আমার সব কিছু ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহকে খুঁজে পেয়েছি : নওমুসলিম নার্গিস

363
নার্গিস

অস্ট্রেলিয়ার নওমুসলিম মিসেস নার্গিস বালদাচিনের ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে বলেছেন, “আমি প্রথমে সূরা এখলাস পড়ি। এ সূরার মাত্র কয়েকটি আয়াত পড়ে আমি খ্রিস্টান ধর্মের বিশ্বাস বা চিন্তাগত বহু সমস্যার সমাধান পেয়ে যাই এবং বুঝতে পারি, জীবনের পূর্ণতায় পৌঁছার জন্য ইসলাম ধর্মই একমাত্র অবলম্বন হতে পারে।”

তিনি আরো বলেন, “এতদিন বিভিন্ন বিষয়ে যেসব প্রশ্ন আমার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল তার সব কিছুর উত্তর আমি কোরআন শরীফে পেয়ে যাই। এরপর থেকে আমি নিয়মিত কোরআন পড়া ও এর অর্থ উপলব্ধি করার চেষ্টা শুরু করি।“

নার্গিসের আগের নাম ছিল ইয়াভেত বালদাচিনো। তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আইন বিশেষজ্ঞ। ক্যাথলিক খ্রিস্টান এই নারী ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর নিজের নাম রাখেন নার্গিস বালদাচিনো।

ইসলাম একটি যুগোপযোগী ধর্ম এবং এ ধর্ম মানব প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একমাত্র ইসলাম ধর্মই মানব সমাজের উন্নতি ও সৌভাগ্যের পথ দেখায়। এ কারণে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যারা জীবনের প্রকৃত অর্থ খোঁজার বা উপলব্ধি করার চেষ্টা করছেন তারাই ইসলাম ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন এবং এ ধর্মের সুশীতল ছায়াতলে আত্মিক উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করছেন। নওমুসলিম মিসেস ইয়াভেত বালদাচিনো হচ্ছেন এদেরই একজন। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কারণ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন,

“ছোটবেলা থেকেই আমি ধর্মের বিষয়ে উৎসাহী ছিলাম এবং বলতে গেলে তখন থেকেই এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করি। আমি লক্ষ্য করলাম, মানব জীবনের বহু সমস্যা, চাহিদা কিংবা প্রশ্নের কোনো সদুত্তর খ্রিস্টান ধর্মে নেই। তাই খ্রিস্টানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি এড়িয়ে চলতাম।”

মিসেস ইয়াভেত বালদাচিনো আরো বলেন, “নিজের অজান্তেই আমি একক সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অনুভব করতাম। দু’টি প্রশ্ন সবসময়ই আমাকে তাড়া করত। একটি হচ্ছে আমি এ পৃথিবীতে কিভাবে এসেছি, আমার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যইবা কি? আর অপরটি হচ্ছে আমার ভবিষ্যত গন্তব্য কোথায়?”

ইয়াভেত বালদাচিনোর মতে, “খ্রিস্টান ধর্মের একটি বড় সমস্যা বা দুর্বলতা হচ্ছে, এ ধর্মের বক্তব্য বা নিদর্শনগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই এবং এতে অসংখ্য পরস্পর বিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়।” এ প্রসঙ্গে তিনি খ্রিস্টধর্মে প্রচলিত ‘ত্রিত্ববাদ’ বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করেন যা খুবই অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর। তার মতে, “ত্রিত্ববাদে এক ঈশ্বরের মধ্যে পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার যে মিলনের কথা বলা হয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তিনি বলেন, “শৈশবকালে আমি বাবা মায়ের কাছে ধর্ম বিষয়ে নানা প্রশ্ন করতাম এবং তারা আমার প্রশ্নের জবাবও দিতেন। কিন্তু এরপরও সে সব উত্তর আমার অতৃপ্ত আত্মাকে তৃপ্ত করতে পারত না।”

একটি সফরের মধ্য দিয়ে নার্গিস বালদাচিনোর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কাহিনী শুরু হয়। তিনি মিশরে তার মায়ের কাছে কিছুদিন কাটিয়ে ইউরোপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন মিশরে অবস্থান করার পর তিনি সেখানেই থেকে গেলেন। এ সম্পর্কে নার্গিস বলেন, “কথা ছিল তিনি মিশরে পাঁচ দিন এরপর ইউরোপে ছয় মাস কাটাবেন। কিন্তু ঘটনা ঘটল ঠিক এর উল্টো। অর্থাৎ তিনি মিশরে ছয় মাস থাকলেন এবং এটা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, “একটি বিষয়ে অবাক হলাম আর তা হচ্ছে, মিশরের মুসলমানরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি ছিল এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক দয়া ও ভ্রাতৃত্ববোধ লক্ষ্য করেছি। নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়া এমনকি ইউরোপের অনেক দেশে আমি দেখেছি বহু মানুষ সম্পদশালী হলেও তাদের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা বিরাজ করে। কিন্তু কেনো এ শূন্যতা-তা তখন বুঝতে পারিনি। মিশরের জনগণের মধ্যে অভাব বা বৈষয়িক সমস্যা থাকলেও তাদের উত্তম চাল-চলন ও ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করে এবং মুসলমানদের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলে। এরই সূত্র ধরে আমি মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনের সঙ্গে পরিচিত হই।”

