাবলী দ্বারা হতে হবে, যার অর্থ বুঝা যায় (এবং তাতে ‘মুনকার’ কিছুও নেই)। তিন. এমন বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহই সুস্থতা দানকারী, ঝাড়ফুঁক নয়। -ফাতহুল বারী ১০/২৪০

আল্লাহর যাত-সিফাত, নাম-কালাম দিয়ে স্বয়ং নবীজীও ঝাড়ফুঁক করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরাম করলে তার সমর্থনও করেছেন। হাদীসের কিতাবে নবীজী ও সাহাবায়ে কেরামের ঝাড়ফুঁক বিষয়ক বহু বর্ণনা ও ঘটনা উল্লেখ আছে। নমুনা স্বরূপ কয়েকটি উল্লেখ করা হল।

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

أن النبي صلى الله عليه وسلم كان ينفث على نفسه في المرض الذي مات فيه بالمعوذات، فلما ثقل كنت أنفث عليه بهن وأمسح بيد نفسه لبركتها.

নবীজী  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর সময় অসুস্থ হলে সূরা ফালাক ও নাস পড়ে উভয় হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে বুলিয়ে দিতেন। যখন অসুস্থতা এত বেড়ে যেত যে, নিজে নিজে তা করতে পারছেন না তখন আমি নিজেই পড়ে তাঁর গায়ে দম করতাম এবং তাঁর হাত তাঁর গায়ে বুলিয়ে দিতাম। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৩৫

ইমাম বুখারী রাহ. এ হাদীসের শিরোনাম দিয়েছেন-

باب الرقي بالقرآن والمعوذات

তিনি আরো বলেন-

كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا آوى إلى فراشه نفث في كفيه بـ “قل هو الله أحد” وبالمعوذتين جميعا، ثم يمسح بهما وجهه وما بلغت يداه من جسده. قالت عائشة: فلما اشتكى كان يأمرني أن أفعل ذلك به.

নবীজী যখন রাতে শোয়ার জন্য বিছানায় আসতেন তখন সূরা ইখলাস-ফালাক-নাস পড়ে দু’হাতে ফুঁ দিতেন। অতপর উভয় হাত, মুখ ও শরীরের যে পর্যন্ত পৌঁছে সে পর্যন্ত বুলাতেন, ইন্তেকালের পূর্বে যখন নবীজী অসুস্থ হন তখন আমাকে তা পড়ে তাঁর গায়ে এমন করে দিতে বলতেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৪৮

ইমাম বুখারী রাহ. এ হাদীসের শিরোনাম দিয়েছেন-

باب النفث في الرقية

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,-

أن رهطا من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم انطلقوا في سفرة سافروها، حتى نزلوا بحي من أحياء العرب، فاستضافوهم فأبوا أن يضيفوهم، فلدغ سيد ذلك الحي، فسعوا له بكل شيء، لا ينفعه شيء، فقال بعضهم لو أتيتم هؤلاء الرهط الذين قد نزلوا بكم، لعله أن يكون عند بعضهم شيء، فأتوهم فقالوا: يا أيها الرهط إن سيدنا لدغ فسعينا له بكل شيء لا ينفعه شيء ،فهل عند أحد منكم شيء؟ فقال بعضهم: نعم والله إني لراق، ولكن والله لقد استضفناكم فلم تضيفونا، فما أنا براق لكم حتى تجعلوا لنا جعلا فصالحوهم على قطيع من الغنم، فانطلق فجعل يتفل ويقرأ الحمد لله رب العالمين حتى لكأنما نشط من عقال، فانطلق يمشي ما به قلبة، قال: فأوفوهم جعلهم الذي صالحوهم عليه، فقال بعضهم: اقسموا فقال الذي رقى: لا تفعلوا حتى نأتي رسول الله صلى الله عليه وسلم، فنذكر له الذي كان، فننظر ما يأمرنا، فقدموا على رسول الله صلى الله عليه وسلم فذكروا له، فقال وما يدريك أنها رقية؟ أصبتم، اقسموا واضربوا لي معكم بسهم.

সাহাবীদের এক কাফেলা একবার সফরে বের হন। পথিমধ্যে তারা আরবের একটি গোত্রের এলাকায় পৌঁছেন এবং তাদের মেহমান হতে আবেদন করেন, কিন্তু গোত্রবাসী তাদের মেহমানদারী করতে অসম্মতি জানায় । এ সময় গোত্রপ্রধানকে সাপ বা বিচ্ছু দংশন করে এবং গোত্রবাসী বিষ নামানোর জন্য সর্বপ্রকার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো কাজ হয় না। অবশেষে তারা সাহাবীদের কাছে এসে বলল, আমাদের গোত্রপ্রধান দংশিত হয়েছেন, আমরা সব ধরনের চেষ্টা করেছি, কিন্তু ফল হচ্ছে না; তোমাদের কাছে কি কিছু আছে?

এক সাহাবী বললেন, হাঁ, আমি ঝাড়ফুঁক জানি, কিন্তু আমরা তোমাদের কাছে মেহমানদারীর আবেদন করেছি তোমরা তা প্রত্যাখ্যান করেছ। তাই আল্লাহর শপথ তোমরা বিনিময় নির্ধারণ করার আগ পর্যন্ত আমি কোনো প্রকার ঝাড়ফুঁক করব না। অবশেষে তারা এক পাল ছাগল দিতে সম্মত হল। সে সাহাবী সূরা ফাতিহা পড়ে ঐ ব্যক্তির গায়ে ফুঁ দিতে লাগলেন। ধীরে ধীরে সে এমন সুস্থ হয়ে গেল, যেন সে এইমাত্র বাঁধনমুক্ত হল এবং এমনভাবে হাঁটতে লাগল যেন তার কোনো কষ্টই নেই। অতপর তারা তাদের ওয়াদাকৃত বিনিময় দিল। তখন একজন সাহাবী বললেন, এগুলো আমরা ভাগ করে নিই। তখন যে সাহাবী ঝাড়ফুঁক করেছেন তিনি বললেন, না, নবীজীকে জিজ্ঞেস করা ছাড়া তা হবে না। তিনি যা বলেন তাই করব। তারা নবীজীর কাছে আসার পর পুরো ঘটনা বলেন। তখন নবীজী বলেন, তোমাদের কে বলল, এটি জাহেলী ঝাড়ফুঁক! তোমরা যা করেছ ঠিকই করেছ। যাও, এগুলো তোমাদের মাঝে বণ্টন করে নাও আর আমাকেও এক অংশ দিয়ো। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৪৯

ইমাম বুখারী রাহ. এ হাদীসের শিরোনাম দেন-

باب النفث في الرقية

খারিজা ইবনুস সালত তার চাচা থেকে বর্ণনা করেন-

أنه مر بقوم عندهم مجنون موثق في الحديد، فقال له بعضهم : عندك شيء تداوي هذا به، فإن صاحبكم قد جاء بخير؟ قال : فقرأت عليه فاتحة الكتاب ثلاثة أيام، كل يوم مرتين، فأعطاه مئة شاة، قأتى النبي صلى الله عليه و سلم، فذكر ذلك له، فقال له صلى الله عليه و سلم : كل، فمن أكل برقية باطل فقد أكلت برقية حق.

তার চাচা একদা এক গোত্রের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখলেন, এক লোক উন্মাদ হয়ে গিয়েছে। তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তখন ঐ লোকের পরিবার খারেজার চাচার কাছে এসে বলল আমরা শুনেছি, তোমাদের রাজা (নবীজী) নাকি উত্তম কিছু নিয়ে এসেছেন। তাই তোমার কাছে কি এ ব্যক্তির চিকিৎসার কিছু আছে? তখন তিনি তিন দিন তাকে সূরা ফাতিহা পড়ে ঝাড়ফুঁক করলেন। এতে লোকটি সুস্থ হয়ে গেল এবং তারা তাকে একশটি ছাগল হাদিয়া দিল। তিনি নবীজীর কাছে এসে ঘটনা শোনালেন। নবীজী বললেন, এ ছাগল তুমি খাও (এতে কোনো অসুবিধা নেই)। অন্যরা বাতিল ঝাড়ফুঁক করে খায়, এগুলো তো  তুমি সত্য ঝাড়ফুঁক করে পেয়েছ। -মুসনাদে আহমাদ ৫/৩১১; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৬১১০

উপরোক্ত হাদীস ও উলামায়ে কেরামের অভিমতগুলো থেকে পরিষ্কার যে, ইসলাম শিরককে কোনোভাবেই মেনে নেয় না। মুসলমানদের জীবনের সকল ক্ষেত্র শিরকমুক্ত হবে। তাওহীদই হল সবকিছুর মূল। তাই নবীজী শিরক অনুপ্রবেশের সকল ছিদ্রপথ কঠোরভাবে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। আর সে অনুসারেই ঝাড়ফুঁকের সীমা নির্ধারণ করে  দেন যে, শিরকসম্বলিত কোনো ঝাড়ফুঁকই মুসলমানদের জন্য জায়েয নেই, হারাম। এতে তার ঈমান ধ্বংস হয়ে যাবে।

তবে যদি শিরকমুক্ত হয় তাহলে ঝাড়ফুঁক বৈধ। তাই উলামায়ে কেরাম বলেছেন, আল্লাহর নাম-সিফাত, তাঁর কালাম ও হাদীসের দুআ ইত্যাদি দিয়ে ঝাড়ফুঁক মাসনূন। তেমনি শিরকমুক্ত অন্য যে কোনো কথা দিয়েও ঝাড়ফুঁক জায়েয, তবে এর জন্য জরুরি হল, কী বলছে তার ভাষা বুঝা যেতে হবে। তাতে ‘মুনকার’ কিছু না থাকতে হবে এবং এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহই সুস্থতা দানকারী। যদি ভাষা বুঝা না যায় তাহলে উলামায়ে কেরাম এসব তন্ত্র-মন্ত্রকেও নাজায়েয বলেন।

আর যেহেতু নবীজী নিজেই বিভিন্ন রোগ বালাইয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দুআ যিকির দ্বারা ঝাড়ফুঁক করেছেন এবং শিখিয়ে গিয়েছেন তাই অন্য সকল ঝাড়ফুঁক থেকে সেগুলোই শ্রেষ্ঠ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ। কিন্তু সমাজের চিত্র দেখলে মনে হয়, ঝাড়ফুঁকের ক্ষেত্রে যে ইসলামের এমন কঠোর বিধান আছে তা আমাদের  অনেকেই জানে না। মনে করে, যে কোনো ব্যক্তি থেকে ঝাড়ফুঁক নেওয়া যাবে। সে কী দিয়ে ঝাড়ফুঁক করছে তার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ  করে না; বরং সে বিধর্মী, মুশরিক (যেমন, হিন্দু), অগ্মিপূজক হলেও কোনো অসুবিধা মনে করে না। অথচ জানা কথা তার তন্ত্র-মন্ত্র শিরকমুক্ত হবে না। তার পরও বিনা দ্বিধায় তারা হিন্দু, মগ, চাকমা, বৌদ্ধ ইত্যাদি গণক ও মন্ত্রবিদের কাছে যায়; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুসলমানদের ঝাড়ফুঁকের চেয়ে তাদের ঝাড়ফুঁককে বেশি কার্যকর মনে করে (নাউযুবিল্লাহ)।

আমরা অনেকে মনে করি, সকল রোগই  শারীরিক কারণে সৃষ্টি হয়, এখানে অন্য কোনো কিছু কার্যকর নয়। অথচ বিষয়টি এমন নয়। শয়তানও এসব সৃষ্টি করে, যাতে মানুষ শয়তানী মন্ত্রের চিকিৎসা নিয়ে মুশরিক হয়ে যায়।

সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. একদিন তাঁর স্ত্রী যায়নাবকে হাদীস শোনান যে, নবীজী বলেছেন, নিশ্চয় জাহেলী ঝাড়ফুঁক শিরক। তখন যায়নাব বলেন, বিষয়টি বুঝলাম না; আমার চোখ ফুলে যেত এবং পানি ঝরত। তাই আমি এক ইহুদী নারী থেকে ঝাড়ফুঁক নিতাম। ঝাড়ফুঁক করালেই সুস্থ হয়ে যেতাম। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বললেন, এটা শয়তানের কাজ। সে তোমার চোখে খোঁচা দেয় আর তাতে তা ফুলে যায় ও পানি ঝরতে থাকে আর যখন সে ইহুদী নারী (মন্ত্র দিয়ে) ঝাড়ফুঁক করে তখন শয়তান থেমে যায়। তোমার জন্য তো সে দুআটিই যথেষ্ট, যা নবীজী বলতেন-

أَذْهِبِ الْبَأْسَ رَبّ النّاسِ، اشْفِ أَنْتَ الشّافِي، لَا شِفَاءَ إِلّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا.

-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৭৯

তো এসব কারণে অনেক সময় শিরকী মন্ত্রে কাজ হয়, এটা শয়তানেরই চক্রান্ত। কিন্তু কথা হল, ঈমান সবার আগে। ঈমানের জন্যই বাঁচা। শয়তানের নামে মন্ত্র পড়ে ঝাড়ফুঁক করে সুস্থ হলাম, কিন্তু শিরকে লিপ্ত হলাম। শিরকওয়ালা জীবনের কী মূল্য?

তাই অবশ্যকরণীয়- আমাদের ঈমান শুধরে নেওয়া। বেশি বেশি আল্লাহর কুদরতের আলোচনা করার মাধ্যমে ঈমানকে মজবুত করা। আর কুরআন-হাদীসে বর্ণিত দুআসমূহকে নিজের ও পরিবারের জন্য রক্ষাকবচ জ্ঞান করা।

এসব দুআ সংকলিত হয়েছে এমন একটি কিতাবের নাম ‘হিসনুল মুসলিম’, যার অর্থ হল- মুসলিমের দুর্গ। বাস্তবেই নবীজীর শেখানো দুআগুলো মুসলিমের দুর্গ। উক্ত কিতাবের লেখকেরই আরেকটি কিতাবের নাম ‘আদ দুআ মিনাল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ’। ইনশাআল্লাহ, আমরা এসব দুআ শিখব এবং দৈনন্দিন আমলে পরিণত করব।

প্রসঙ্গ : তাবিজ

পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি রোগ-বালাই ও মসিবতে নবীজী অনেক দুআ ও ঝাড়ফুঁক শিখিয়েছেন। সেসব দুআসহ আল্লাহর নাম বা যে কোনো দুআ দ্বারা ঝাড়ফুঁক বৈধ বরং মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে সকল উলামায়ে কেরাম একমত এবং এর উপর সর্বযুগে আমল হয়ে আসছে।  যেহেতু আল্লাহর নাম, সিফাত, কালাম ইত্যাদির মাধ্যমে রোগ-বালাই ও বিপদ-আপদ দূর হয় তাই এসব দ্বারা যেমন ঝাড়ফুঁক করা হত, তেমনিভাবে অনেকে এক্ষেত্রে আরো একটি পদ্ধতি অবলম্বন করতেন; আর তা হল, এসব দুআ-যিকির-আয়াত কাগজ ইত্যাদিতে লিখে তা  রোগীর গায়ে লাগিয়ে দিতেন। এ পদ্ধতিটি সাহাবা-তাবেয়ী যুগেও মওজুদ ছিল। সামনে আমরা এ বিষয়ে আলোকপাত করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। আমরা দেখব, সাহাবী-তাবেয়ীযুগে তাবীজের ব্যবহার কেমন ছিল

১. সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. হতে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِذَا فَزِعَ أَحَدُكُمْ مِنْ نَوْمِهِ فَلْيَقُلْ: بِسْمِ اللهِ، أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التّامّاتِ مِنْ غَضَبِهِ وَسُوءِ عِقَابِهِ، وَمِنْ شَرِّ عِبَادِهِ، وَمِنْ شَرِّ الشّيَاطِينِ وَأَنْ يَحْضُرُونِ.

তোমাদের কেউ ঘুমে ভয় পেলে সে যেন এ দুআ পড়ে-

بِسْمِ اللهِ، أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التّامّاتِ مِنْ غَضَبِهِ وَسُوءِ عِقَابِهِ، وَمِنْ شَرِّ عِبَادِهِ، وَمِنْ شَرِّ الشّيَاطِينِ وَأَنْ يَحْضُرُونِ.

বর্ণনাকারী সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস তার প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদেরকে এ দুআটি শিখিয়ে দিতেন। আর যারা অপ্রাপ্ত বয়স্ক তাদের জন্য দুআটি লিখে তাদের গলায় ঝুলিয়ে দিতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ২৩৫৪৭; মুসনাদে আহমাদ ২/১৮১; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৮৯; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৫২৮; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ২০১০

قال الترمذي : حسن غريب.

২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, কোনো নারীর সন্তান প্রসব কঠিন হয়ে গেলে তার জন্য যেন এ দুআ ও এ দুটি আয়াত একটি থালায় লেখা হয়। অতপর তা ধুয়ে সে নারীকে পান করানো হয়। দুআটি হল-

بِسْمِ اللهِ لا إِلهَ إِلاّ هُوَ الْحَلِيمُ الْكَرِيمُ، سُبْحَانَ اللهِ رَبِّ السّموَاتِ السّبْعِ وَرَبِّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، كَأَنّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلّا عَشِيّةً أَوْ ضُحَاهَا. كَأَنّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَ مَا يُوعَدُونَ لَمْ يَلْبَثُوا إِلّا سَاعَةً مِنْ نَهَارٍ، بَلَاغٌ فَهَلْ يُهْلَكُ إِلّا الْقَوْمُ الْفَاسِقُونَ.

-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ২৩৯৭৫

৩.

عَنْ عَائِشَةَ: أَنّهَا كَانَتْ لَا تَرَى بَأْسًا أَنْ يُعَوّذَ فِي الْمَاءِ ثُمّ يُصَبّ عَلَى الْمَرِيضِ.

হযরত আয়েশা রা. রোগীর জন্য পানিতে কিছু পড়ে তা রোগীর গায়ে ঢেলে দেওয়াতে কোনো অসুবিধা মনে করতেন না। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ২৩৯৭৫

৪. আবু কিলাবা লাইস এবং মুজাহিদ রাহ. থেকে বর্ণনা করেন-

أنهما لم يريا بأسا أن يكتب آية من القرآن ، ثم يسقاه صاحب الفزع.

তারা উভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত রোগীর জন্য কোনো আয়াত লিখে তা ধুয়ে রোগীকে খাওয়ানোতে কোনো ধরনের অসুবিধা মনে করতেন না। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ২৩৯৭৬

৫. হাজ্জাজ বলেন-

أخبرني من رأى سعيد بن جبير يكتب التعويذ لمن أتاه، قال حجاج: وسألت عطاء فقال: ما سمعنا بكراهيته إلا من قبلكم أهل العراق.

বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত সায়ীদ ইবনে জুবাইর নিজে তাবীজ লিখতেন।

বর্ণনাকারী হাজ্জাজ বলেন, আমি আতা ইবনে আবী রাবাহকে তাবীয বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন এতে কোনো অসুবিধার কথা আমরা শুনিনি। কেউ কিছু বললে তোমাদের ইরাকের কেউ বলতে পারে।  -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, বর্ণনা ২৩৯৭৭

(বিশিষ্ট তাবেয়ী) ইবরাহীম নাখায়ী বিষয়টি নিষেধ করতেন। তিনি ইরাকের। আতা ইবনে আবী রাবাহ সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

ইবনে আবী শাইবা রাহ. এখানে শিরোনাম দিয়েছেন-

فِي الرّخْصَةِ فِي الْقُرْآنِ يُكْتَبُ لِمَنْ يُسْقَاهُ.

৬. আবু ইছমা বলেন-

سألت سعيد بن المسيب عن التعويذ؟ فقال: لا بأس به إذا كان في أديم.

আমি সায়ীদ ইবনুল মুসায়্যিবকে তাবীয সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি, জবাবে তিনি বলেন, কোনো অসুবিধা নেই যদি চামড়ায় মোড়ানো থাকে। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ২৪০০৯

৭. আব্দুল মালিক রাহ. বলেন-

عن عطاء في الحائض يكون عليها التعويذ، قال: إن كان في أديم، فلتنزعه، وإن كان في قصبة فضة، فإن شاءت وضعته، وإن شاءت لم تضعه.

আতা ইবনে আবী রাবাহকে জিজ্ঞেস করা হয়, ঋতুবর্তী নারীর গায়ে তাবিজ থাকলে কোনো অসুবিধা আছে? জবাবে বলেন, যদি চামড়ায় লেখা থাকে তাহলে গায়ের থেকে খুলে নিবে। আর যদি রূপার (ইত্যাদি) খোলে থাকে তাহলে খুলে রাখলে ভালো, না খুললেও কোনো অসুবিধা নেই। -প্রাগুক্ত ২৪০১০

৮. ছুওয়াইর রাহ. বলেন-

كان مجاهد يكتب للناس التعويذ فيعلق عليهم.

(আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বিশিষ্ট ছাত্র, প্রসিদ্ধ তাবেয়ী) মুজাহিদ রাহ. মানুষের জন্য তাবীয লিখতেন। অতপর তাদের গায়ে ঝুলিয়ে দিতেন। -প্রাগুক্ত ২৪০১১

৯. লাইছ রাহ. আতা ইবনে আবী রাবাহ রাহ. থেকে বর্ণনা করেন-

لا بأس أن يعلق القرآن.

কুরআনের আয়াত লিখে ঝুলাতে কোনো অসুবিধা নেই। -প্রাগুক্ত ২৪০১৬

১০. নবীজীর বংশধর জাফর সাদিক তাঁর পিতা (এবং হযরত হুসাইন রা.-এর নাতি) মুহাম্মাদ ইবনে আলী থেকে বর্ণনা করেন-

كان لا يرى بأسا أن يكتب القرآن في أديم ثم يعلقه.