কোরআন শরীফ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি বড় মোজেযা এবং এটি মানব সমাজকে পথ নির্দেশকারী একটি মহাগ্রন্থ। খ্যাতনামা ফরাসি দার্শনিক আর্নেস্ট রেনান পবিত্র কোরআন শরীফকে একটি বিস্ময়কর ও চমৎকার গ্রন্থ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, “আমার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য বই সংরক্ষিত আছে। এসব বই একবারের বেশি আমি কখনই পড়িনি। কিন্তু এগুলোর মধ্যে একটি বই ছিল আমার নিত্য সঙ্গী এবং যখনই ক্লান্ত হয়ে পড়তাম তখনই বইটি পড়তাম। বইটি একবার নয় বহুবার পড়েছি।”

অস্ট্রেলিয়ার নও মুসলিম নার্গিস যখন মিশরের নীল নদের তীরে কোরআন পড়তেন তখন তিনি অনুভব করতেন তার সামনে পূর্ণতা ও আধ্যাত্মিকতার বিশাল দরজা উন্মোচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “যখনই কোরআনের সুমধুর ধ্বনি আমার কানে ভেসে আসত তখনই আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যেতাম। আমি সুযোগ পেলেই নীল নদের তীরে গিয়ে কোরআন পড়তাম। কোনো গ্রন্থের সঙ্গেই এ ঐশী গ্রন্থের তুলনা হয় না এবং সব কিছুই এ গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।”

তিনি বলেন, “আমার সব প্রশ্নের উত্তর কোরআন শরীফে পেয়ে গেছি। আমি কোরআন অধ্যয়ন করার সময় অনুভব করতাম কোরআনে উল্লেখিত বক্তব্যগুলো এমন কারো যিনি এ পৃথিবী ও মানুষ সৃষ্টি করেছেন।”

বালদাচিনো মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে কালেমা শাহাদাত পড়ে পবিত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। মুসলমান হওয়ার পরও তিনি ইসলামের শিক্ষার ব্যাপারে অধ্যয়ন ও গবেষণা অব্যাহত রাখেন। তিনি বলেন, “ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ছয় বছর পর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন (আ.) এবং কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারি। এর ফলে ইসলামে শিয়া মাজহাব সম্পর্কে আমার গভীর আগ্রহ জন্মে। আমার মতে শিয়া মাজহাবে ভিন্নতা রয়েছে এবং মানুষের মধ্যে আলাদা চিন্তা-চেতনার জন্ম দেয়। শিয়া মাজহাব গ্রহণ করার পর আমি আধ্যাত্মিকতার একবারে গভীরে চলে যাই।”

ইসলাম ধর্মে মেয়েদের শালীন পোশাক বা হিজাব ব্যবহার বাধ্যতামূলক। হিজাব নারীদের আত্মসম্মানবোধ ও মানসিক প্রশান্তি দেয়। যে কোনো সমাজে সত্যিকারের উন্নতি ও নিরাপত্তা দেয় হিজাব। নওমুসলিম নারীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরপরই হিজাবের প্রতিও আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। কিন্তু হিজাব পছন্দ করলেও অনেক ক্ষেত্রেই তারা বিরোধিতা ও নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হন।

মিসেস বালদাচিনো এ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, “আমি অস্ট্রেলিয়ার এমন এক সমাজে বাস করতাম যেখানকার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাবে আমি নিজের সৌন্দর্য প্রকাশে আগ্রহী ছিলাম। কারণ অস্ট্রেলিয়ার সমাজে একজন নারীর সৌন্দর্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলাম ধর্ম গ্রহনের পর পরিবারের পক্ষ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিতাড়িত হওয়ার আশঙ্কায় প্রথমে হিজাব ব্যবহার থেকে বিরত থাকতাম। কিন্তু হজ্জ্ব করার পর হিজাব আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। আগে আমি ভাবতাম হিজাব পোশাক মাত্র। কিন্তু পরে হিজাবের প্রয়োজনীয়তা ও এর গুরুত্ব  উপলব্ধি করতে পারি।”

বর্তমানে এ নও মুসলিম নিজের নাম রেখেছেন নার্গিস এবং তিনি ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলছেন। তার মতে, “আল্লাহকে পাওয়ার জন্য এবং জীবনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারের মূল্য রয়েছে। তিনি বলেন, “আমার যা কিছু ছিল তার সবই ধর্মের জন্য ত্যাগ করেছি। বিনিময়ে আমি জীবনের লক্ষ্য এবং আল্লাহকে খুঁজে পেয়েছি।”-প্যারিস টুডে

Facebook Comments