মুহাম্মদ ইবনে আলী চামড়ায় কুরআনের আয়াত লিখে তা গায়ে ঝুলানোতে কোনো অসুবিধা মনে করতেন না। -প্রাগুক্ত ২৪০১২

১১. ইউনুছ ইবনে খাব্বাব বলেন-

سألت أبا جعفر عن التعويذ يعلق على الصبيان، فرخص فيه.

আমি আবু জাফর (মুহাম্মাদ ইবনে আলী)-কে শিশুদের গায়ে তাবীয ঝুলানো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি, তিনি এর অনুমতি দেন। -প্রাগুক্ত ২৪০১৭

১২. ইসমাঈল ইবনে মুসলিম রাহ. বিশিষ্ট তাবেয়ী ইবনে সীরীন রাহ.-এর ফাতাওয়া বর্ণনা করেন-

أنه كان لا يرى بأسا بالشيء من القرآن.

ইবনে সীরীন রাহ. কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে তাবীয লেখাকে দূষণীয় মনে করতেন না। -প্রাগুক্ত ২৪০১৪

১৩. জুওয়াইবির ইবনে সায়ীদ আলআযদী রাহ. দাহহাক-এর অভিমত বর্ণনা করেন-

أنه لم يكن يرى بأسا أن يعلق الرجل الشيء من كتاب الله، إذا وضع عند الغسل و عند الغائط.

দাহহাক রাহ. কুরআনের আয়াত দিয়ে তাবিজ লিখে তা গায়ে ঝুলাতে কোনো অসুবিধা মনে করতেন না, যদি গোসল ও হাম্মামে যাওয়ার সময় তা খুলে রাখা হয়। (অর্থাৎ যদি খোলের ভেতর না থাকে) -প্রাগুক্ত ২৪০১৮

ইবনে আবী শাইবা রাহ. এ অধ্যায়ের শিরোনাম দেন-

من رخص في تعليق التعويذ

১৪. ইউনুছ ইবনে হিব্বান রাহ. বলেন-

سَأَلْتُ أبا جعفر محمد بن علي أَنْ أُعَلِّقَ التّعْوِيذَ، فَقَالَ: إِنْ كَانَ مِنْ كِتَابِ اللهِ أَوْ كَلَامٍ عَنْ نَبِيِّ اللهِ فَعَلِّقْهُ وَاسْتَشْفِ بِهِ مَا اسْتَطَعْتَ.

আমি আবু জাফর বাকিরকে তাবীয পরিধান  সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি, জবাবে তিনি বলেন, যদি কুরআন বা নবীর কথা দিয়ে হয় তাহলে পরিধান কর এবং যত পার তা দিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ কর। -যাদুল মাআদ ৪/৩২৭

১৫. আব্দুুল মালিক রাহ. বলেন-

عَنْ عَطَاءٍ، فِي الْمَرْأَةِ الْحَائِضِ فِي عُنُقِهَا التّعْوِيذُ أَوِ الْكِتَابُ؟ قَالَ: إِنْ كَانَ فِي أَدِيمٍ فَلْتَنْزِعْهُ وَإِنْ كَانَ فِي قَصَبَةٍ مُصَاغَةٍ مِنْ فِضّةٍ، فَلَا بَأْسَ إِنْ شَاءَتْ وَضَعَتْ، وَإِنْ شَاءَتْ لَمْ تَفْعَلْ.

قِيلَ لِعَبْدِ اللهِ: تَقُولُ بِهَذَا قَالَ: نَعَمْ

ঋতুমতী নারীর গলায় তাবীয বা কুরআনের কোনো আয়াত ঝুলানো থাকে, এতে কোনো অসুবিধা আছে কি না- আতা ইবনে আবী রাবাহকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, যদি চামড়ায় থাকে তাহলে ঋতু চলাকালীন সময়ে যেন তা খুলে নেয়। আর যদি রুপার খোলের ভেতর থাকে তাহলে না খুললেও কোনো অসুবিধা নেই।

আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হল যে, আপনিও এমন বলেন, জবাবে বললেন, হাঁ। -সুনানে দারেমী, বর্ণনা ১২১২; ইমাম দারেমী রাহ. শিরোনাম দিয়েছেন-

باب التعويذ للحائض

১৬.  ইবনে জুরাইজ রাহ. বলেন,

قلت لعطاء، القرآن كان على امراة فحاضت أو أصابتها جنابة اتنزعها؟ قال: إن كان في قصبة فلا بأس. قلت: فكان في رقعة، فقال هذه أبغض إلي. قلت: فلم مختلفان؟ قال: إن القصبة هي أكف من الرقعة.

قال ابن جريج : و سمعته قبل ذلك يسأل أيجعل على الصبي القرآن؟ قال: إن كان في قصبة من حديد أو قصبة ما كانت فنعم، أما رقعة فلا.

আমি আতা ইবনে আবী রাবাহকে জিজ্ঞেস করলাম, কোনো নারীর শরীরে যদি কুরআনের আয়াত লেখা (তাবীয) থাকে আর সে ঋতুমতী হয় বা তার ওপর গোসল ফরয হয় (অর্থাৎ যে সময়  কুরআন স্পর্শ করা নাজায়েয) তাহলে কি সে তাবীযটি খুলে রাখবে?

জবাবে তিনি বললেন, যদি তা খোলের মধ্যে হয় তাহলে কোনো অসুবিধা নেই। আর যদি কাগজের মধ্যে হয় তাহলে খুলে নিবে। আমি বললাম উভয়ের মাঝে পার্থক্য কী? জবাবে বললেন, যখন তা খোলের ভেতর থাকে তখন তা ভেতরে থাকে; স্পর্শে আসে না। কিন্তু কাগজে থাকলে স্পর্শে আসে। ইবনে জুরাইজ বলেন, আমি এর পূর্বে (এক ব্যক্তিকে) তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে শুনেছি যে, শিশুদের গায়ে কুরআনের আয়াত লিখে ঝুলাতে কোনো অসুবিধা আছে কি না? তখন জবাবে তিনি বলেছিলেন, যদি লোহা বা এজাতীয় অন্য কিছুর খোলে হয়, তাহলে অসুবিধা নেই আর যদি কাগজে হয় তাহলে নিষেধ। (কারণ, এতে কুরআনের সম্মান রক্ষা সম্ভব হয় না।) -মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, বর্ণনা ১৩৪৭

১৭. আলকামা রাহ. বলেন-

سَأَلْتُ ابْنَ الْمُسَيِّبِ، عَنِ الِاسْتِعَاذَةِ تَكُونُ عَلَى الْحَائِضِ وَالْجُنُبِ؟ فَقَالَ: لَا بَأْسَ بِهِ إِذَا كَانَ فِي قَصَبَةٍ أَوْ رُقْعَةٍ يَجُوزُ عَلَيْهَا.

আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহ.-কে জিজ্ঞেস করলাম, গোসল ফরয হওয়া ব্যক্তি বা ঋতুমতী নারীর গায়ে তাবীয থাকাতে কোনো অসুবিধা আছে কি না? জবাবে বললেন, যদি কোনো খোলের মধ্যে হয় অথবা কোনো কাগজে মোড়ানো থাকে তাহলে অসুবিধা নেই। -মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, বর্ণনা ১৩৪৮

উপরোক্ত বক্তব্যগুলো বড় বড় সাহাবী এবং বিশিষ্ট তাবেয়ীগণের। এসব থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, সে যুগে রোগ-বালাই থেকে মুক্তি বা নিরাপত্তার জন্য ঝাড়ফুঁকের ন্যায় তাবিজও ব্যবহার হত। আরো স্পষ্ট হল যে, ঐ যুগেও  তাবীযের প্রচলন ছিল। এমনকি সায়ীদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহ., মুজাহিদ রাহ., সায়ীদ ইবনে জুবায়ের রাহ.-এর মত দ্বীনের এত বড় জ্ঞানী তাবেয়ীগণ নিজেরাও তাবীয লিখতেন। সে তাবিজ মানুষ ব্যবহার করত। শিশু-নারী-পুরুষ সকলে ব্যবহার করত।

তাবিজের প্রচলন তাদের মধ্যে ছিল বলেই তো এ প্রশ্ন সামনে এসেছে যে, অপবিত্র অবস্থায় এ তাবিজ কী করবে। কারণ, এ সময় কুরআন স্পর্শ করা নাজায়েয; আর তাবীযে তো কুরআনের আয়াতই লেখা থাকে।

শুধু এ প্রশ্নটি ঐ যুগের কত মুফতীর কাছে এসেছে তা আমরা উপরে পড়েছি। এ থেকে বুঝা যায় তাঁদের মাঝে এর প্রচলন কত ব্যাপক ছিল।

মুসলিম যেহেতু তাওহীদে বিশ্বাসী, তাই সে সুস্থতা-অসুস্থতা, আপদ-বিপদ, সুখ-শান্তি একমাত্র আল্লাহর থেকেই হয় বলে বিশ্বাস করে। ঝাড়ফুঁক ও তাবিজ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সে এই বিশ্বাস মনে জাগরুক রাখবে। তাবিজ গ্রহণ করলে এই বিশ্বাস মনে জাগরূক রেখেই মুমিন একটি ওসীলা হিসেবে তাবীয গ্রহণ করবে এবং পূর্ণ লক্ষ্য রাখবে যাতে তাবিজ শিরকমুক্ত ও সকল বাতিল আকীদা ও নাজায়েয কর্মকাণ্ড মুক্ত হয়।

কিন্তু কিছু মানুষকে দেখা যায় দেদারসে কুফর-শিরক সম্বলিত তাবিজ গ্রহণ করছে, ব্যবহার করছে। কেউ কেউ তো বিধর্মীদের কাছেও তাবিজ আনতে যায়। আল্লাহর নাম-যিকির বাদ দিয়ে গায়রুল্লাহ বা অস্পষ্ট অনেক কিছু দিয়ে তাবীয লেখা হয়, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

শিরকের ভয়াবহতা ও ঘৃণ্যতার সামান্যতম অনুভ‚তি থাকলে এসবের অল্পতেই গা শিউরে ওঠার কথা। আলোচনার শুরুতে শিরকের ভয়াবহতা নিয়ে সামান্য আলোকপাত করা হয়েছে। সেখানে আমরা দেখেছি, শিরকের শাস্তি চিরস্থায়ী জাহান্নাম। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন। তাওহীদের উপর অবিচল রাখুন। সীরাতে মুসতাকীমের উপর থাকার তাওফীক দান করুন।

তাবিজ কি শিরক?

তাবিজ ব্যবহারকারীদের মধ্যে যেমন সীমালঙ্ঘন দেখা যায়; নির্দ্বিধায় ‘মুনকার’ ও শিরকী তাবিজ আদান-প্রদান ও ব্যবহার করতে দেখা যায় তেমনিভাবে কাউকে কাউকে দেখা যায়, আল্লাহর নামের যিকির, কুরআনের আয়াত বা দুআ সম্বলিত বৈধ তাবীযকে শিরক বলে বেড়াতে। শত শত তাওহীদী মুসলমানকে শিরকের দোষে দোষী সাব্যস্ত করতে।

আমরা একটু ভাবি, যারা আল্লাহর নাম-সিফাত, যিকির-আয়াত ও অন্যান্য দুআ সম্বলিত তাবিজকে শরীয়তস্বীকৃত একটি ‘মুবাহ মাধ্যম ও ওসিলা’ হিসেবে ব্যবহার করে এবং তাবিজ ব্যবহারের শরয়ী শর্তাবলি যথাযথ রক্ষা করে- যেমন, একমাত্র আল্লাহ তাআলাকেই মুক্তিদাতা ও আরোগ্যদাতা মনে করে, তাবীয  বা তাবীযদাতার ব্যাপারে কোনো ধরনের অতিরঞ্জনের শিকার হয় না, তাকে মুক্তিদাতা বা আরোগ্যদাতা মনে করে না বা তার তাবীয বা তার ঝাড়ফুঁককে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রভৃতি ‘মুনকার’ বিশ্বাস রাখে না, (এবং তাবীয ব্যবহারের পাশাপাশি মাসনূন দুআ-দরূদ ও মাসনূন ঝাড়ফুঁকের প্রতিও যত্নবান থাকে) তারা কি আল্লাহর সত্তায় বা তাঁর গুণাবলীতে কাউকে শরীক করছে?

স্পষ্ট যে, তারা এ ধরনের তাবীয ব্যবহার করে আল্লাহর সাথে বা তাঁর গুণাবলিতে কাউকে শরীক করছে না; বরং তাঁর দিকেই ধাবিত হচ্ছে এবং তাকেই রোগবালাই, বিপদ-মুসিবতে একমাত্র মুক্তিদাতা মনে করেই তার নাম-কালাম ব্যবহার করছে, যেমনটি ঝাড়ফুঁকের সময় করা হয়। তো  এটা একদিক থেকে তার ঈমান ও তাওহীদেরই বহিঃপ্রকাশ।

শিরকের পরিচয়, এর হাকীকত ও ভয়াবহতা সবচে বেশি বুঝতেন সাহাবায়ে কেরাম। তারপর তাঁদের অনুসারী তাবেয়ীগণ। তাঁরা নিজেরা কোনো প্রকার শিরকে লিপ্ত হবেন, কাউকে তা করতে বলবেন বা বাতলে দিবেন- তা কল্পনা করাও অসম্ভব। তাহলে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমর  ইবনুল আস কীভাবে তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চাদের গায়ে তাবিজ ঝুলিয়ে দিলেন! আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. কীভাবে তাবিজ লিখে রোগীকে তা ধুইয়ে খাওয়াতে বললেন? তখন কি অন্য সাহাবীরা ছিলেন না? কেন তাঁরা এদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন না এবং প্রতিবাদও করলেন না; বিষয়টি যদি ঈমান-কুফরের, তাওহীদ-শিরকের ইখতিলাফ হত?

বিশিষ্ট তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ., সাইদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহ., সাইদ ইবনে জুবাইর রাহ. এঁরা বড় বড় বিদ্বান। বড় বড় সাহাবীগণের শিষ্য। এঁরাই সাহাবীগণের পরে সে যুগের এবং পরবর্তী যুগের বড় বড় হাদীসবিশারদ ও ফিকাহবিদ। তাওহীদ ও তাকওয়া, ইখলাস ও যুহদ, ইবাদত ও আখলাক তথা দ্বীনী ইলম ও আমলের ধারক-বাহক। তাঁরা তাবিজ লিখতেন এবং তাঁদের মাঝে এর প্রচলন ছিল।

তেমনিভাবে আতা ইবনে আবি রাবাহ রাহ., দাহহাক রাহ., আবু জাফর আলবাকের রাহ., ইবনে সীরীন রাহ.-এর মত বড় বড় তাবেয়ী তাবীয লিখতেন ও ঝুলানোর অনুমতি দিতেন। দ্বীনী জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সাহাবীদের পরেই তাঁদের স্থান। এটা যদি শিরকই হত তাহলে এর প্রতিরোধে তাঁরাই হতেন উম্মাহর অগ্রজ। সাথে সাথে সাহাবা-তাবেয়ীনের ফতোয়ায় এর বৈধতা তো দূরের কথা বরং এর প্রতিরোধে তাঁরা কঠোর পদক্ষেপ নিতেন।

উপরোল্লেখিত শর্তসাপেক্ষে তাবীয যে জায়েয এবং তা যে শিরক নয় একথা প্রমাণের জন্য এসকল সাহাবা-তাবেয়ীনের আমলই যথেষ্ট। আল্লাহ আমাদের সুমতি দিন, রহম করুন। সকল বিষয়কে শরীয়তের নির্ধারিত সীমার ভেতর থেকে গ্রহণ-বর্জন করার তাওফীক দান করুন।

হাদীসে বর্ণিত তামীমা শব্দের অর্থ  তাবিজ নয়

মূল প্রসঙ্গের শুরুতে আমরা একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنّ الرّقَى، وَالتّمَائِمَ، وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ.

নিশ্চয় রুকইয়া, তামীমা ও তিওয়ালা শিরক। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৮৬

রুকইয়া হল ঝাড়ফুঁক, কিছু পড়ে কারো গায়ে দম করা, ফুঁ দেওয়া। প্রবন্ধের শুরুতে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোন ধরনের রুকইয়া (ঝাড়ফুঁক) শিরক, কোনটা মাসনূন আর কোনটা মুবাহ।

তিওয়ালা হল স্বামীকে বসে আনার মন্ত্র, জাহেলী যুগে যা শিরকে ভরপুর ছিল, ফলে তা শিরক।

আর রইল তামীমা, সেটির অর্থ কী?

আরেক হাদীসে আছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ تَعَلّقَ تَمِيمَةً، فَلَا أَتَمّ اللهُ لَهُ.

যে ‘তামীমা’ ঝুলায় আল্লাহ যেন তার উদ্দেশ্য পূর্ণ না করেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৪০৪

এভাবে আরো বেশ কয়েকটি হাদীসে ‘তামীমা’কে শিরক বলা হয়েছে ও এর কঠোর নিন্দা এসেছে। এই ‘তামীমা’ অর্থ কী?

যারা শরীয়তস্বীকৃত তাবীযকে শিরক বলে ফেলেন, তারা ‘তামীমা’র অর্থ মনে করেন তাবীয। আর হাদীসে তামীমাকে শিরক বলা হয়েছে সুতরাং তাবীয শিরক। গলতটা মূলত এখানেই। তাই ‘তামীমা’ শব্দের অর্থ পরিষ্কার হওয়া আবশ্যক। নি¤েœ আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ্ই তাওফীকদাতা।

‘তামায়েম’ ‘তামীমাহ’ শব্দের বহুবচন। এটি আরবী ভাষার বহু প্রাচীন শব্দ। ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়্যাতের যুগ থেকেই আরবী সাহিত্যে গদ্যে-পদ্যে বহুভাবে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামের পূর্বের প্রসিদ্ধ আরব কবি ইমরুউল কায়স তার এক কবিতায় বলেন-

فألهيتها عن ذي تمائم محول.

তেমনিভাবে পরবর্তী কবি-সাহিত্যিকদের কথায় ও কবিতায়ও তার অনেক ব্যবহার রয়েছে। এ ‘তামীমা’ হল কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর বিশেষ, যা ছিদ্র করে সুতায় বা চামড়ায় গেঁথে গলায় বা গায়ে পরা হত। তাদের জাহেলী বিশ্বাস ছিল, এ পাথরগুলো বিপদ-আপদ রোধ করে, অসুস্থতা দূর করে। বিশেষভাবে বদনযর প্রতিহত করে। তাই তাদের যেকোনো শিশুকে জন্মের পরই তারা তামীমা পরাত এবং একটি বয়স হলে তা খুলে ফেলত। তাদের ধারণা, এখন সে নিজেই শক্তিমান, বীর বাহাদুর; এখন তামীমা ঝুলানো থাকা এক ধরনের কাপুরুষতা। তাই সে বয়সে পৌঁছলে মাতা-পিতা তা খুলে নিত।

আরবী সাহিত্যের প্রসিদ্ধ পণ্ডিত আবু মুহাম্মাদ কাসিম ইবনে আলী আলহারীরী তার ‘মাকামাত’ গ্রন্থের দ্বিতীয় ‘মাকামা’র শুরু এভাবে করেন-

حكى الحارث بن همام قال : كلفت مذ ميطت عني التمائم، ونيطت بي العمائم.

যখন থেকে আমার ‘তামীমা’ খোলা হয় এবং আমাকে শিরস্ত্রাণ পরিয়ে দেয়া হয় তখন থেকে আমি সাহিত্য সভার প্রতি আসক্ত হই। -মাকামাতে হারীরী পৃ. ২৫

আরেক কবি এক স্থান সম্পর্কে বলেন-

بلاد بها نيطت علي تمائمي + وأول أرض مس جلدي ترابها.

এটি এমন জায়গা, যেখানে আমাকে ‘তামীমা’ পরানো হয় এবং আমার শরীর সর্বপ্রথম ভূমি স্পর্শ করে। অর্থাৎ আমি জন্ম নিই। -আল ইবানা ২/৩৩১

আরবী ভাষার প্রাচীন কিতাব কিতাবুল জীম-এর লেখক আবু আমর আশশায়বানী (মৃত্যু : ২০৬ হিজরী) তার এ অনবদ্য গ্রন্থে লেখেন-

قال الأكوعي : التمائم الخرز الذي يعلق على الإنسان أو الدابة مخافة العين.

আকওয়ায়ী বলেন, ‘তামীমা’ হচ্ছে ক্ষুদ্র পাথরমালা, যা মানুষ বা প্রাণীর গায়ে ঝুলানো হয় বদ নযরের আশংকায়। -কিতাবুল জীম ১/৩২

একই সময়ের আরেক আরবী ভাষাবিদ ইমাম আবু যায়দ (মৃত্যু ২১৫ হিজরী) বলেন-

التميمة خرزة رقطاء تنظم في السير ثم يعقد في العنق.

তামীমা হল কালো ছিট বিশিষ্ট সাদা ক্ষুদ্র পাথর, যা চামড়ায় গাঁথা হয় অতপর গলায় ঝুলানো হয়। -গরীবুল হাদীস ১/১৮৩

প্রখ্যাত ফকীহ ও আরবী ভাষাবিদ আবু উবাইদ কাসিম ইবনে সাল্লাম রাহ. যে হাদীসে ঝাড়ফুঁক ও তামীমাকে শিরক বলা হয়েছে তা সম্পর্কে বলেন-

إنما أراد بالرقى والتمائم عندي ما كان بغير لسان العربية مما لا يدرى ما هو.

এ হাদীসে ঝাড়ফুঁক ও তামীমা দ্বারা ঐ সব ঝাড়ফুঁক ও তামীমা উদ্দেশ্য, যেগুলো অনারবী ভাষায় হয় এবং তার অর্থ বোঝা যায় না।     -গরীবুল হাদীস ২/১৯০

আবু উবায়দ-এর কথা থেকে বোঝা যায় যে তামীমা দু ধরনের। এক. যা আল্লাহর নাম, কুরআনের আয়াত বা যিকির দিয়ে হয়, দুই. যা কুফরি কালাম বা অন্য কিছু দিয়ে বা বোঝা যায় না এমন কোনো  ভাষায় হয়।

আবু উবায়দ রাহ. এ কিতাবটি রচনা করেন হাদীসের দুর্বোধ্য শব্দাবলির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে। এতে কিছু ভুল-বিচ্যুতিও হয়ে যায়;  এগুলো নিয়ে আবার কিতাব লেখেন তৎকালীন আরেক আরবী ভাষাবিদ ইবনে কুতাইবা রাহ.। তিনি স্বতন্ত্র একটি কিতাব রচনা করে তার নাম দেন إصلاح الغلط । সে রচনায় আবু উবায়দের উক্ত বক্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন-

و هذا يدل أن التمائم عند أبي عبيد المعوذات التي يكتب فيها وتعلق. قال أبو محمد : و ليست التمائم إلا الخرز وكان أهل الجاهلية يسترقون بها ويظنون بضروب منها أنها تدفع عنهم الآفات.  … قال الشاعر : إذا مات لم تفلح مزينة بعده + فنوطي عليه يا مزين التمائما. أي علقي عليه هذا الخَرَز ليقيه أسباب المنايا. أخبرنا أبو حاتم قال أخبرنا أبو زيد أن التميمة خرزة رقطاء .

অর্থাৎ, আবু উবায়দের এ কথা থেকে বুঝা যায়, তামীমা হল সেসব তাবীয, যা লেখা হয় এবং ঝুলানো হয়। অথচ ‘তামীমা’ হল শুধু ক্ষুদ্র পাথর; জাহেলীযুগের মানুষেরা যেগুলোকে রোগ প্রতিরোধ বা বিপদ-আপদ দূর করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত এবং তাদের বিশ্বাস ছিল এগুলো বিপদ-আপদ প্রতিহত করে।…

এক কবি বলেন, যদি সে মারা যায় তাহলে মুযায়না গোত্র তারপর আর সফল হতে পারবে না, তাই হে মুযায়না! তোমরা তার গায়ে তামীমা পরিয়ে দাও। অর্থাৎ এসব পাথর তাকে মৃত্যুর কারণসমূহ থেকে রক্ষা করবে।

আমাকে আবু হাতেম বলেছেন, তাকে (আরবী ভাষাবিদ) আবু যায়দ বলেছেন, তামীমা হল কালো ছিটযুক্ত সাদা পাথর। -ইসলাহুল গালাত পৃ. ৫৪

আবু যায়দের এ অভিমত আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছি।

ইমাম আবু উবায়দের ন্যায় ইমাম ইবনে কুতায়বাও হাদীসের দুর্বোধ্য শব্দাবলি নিয়ে কিতাব রচনা করেন, সে কিতাবেও এ প্রসঙ্গটি আনেন। তিনি বলেন-

التميمة خرزة كانت الجاهلية تعلقها في العنق وفي العضد فتوقى بها، وتظن أنها تدفع عن المرء العاهات، وكان بعضهم يظن أنها تدفع المنية حينا، ويدلك على ذلك قول الشاعر: إذا مات لم تفلح مزينة بعده + فنوطي عليه يا مزين التمائما.‘

قال أبو زيد: التميمة خرزة رقطاء، روى عقبة بن عامر أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: من تعلق تميمة فقد أشرك.

وبعض الناس يتوهم أن المعاذات هي التمائم، ويقول في قول عبد الله بن مسعود إن التمائم والرقى والتولة من الشرك. والرقى المكروهة ما كان بغير لسان العربية، وليس كذلك، إنما التميمة الخرز، ولا بأس بالمعاذات إذا كتب فيها القرآن وأسماء الله عز وجل.‘

তামীমা হল ক্ষুদ্র পাথর, যেগুলো জাহেলী যুগে লোকেরা গলায় ও বাহুতে ঝুলাতো। তাদের বিশ্বাস ছিল এগুলো মানুষের বিপদ আপদ রোধ করে। তাদের কেউ কেউ মনে করে, এগুলো কখনো মৃত্যুও প্রতিহত করে। তাদের এ বিশ্বাসের দলীল হল, কবির এ পঙক্তি-

: إذا مات لم تفلح مزينة بعده + فنوطي عليه يا مزين التمائما.

সে মারা গেলে মুযায়না গোত্র আর কখনো সফল হতে পারবে না। তাই হে মুযায়না! তোমরা তার গায়ে তামীমা ঝুলাও।

আবু যায়দ বলেন, তামীমা হল কালো ছিটবিশিষ্ট সাদা ক্ষুদ্র পাথর। উকবা ইবনে আমের রা. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, যে তামীমা ঝুলাল সে শিরক করল। কেউ কেউ মনে করেন যে, তাবীযই হল তামীমা। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ-এর হাদীস- ‘নিশ্চই তামীমা ঝাড়ফুঁক ও তিওয়ালা শিরক’। অনেকে মনে করেন, এ হাদীসের ‘তামীমা’ অর্থ তাবিজ । তাদের এ ধারণা ঠিক নয়। তামীমা হল ক্ষুদ্র পাথর। আর তাবীয; তাতে যদি কুরআন ও আল্লাহর নাম লিখা হয়, তাহলে  কোনো অসুবিধা নেই। -গরীবুল হাদীস ১/১৮৩

তামীমার অর্থ বুঝতে ইমাম আবু উবায়দ-এর যেমন স্খলন হয় তেমনিভাবে আরেক আরবী ভাষাবিদ লায়ছ ইবনে মুযাফ্ফর-এরও স্খলন হয়। তবে তার স্খলনটি আরেকভাবে। তিনি মনে করতেন তামীমা পাথর নয়। বরং তা চামড়া বা ফিতা, যাতে পাথরগুলো গাঁথা হয়।

আরবী সাহিত্যের অবিসংবাদিত ইমাম আযহারী তার এ মতের উপর কলম ধরেন এবং বিভিন্ন দলীল-প্রমাণ দিয়ে তা খ-ন করে বলেন, তামীমা ফিতা বা চামড়া নয়। বরং সেই পাথরগুলোকেই তামীমা বলা হয়, যা চামড়ায় গাঁথা হয়। তিনি লেখেন-

قال الليث: …والتميمة قلادة من سيور، وربما جعلت العوذة التي تعلق في أعناق الصبيان.

وفي حديث ابن مسعود: إن التمائم والرقى والتولة من الشرك.

قلت: التمائم واحدتها تميمة وهي خرزات كانت الأعراب يعلقونها على أولادهم يتقون بها النفس والعين بزعمهم، وهو باطل، وإياها أراد أبو ذؤيب الهذلي بقوله:

وإذا المنية أنشبت أظفارها

ألفيت كل تميمة لا تنفع

وقال آخر:

إذا مات لم تفلح مزينة بعده

فنوطي عليه يا مزين التمائما

وجعلها ابن مسعود من الشرك، لأنهم جعلوها واقية من المقادير والموت، فكأنهم جعلوا لله شريكا فيما قدر وكتب من آجال العباد والأعراض التي تصيبهم، ولا دافع لما قضى، ولا شريك له عز وجل فيما قدر، قلت: ومن جعل التمائم سيورا فغير مصيب، وأما قول الفرزدق:

وكيف يضل العنبري ببلدة

بها قطعت عنه سيور التمائم

فإنه أضاف السيور إلى التمائم لأن التمائم خرز يثقب ويجعل فيها سيور وخيوط تعلق بها، ولم أر بين الأعراب خلافا، أن التميمة هي الخرزة نفسها، وعلى هذا قول الأئمة. ‘

লাইছ বলেন, …তামীমা হল চামড়ার হার, আবার কখনো কখনো তাতে শিশুদের গলায় ঝুলানো কবজও গেঁথে দেয়া হয়। ইবনে মাসউদ রা.-এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নিশ্চয় তামীমা ঝাড়ফুঁক ও তিওয়ালা শিরক, (আযহারী বলেন,) সহীহ কথা হল, তামায়েম -তার এক বচন হল তামীমা- কিছু পাথর, যা জাহেলী যুগের লোকেরা তাদের সন্তানদের গলায় ঝুলিয়ে দিত। তাদের ধারণা অনুযায়ী বদনযর থেকে বাঁচার জন্য। কবি আবু যায়দ হুযালী তাঁর এ কবিতায় এটাই উদ্দেশ্য নিয়েছেন-

যখন মৃত্যু তার নখ বসিয়ে দিবে তখন তুমি সকল তামীমা অকার্যকর পাবে।

আরেক কবি বলেন, যদি এ মারা যায় তাহলে মুযায়না গোত্র আর কখনো সফল হতে পারবে না, সুতরাং হে মুযায়না গোত্র! তোমরা তার গায়ে তামীমা লাগিয়ে দাও।

আর এ পাথরকে ইবনে মাসউদ রা. শিরক বলেছেন, কেননা তারা (জাহেলী যুগের লোকেরা) এ তামীমাকে বিপদ-আপদ ও মৃত্যু থেকে নিজ শক্তিবলে রক্ষাকারী মনে করত। যেন আল্লাহ যে ভাগ্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, বান্দাদের যে জীবন-সীমা নির্ধারণ করে রেখেছেন এবং যেসব অসুস্থতা তাদের আক্রান্ত করবে সেসবের ক্ষেত্রে এগুলোকে আল্লাহর শরীক স্থির করে নিল। অথচ আল্লাহ যা ফায়সালা করে রেখেছেন তা প্রতিহত করার কেউ নেই। যা নির্ধারণ ও লিপিবদ্ধ করেছেন তাতে তাঁর কোনো শরীক নেই।

সুতরাং যারা বলে, তামীমা অর্থ চামড়ার হার- তাদের কথা ঠিক নয়। আর বিখ্যাত কবি ফারাযদাকের এ পংক্তিটি-

وكيف يضل العنبري ببلدة

بها قطعت عنه سيور التمائم

(কিভাবে আম্বরী এ শহরে হারিয়ে যাবে, অথচ এ শহরেই তার শরীর থেকে তামীমার সুতো কাটা হয়েছে । অর্থাৎ এ শহরেই সে বড় হয়েছে আর বড় হলে তামীমা খুলে শিরস্ত্রাণ পরিয়ে দেওয়া হয়, যেমন উপরে উল্লেখিত হয়েছে) তো ফারাযদাক এখানে سيور التمائم বলেছে অর্থাৎ ‘তামীমার ফিতা’ বলা হয়েছে سيور  -কে تمائم -এর দিকে এযাফত করেছে। তাহলে ফিতা এক জিনিস তামীমা আরেক জিনিস। তামীমা তো হল শুধুমাত্র পাথর, যার মধ্যে ছিদ্র করে সুতোয় বা ফিতায় গাঁথা হয়। অতপর তা ঝুলানো হয়। তামীমা অর্থ ছোট ছোট পাথর, ফিতা নয়; এ অর্থের ক্ষেত্রে আমি আরব বেদুঈনদের মাঝে কোনো দ্বিমত দেখিনি (আর আরব বেদুঈনরাই আরবী শব্দের মূল অর্থের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত)। আর এটাই আরবী ভাষাবিদ সকল ইমামের সিন্ধান্ত। -তাহযীবুল লুগাহ ১৪/১৮৪

অর্থাৎ আরবী ভাষাবিদ লাইছ তামীমা অর্থ করেছেন, চামড়ার মালা, যাতে কখনো কখনো সেসব কবয লাগানো হয়, যা বদনযর প্রতিহত করে বলে তাদের বিশ্বাস ছিল। লাইছ যে অর্থ বলেছেন তা আরেক ভাষাবিদ ইমাম খলীল ইবনে আহমাদ (মৃত্যু ১৭০হি.)ও বলেছেন। তিনি তার প্রসিদ্ধ কিতাব কিতাবুল আইন-এ বলেছেন-

التميمة قلادة من سيور. وربما جعلت العوذة التي تعلق في عناق الصبيان.

অর্থ তামীমা হল চামড়া বা ফিতা, যা গলায় পরা হয় কখনো কখনো তাতে কবয গাঁথা হয়। -কিতাবুল আইন ২/১৩৫

ইমাম আযহারী এ মতকে খ-ন  করেন এবং এটা প্রমাণ করেন যে, তামীমা হল পাথর অন্য কিছু নয়। আরবী শব্দের আসল অর্থ সম্পর্কে  আরব বেদুঈনেরা বেশি জানেন। তাই তিনি শেষে বলেন যে, তামীমা অর্থ-পাথর এক্ষেত্রে আরব বেদুঈনদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই । ইমাম আযহারী বহু সময় আরব বেদুঈনদের মাঝে কাটান। (দেখুন, সিয়ারু আলামিন নুবালা)

আল্লামা আযহারীর কথা পরবর্তী সাহিত্যিক মুহাক্কিকগণ গ্রহণ করেন। আল্লামা আযহারী একই রচনায় অন্যত্র বলেন-

والأصل في ذلك أن الصبي ما دام طفلا تعلق عليه أمه التمائم، وهي الخرز تعوذه بها العين، فإَذا كبر قطعت عنه .

শিশু যতদিন ছোট থাকে তার মা তার গায়ে তামীমা ঝুলিয়ে রাখে। তামীমা হল পাথর, যা দিয়ে বদনযর থেকে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হয়। যখন সে বড় হয় তখন তা খুলে ফেলা হয়।

হাদীসে বর্ণিত দুর্বোধ্য শব্দ-বিশ্লেষণ বিষয়ে যারা কিতাব লিখেছেন তাদের অন্যতম ব্যক্তি হলেন আল্লামা ইবনুল আসীর আলজাযারী। হাদীসের শব্দাবলীর বিশ্লেষণে তার গবেষণা সবার নিকট স্বীকৃত; তিনি তামীমার অর্থ লিখেছেন-

(هـ) التمائم جمع تميمة، وهي خرزات كانت العرب تعلقها على أولادهم يتقون بها العين في زعمهم، فأبطلها الإسلام.

ومنه حديث ابن عمر  وما أبالي ما أتيت إن تعلقت تميمة. والحديث الآخر من علق تميمة فلا أتم الله له كأنهم كانوا يعتقدون أنها تمام الدواء والشفاء، وإنما جعلها شركا لأنهم أرادوا بها دفع المقادير المكتوبة عليهم، فطلبوا دفع الأذى من غير الله الذي هو دافعه.

তামীমা হল পাথর, যা আরবরা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের সন্তানদের গলায় ঝুলাতো বদনযর থেকে বাঁচার জন্য। ইসলাম এসে তা বাতিল করে দেয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত হাদীস-

وما أبالي إن تعلقت تميمة

আরেক হাদীস-

من علق تميمة فلا أتم الله له

এ দুই হাদীসে তামীমা শব্দ এই অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। যেন তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এসব পাথর সুস্থতা আনয়নে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আর এ তামীমাকে শিরক বলা হয়েছে, যেহেতু তারা এ পাথর দ্বারা তাকদীর প্রতিহত করতে চাইত। আর এতে গায়রুল্লাহ্র মাধ্যমে বিপদ-আপদ দূর করতে চাওয়া হয়। অথচ একমাত্র আল্লাহই বিপদ দূরকারী। -আন নিহায়াহ  ১/১৯৮

আল্লামা মুরতাযা যাবীদী রাহ. বলেন-

و التميم : جمع تميمة، كالتمائم اسم لخرزة رقطاء تنظم في السير ثم يعقد في العنق، قال سلمة بن خرشب: تعوذ بالرقى من غير خبل … ويعقد في قلائدها التميم.

وقال رقاع بن قيس الأسدي: بلاد بها نيطت علي تمائمي … وأول أرض مس جلدي ترابها

وقال أبو ذؤيب: وإذا المنية أنشبت أظفارها … ألفيت كل تميمة لا تنفع

قال الأزهري: ومن جعل التمائم سيورا فغير مصيب، وأما قول الفرزدق: وكيف يضل العنبري ببلدة … بها قطعت عنه سيور التمائم، فإنه أضاف السيور إلى التمائم، لأن التمائم خرز يثقب ويجعل فيها سيور وخيوط تعلق بها. قال ولم أر بين الأعراب خلافا أن التميمة هي الخرزة نفسها.

তামীমা হল কালো ছিটবিশিষ্ট সাদা পাথর, যা চামড়ায় গাঁথা হয় অতপর গলায় পরা  হয়। (এরপর তিনি তিনজন আরবী ভাষাবিদদের বক্তব্য দ্বারা প্রমাণ দেন) সালামা ইবনুল খুরশুব বলেন, কোনো অসুস্থতা ছাড়াই তাকে ঝাড়ফুঁক করা হচ্ছে এবং তার গলার হারে তামীমা (পাথর) বাঁধা হচ্ছে। রিফা ইবনে কায়স বলেন, এটি এমন জায়গা, যেখানে আমাকে তামীমা পরানো হয়। এবং আমার শরীর সর্বপ্রথম ভূমি স্পর্শ করে। (অর্থাৎ আমি জন্ম গ্রহণ করি) আবু যুয়াইব বলেন, যখন মৃত্যু থাবা দিবে তখন সকল তামীমা অকার্যকর হয়ে যাবে। আযহারী বলেন, সুতরাং যারা বলে, তামীমা অর্থ চামড়ার হার তাদের কথা ঠিক নয়। এর আরো প্রমাণ হল বিখ্যাত কবি ফারাযদাকের এ পংক্তিটি-

وكيف يضل العنبري ببلدة

بها قطعت عنه سيور التمائم

কীভাবে আম্বরী এ শহরে হারিয়ে যাবে, অথচ এ শহরেই তার শরীর থেকে তামীমার সুতো কাটা হয়েছে। (অর্থাৎ এ শহরেই সে বড় হয়েছে আর বড় হলে তামীমা খুলে শিরস্ত্রাণ পরিয়ে দেওয়া হয়, যেমন উপরে উল্লেখিত হয়েছে)

তো ফারাযদাক এখানে سيور التمائم বলেছে অর্থাৎ তামীমার ফিতা বলা হয়েছে; سيور -কে تمائم -এর দিকে এযাফত করেছে। তাহলে ফিতা এক জিনিস তামীমা আরেক জিনিস। তামীমা তো হল কেবলমাত্র পাথর, যার মধ্যে ছিদ্র করে সুতোয় বা ফিতায় গাঁথা হয়। অতপর তা ঝুলানো হয়। তামীমা অর্থ ছোট ছোট পাথর, ফিতা নয়; এ অর্থের ক্ষেত্রে আমি আরব বেদুঈনদের মাঝে কোনো দ্বিমত দেখিনি। আর এটাই আরবী ভাষাবিদ সকল ইমামের সিন্ধান্ত। -তাজুল আরুস ৬/৭৬

ইমাম মুনযিরী বলেন-

التميمة: يقال:إنها خرزة كانوا يعلقونها، يرون أنها تدفع عنهم الآفات، واعتقاد هذا الرأي جهل وضلالة، إذ لا مانع إلا الله ولا دافع غيره، ذكره الخطابي رحمه الله.

তামীমা হল এক ধরনের ক্ষুদ্র পাথর, যা আরবরা গায়ে ঝুলাতো, তাদের বিশ্বাস ছিল, এগুলো বিপদ-আপদ প্রতিহত করে। এটি নিতান্তই মূর্খতা ও গোমরাহী। কেননা আল্লাহ্ই একমাত্র প্রতিহতকারী। -আত-তারগীব ৪/২৫০

আবুল ফাতাহ আলমুতাররিযী বলেন-

وفي حديث ابن مسعود إن التمائم والرقى والتولة من الشرك.

قال الأزهري : التمائم واحدها تميمة، وهي الخرزات كانت الأعراب يعلقونها على أولادهم ينفون بها النفس أي العين بزعمهم، وهو باطل.

ولهذا قال عليه السلام: من تعلق تميمة فقد أشرك، وإياها أراد أبو ذؤيب بقوله: وإذا المنية أنشبت أظفارها … ألفيت كل تميمة لا تنفع

قال ابن قتيبة : وبعضهم يتوهم أن المعاذات هي التمائم، وليس كذلك، إنما التميمة الخرزة، ولا بأس بالمعاذات إذا كتب فيها القرآن وأسماء الله تعالى .

আযহারী বলেন, তামীমা একধরনের ক্ষুদ্র পাথর, যা আরবরা তাদের বাচ্চাদের গায়ে ঝুলাতো। তাদের ধারণা ছিল, এটি বদনযর প্রতিহত করে। আর এটি বাতিল বিশ্বাস। এজন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে তামীমা ঝুলাল  সে শিরক করল। ইবনে কুতাইবা বলেন, কারো কারো ধারণা, তাবীযই তামীমা এটি ভুল। তামীমা হল শুধু পাথর আর কুরআন ও আল্লাহর নাম লিখে তাবীয পরিধানে কোন অসুবিধা নেই। -আলমুগরিব ১/১৭০

আল্লামা মাজদুদ্দীন ফায়রোযাবাদী, আল্লামা ইবনুল জাওযী ও আল্লামা তাফতাযানী  অনুরূপ লিখেছেন। (দেখুন আলকামুসুল মুহীত ৪/১৮; মুখতাসারুল মাআনী পৃ. ৪০৬)

এ তো গেল আরবী ভাষাবিদ সাহিত্যিক এবং হাদীস ব্যাখ্যাতাদের বক্তব্য । এসব বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, তামীমা হল পাথর। কুরআন বা দুআ সম্বলিত তাবীয তামীমা নয়- এটা ভাষাবিদদের নিকট যেমন স্বীকৃত কথা তেমনি আমাদের গায়রে মুকাল্লিদ বন্ধুদের (যাদের অনেকে কুরআন-আল্লাহর নাম-সিফাত বা দুআ সম্বলিত তাবীযকেও তামীমা এবং শিরক বলে প্রচার করেন) অনুকরণীয় বরেণ্য ব্যক্তিরাও বলে গিয়েছেন যে, তামীমা হল পাথর, তাবীয নয়। তাদের প্রামাণ্য ব্যক্তি শাওকানী রাহ. লেখেন-

والتمائم جمع تميمة، وهي خرزات كان العرب تعلقها على أولادهم يمنعون بها العين في زعمهم فأبطله الإسلام.

তামীমা হল ছোট ছোট পাথর, আরবরা তাদের সন্তানদের গায়ে ঝুলাতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, এগুলোা বদনযর প্রতিহত করে। ইসলাম এসে তা বাতিল করে দেয়। -নায়লুল আওতার ৮/২২১

নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহ. বলেন-

التميمة خرزات كانت العرب تعلقها على أولادهم يتقون بها العين في زعمهم فأبطلها الإسلام كما في النهاية.

তামীমা হল ছোট ছোট পাথরমালা, যা আরবের লোকেরা তাদের সন্তানদের গলায় ঝুলিয়ে দিত বদনযর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। ইসলাম এসে তা বাতিল করে দেয়। যেমন ইবনুল আসীর আননিহায়া গ্রন্থে বলেছেন।

শায়েখ জাযূলী কর্তৃক রচিত দালায়েলুল খায়রাতের ব্যাখ্যাতার একটি বক্তব্য খ-ন করতে গিয়ে শায়েখ আলবানী রাহ. বলেন-

وتأويل الشارح د “الدلائل” بأن التمائم جمع تميمة وهي الورقة التي يكتب فيها شيء من الأسماء والآيات وتعلق على الرأس مثلا للتبرك، فمما لايصح، لأن التمائم عند الإطلاق إنما هي الخرزات كما سبق عن ابن الأثير.

আর ব্যাখ্যাতার কথা যে, ‘তামীমা’র অর্থ হল ঐ কাগজ, যাতে আল্লাহর নাম ও আয়াত লিখা হয় অতপর তা মাথায় (বা অন্য কোথাও) ঝুলিয়ে দেয়া হয় তা ঠিক নয়। কেননা তামীমা বলতে পাথরকেই বুঝানো হয়। -সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, বর্ণনা ৪৯২ ১/২/৮৯১

এখানে এ কয়েকটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেই ইতি টানছি। আরবী অভিধান ও সাহিত্যের কিতাবে এ ধরনের বহু বক্তব্য বিদ্যমান, যা উল্লেখে আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। এসব বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, হাদীসে বর্ণিত ‘তামীমা’ হল, ছোট ছোট পাথর, যা সুতোয় গেঁথে গলায় বা শরীরে লাগানো হত, প্রচলিত তাবীয নয়।

প্রসঙ্গত এখানে আরো একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাওয়া দরকার যে, ‘তামীমা’ অর্থ পাথরের মালা হলেও পরবর্তীতে কেউ কেউ এতে বড় ব্যাপকতার অনুপ্রবেশ ঘটায়। অর্থাৎ তারা পাথরের মালাসহ কুরআন-আল্লাহর নাম-সিফাত দ্বারা লিখিত তাবিজকেও তামীমা বলতে থাকে। তাই অভিধান বা ফিকহ ও অন্যান্য বিষয়ের কোনো কোনো কিতাবে ‘তামীমা’ শব্দের ব্যবহার এমন ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে এটা স্পষ্ট যে হাদীসে বর্ণিত তামীমা অর্থ পাথর, তাবীয নয়। আল্লামা তূরবিশতী বলেন-

وأما التميمة فإنها في الأصل خرزات كانت العرب تعلقها على أولادهم ينفون بها العين بزعمهم، وقد اتسعوا فيها حتى سموا بها كل عوذة؛ وفي الحديث: التمائم والرقى من الشرك، فعلمنا أن المراد به منها ما كان من الجاهلية و رقاها على ما بين في غير موضع.

فأما القسم الذي يختص بأسماء الله  وكلماته فإنه غير داخل في جملته بل هو مستحب مرجو البركة عرف ذلك من أصل السنة، لا ينكر فضله و فائدته.

আর তামীমা হল, মূলত পাথর, যা আরবরা তাদের সন্তানের গায়ে ঝুলাতো; তাদের ধারণা অনুযায়ী বদনযর প্রতিহত করার জন্য। অবশ্য পরবর্তীতে লোকেরা এতে ব্যাপকতা নিয়ে আসে এবং পাথর, তাবীয সবকিছুকে তামীমা বলে। আর হাদীসে যে এসেছে, ‘তামীমা শিরক’- এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল জাহেলী যুগের তামীমা। তাই যেগুলো আল্লাহর নাম-কালাম দিয়ে হয় তা এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং তা মুস্তাহাব, বরকতপূর্ণ, সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। এর উপকারিতা অনস্বীকার্য। -আলমুয়াস্সার  ৩/১০০৮

আল্লামা মুনাভী বলেন-

والتمائم جمع تميمة و أصلها خرزات تعلقها العرب على رأس الولد لدفع العين فتوسعوا فيها فسموا بها كل عوذة.

তামীমা মূলত ছোট ছোট পাথর, যা আরবরা তাদের সন্তানের গায়ে ঝুলাতো বদনযর প্রতিহত করার  জন্য। অতপর তাতে ব্যাপকতা আসে এবং নিরাপত্তার জন্য যা কিছুই ঝুলানো হয় সবকিছুকে তামীমা বলে । -ফয়যুল কাদীর ২/৪৪৩

আল্লামা মোল্লা আলী কারী মুনাবীর বক্তব্য সম্পর্কে বলেন-

هو كلام حسن وتحقيق مستحسن.

এটি সুন্দর উক্তি, উত্তম বিশ্লেষণ। -মিরকাত   ৮/৩৭১

তো যাই হোক একথা সকলের কাছে স্বীকৃত ও সকলে এক্ষেত্রে একমত যে, হাদীসে যে ‘তামীমা’কে শিরক বলা হয়েছে সেই ‘তামীমা’ হল ঐ পাথরমালা, যা জাহেলী যুগে একটি শিরকী বিশ্বাসের ভিত্তিতে বাচ্চাদের গায়ে ঝুলানো হত।

এ পর্যন্ত আমরা আরবী ভাষাবিদ সাহিত্যিক এবং হাদীস ব্যখ্যাতাদের উক্তি ও বক্তব্য দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছি যে, হাদীসে বর্ণিত ‘তামীমা’ অর্থ, ছোট ছোট পাথর বিশেষ, যা তারা একটি শিরকী বিশ্বাসের ভিত্তিতে বদনযর ইত্যাদি প্রতিহত করার জন্য শিশুর গলায় ঝুলাতো। কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত ইত্যাদি সম্বলিত তাবীয তামীমা নয়। এখন সাহাবা তাবেয়ীনের কিছু বক্তব্য ও আমল উদ্ধৃত করছি, যেগুলো দ্বারাও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তামীমা হল ছোট ছোট পাথর, তাবীয নয়।

সাহাবী আবু কিলাবা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

قطع رسول الله صلى الله عليه وسلم التميمة من قلادة الصبي يعني الفضل بن العباس. قال وهي التي تخرز في عنق الصبي من العين.

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফযল ইবনে আব্বাস-এর গলার হার থেকে তামীমা ছিড়ে ফেলেন।

আবু কিলাবা বলেন, আর তামীমা হল, যা শিশুর গলায় গাঁথা হয় (অর্থাৎ চামড়া বা সুতোয় গেঁথে পরানো হয়)। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ২০৩৪২

আবু উবায়দা তার পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ-এর ঘটনা বর্ণনা করেন, তিনি একদা তার স্ত্রীর ঘাড়ে পাথর পরিহিত দেখেন, যা তার স্ত্রী ফোড়া জাতীয় এক রোগবিশেষ-এর জন্য পরিধান করেন। তখন ইবনে মাসউদ তা ছিড়ে ফেলেন এবং বলেন-

إن آل عبد الله بن مسعود لأغنياء من الشرك.

নিশ্চয় আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের পরিবার শিরক থেকে মুক্ত । -প্রাগুক্ত (২০৩৪৩)

আব্দুর রাযযাক রাহ. এ অধ্যায়ের শিরোনাম দেন- الأخذة والتمائم।

তো ইবনে মাসউদ রা.-এর হাদীসে আমরা দেখলাম যে, তাঁর স্ত্রীর ঘাড়ে ছিল পাথর। এ হল সে যুগের ‘তামীমা’। ইমাম আবদুর রাযযাক রাহ. এ অধ্যায়ের শিরোনাম দেন الأخذة و التمائم ‘উখযা ও তামীমা অধ্যায়’। ‘উখযা’ও এক ধরনের পাথরবিশেষ। তো আবদুর রাযযাকের শিরোনাম দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, ঐ যুগের তামীমা হল পাথর।

কুয়েত ধর্মমন্ত্রণালয়ের ফিকহী সেমিনারে একবারের বিষয়বস্তু ছিল তাবীয, তখন সেখানে অনেক প্রবন্ধ পঠিত হয়। সেসব প্রবন্ধের যেগুলো সেমিনারের পক্ষ থেকে স্বীকৃত হয় এমন একটি প্রবন্ধে বলা হয়-

اتفق العلماء على عدم جواز تعليق التميمة بالمعنى الجاهلي، وهي الخرز التي تعلق على الأولاد، يتقون بها العين في زعمهم. وعلى هذا المعنى يحمل أحاديث النهي عن تعليق التمائم، واختلفوا في جواز تعليق التميمة بالمعنى الآخر،  وهي ورقة يكتب فيها شيء من القرآن أو غيره، وعلق على الرأس مثلا للتبرك.

-আত তাশাফী বিল কুরআন ১/১০৩

এ বক্তব্যে পরিষ্কার যে, তাদের কাছে হাদীসে বর্ণিত তামীমার অর্থ তাবীয নয়, বরং চামড়ায় গাঁথা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর বিশেষ।

জাহেলী যুগে বদনযর থেকে রক্ষার্থে যেমন তারা তামীমা পরত ঠিক তেমনিভাবে অন্যান্য রোগের জন্য আরো বিভিন্ন ধরনের ধাতব বা অন্যান্য পাথর পরত। নবীজী যার গায়েই এ ধরনের যা কিছু দেখতেন তা শিরক বলে তা পরিধান করতে নিষেধ করতেন। এগুলোর একটি হল ودعة । ‘ওয়াদাআ’ হল কড়ি। নবীজী বলেন-

ومن تعلق ودعة فلا ودع الله له.

যে কড়ি ঝুলালো আল্লাহ যেন তাকে শান্তি ও স্থিরতায় না রাখেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৪০৪

আরেকটি হল, তামার বালা, যা বিশেষ  এক রোগের জন্য ব্যবহার করা হত। একবার নবীজীর কাছে দশজন ব্যক্তি বাইআত হতে আসেন। নবীজী নয়জনকে বাইআত করেন, দশম জনের হাতে এমন বালা ছিল বলে তাকে বাইআত করেননি। পরে সে তা খুলে ফেলে, তারপর বাইআত করেন।

সে যুগে এ ধরনের আরো বিভিন্ন জিনিস ব্যবহারের প্রচলন ছিল, যেগুলোর কথা হাদীসে বা সাহাবীদের বাণী-বর্ণনায় এসেছে, সেগুলোর কোনোটিই এমন নেই যে, যা লিখা হত, অতপর ঝুলানো হত।

মূলত আরব জাহেলী যুগে পাথরের প্রতি তাদের বেশ আসক্তি ছিল। পাথর নিয়ে তাদের বিভিন্ন অলীক ভ্রান্ত বিশ্বাস ছিল। তারা মনে করত এ পাথর বিভিন্ন রোগ-বালাই, আপদ-বিপদ থেকে মুক্তি দেয়। তাই তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন পাথর ব্যবহার করত এবং প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা নাম ছিল। একটি পাথর ছিল “خرزة العقرة”, যা নারীরা সন্তান গর্ভে না আসার জন্য কোমরে ধারণ করত। আরেকটি ছিল الينجلب, যা পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তি ফিরে আসার জন্য এবং তার মন পাওয়ার জন্য ব্যবহার করত। আরেকটির নাম الخصمة, যা কোনো প্রতাপশালী বাদশাহ্র দরবারে যাওয়ার সময় কাপড়ের নীচে অথবা তরবারির খাপের ভিতর রাখা হত ।

আরেকটি ছিল الدردبليس যা স্ত্রী স্বামীকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য/বশে আনার জন্য ব্যবহার করত। আরেকটি ছিল الهرةযা নারীরা পুরুষকে আকৃষ্ট করার জন্য পরত। এভাবে তারা আরো বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের পাথর ব্যবহার করত। এগুলোর মধ্যেই একটি হল এখানে আলোচ্য ‘তামীমা’। এটি সে পাথর, যা বদনযর বা বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার মানসে পরা হত। (দেখুন, আলমুফাস্সাল ফী তারীখিল আরব কাবলাল ইসলাম ১৩/ ১৬১)

তো যাই হোক এখানে অনেক আরবী ভাষাবিদ হাদীস ব্যখ্যাতার বক্তব্য উদ্ধৃত করা হল। ইলম, ভাষা ও শরীয়তের জ্ঞানের জগতে এরাই প্রামাণ্য। এঁদের সকলে বলে গিয়েছেন যে, তামীমা হল এক ধরনের পাথর। তাই এটা স্পষ্ট যে, তামীমা অর্থ তাবীয বলা ঠিক নয়।

তামীমা ও তাবিজ নামের দিক থেকেও ভিন্ন

তামীমা শব্দটি تم ধাতু থেকে নির্গত হয়েছে। تم অর্থ পূর্ণ ও শক্তিশালী। প্রসিদ্ধ ভাষাবিদ ইবনে ফারিস লেখেন, এ পাথরকে তামীমা নাম দিয়েছে এজন্য যে, তারা এ পাথরকে পরিপূর্ণ সুস্থতা দানকারী মনে করত।

…كأنهم يريدون أنها تمام الدواء والشفاء المطلوب.

-মুজামু মাকাঈসিল লুগাহ, পৃষ্ঠা ১৫২

তো এ পাথরকে তারা আল্লাহর পরিবর্তে সুস্থতা দানকারী মনে করত বলেই নামও দিয়েছে এমন যে, শুধু নাম থেকেই শিরক স্পষ্ট। এবং এই শিরকী বিশ্বাসের কারণেই এটির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ‘তাবীয’-এর অর্থ হল আশ্রয় দেয়া। অর্থাৎ এ লিখিত কাগজ গায়ে ঝুলিয়ে তাকে আল্লাহর আশ্রয়ে সোপর্দ করা হচ্ছে। সে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছে, তার জন্য আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে, লিখিত দুআ ও আল্লাহর নামের বরকতে তার শেফার আশা করা হচ্ছে। তাই এ নামে কোনো শিরক নেই । এতেই বুঝা যায় তামীমা জাহেলী নাম, তাবীয ইসলামী যুগে সৃষ্ট নাম। তাবীয নামটি সাহাবা-তাবেয়ীনের অনেকের থেকে বর্ণিত। তাঁরা দুআ ও কুরআন দ্বারা লিখিতগুলোকে তাবীয নাম দিয়েছেন। পূর্বে আমরা তাবীযের প্রচলন সংক্রান্ত যেসব বাণী ও আমল উল্লেখ করেছি সেগুলোতে এ নামটির ব্যবহার বেশ এসেছে। এ থেকে স্পষ্ট যে, তামীমা আর তাবীয দুই জিনিস; তামীমা শিরকী নাম, পক্ষান্তরে তাবীয শব্দে শিরকী কিছু নেই। বরং তাতে আল্লাহর আশ্রয় কামনার কথা রয়েছে।

তামীমা ও তাবীয সত্তাগতভাবেও ভিন্ন

এ তো গেল নামগত পার্থক্য। উভয়টির প্রতি সামান্য দৃষ্টি দিলে যে কারোর কাছে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠবে যে, উভয়টি সত্তাগতভাবেও ভিন্ন। তামিমা হল পাথর, তাদের আকীদা-বিশ্বাস ছিল যে, এ পাথরগুলো তাদেরকে সুস্থ করে, রক্ষা করে। এসব মূর্তি-পাথর-তারকা ইত্যাদি তাদের ভ্রান্ত ধারণা মতে একেক ক্ষেত্রে তাদের হাজত পূর্ণকারী। স্পষ্টতই এগুলো সম্পূর্ণ শিরকী ধ্যান-ধারণা। এই শিরকী বিশ্বাসের কারণেই তামীমা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম। পক্ষান্তরে তাবীয হল কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত বা দুআ সম্বলিত কাগজ। কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত বা  দুআর বরকত গ্রহণ শিরক তো নয়ই বরং একদিক থেকে তাওহীদ ও তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ্-এর নিদর্শন।

তো তামীমা হল পুরোটাই শিরক। কারণ এর সাথে একটি শিরকী বিশ্বাস জড়িত আছে। জড়পাথরকে মুক্তিদাতা ও আরোগ্যদাতা মনে করা হচ্ছে; যা সম্পূর্ণ শিরকী বিশ্বাস। কিন্তু তাবীযের বিষয়টি ভিন্ন। তাবীয যদি কুরআন-হাদীস ও আল্লাহর নাম-সিফাত দিয়ে লেখা হয় এবং তাবীয প্রদানকারী ও গ্রহণকারীর আকীদা-বিশ্বাস স্বচ্ছ হয় অর্থাৎ তারা উভয়ে একমাত্র আল্লাহ তাআলাকেই মুক্তিদাতা ও আরোগ্যদাতা মনে করে এবং তাবীয কেবলই বরকত লাভের উদ্দেশ্যে একটি ‘জায়েয ওসিলা’ হিসেবে ব্যবহার করে তাহলে তা শিরক হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না বরং নিয়ত খালেস হলে তা তাওহীদের বহিঃপ্রকাশ বলে গণ্য হবে। কেনান কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাতের মাধ্যমে শফা তলব করা মূলত আল্লাহ তাআলার দিকে রুজু করা।

যারা কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত-দুআর তাবীযকে শিরক বলে ফেলে মূলত এখানেই তাদের গলতটি হয়ে যায়। তারা হাদীসে বর্ণিত তামীমাকে তাবীয অর্থে ধরে নেয়। এবং তাবীযকেও তাতে অন্তর্ভুক্ত করে। তাকেও জাহেলী তামীমা বা পাথরের ন্যায় শিরক বলে দেয়। অথচ নবীজী জাহেলী তামীমা (যা পাথর)-কে শিরক বলেছেন, অন্যটিকে নয়।

কারণ অন্যটি শিরক হওয়ার কোনো কারণ তাতে বিদ্যমান নেই। শিরক হল, আল্লাহর যাত এবং সিফাতে কাউকে শরীক করা। তো যে ব্যক্তি স্বচ্ছ বিশ্বাস নিয়ে এবং শরয়ী নীতিমালা রক্ষা করে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত বা দুআ সম্বলিত কোনো তাবীয পরিধান করল সে তো আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেনি; বরং আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করেছে। আর এ তাবীযকে যে সুস্থতার কারণ বা মাধ্যম মনে করে তা তো আল্লাহর নাম বা তাঁর কালামের কারণেই।

যাইহোক উপরোক্ত আলোচনা থেকে পরিষ্কার যে, হাদীসে বর্ণিত তামীমা অর্থ তাবীয নয়, বরং তা হল পাথরমালা। যাকে ঘিরে তাদের মাঝে একটি শিরকী বিশ্বাস ছিল। বিষয়টি বড় বড় বিদ্বান, ভাষাবিদ ও হাদীসের ব্যাখ্যাকারীগণ স্পষ্টভাবে বলে গিয়েছেন। তাই ‘তামীমা’র শিরক তাবীযে আসবে না। আর আমাদের আলোচ্য তাবীযের মধ্যে শিরক হওয়ার কোনো কারণও নেই, তাই তাকে শিরক বলা যাবে না। অবশ্য তাবীযের মধ্যে যদি কোনো ‘মুনকার’ ও শিরকী কথাবার্তা থাকে, কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত ব্যতীত অন্য কোনো কুফরী কালাম থাকে তাহলে তা ভিন্ন এবং নিঃসন্দেহে তা শিরক। এমনিভাবে তাবীয বা তাবীয প্রদানকারী সম্পর্কেও কোনো বাতিল আকীদা, আপত্তিকর বিশ্বাস যদি থাকে; যেমন তাকে মুক্তিদাতা বা আরোগ্যদাতা মনে করল বা তাকে বিশেষ কোনো ক্ষমতার অধিকারী মনে করল- এ ধরনের বিশ্বাসও কুফরি বিশ্বাস। বরং এই বিশ্বাস রাখতে হবে, আরোগ্য দানকারী একমাত্র আল্লাহ, মুক্তিদাতা একমাত্র আল্লাহ।


আল কাউসারে প্রকাশিত ধারাবাহিক লেখার সংকলন –
পর্ব – এক
পর্ব – দুই
পর্ব – তিন কামিং…

Facebook Comments